বসের ডায়েরিতে আমার নাম

মেহরিনের নতুন চাকরি শুরু হয়েছিল এক রোদঝলমলে সকালে। ঢাকার গুলশানের একটি বড় বিজ্ঞাপন সংস্থার অফিসে সে যোগ দিয়েছে কপিরাইটার হিসেবে। প্রথম দিনই তার মনে হয়েছিল, এখানে সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। কিন্তু সেই ভাবনা ভেঙে যায় আয়ান হাসানের মুখোমুখি হওয়ার পরই।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

আয়ান হাসান। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। বয়স তিরিশের কোঠায়, লম্বা, গম্ভীর মুখ, চোখে এক ধরনের কঠোরতা যা দেখলেই মানুষ দূরে সরে যায়। অফিসের সবাই তাকে ভয় পায়। মেহরিনও প্রথম দিন থেকেই সেই ভয় অনুভব করেছে।

“মেহরিন, এই কপিটা আবার লিখুন। ক্লায়েন্ট এমন দুর্বল বাক্য চায় না।” আয়ানের গলায় কোনো নরমভাব নেই। সে মেহরিনের লেখা কাগজটা টেবিলে ছুড়ে দিয়েছে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

মেহরিন চুপচাপ কাগজটা তুলে নিয়েছে। ভিতরে ক্ষোভ জমেছে, কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। সে জানে, নতুন চাকরিতে মুখ খুললেই সমস্যা বাড়বে।

দিনগুলো এভাবেই কেটেছে। সামান্য ভুল হলেই আয়ান তাকে ডেকে নিয়ে যায়। মিটিং রুমে দরজা বন্ধ করে তাকে ধমক দেয়। “আপনি কি মনে করেন এখানে খেলতে এসেছেন? সময় নষ্ট করবেন না।”

মেহরিন প্রতিবারই মাথা নিচু করে শোনে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আয়ান যত কঠোরই হোক না কেন, মেহরিনের কাজ কখনো শেষ মুহূর্তে আটকে থাকে না। একদিন সে দেখে তার প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজনীয় রেফারেন্স ফোল্ডার কেউ না কেউ তার ডেস্কে রেখে গেছে। আরেকদিন দেখে ক্লায়েন্টের পুরনো ক্যাম্পেইনের ফাইলগুলো তার মেইলে চলে এসেছে, অথচ সে চায়নি।

একদিন সে সহকর্মী নাফিসাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “কে এসব করে দিচ্ছে?”

নাফিসা হেসে বলেছিল, “জানি না। তবে আয়ান স্যারের চোখ এড়িয়ে কেউ এমন সাহায্য করে না।”

মেহরিন বিশ্বাস করতে চায়নি। আয়ান তাকে সাহায্য করছে? যে মানুষ তাকে প্রতিদিন অপমান করে, সে কিভাবে সাহায্য করতে পারে?

এক সন্ধ্যায় অফিসে সবাই চলে যাওয়ার পর মেহরিন একা বসে কাজ করছিল। হঠাৎ আয়ান তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায়।

“এখনো কাজ শেষ হয়নি?”

মেহরিন মাথা তুলে তাকিয়েছে। “শেষ হয়ে গেছে। শুধু একটু চেক করছিলাম।”

আয়ান কাছে এসে তার মনিটরের দিকে তাকিয়েছে। “এই লাইনটা বদলান। আরও সরাসরি বলুন।”

মেহরিন চুপচাপ সংশোধন করেছে। আয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলেছে, “কাল সকালে জমা দেবেন। দেরি করবেন না।”

সে চলে গেছে। মেহরিন তার পেছনে তাকিয়ে থেকেছে। আয়ানের পিঠের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছে, এই মানুষটা যেন দুই রকম। এক রকম অফিসে সবার সামনে, আরেক রকম একা থাকলে।

পরের দিনগুলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আয়ান তাকে সবার সামনে কঠোরভাবে কথা বলে, কিন্তু আড়ালে তার কাজের পথ মসৃণ করে দেয়। মেহরিন বুঝতে পারে না কেন। সে শুধু এটুকুই জানে যে সে আয়ানকে পছন্দ করে না। তার কঠোর কথাগুলো মেহরিনের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিচ্ছে।

একদিন মিটিংয়ে মেহরিনের প্রেজেন্টেশনে ছোটখাটো ভুল হয়। আয়ান সবার সামনে বলে, “এভাবে কাজ করলে আপনাকে এখানে রাখার কোনো মানে নেই।”

মেহরিনের চোখ জ্বলে ওঠে। সে মিটিং শেষে সোজা আয়ানের কেবিনে গিয়ে দাঁড়ায়।

“আপনি কেন এভাবে আমাকে অপমান করেন? আমি চেষ্টা করি। ভুল হলে শেখান, সবার সামনে নামিয়ে দেবেন না।”

আয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে তাকে দেখেছে। তার চোখে কোনো রাগ নেই, শুধু এক ধরনের গভীর নীরবতা।

“আপনি ভুল বুঝছেন, মেহরিন।”

“আমি কিছুই ভুল বুঝছি না। আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। তাই না?”

আয়ান উঠে দাঁড়িয়েছে। তার উচ্চতা মেহরিনের চেয়ে অনেক বেশি। সে এক পা এগিয়ে এসেছে। মেহরিন পিছু হটেনি।

“আমি আপনাকে পছন্দ করি না—এ কথাটা আপনি নিজে থেকে বলছেন। আমি কখনো বলিনি।”

মেহরিনের হৃদয় জোরে বেজেছে। আয়ানের গলায় সেই কঠোরতা নেই। বরং এক ধরনের চাপা অনুভূতি আছে যা সে আগে কখনো শোনেনি।

সেদিন মেহরিন আর কিছু না বলে চলে এসেছে। কিন্তু সেই রাত থেকেই তার মনে আয়ানের কথা ঘুরতে শুরু করেছে। সে বুঝতে পারছে না, এই মানুষটার আসল রূপ কোনটা।

পরের সপ্তাহে একদিন অফিসে বড় প্রজেক্ট এসেছে। সবাই ব্যস্ত। মেহরিনও রাত পর্যন্ত কাজ করছে। একসময় সে চায়ের জন্য প্যান্ট্রিতে গিয়েছে। ফিরে এসে দেখে তার ডেস্কে একটা ছোট নোট রাখা।

“আজকের কাজের ফাইলগুলো আমি সাজিয়ে রেখেছি। কাল সকালে শুধু রিভিউ করলেই হবে। —আ”

মেহরিন নোটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়ানের হাতের লেখা। সে চারপাশে তাকিয়েছে। কেউ নেই। আয়ানের কেবিনের লাইটও নেভানো।

সে নোটটা পকেটে রেখেছে। মনে মনে বলেছে, “কেন? কেন আপনি এভাবে সাহায্য করেন আর সবার সামনে আমাকে ছোট করেন?”

সেই রাতে বাসায় ফিরে মেহরিন অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে। শহরের আলোগুলো জ্বলছে। তার মনে হচ্ছে, আয়ানের ব্যাপারে তার ধারণা হয়তো পুরোপুরি ঠিক নয়। কিন্তু সে এখনো নিশ্চিত নয়।

পরের দিন অফিসে আয়ান আবার স্বাভাবিক। কঠোর, নির্লিপ্ত। মেহরিনের দিকে তাকিয়েও তাকায় না বললেই চলে। মেহরিনও তার দিকে তাকানো এড়িয়ে চলে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অস্থিরতা কাজ করছে।

একদিন দুপুরে নাফিসা বলেছে, “তুমি জানো? আয়ান স্যার গত মাসে একটা প্রজেক্টে তোমার নাম রেকমেন্ড করেছিল প্রমোশনের জন্য। ম্যানেজমেন্ট রাজি হয়নি কারণ তুমি নতুন।”

মেহরিন অবাক হয়ে তাকিয়েছে। “কী?”

নাফিসা মাথা নেড়েছে। “হ্যাঁ। আমি নিজে শুনেছি।”

মেহরিন আর কথা বলেনি। তার মনে একটা ঝড় উঠেছে। আয়ান তাকে প্রমোশনের জন্য রেকমেন্ড করেছে? যে মানুষ তাকে প্রতিদিন ধমক দেয়?

সেদিন বিকেলের দিকে মেহরিন আয়ানের কেবিনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। দরজা আধখোলা। ভিতরে আয়ান নেই। মেহরিনের চোখ পড়েছে টেবিলের ওপর রাখা একটা কালো ডায়েরির ওপর। পুরনো ধরনের, চামড়ার বাঁধাই করা।

সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকেছে। তারপর পা বাড়িয়েছে। ডায়েরিটা হাতে তুলেছে। প্রথম পাতা খুলেছে।

এবং সেখানেই সে দেখেছে নিজের নাম।

মেহরিনের হাত কেঁপে উঠেছে। সে দ্রুত ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলে রেখে দিয়েছে। কিন্তু মনে হয়েছে, সে যা দেখেছে তা ভুল হতে পারে না।

সে দ্রুত সেখান থেকে সরে এসেছে। হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। আয়ানের ব্যক্তিগত ডায়েরি। এবং সেখানে তার নাম।

মেহরিন জানে না এখন কী করবে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—আয়ান হাসানকে নিয়ে তার এতদিনের ধারণা হয়তো পুরোপুরি ভুল।

এবং সেই ভুল ধারণা বদলানোর শুরু এখান থেকেই।

পরের কয়েকদিন মেহরিন ডায়েরির কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। আয়ানের কেবিনের সামনে দিয়ে গেলেই তার চোখ চলে যায় সেই কালো ডায়েরির দিকে। আয়ান যখন অফিসে থাকে না, তখনও সে ডায়েরিটা টেবিলেই থাকে। যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই রাখা।

এক শুক্রবার বিকেল। অফিসে লোকজন কম। আয়ান মিটিংয়ে গেছে। মেহরিন আর থাকতে পারেনি। সে আয়ানের কেবিনে ঢুকেছে। দরজা বন্ধ করেছে। ডায়েরিটা হাতে নিয়েছে।

প্রথম পাতা। আয়ানের হাতের লেখায়—

“মেহরিন আলম। নতুন কপিরাইটার। তার লেখার মধ্যে একটা আগুন আছে যা আমি অনেকদিন দেখিনি। কিন্তু সে নিজেকে ছোট করে দেখে। আমাকে তাকে কঠিন হতে হবে। নাহলে সে নিজের সক্ষমতা বুঝবে না।”

মেহরিনের গলা শুকিয়ে গেছে। সে পাতা উল্টেছে।

“আজ তাকে সবার সামনে কথা বলেছি। তার চোখে রাগ দেখেছি। ভালো লেগেছে। রাগ মানে সে লড়ছে। আমাকে সে পছন্দ করে না—এটা জানি। কিন্তু আমাকে তার পছন্দের মানুষ হতে হবে না। আমাকে তাকে ভালো কপিরাইটার বানাতে হবে।”

আরেক পাতা।

“রাত দুইটা। এখনো অফিসে। তার ডেস্কে ফাইলগুলো সাজিয়ে রেখে এলাম। সে জানবে না কে করেছে। জানুক না। আমাকে দূর থেকে সাহায্য করতে হবে। কাছে গেলে সে ভয় পাবে।”

মেহরিনের চোখ ভিজে এসেছে। সে বুঝতে পারছে, আয়ান ইচ্ছাকৃতভাবেই কঠোর। তার ভালোবাসার একটা অদ্ভুত রূপ এটা।

আরও পাতা উল্টেছে।

“আজ সে আমার কেবিনে এসে চিৎকার করেছে। প্রথমবার। তার চোখে আগুন ছিল। আমি চাইছিলাম তাকে টেনে নিজের কাছে টেনে নিতে। কিন্তু পারিনি। আমি তার বস। আমাকে সীমা মানতে হবে।”

মেহরিনের হৃদয় জোরে কাঁপছে। সে বসে পড়েছে আয়ানের চেয়ারে। ডায়েরিটা কোলে নিয়ে পড়তে থাকছে।

“মেহরিনকে দেখলে আমার মনে হয় সে একটা ঝড়। আমাকে সেই ঝড়ের মধ্যে দাঁড়াতে হবে, কিন্তু ছুঁতে পারব না। এটাই আমার শাস্তি।”

এই লাইনটা পড়ে মেহরিনের শ্বাস আটকে গেছে। আয়ান তাকে এভাবে দেখে?

সে আরও পাতা উল্টেছে। মাঝের দিকের এক পাতায়—

“আজ রাতে স্বপ্ন দেখেছি। সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি তার চুল সরিয়ে দিচ্ছি। তার ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়ে যাচ্ছি। জেগে উঠেছি ঘামে ভিজে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

মেহরিনের গাল গরম হয়ে উঠেছে। তার শরীরে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে। আয়ান তাকে নিয়ে এমন চিন্তা করে?

সে আরও পড়েছে। আয়ানের অনুভূতিগুলো কাঁচা, সৎ, এবং গভীর। সে মেহরিনকে শুধু পছন্দ করে না—সে তাকে চায়। কিন্তু নিজের অবস্থানের কারণে দূরে থাকতে বাধ্য।

হঠাৎ বাইরে পায়ের শব্দ। মেহরিন চমকে উঠেছে। সে দ্রুত ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলে রেখেছে এবং কেবিন থেকে বেরিয়ে এসেছে। করিডোরে নাফিসাকে দেখেছে।

“কী হয়েছে? তোমার মুখ লাল।” নাফিসা জিজ্ঞেস করেছে।

মেহরিন মাথা নেড়েছে। “কিছু না। গরম লাগছে।”

সে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়েছে। সেখানে একটা নতুন আলো।

সেদিন বিকেলের দিকে আয়ান অফিসে ফিরেছে। মেহরিন তার দিকে তাকিয়েছে। আয়ানও তাকিয়েছে। তাদের চোখাচোখি হয়েছে কয়েক সেকেন্ড। মেহরিন প্রথমবারের মতো চোখ ফেরায়নি।

আয়ানের চোখে একটা প্রশ্ন ফুটে উঠেছে। মেহরিন মৃদু হেসে মাথা নিচু করেছে।

পরের দিন থেকে অফিসের পরিবেশ বদলে গেছে। আয়ান আর আগের মতো কঠোর নয়। মেহরিনের কাজে ভুল হলে সে এখন শান্ত গলায় বলে, “এখানে একটু বদলান।” সবার সামনে আর ধমক দেয় না।

একদিন দুপুরে আয়ান মেহরিনকে ডেকেছে।

“কালকের প্রেজেন্টেশন নিয়ে কথা বলব। আমার কেবিনে আসুন।”

মেহরিন গিয়েছে। দরজা বন্ধ করেছে আয়ান।

“আপনি কি আমার ডায়েরি পড়েছেন?” আয়ান সরাসরি জিজ্ঞেস করেছে।

মেহরিনের হৃদয় থমকে গেছে। সে চুপ করে আছে।

আয়ান এক পা এগিয়ে এসেছে। “বলুন।”

মেহরিন মাথা তুলেছে। “হ্যাঁ।”

আয়ানের চোখে একটা স্বস্তি ফুটে উঠেছে। “কতটা?”

“যথেষ্ট।”

আয়ান কাছে এসেছে। মেহরিন পিছু হটেনি। তাদের মধ্যে ব্যবধান কমে এসেছে।

“তাহলে আপনি জানেন আমি কী অনুভব করি।”

মেহরিন মাথা নেড়েছে। “জানি। কিন্তু বুঝি না কেন এতদিন এভাবে দূরে থেকেছেন।”

আয়ান হাত বাড়িয়ে মেহরিনের চুলের একটা কোঁকড়ানো অংশ সরিয়ে দিয়েছে। তার আঙুল মেহরিনের গাল ছুঁয়েছে।

“কারণ আমি আপনার বস। এবং আমি জানতাম একবার ছুঁলে আর ছাড়তে পারব না।”

মেহরিনের শ্বাস ভারী হয়েছে। আয়ানের চোখে যে আগুন সে দেখেছে, তা তার শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

আয়ান আরও কাছে এসেছে। তার অন্য হাতটা মেহরিনের কোমরে রেখেছে।

“এখনো সময় আছে সরে যেতে, মেহরিন। একবার শুরু হলে আমি থামব না।”

মেহরিন উত্তর দেয়নি। সে নিজে থেকেই আয়ানের কাছে লেগেছে। তাদের ঠোঁট মিলেছে।

প্রথম চুমুটা ছিল ধীর, সাবধানী। তারপর আয়ানের হাত মেহরিনের পিঠে চেপে ধরেছে। চুমু গভীর হয়েছে। মেহরিনের হাত আয়ানের ঘাড়ে উঠে গেছে। তাদের শরীর একে অপরের কাছে চেপে গেছে।

আয়ান মেহরিনকে টেবিলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মেহরিন টেবিলের কিনারায় বসেছে। আয়ান তার দুই পায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চুমু খেয়ে চলেছে। তার হাত মেহরিনের কোমর থেকে উঠে গেছে তার পিঠের দিকে, কাপড়ের নিচে।

মেহরিনের শরীর কেঁপে উঠেছে। আয়ানের স্পর্শ গরম, দাবিদার। সে মেহরিনের গলায় চুমু খেয়েছে, কানে ফিসফিসিয়ে বলেছে, “আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে চাইছি।”

মেহরিনের উত্তর এসেছে একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। “তাহলে আর দেরি করো না।”

আয়ান থেমে গেছে। তার চোখে তাকিয়েছে। “এখানে নয়। আজ রাতে। আমার বাসায়।”

মেহরিন মাথা নেড়েছে। আয়ান আবার তার ঠোঁট চুম্বন করেছে, এবার আরও গভীরভাবে। মেহরিনের পুরো শরীর আয়ানের স্পর্শে কাঁপছে।

সেদিন বাকি সময়টা দুজনের কাছেই কেটেছে অস্থিরতার মধ্যে। চোখাচোখি হলেই যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়।

সন্ধ্যায় মেহরিন আয়ানের গাড়িতে উঠেছে। কথা হয়নি বেশি। শুধু হাত ধরাধরি। আয়ানের বাসায় পৌঁছে দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে।

সে রাতটা ছিল আগুনের। আয়ান মেহরিনকে ধীরে ধীরে খুলেছে, প্রতিটি স্পর্শে তার শরীরকে জানতে চেয়েছে। মেহরিনও পিছিয়ে থাকেনি। তাদের দেহ মিলেছে এমনভাবে যেন অনেকদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে।

ভোরের আলো আসার আগেই মেহরিন ঘুমিয়ে পড়েছে আয়ানের বুকে। আয়ান তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। তার চোখে একটা শান্তি যা মেহরিন আগে কখনো দেখেনি।

কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ থাকেনি।

সকালে মেহরিন যখন জেগেছে, আয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার হাতে সেই কালো ডায়েরি।

মেহরিন কাছে গিয়েছে। “কী হয়েছে?”

আয়ান পেছন ফিরে তাকিয়েছে। তার চোখে একটা ছায়া।

“তুমি ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়োনি।”

মেহরিনের শরীর শক্ত হয়ে গেছে। “কী আছে সেখানে?”

আয়ান ডায়েরিটা তার হাতে দিয়েছে। “পড়ো।”

মেহরিন শেষ পাতা খুলেছে। এবং যা পড়েছে, তাতে তার পুরো পৃথিবী থমকে গেছে।

ডায়েরির শেষ পাতায় আয়ানের হাতের লেখায়—

“আজকে যদি কিছু হয় আমার, মেহরিনকে বলো—আমি তাকে ভালোবেসেছি প্রথম দিন থেকে। কিন্তু আমাকে যে কাজটা করতে হয়েছে, সেটা তার জন্য নিরাপদ রাখার জন্যই। সে যদি কখনো জানতে পারে আমি কে ছিলাম, তাহলে সে আমাকে ঘৃণা করবে। আমি চাই না সে ঘৃণা করুক। তাই আমি চুপ থাকব। যতদিন সম্ভব।”

মেহরিনের হাত কাঁপছে। সে আয়ানের দিকে তাকিয়েছে। “এর মানে কী?”

আয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। “আমি আগে অন্য জায়গায় কাজ করতাম। একটা বড় কোম্পানিতে। সেখানে কিছু জিনিস দেখে ফেলেছিলাম যা দেখার কথা ছিল না। কিছু লোক আমাকে চুপ করাতে চেয়েছিল। আমি পালিয়ে এসেছি। নতুন নাম, নতুন পরিচয়। এই চাকরিটাও সেই পালানোর অংশ।”

মেহরিনের গলা শুকিয়ে গেছে। “তুমি কি বিপদে আছো?”

আয়ান মাথা নেড়েছে। “হয়তো। গত সপ্তাহে একটা মেইল পেয়েছি। তারা আমাকে খুঁজে পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”

মেহরিন ডায়েরিটা রেখে আয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। “তাহলে তুমি আমাকে এসব বলোনি কেন?”

“কারণ তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি।” আয়ানের চোখে গভীর ক্লান্তি। “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো জিনিস। আমি চাইনি তুমি আমার অতীতের ছায়ায় পড়ো।”

মেহরিন তার হাত ধরেছে। “আমি ইতিমধ্যেই পড়ে গেছি। এখন আর দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করো না।”

আয়ান তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার বুকে মেহরিনের মাথা রেখেছে। “আমি ভয় পাচ্ছি, মেহরিন। তোমার জন্য।”

মেহরিন মাথা তুলেছে। “তাহলে একসঙ্গে মুখোমুখি হবো। আমি পালাতে চাই না।”

সেদিন থেকে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। দিনের বেলা অফিসে তারা পেশাদার থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু রাতে তারা একে অপরের। আয়ানের বাসায়, কখনো মেহরিনের ছোট ফ্ল্যাটে। তাদের শরীরের ভাষা প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয়। আয়ান মেহরিনকে এমনভাবে ছোঁয় যেন সে নিশ্চিত করতে চায় মেহরিন সত্যিই তার। মেহরিনও পিছিয়ে থাকে না। সে আয়ানের শরীরের প্রতিটি রেখা চিনে নেয়, তার গলার শব্দ, তার শ্বাসের ছন্দ।

এক রাতে আয়ান মেহরিনকে বিছানায় শুইয়ে তার ওপর এসেছে। তার চুমুগুলো গভীর, হাতগুলো দাবিদার। মেহরিনের শরীর আয়ানের স্পর্শে কেঁপে ওঠে। তাদের মিলন হয় ধীরে, গভীরে, এমনভাবে যেন সময় থেমে গেছে। শেষে তারা পাশাপাশি শুয়ে থাকে, ঘামে ভেজা শরীর, জড়ানো হাত।

কিন্তু বিপদ কাছে এগিয়ে আসছিল।

একদিন অফিসে মেহরিনের কাছে একটা অজানা নম্বর থেকে কল আসে। অন্য প্রান্তে এক পুরুষের গলা—

“আয়ান হাসানকে বলো, আমরা জানি সে কোথায়। এবং আমরা জানি তুমি কে।”

মেহরিনের রক্ত জমে গেছে। সে আয়ানকে খবর দিয়েছে। আয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেছে।

“আমাকে চলে যেতে হবে, মেহরিন।”

মেহরিন তার হাত শক্ত করে ধরেছে। “আমিও যাব।”

আয়ান মাথা নেড়েছে। “না। তুমি নিরাপদ থাকবে এখানে।”

“আমি তোমার ছাড়া নিরাপদ নই।” মেহরিনের চোখে জেদ। “তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমিও তোমাকে। এখন আর আলাদা হওয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই।”

আয়ান অনেকক্ষণ চুপ করে থেকেছে। তারপর মেহরিনকে জড়িয়ে ধরেছে। “তাহলে একসঙ্গে।”

তারা পরিকল্পনা করেছে। আয়ান তার পুরনো পরিচিত একজনের সাহায্যে নতুন জায়গায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। চট্টগ্রামের বাইরে, সমুদ্রের কাছে একটা ছোট শহরে। নতুন পরিচয়, নতুন শুরু।

যাওয়ার আগের রাতে তারা আয়ানের বাসায় ছিল। জিনিসপত্র গোছানো শেষ। ঘরটা প্রায় খালি। মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আয়ান পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে।

“ভয় পাচ্ছ?” আয়ান জিজ্ঞেস করেছে।

মেহরিন মাথা নেড়েছে। “না। তোমার সঙ্গে থাকলে ভয় পাই না।”

আয়ান তাকে ঘুরিয়ে নিয়েছে। তাদের চোখাচোখি হয়েছে। তারপর চুমু। এই চুমুটা ছিল আগেরগুলোর চেয়ে আলাদা—যেন প্রতিশ্রুতি।

সে রাতে তাদের মিলন হয়েছে ধীরে, গভীরে। আয়ান মেহরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে পুরোটা সময়। মেহরিনও। তাদের শরীর কথা বলেছে যে কথা মুখে বলা যায় না। শেষে তারা জড়িয়ে শুয়ে থেকেছে। বাইরে শহরের আওয়াজ। ভিতরে শুধু তাদের শ্বাস।

সকালে তারা রওনা দিয়েছে। গাড়িতে বসে মেহরিন আয়ানের হাত ধরেছে।

“ডায়েরির শেষ পাতায় তুমি লিখেছিলে আমি তোমাকে ঘৃণা করব। আমি ঘৃণা করি না। আমি তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসি।”

আয়ান তার হাত চুমু খেয়েছে। “আমি জানি। এখন জানি।”

চট্টগ্রামের পথে তারা কথা বলেছে অনেক। আয়ান তার অতীতের কথা বলেছে—কী দেখেছিল, কেন পালিয়েছিল। মেহরিন শুনেছে নীরবে। শেষে বলেছে, “তোমার অতীত তোমার। কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ আমাদের।”

নতুন শহরে পৌঁছে তারা একটা ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। সমুদ্রের গন্ধ বাতাসে। আয়ান নতুন কাজ খুঁজেছে একটা ছোট এজেন্সিতে। মেহরিনও ফ্রিল্যান্স কাজ শুরু করেছে।

এক সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে হাঁটতে হাঁটতে আয়ান মেহরিনকে থামিয়ে দিয়েছে।

“আমার আর কোনো গোপন কথা নেই। তুমি সব জানো।”

মেহরিন হেসেছে। “আমি জানি। এবং আমি এখনো এখানে।”

আয়ান তার কোমরে হাত রেখে টেনে নিয়েছে। তাদের চুমু মিশেছে সমুদ্রের শব্দের সঙ্গে। হাতগুলো ঘুরেছে একে অপরের শরীরে। সেখানে, খোলা আকাশের নিচে, তারা আবার কাছে এসেছে—এবার কোনো ভয় ছাড়া, কোনো ছায়া ছাড়া।

রাতে বাড়িতে ফিরে তারা জানত, বিপদ হয়তো শেষ হয়নি। কিন্তু তারাও জানত, একে অপরকে পেয়েছে। এবং সেটাই যথেষ্ট।

মেহরিন আয়ানের বুকে মাথা রেখে শুয়েছিল। আয়ানের হাত তার চুল আঁচড়াচ্ছিল।

“আরেকটা ডায়েরি শুরু করবে?” মেহরিন ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করেছে।

আয়ান হেসেছে। “এবার তোমার সঙ্গে মিলে লিখব।”

মেহরিন চোখ বুজেছে। বাইরে সমুদ্রের শব্দ। ভিতরে আয়ানের হৃদস্পন্দন। সে জানত, তাদের গল্প এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু এবার তারা একসঙ্গে লিখবে।

এবং সেই লেখার প্রতিটি শব্দ হবে ভালোবাসার। গভীর, গরম, এবং সত্য।

....
👁 20