অস্বীকারের আড়ালে মনের কথা

ঢাকার এক অন্ধকার রাত। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে থেমে গেছে। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছের ছায়া আর হালকা কুয়াশা মিশে আছে। ইনশিরাহ হেঁটে যাচ্ছিল রাস্তার পাশ দিয়ে। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ, চোখে ক্লান্তির ছাপ। অফিস থেকে দেরিতে বের হয়েছিল। বাসের শেষ ট্রিপ মিস হয়ে গেছে। একা হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে হিসাব কষছিল—বাসায় পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

হঠাৎ পায়ের নিচে কিছু একটা লাগল। রাস্তার ধারে একটা ভাঙা পাথর। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। হাঁটুতে ব্যথা উঠল। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখল, তার মোবাইল ফোন রাস্তায় ছিটকে গেছে। স্ক্রিন ফাটা। চার্জও নেই। চারপাশে তাকিয়ে কোনো রিকশা বা গাড়ি দেখতে পেল না। মনে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। একা মেয়ে রাতের বেলা রাস্তায়—এই শহরে কত কথা শোনা যায়।

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট এল। গাড়িটা ধীরে এগিয়ে এসে থামল তার কাছে। ড্রাইভারের সিট থেকে নেমে এল একজন পুরুষ। লম্বা, শান্ত মুখ, চোখে একটা গম্ভীর আলো। কালো শার্ট আর জিন্স পরা।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

“আপনি কি ঠিক আছেন?” গলাটা গম্ভীর কিন্তু নরম।

ইনশিরাহ উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগ ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “হাঁটুতে লাগেছে। ফোনটাও নষ্ট হয়ে গেছে।”

মেহরাব হাঁটু গেড়ে বসে তার ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিন দেখে মাথা নাড়ল। “এটা এখন কাজ করবে না। আপনি কোথায় যাবেন?”

“মিরপুর।” ইনশিরাহ একটু দ্বিধা করেই বলল।

মেহরাব কোনো প্রশ্ন না করে গাড়ির দরজা খুলে দিল। “উঠুন। আমি ওদিকেই যাচ্ছি।”

ইনশিরাহ এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। অপরিচিত পুরুষ। কিন্তু চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হল—এই মানুষটা বিপজ্জনক নয়। সে উঠে পড়ল। গাড়ির ভেতরটা পরিষ্কার, হালকা সুগন্ধ। মেহরাব চালাতে শুরু করল।

কয়েক মিনিট নীরবতা। তারপর মেহরাব বলল, “রাতের বেলা একা হাঁটা উচিত না। বিশেষ করে এই এলাকায়।”

ইনশিরাহ হালকা হাসল। “অফিস দেরি হয়ে গেছে। বাস মিস করেছি।”

মেহরাব তার দিকে একবার তাকাল। চোখের কোণে একটা অদ্ভুত নরম ভাব। “নাম?”

“ইনশিরাহ।”

“মেহরাব।” সে নিজে থেকেই বলল।

গাড়ি চলতে লাগল। রাস্তার আলো এসে পড়ছিল মেহরাবের মুখে। ইনশিরাহ লক্ষ করল তার হাতের নড়াচড়া—ধীর, নিয়ন্ত্রিত। কথা বলার ধরনও শান্ত। কোনো অতিরিক্ত কৌতূহল নেই, অথচ যত্ন আছে। যখন সে কথা বলছিল, গলার স্বরটা যেন ইনশিরাহর ভেতরে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

মিরপুরের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগে মেহরাব একটা ফার্মেসি থামিয়ে হাঁটুর ব্যথার জন্য মলম আর ব্যান্ডেজ কিনে দিল। কোনো কথা না বলেই। ইনশিরাহ বলতে গেল টাকা দেবে, সে হাত তুলে থামিয়ে দিল। “প্রয়োজন নেই।”

বাসার সামনে গাড়ি থামল। ইনশিরাহ নামার আগে মুখ ফিরিয়ে বলল, “ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে…”

মেহরাব তার চোখের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড। সেই তাকানোর মধ্যে এমন কিছু ছিল যা ইনশিরাহর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল। “সাবধানে থাকবেন।” শুধু এটুকু বলে সে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।

ইনশিরাহ বাসার ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বুকের ভেতর এখনও সেই শান্ত গলার স্বর বাজছে। কয়েক মিনিটের পরিচয়। অথচ মনে হচ্ছিল যেন অনেকক্ষণ ধরে চেনে। সেই রাতে ঘুম আসছিল না। বারবার মনে পড়ছিল মেহরাবের চোখ, তার হাতের নড়াচড়া, আর সেই একদৃষ্টিতে তাকানো।

পরের দিনগুলোতেও সেই মুখটা মনে থেকে গেল। অফিসে বসে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ সেই রাতের কথা মনে পড়ত। কেউ জানত না। সেও কাউকে বলেনি। শুধু নিজের ভেতরে সেই অদ্ভুত অনুভূতি লালন করে রেখেছিল।

কয়েক মাস কেটে গেল। ইনশিরাহ নতুন একটা চাকরি পেল। বড় একটা কর্পোরেট অফিস। যোগদানের দিন সে একটু উত্তেজিত ছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ।

অফিসে ঢুকে প্রথমেই যে জিনিসটা চোখে পড়ল—পরিচালকের কেবিনের দরজায় নামফলক। মেহরাব রহমান। ডিরেক্টর।

ইনশিরাহর পা থেমে গেল। বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগল। সেই রাতের মানুষটা। এখানে। তার বস হিসেবে।

কেবিনের ভেতর থেকে মেহরাব বেরিয়ে এল। কালো স্যুট পরা, চোখে একই গম্ভীর আলো। ইনশিরাহর দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আপনি নতুন?”

ইনশিরাহর গলা শুকিয়ে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, “জি। ইনশিরাহ।”

মেহরাব কোনো পরিচয়ের চিহ্ন দেখাল না। শুধু মাথা নেড়ে বলল, “এইচআর-এর সাথে কথা বলে নিন। কাজ শুরু করুন।” তারপর ঘুরে কেবিনে ঢুকে গেল।

ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল যেন কেউ বুকের ভেতর থেকে কিছু কেড়ে নিয়েছে। সেই রাতের মানুষটা এখন এমন আচরণ করছে যেন তাদের কখনো দেখা হয়নি। যেন সেই গাড়ির ভেতরের কথাগুলো, সেই তাকানো, সেই যত্ন—সব মিথ্যে ছিল।

সেদিন থেকেই শুরু হল এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। অফিসে মেহরাব তাকে দেখেও যেন চিনত না। কিন্তু ইনশিরাহর চোখ এড়িয়ে যেত না। প্রতিবার মিটিংয়ে তার দিকে তাকালেই মনে হত—সে জানে। অথচ স্বীকার করছে না।

ইনশিরাহর মনে প্রশ্ন জমে উঠতে লাগল। কেন? কেন সে ভুলে যাওয়ার ভান করছে? সেই রাতে কি শুধু দয়া ছিল? নাকি আরও কিছু?

রাতের অন্ধকারে বাসায় ফিরে ইনশিরাহ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করত। তার চোখে সেই রাতের ছবি ভেসে উঠত। মেহরাবের হাত যখন তার ফোন তুলে দিয়েছিল, যখন ব্যান্ডেজ এনে দিয়েছিল—সেই স্পর্শের স্মৃতি এখনও গায়ে কাঁপুনি তোলে।

অফিসের দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। ইনশিরাহ কাজ করত মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু মেহরাবের উপস্থিতি যেন বাতাসে মিশে থাকত। প্রতিবার তার গলার স্বর শুনলেই বুকের ভেতর সেই অদ্ভুত কম্পন ফিরে আসত।

একদিন সন্ধ্যায় অফিস খালি হয়ে গেছে। ইনশিরাহ শেষ কাজ সারছিল। হঠাৎ কেবিনের দরজা খুলল। মেহরাব দাঁড়িয়ে।

“এখনো আছেন?” তার গলা শান্ত।

ইনশিরাহ উঠে দাঁড়াল। “শেষ করে যাচ্ছি।”

মেহরাব এক ধাপ এগিয়ে এল। দূরত্ব কমে এল। ইনশিরাহর শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠল। মেহরাবের চোখে সেই একই গভীর তাকানো। যেন কিছু বলতে চাইছে, অথচ বলছে না।

“সাবধানে যাবেন।” শুধু এটুকু বলে সে ঘুরে দাঁড়াল।

ইনশিরাহর ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে চাইছিল কিছু বলতে—সেই রাতের কথা, তার আচরণের কথা। কিন্তু মেহরাব ইতিমধ্যেই কেবিনে ঢুকে গেছে।

রাতের আঁধারে বাসায় ফিরে ইনশিরাহ বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে সেই মুহূর্তগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। মেহরাবের উপস্থিতি, তার গন্ধ, তার চোখের গভীরতা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। যে আকর্ষণ দিন দিন আরও গভীর হচ্ছিল। আর সে জানত—এটা শুধু কৌতূহল নয়। এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু।

অফিসের পরিবেশ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছিল। ইনশিরাহ তার কাজের দায়িত্ব ভালোভাবে সামলাচ্ছিল। কিন্তু মেহরাবের আচরণ তাকে বিভ্রান্ত করে রাখছিল। সামনে এলে শান্ত, পেশাদার। কোনো ব্যক্তিগত কথা নয়। অথচ দূর থেকে তার দৃষ্টি ইনশিরাহর ওপর থেমে থাকত। মিটিংয়ে যখন সে কথা বলত, মেহরাব মনোযোগ দিয়ে শুনত। অন্যদের চেয়ে একটু বেশি।

সহকর্মীরা লক্ষ করতে শুরু করেছিল। চায়ের টেবিলে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল।

“দেখেছ? স্যার নতুন মেয়েটার দিকে কেমন করে তাকায়।”

“প্রতিদিন তার রিপোর্ট আলাদা করে চেক করে।”

ইনশিরাহ শুনত, কিন্তু কিছু বলত না। ভেতরে ভেতরে তার নিজেরও প্রশ্ন জমছিল। একদিন সাহস করে মেহরাবের কেবিনে গেল।

দরজায় নক করে ঢুকল। মেহরাব ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাথা তুলে তাকাল।

“কী বিষয়?”

ইনশিরাহ গলা পরিষ্কার করে বলল, “স্যার… আপনি কি আমাকে চিনতে পারেন?”

মেহরাবের চোখে এক মুহূর্তের জন্য কিছু একটা পরিবর্তন হল। তারপর আবার শান্ত হয়ে গেল। “কী বলছেন?”

“কয়েক মাস আগে… এক রাতে রাস্তায়… আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।”

মেহরাব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর হালকা টোকা দিল। “অনেক লোককে সাহায্য করি। সব মনে থাকে না।”

ইনশিরাহর বুকটা চেপে গেল। সে জানত এটা সত্য নয়। সেই রাতের তাকানো, সেই যত্ন—ভুলার মতো ছিল না। কিন্তু মেহরাব এড়িয়ে গেল।

“আচ্ছা।” ইনশিরাহ মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। দরজা বন্ধ করার সময় পেছন ফিরে তাকাল। মেহরাব তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখে এমন একটা গভীরতা যা কথায় প্রকাশ পায় না।

সেই দিন থেকে মেহরাবের যত্ন আরও স্পষ্ট হতে লাগল। ইনশিরাহর প্রজেক্টে সমস্যা হলে সে নিজে এসে সাহায্য করত। দেরি হলে গাড়ি ব্যবস্থা করে দিত। একদিন ইনশিরাহ অসুস্থ হয়ে অফিসে এসেছিল। মেহরাব খবর পেয়ে নিজে এসে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দিল, আর পরের দিন ফলের ঝুড়ি পাঠাল। কোনো নাম ছাড়া।

সহকর্মীদের আলোচনা আরও বেড়ে গেল।

“ওদের মধ্যে কিছু আছে।”

“স্যার এত যত্ন কখনো কাউকে করেনি।”

ইনশিরাহ সব শুনত। ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব চলত। একদিকে রাগ—কেন সে অস্বীকার করছে। অন্যদিকে এক অদ্ভুত টান। মেহরাব যখন কাছে আসত, তার গায়ের হালকা সুগন্ধ, গলার স্বর—সব মিলিয়ে ইনশিরাহর শরীরে একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে যেত। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে পড়ত তার চোখ। কল্পনায় তার হাতের স্পর্শ অনুভব করত।

এক সন্ধ্যায় অফিসে বড় মিটিং ছিল। সবাই চলে যাওয়ার পর ইনশিরাহ আর মেহরাব বাকি রইল। রিপোর্ট শেষ করতে হবে। ঘরের আলো মৃদু। বাইরে শহরের আওয়াজ।

মেহরাব চেয়ার টেনে ইনশিরাহর পাশে বসল। তাদের কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ইনশিরাহর হাত কাঁপছিল কিবোর্ডে। মেহরাব তার হাতের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

“আপনার হাত ঠান্ডা।” তার গলা একটু ভারী।

ইনশিরাহর শ্বাস থেমে গেল। সে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। মেহরাবের চোখ খুব কাছে। এত কাছে যে তার শ্বাস অনুভব করা যাচ্ছিল।

“স্যার…”

মেহরাব হাত সরাল না। “আমার নাম মেহরাব। অফিসের বাইরে।”

ইনশিরাহর বুক দ্রুত বাজছিল। সে জানত এই মুহূর্তটা বিপজ্জনক। অথচ সরতে পারছিল না। মেহরাবের আঙুল ধীরে তার কবজির ওপর ঘুরছিল। উষ্ণ। দাবিদার।

হঠাৎ দরজায় শব্দ হল। কেউ আসছিল। মেহরাব হাত সরাল। মুহূর্তের মধ্যে আবার পেশাদার মুখ ফিরে এল।

ইনশিরাহ সেদিন বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গাল ছুঁয়ে দেখল। গরম। শরীর জুড়ে একটা অস্থিরতা। সে জানত—এই টান দুজনেরই। মেহরাব লুকোচ্ছে। কিন্তু কেন?

পরের কয়েকদিন মেহরাব আরও দূরত্ব রাখল। কিন্তু তার চোখ মিথ্যা বলত না। প্রতিবার ইনশিরাহর দিকে তাকালেই সেই গভীর ক্ষুধা ফুটে উঠত। ইনশিরাহও আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। রাতে একা শুয়ে কল্পনা করত—মেহরাব যদি সেই রাতের মতো আবার কাছে আসে। যদি তার হাত ধরে টানে। যদি…

একদিন অফিসের পার্টিতে সবকিছু বদলে গেল। সবাই ব্যস্ত। ইনশিরাহ বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে মেহরাব এল।

“আপনি একা কেন?”

ইনশিরাহ ঘুরে দাঁড়াল। “একটু হাওয়া লাগছিল।”

মেহরাব আরও কাছে এল। হাত বাড়িয়ে তার চুলের একটা আলগা কুঞ্চল সরিয়ে দিল। আঙুলের স্পর্শ গাল ছুঁয়ে গেল। ইনশিরাহর চোখ বন্ধ হয়ে এল।

“আপনি জানেন না… আপনাকে দেখলে কী হয় আমার।” মেহরাবের গলা ফিসফিসানি।

ইনশিরাহ চোখ খুলল। “তাহলে কেন লুকোচ্ছেন?”

মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, “কারণ আমি জানি—একবার শুরু হলে থামা যাবে না।”

সেই রাতে ইনশিরাহ বাসায় ফিরে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। শরীর জুড়ে আগুন। মেহরাবের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল। তার স্পর্শের স্মৃতি শরীরে জ্বলছিল। সে জানত—এখন আর পেছনে ফিরে যাওয়ার পথ নেই।

সত্যটা বেরিয়ে এল একদিন দুপুরে। ইনশিরাহ অফিসের ফাইল খুঁজতে গিয়ে পুরনো একটা রেকর্ড দেখতে পেল। মেহরাবের ব্যক্তিগত ফোল্ডারে নয়—একটা অ্যাসিস্ট্যান্টের কম্পিউটারে ভুলে খোলা ফাইল। সেখানে ইনশিরাহর নাম। তার পুরনো অফিসের ঠিকানা। এমনকি সেই রাতের তারিখও নোট করা।

ইনশিরাহর হাত কাঁপতে লাগল। মেহরাব খোঁজ নিয়েছিল। সেই রাতের পর থেকেই।

সে সোজা কেবিনে গেল। দরজা খুলে ঢুকে বলল, “আপনি খোঁজ নিয়েছিলেন আমার সম্পর্কে।”

মেহরাব ল্যাপটপ বন্ধ করল। উঠে দাঁড়াল। দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরটা হঠাৎ ছোট হয়ে এল।

“হ্যাঁ।” সে স্বীকার করল। কোনো দ্বিধা নেই।

“কেন?”

মেহরাব কাছে এল। একধাপ, দুইধাপ। ইনশিরাহ পেছনে সরে দেয়ালে পৌঁছে গেল। মেহরাব তার দুইপাশে হাত রেখে তাকে ঘিরে ফেলল।

“কারণ সেই রাতে আপনাকে দেখে আমি থামতে পারিনি। আপনার চোখ, আপনার কণ্ঠস্বর… সবকিছু আমাকে টানছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম আপনি কে। কোথায় থাকেন। কী করেন।”

ইনশিরাহর শ্বাস দ্রুত হচ্ছিল। মেহরাবের শরীর খুব কাছে। তার গরম শ্বাস গালে লাগছিল।

“তাহলে অস্বীকার করলেন কেন?”

মেহরাব মাথা নিচু করে ইনশিরাহর কানের কাছে এল। “কারণ আমি জানি আমি কতটা বিপজ্জনক হতে পারি আপনার জন্য। আমি চাইনি আপনি অফিসে অস্বস্তিতে পড়ুন। কিন্তু প্রতিদিন আপনাকে দেখে… নিজেকে আর আটকাতে পারছি না।”

তার ঠোঁট ইনশিরাহর কানের লতিতে হালকা ছুঁয়ে গেল। ইনশিরাহর শরীর কেঁপে উঠল। সে হাত তুলে মেহরাবের শার্টের সামনে ধরল।

“তাহলে আর লুকাবেন না।”

মেহরাব আর অপেক্ষা করল না। তার ঠোঁট এসে পড়ল ইনশিরাহর ঠোঁটে। গভীর, ক্ষুধার্ত, দাবিদার। ইনশিরাহর হাত তার চুলের ভেতর ঢুকে গেল। মেহরাব তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শরীর শরীরে চেপে ধরে চুমু খেলতে লাগল যেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে।

চুমু ভেঙে মেহরাব তার কপালে কপাল রাখল। “আজ রাতে আমার সাথে থাকো।”

ইনশিরাহ মাথা নাড়ল। কোনো দ্বিধা নেই।

সন্ধ্যায় মেহরাব তাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই আবার জড়িয়ে ধরল। কাপড় খুলতে খুলতে চুমু খেলতে লাগল। ইনশিরাহর শরীর তার হাতে কাঁপছিল। মেহরাব তাকে বিছানায় শুইয়ে ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে ফেলল। তার চোখ ইনশিরাহর শরীরের প্রতি ইঞ্চি অনুসরণ করছিল।

“তুমি কত সুন্দর…” তার গলা ভারী।

সে ইনশিরাহর গলায় চুমু দিল। তারপর কণ্ঠনালী বেয়ে নেমে এল। স্তনের ওপর ঠোঁট রাখল। জিভ দিয়ে ঘিরে ধরল। ইনশিরাহর পিঠ বাঁকা হয়ে উঠল। আনন্দে আর অস্থিরতায় কামড় দিয়ে উঠল মেহরাবের কাঁধে।

মেহরাব তার পা খুলে দিয়ে মাঝখানে নেমে গেল। জিভ দিয়ে আলতো করে শুরু করল। ইনশিরাহর কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল। সে চাদর মুঠো করে ধরল। মেহরাব আরও গভীরে গেল। চোষতে লাগল, চাপ দিতে লাগল যতক্ষণ না ইনশিরাহর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠল প্রথমবারের মতো।

তারপর মেহরাব উঠে এল। নিজের কাপড় খুলে ফেলল। ইনশিরাহর চোখ বড় হয়ে গেল। মেহরাব তার দুইপাশে হাত রেখে ধীরে ঢুকে গেল। ইনশিরাহর নখ তার পিঠে ফুটে গেল। ব্যথা আর সুখ একসাথে।

মেহরাব নড়তে শুরু করল। প্রথমে ধীরে। তারপর গভীর। প্রতিটা ধাক্কায় ইনশিরাহর ভেতর একটা নতুন আগুন জ্বলছিল। মেহরাব তার ঠোঁট চেপে ধরে আরও জোরে নড়ল। ঘামে ভিজে যাচ্ছিল দুজনের শরীর। ইনশিরাহর পা তার কোমরে জড়িয়ে গেল।

“আরও…” ইনশিরাহ ফিসফিসিয়ে বলল।

মেহরাব তার কথা শুনল। তাকে উল্টে উপুড় করে শুইয়ে পেছন থেকে ঢুকল। আরও গভীর। ইনশিরাহর মুখ বালিশে চাপা পড়ল। আনন্দের আওয়াজ বেরোচ্ছিল। মেহরাব তার চুল মুঠো করে ধরে টানতে টানতে নড়ছিল। শরীরের প্রতিটা অংশ যেন একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত দুজনেই একসাথে ভেঙে পড়ল। মেহরাব তার ওপর ঢলে পড়ল। শ্বাস ফেলতে ফেলতে ইনশিরাহর কানে চুমু দিল।

রাতভর তারা একে অপরকে চেনেছে। আবার। আরও গভীরে। মেহরাব তাকে জানালার পাশে দাঁড় করিয়ে তুলে ধরেছিল। বিছানায় শুইয়ে পা তুলে রেখেছিল। প্রতিবারই ইনশিরাহর শরীর নতুন করে কাঁপছিল।

ভোরের আলো আসার আগে মেহরাব তাকে বুকে টেনে নিল।

“এবার আর লুকাবো না।” সে ফিসফিসিয়ে বলল। “তুমি আমার।”

ইনশিরাহ চোখ বন্ধ করে তার বুকে মাথা রাখল। বাইরে শহর জেগে উঠছে। আর ভেতরে দুজনের শরীর এখনও একে অপরের উষ্ণতায় জড়িয়ে আছে। সেই রাতের অপরিচিত মানুষটা এখন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আর এই সম্পর্ক—এখন আর থামবে না।

....
👁 9