যে মেয়েকে ভুলতে পারেনি

লামিসা যখন ঢাকার উত্তরায় সেই বাড়ির সামনে দাঁড়ালো, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাড়িটা তিনতলা, সাদা রং করা, সামনে ছোট একটা উঠোন। মালিক আব্দুল্লাহ সাহেবের পরিবার। লামিসা তাদের দোতলার একটা রুম ভাড়া নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে পড়ছে, আলাদা থাকার দরকার হয়েছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

আব্দুল্লাহ সাহেবের স্ত্রী সালমা আপু তাকে রুম দেখিয়ে দিলেন। “এইটা তোমার। বাথরুম আলাদা। নিচের ফ্রিজ ব্যবহার করতে পারবে।” সালমা আপুর কণ্ঠ নরম।

লামিসা জিনিসপত্র নামাচ্ছিল তখনই সিঁড়ি দিয়ে কেউ নামলো। লম্বা, কালো চুল, ধূসর টি-শার্ট। চোখে একটা অদ্ভুত শীতল ভাব।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

“এই যে মুশফিক,” সালমা আপু বললেন, “লামিসা এসেছে। তোমার রুমের পাশেই তার।”

মুশফিক থেমে গেল। চোখ তুলে লামিসার দিকে তাকালো। এক সেকেন্ড। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে চলে গেল। কোনো সালাম নেই, কোনো কথা নেই।

লামিসা চোখ কুঁচকে তাকালো। এমন অভদ্র ছেলে আগে দেখেনি।

প্রথম সপ্তাহটা কেটে গেল টানাপোড়েনে। মুশফিক সকালে উঠেই রান্নাঘর দখল করে। লামিসা যখন কফি বানায়, সে চুপচাপ তার মগ নিয়ে চলে যায়। একদিন লামিসা দেখল তার প্রিয় কফি পাউডারের টিন খালি। মুশফিকের টেবিলে সেই টিন পড়ে আছে।

“তুমি আমার কফি খেয়েছ?” লামিসা জিজ্ঞেস করল।

মুশফিক বই থেকে চোখ না তুলে বলল, “ভুল করে নিয়েছিলাম। ফেরত দিয়েছি।”

“ফেরত দিয়েছ মানে খালি টিন?”

“হ্যাঁ।”

লামিসা রেগে গিয়ে তার টেবিল থেকে একটা উপন্যাস তুলে নিল। “তাহলে এটাও ভুল করে নিলাম।”

মুশফিক উঠে দাঁড়াল। “ওইটা আমার প্রিয় বই।”

“আমার কফিও প্রিয় ছিল।”

তারা দুজনে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। সালমা আপু রান্নাঘর থেকে এসে হাসতে হাসতে বললেন, “আবার শুরু হয়েছে। তোমরা দুজন যেন বিড়াল-কুকুর।”

আব্দুল্লাহ সাহেবও হাসলেন। “ছেলেবেলা থেকেই মুশফিক এমন। কারো সাথে মিশতে চায় না।”

লামিসা রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করল। রাগের চোটে বইটা টেবিলে ছুঁড়ে মারল। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হলো, মুশফিকের চোখে শুধু রাগ ছিল না। আরও কিছু ছিল। যেন সে চেনে তাকে।

দ্বিতীয় সপ্তাহে ঝগড়া আরও বেড়ে গেল। লামিসা তার ল্যাপটপ চার্জার নিয়ে গেল, মুশফিক তার হেডফোন লুকিয়ে রাখল। একদিন লামিসা সিঁড়িতে নামতে গিয়ে মুশফিকের সাথে ধাক্কা খেল। তার বুকের সাথে লামিসার কাঁধ লেগে গেল। মুশফিক হাত বাড়িয়ে তাকে ধরল যাতে না পড়ে। সেই স্পর্শ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। লামিসার ত্বক জ্বলে উঠল। মুশফিকের আঙুল তার বাহুতে চেপে ধরেছিল। তার শ্বাস গরম।

“সাবধান হও,” মুশফিক ফিসফিস করে বলল। কণ্ঠে রাগ নেই। অন্য কিছু।

লামিসা সরে গেল। “তুমিই যে রাস্তা আটকে রেখেছিলে।”

সে রাতে লামিসা ঘুমাতে পারল না। মুশফিকের হাতের উষ্ণতা এখনও গায়ে লেগে আছে। কেন সে এত বিরক্ত হয়? কেন প্রতিবার দেখা হলেই বুকের ভিতরটা অদ্ভুত লাগে?

একদিন দুপুরে বাড়িতে কেউ নেই। সালমা আপু বাজারে গেছেন, আব্দুল্লাহ সাহেব অফিসে। মুশফিকও ক্লাসে। লামিসা নিচের স্টোরে রুমে গেল পুরনো কিছু জিনিস খুঁজতে। তার নিজের একটা বাক্স হারিয়ে গেছে মনে হয়েছিল। স্টোর রুমে অনেক পুরনো জিনিস। একটা কাঠের বাক্স চোখে পড়ল। ধুলোয় ঢাকা। খুলে দেখল ভিতরে চিঠির বাঁধন।

প্রথম চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়ল।

“লামিসা,

তুমি আজকেও আমার স্বপ্নে এসেছিলে। তোমার হাসিটা এখনও মনে আছে। সেই দিনটা… যখন তুমি প্রথমবার আমার দিকে তাকিয়েছিলে। আমি জানি তুমি আমাকে চিনো না। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি। প্রতিটা রাত তোমার নাম নিয়ে কাটে।

—যে তোমাকে কখনো ভোলেনি”

লামিসার হাত কাঁপতে লাগল। চিঠিগুলো অনেক পুরনো। কাগজ হলুদ হয়ে গেছে। তারিখ দেখে বুঝল আট-নয় বছর আগের। তখন তার বয়স মাত্র বারো-তেরো। সে কখনো এই শহরে আসেনি। তাহলে কে লিখেছে?

আরও কয়েকটা চিঠি পড়ল। প্রতিটাতেই তার নাম। প্রতিটাতেই একই ব্যথার অনুভূতি। কেউ তাকে ভুলতে পারেনি। কেউ তাকে প্রতিদিন মনে রেখেছে।

শেষ চিঠিটায় লেখা,

“আমি জানি একদিন তুমি ফিরে আসবে। হয়তো অন্য নামে, অন্য রূপে। কিন্তু আমি চিনে নেব। কারণ আমার হৃদয় শুধু তোমার জন্যই তৈরি।”

লামিসা চিঠিগুলো নিজের রুমে নিয়ে এল। রাতে মুশফিক বাড়ি ফিরলে সে তার দরজায় কড়া নাড়ল।

মুশফিক দরজা খুলে দাঁড়াল। “কী চাই?”

লামিসা চিঠিগুলো তার সামনে ধরল। “এগুলো তোমার লেখা?”

মুশফিকের মুখ শক্ত হয়ে গেল। চোখের পাতা একবার কেঁপে উঠল। তারপর সে শান্ত গলায় বলল, “না।”

“মিথ্যে বলো না। এখানে আমার নাম। তুমি কীভাবে জানতে আমার নাম?”

মুশফিক চিঠিগুলোর দিকে তাকাল না। “আমি জানি না কী বলছ। আমার রুমে যেও না আর।”

সে দরজা বন্ধ করে দিল।

লামিসা করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভিতরটা দুরুদুরু করছে। মুশফিক মিথ্যে বলছে। সে জানে। চিঠির হাতের লেখা তার নোটবুকের সাথে মিলে যায়। সে দেখেছে।

কিন্তু কেন সে অস্বীকার করছে? আর কীভাবে আট বছর আগে তার নাম জানত?

সে রাতে লামিসা জানালার পাশে বসে রইল। নিচের রাস্তায় গাড়ির আলো এসে পড়ছে। মুশফিকের রুমের আলো জ্বলে আছে। সেও জেগে আছে।

লামিসার মনে হলো, এই ঝগড়াগুলো শুধু ঝগড়া নয়। এর নিচে আরও গভীর কিছু আছে। কিছু যা তাকে ভয় পায়, আর একই সাথে টানে।

পরের দিন সকালে মুশফিক রান্নাঘরে এসে দেখল লামিসা কফি বানাচ্ছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। লামিসা পেছন ফিরে তাকাল। তাদের চোখ মিলল। এইবার রাগ নেই। শুধু একটা গভীর নীরবতা। যেন দুজনেই জানে কোনো একটা সত্য লুকিয়ে আছে, যা এখনও বেরোয়নি।

মুশফিক কাছে এল। তার শরীরের গরম লামিসার গায়ে লাগল। সে লামিসার কাঁধের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে চিনির ডিবেটা নিল। আঙুল লামিসার ঘাড়ে হালকা ছুঁয়ে গেল। লামিসার শ্বাস আটকে গেল।

“তোমার কফি শেষ হয়ে গেছে,” মুশফিক ফিসফিস করে বলল। “আমি নতুন কিনে এনেছি।”

লামিসা তাকিয়ে রইল তার দিকে। মুশফিকের চোখে সেই একই অদ্ভুত আলো। যেন সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারছে না।

লামিসা ধীরে বলল, “তুমি চিঠিগুলো লিখেছিলে। আমি জানি।”

মুশফিক কিছু বলল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পেছন ফিরে চলে গেল।

লামিসার হাত কাঁপছে। কফি মগটা টেবিলে রাখল। বুকের ভিতরটা জ্বলছে। এই ছেলে তাকে ঘৃণা করে না। সে তাকে ভালোবাসে। অনেক দিন ধরে। এত গভীরভাবে যে চিঠি লিখে রেখেছে বছরের পর বছর।

কিন্তু কেন লুকাচ্ছে?

লামিসা সিদ্ধান্ত নিল। সে জানবে। যাই হোক না কেন। মুশফিকের অতীত, তার নাম জানার কারণ, সব কিছু। কারণ এই টানাপোড়েন আর সহ্য হচ্ছে না। প্রতিবার তার কাছে গেলে শরীর জ্বলে ওঠে। প্রতিবার তার চোখে চোখ রাখলে মনে হয় সে হারিয়ে যাচ্ছে।

এবং লামিসা হারাতে রাজি।

পরের কয়েকদিন লামিসা চুপচাপ মুশফিককে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। সে আর ঝগড়া করল না। বরং প্রতিবার সুযোগ পেলে তার কাছে গেল। একদিন রাতে দুজনে ছাদে উঠল। আকাশ পরিষ্কার, তারা জ্বলছে। নিচে শহরের আলো।

মুশফিক সিগারেট ধরাল। লামিসা তার পাশে দাঁড়াল।

“তুমি কেন আমার নাম জানতে?” লামিসা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল।

মুশফিক ধোঁয়া ছাড়ল। “আমি জানি না তুমি কী বলছ।”

“মিথ্যে বলো না। চিঠিগুলোর হাতের লেখা তোমার। আমি তোমার নোটবুক দেখেছি।”

মুশফিক মুখ ঘুরাল। “তুমি আমার জিনিসপত্র ঘাঁটছ কেন?”

“কারণ তুমি আমার কফি লুকাচ্ছ। আমার বই নিচ্ছ। আর এখন দেখছি তুমি বছরের পর বছর আমার নাম নিয়ে চিঠি লিখেছ।”

মুশফিক সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলল। তারপর হঠাৎ লামিসার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। দুই হাতে তার কাঁধ ধরল। জোরে।

“তুমি বুঝতে পারছ না,” তার কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা। “কিছু জিনিস বলা যায় না।”

লামিসা তার চোখের দিকে তাকাল। এত কাছে। মুশফিকের শ্বাস তার মুখে লাগছে। তার শরীর গরম। লামিসার বুকের ভিতরটা দুরুদুরু করে কাঁপছে।

“বলো,” লামিসা ফিসফিস করল। “আমি শুনব।”

মুশফিকের চোখ বন্ধ হয়ে গেল। তার কপাল লামিসার কপালে ঠেকল। “তুমি যদি জানতে… আমি কতবার তোমাকে খুঁজেছি। কতবার ভেবেছি হয়তো আর পাব না।”

লামিসা হাত তুলে তার গালে রাখল। “তাহলে বলো। কীভাবে জানলে আমার নাম?”

মুশফিক হঠাৎ সরে গেল। “না। এখন না।”

সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। লামিসা ছাদে একা দাঁড়িয়ে রইল। শরীর কাঁপছে। মুশফিকের স্পর্শ এখনও কাঁধে জ্বলছে। তার গলার স্বর এখনও কানে বাজছে।

সে রাতে লামিসা ঘুমাতে পারল না। ভোরের দিকে মুশফিকের রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। ভিতরে মুশফিক বিছানায় বসে আছে। মাথা দুই হাতে নিয়ে।

লামিসা ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করল।

মুশফিক উঠে দাঁড়াল। “এখানে কেন?”

লামিসা তার দিকে এগিয়ে গেল। “কারণ আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ। অথচ প্রতিবার তোমার চোখে চোখ রাখলে মনে হয় তুমি আমাকে খেয়ে ফেলতে চাও।”

মুশফিকের চোখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে এক পা এগিয়ে এল। “তুমি জানো না তুমি কী বলছ।”

“জানি।” লামিসা আরও কাছে গেল। তাদের শরীর প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। “তুমি আমাকে চাও। আমিও তোমাকে চাই। এই ঝগড়াগুলো শুধু ছুতো। তুমি ভয় পাচ্ছ।”

মুশফিক হঠাৎ তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। দুই হাত তার মাথার দুপাশে রাখল। তার শরীর লামিসার শরীরের সাথে লেগে আছে। গরম। শক্ত।

“আমি ভয় পাই না,” মুশফিক ফিসফিস করল। তার ঠোঁট লামিসার কানের কাছে। “আমি শুধু… তোমাকে হারাতে চাই না আবার।”

লামিসা তার গলায় হাত রাখল। “তাহলে হারাবে না। বলো সব।”

মুশফিকের ঠোঁট তার গালে ছুঁয়ে গেল। হালকা। তারপর ঘাড়ে। লামিসার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। শরীর জ্বলে উঠল। মুশফিকের হাত তার কোমরে গিয়ে পড়ল। আঙুল তার চামড়ার নিচে ঢুকে গেল।

“লামিসা…” তার কণ্ঠ ভাঙা। “তুমি যদি জানতে আমি কত রাত তোমার নাম নিয়ে কাটিয়েছি…”

লামিসা তার মুখ তুলে ধরল। তাদের ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে গেল। “তাহলে চুমু খাও। আর বলো।”

মুশফিক আর সহ্য করতে পারল না। তার ঠোঁট লামিসার ঠোঁটে এসে পড়ল। গভীর। ক্ষুধার্ত। লামিসা তার গলা জড়িয়ে ধরল। মুশফিকের জিভ তার মুখে ঢুকে গেল। স্বাদ তিক্ত আর মিষ্টি মেশানো। সিগারেট আর চায়ের গন্ধ। লামিসার হাঁটু দুর্বল হয়ে গেল। মুশফিক তাকে আরও জোরে চেপে ধরল। তার হাত লামিসার পিঠ দিয়ে নিচে নামল। কোমর ঘিরে ধরল।

চিুম্ভ ভাঙল যখন দুজনেই হাঁপাচ্ছে। মুশফিকের কপাল তার কপালে।

“আট বছর আগে,” মুশফিক ফিসফিস করল। “আমার বাবা একটা গ্রামে প্রজেক্টে গিয়েছিল। আমিও গিয়েছিলাম। সেখানে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। নদীতে। সে হাসছিল। তার নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম একজনকে। তারা বলেছিল লামিসা। তারপর আর দেখিনি। কিন্তু ভুলতে পারিনি। প্রতিদিন চিঠি লিখেছি। ভেবেছি হয়তো একদিন পাব।”

লামিসার চোখ ছলছল করে উঠল। “সেই মেয়ে আমি?”

“আমি জানি না। কিন্তু যখন তুমি এই বাড়িতে এলে… তোমার হাসি দেখে মনে হলো। চোখ দেখে মনে হলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম যদি তুমি না হও। আর যদি হও… তাহলে আমি আবার হারাব।”

লামিসা তার গালে চুমু খেল। “আমি সেই মেয়ে কিনা জানি না। কিন্তু আমি এখন এখানে। আর আমি যাচ্ছি না।”

মুশফিক তাকে আবার চুমু দিল। এবার আরও গভীর। তার হাত লামিসার জামায় ঢুকে গেল। গরম ত্বক। লামিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তার মুখে। মুশফিক তাকে বিছানার দিকে নিয়ে গেল। দুজনে পড়ে গেল। মুশফিকের শরীর তার ওপর। ভারী। গরম। লামিসা তার পিঠে নখ বসায়। মুশফিক তার ঘাড়ে চুমু খেল, কামড় দিল হালকা করে। লামিসার শরীর কেঁপে উঠল।

“আরও,” লামিসা ফিসফিস করল।

মুশফিক তার জামা খুলল। ঠোঁট তার বুকে নেমে গেল। লামিসার আঙুল তার চুলে জড়িয়ে গেল। রাতটা কেটে গেল আগুনে। দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। ঘামে ভেজা। শ্বাস মেশানো। মুশফিক প্রতিবার নাম ধরে ডাকল। লামিসাও। যেন বছরের পর বছরের ক্ষুধা এক রাতে মেটাতে চায়।

ভোরের আলো এলেও তারা আলাদা হয়নি। মুশফিক লামিসাকে বুকে চেপে ধরে আছে। তার আঙুল লামিসার চুলে খেলছে।

“আমি এখনও ভয় পাই,” মুশফিক বলল। “যদি তুমি চলে যাও…”

লামিসা তার বুকে চুমু খেল। “যাব না। কিন্তু তোমাকে সব বলতে হবে। পুরোটা।”

মুশফিক চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “সেই গ্রামে… আমি শুধু তোমাকে দেখেছিলাম না। তোমার পরিবারের সাথেও কথা হয়েছিল আমার বাবার। তারা বলেছিল তোমরা শহরে চলে যাবে। আমি খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি। তারপর ভেবেছি হয়তো স্বপ্ন ছিল। কিন্তু চিঠিগুলো লিখতে থাকলাম। কারণ থামাতে পারিনি।”

লামিসা উঠে বসল। চাদর জড়িয়ে। “আমার পরিবার তখন গ্রামেই ছিল। কিন্তু আমি… আমি মনে করতে পারছি না কোনো ছেলেকে।”

মুশফিক হাসি দিল। বিষণ্ণ হাসি। “হয়তো তুমি দেখোনি। আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

লামিসা তার হাত ধরল। “এখন আর দূরে দাঁড়িয়ো না।”

তারা আবার কাছাকাছি এল। এবার চুমুটা নরম। আস্তে আস্তে। যেন সময় নিয়ে একে অপরকে চেনে নিতে চায়। মুশফিকের হাত তার পিঠে ঘুরছে। লামিসা তার বুকে কান পাতল। হৃদয়ের শব্দ শুনল। দুরুদুরু। তার জন্যই।

সেই সকালে বাড়িতে কেউ জানল না। কিন্তু সালমা আপু রান্নাঘরে এসে দুজনকে একসাথে কফি বানাতে দেখে চোখ কুঁচকে তাকালেন। কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন।

লামিসা জানত, এখনও সব শেষ হয়নি। মুশফিকের ভয় এখনও আছে। আর তার নিজের মনেও প্রশ্ন আছে। সেই গ্রামের মেয়ে সত্যিই সে নিজে কিনা। কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো এই মুহূর্ত। মুশফিকের হাত তার হাতে। তার চোখে সেই গভীর আগুন।

আর সেই আগুন এখন আর লুকানো যাবে না।

দিনগুলো কেটে গেল অন্যরকমভাবে। আর ঝগড়া নেই। এখন শুধু চোখে চোখ রাখা, আঙুল ছোঁয়া, রাতে একে অপরের রুমে যাওয়া। মুশফিক আর লুকায় না। লামিসার কফি এখন তার টেবিলেই থাকে। লামিসা তার বই পড়ে, মুশফিক পাশে বসে থাকে। মাঝে মাঝে চুমো খায় যখন কেউ দেখে না।

কিন্তু একদিন রাতে মুশফিক লামিসাকে নিয়ে ছাদে গেল। হাতে একটা পুরনো ছবি।

“এটা দেখ,” সে বলল।

ছবিতে একটা গ্রামের নদী। দূরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফেরা। চুল বাতাসে উড়ছে।

লামিসা ছবিটা হাতে নিল। “এটা… আমি?”

“আমি সেদিন তুলেছিলাম। দূর থেকে। তুমি ঘুরে তাকাওনি। কিন্তু আমি জানি।”

লামিসা ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। মনে করার চেষ্টা করল। নদীর পাড়। বাতাস। কেউ কি তাকে দেখেছিল সেদিন?

হঠাৎ মনে পড়ল। সেই দিন তার খালা এসেছিলেন। তারা নদীতে গিয়েছিলেন। একটা ছেলে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তাকিয়েছিল। লামিসা ভয় পেয়ে খালার হাত ধরে সরে গিয়েছিল।

“আমি মনে পড়েছে,” লামিসা ফিসফিস করল। “তুমি সেদিন নীল শার্ট পরেছিলে।”

মুশফিকের চোখ ছলছল করে উঠল। “তুমি মনে রেখেছ?”

লামিসা ছবিটা রেখে তার দিকে ঘুরল। “এখন মনে পড়েছে। তুমি আমাকে দেখেছিলে। আর আমিও… যদিও ভয় পেয়েছিলাম।”

মুশফিক তাকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে। “আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি চলে যাবে আবার। তাই যখন তুমি এই বাড়িতে এলে… আমি রাগ দেখাতে চেয়েছি। যাতে তুমি কাছে না আসো। যাতে আমি আবার না ভাঙি।”

লামিসা তার বুকে মুখ গুঁজল। “এখন আর ভাঙবে না। আমি এখানেই থাকব।”

মুশফিক তার মুখ তুলে ধরল। চুমু দিল। এবার আর ক্ষুধার্ত নয়। গভীর। ভালোবাসার। লামিসা তার জিভের সাথে মিলিয়ে দিল। দুজনের শরীর আবার জ্বলে উঠল। মুশফিক তাকে ছাদের মেঝেতে শুইয়ে দিল। চাঁদের আলোতে তাদের ছায়া মিশে গেল।

মুশফিক তার জামা খুলল আস্তে আস্তে। প্রতিটা ইঞ্চি চুমু দিয়ে। লামিসা তার চুলে হাত বুলোল। যখন মুশফিক তার বুকে মুখ রাখল, লামিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাতের বাতাস তাদের গায়ে লাগছে। কিন্তু শরীরের আগুন আরও বেশি।

মুশফিক উঠে এসে তার চোখের দিকে তাকাল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি। আট বছর ধরে। আর এখন… আরও বেশি।”

লামিসা তার ঠোঁটে আঙুল রাখল। “আমিও। যদিও আমি জানতাম না। কিন্তু এখন জানি।”

তারা আবার এক হলো। এবার ধীরে। প্রতিটা স্পর্শ গভীর। মুশফিক প্রতিবার থেমে থেমে তার নাম ডাকে। লামিসাও। যেন নিশ্চিত করতে চায় এটা স্বপ্ন নয়। যখন শেষ হলো, দুজনে পাশাপাশি শুয়ে রইল। মুশফিকের হাত তার পেটে।

“তুমি কি সত্যিই থাকবে?” মুশফিক জিজ্ঞেস করল।

লামিসা পাশ ফিরে তার দিকে তাকাল। “থাকব। আর তোমাকে প্রতিদিন মনে করাব যে আমি এখানেই আছি।”

পরের দিন সকালে আব্দুল্লাহ সাহেব দুজনকে একসাথে নাস্তা করতে দেখে হাসলেন। “অবশেষে শান্তি।”

সালমা আপু বললেন, “আমি তো প্রথম দিন থেকেই বুঝেছি। মুশফিকের চোখে সেই মেয়ের ছবি দেখেছিলাম। এখন সেই মেয়েই এসেছে।”

লামিসা লজ্জায় মাথা নিচু করল। মুশফিক তার হাত চাপল টেবিলের নিচে।

সেই সপ্তাহে তারা আরও কাছাকাছি এল। রাতে একসাথে পড়াশোনা। দুপুরে একসাথে রান্না। মাঝে মাঝে লুকিয়ে চুমু। একদিন মুশফিক লামিসাকে তার পুরনো চিঠিগুলো দেখাল। সবগুলো। প্রতিটাতেই তার নাম। প্রতিটাতেই একই প্রার্থনা—যেন একদিন সে ফিরে আসে।

লামিসা পড়তে পড়তে কেঁদে ফেলল। মুশফিক তাকে জড়িয়ে ধরল। “এখন আর কাঁদতে হবে না। তুমি এসে গেছ।”

একদিন সন্ধ্যায় তারা আবার ছাদে গেল। মুশফিক পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। ভিতরে একটা সাদা সুতার চুড়ি।

“এটা সেই গ্রাম থেকে এনেছিলাম,” সে বলল। “ভেবেছিলাম যদি কখনো পাই তোমাকে… তাহলে দেব।”

লামিসা হাত বাড়িয়ে দিল। মুশফিক চুড়িটা পরাল। তারপর তার হাত চুমু খেল।

“এখন তুমি আমার,” মুশফিক বলল।

লামিসা তার দিকে তাকাল। চোখে আগুন। “আর তুমি আমার।”

তারা আবার চুমু খেল। এবার আর কোনো ভয় নেই। কোনো লুকানো কথা নেই। শুধু দুজন মানুষ, যারা বছরের পর বছর দূরে থেকেও একে অপরকে হারায়নি।

রাত গভীর হলো। শহরের আলো জ্বলছে। ছাদে দুজন শুয়ে আছে। মুশফিকের বুকের ওপর লামিসার মাথা। তার আঙুল লামিসার চুলে খেলছে।

“আর কখনো ঝগড়া করব না,” মুশফিক বলল।

লামিসা হাসল। “করব। কারণ তুমি আমার কফি লুকাবে আবার।”

মুশফিক হেসে উঠল। প্রথমবার সত্যিকারের হাসি। “তাহলে লুকাব। আর তুমি আমার বই নিয়ে যাবে। আর আমরা আবার ঝগড়া করব। তারপর আবার মিটমাট করব। এইভাবেই।”

লামিসা উঠে বসল। তার দিকে তাকাল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মুশফিক।”

মুশফিক তাকে টেনে নিল। “আমিও। আজীবন।”

তারা আবার কাছাকাছি এল। শরীর মিশে গেল। রাতটা আবার আগুনে জ্বলে উঠল। এবার আর কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো অতীতের ছায়া নেই। শুধু দুজনের হৃদয়, একসাথে ধুকপুক করছে।

সকালে যখন সূর্য উঠল, লামিসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। মুশফিক এসে তার পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। চুমু খেল তার ঘাড়ে।

“আজ কী করবে?” মুশফিক জিজ্ঞেস করল।

লামিসা পেছন ফিরে তার দিকে তাকাল। হাসল। “তোমার সাথে ঝগড়া করব। তারপর মিটমাট করব। আর সারাজীবন এভাবেই কাটাব।”

মুশফিক তাকে চুমু দিল। গভীর। প্রতিশ্রুতির মতো।

বাড়ির নিচে সালমা আপু ডাকলেন, “নাস্তা হয়ে গেছে!”

দুজনে হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নামল। হাত ধরাধরি করে। আর কোনো দূরত্ব নেই। কোনো লুকানো চিঠি নেই। শুধু একটা ভালোবাসা, যা আট বছর ধরে অপেক্ষা করেছিল। আর এখন পেয়েছে তার ঠিকানা।

লামিসার হাতে সেই সাদা চুড়ি জ্বলজ্বল করছে। মুশফিকের চোখে সেই একই আগুন, যা চিঠিগুলোতে লেখা ছিল।

এবার আর কোনো বিচ্ছেদ নেই। শুধু একসাথে পথ চলা। প্রতিদিন। প্রতি রাত। আগুন নিয়ে। ভালোবাসা নিয়ে।

....
👁 9