তূর্য বিমানবন্দরের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। ঢাকার বাতাস তার গায়ে লাগল। অনেক বছর পর এই মাটি। তার হাতে একটা কালো স্যুটকেস, কাঁধে একটা ল্যাপটপ ব্যাগ। চোখে কালো চশমা। কেউ তাকে চিনতে পারল না প্রথমে। ট্যাক্সি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “ভাই, কোথায় যাবেন?” তূর্য বলল, “গুলশান।”
সে গুলশানের একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছে। ভাড়া বাসা। পুরনো বাড়ি ছাড়াই থাকবে বলে ঠিক করেছে। বাবা-মা আর নেই। বোন আমেরিকায়। চাচা-চাচিরা সিলেটে। সে একা। কিন্তু একা নয় আসলে। তার মনে একটা কাজ আছে।
পরদিন সকালে সে কফি শপে গেল। সেখানেই মাধুরীকে দেখল। মাধুরী একটা ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। চুল বাঁধা, চোখে চশমা। তূর্যের বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। সে জানত মাধুরী এখন একটা এনজিওতে কাজ করে। শিশুদের শিক্ষা নিয়ে। তূর্য কাছে গেল না। দূর থেকে দেখল। মাধুরী একবার মাথা তুলে তাকাল। চোখাচোখি হল। মাধুরীর মুখে অবাক ভাব। তূর্য হালকা হাসল। মাধুরী উঠে এল।
“তূর্য? তুমি?” মাধুরীর গলায় বিশ্বাস হচ্ছে না এমন সুর।
“হ্যাঁ। ফিরে এসেছি।”
“কবে?”
“গতকাল।”
মাধুরী একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “বসো।”
তারা কথা বলল। সাধারণ কথা। তূর্য বলল সে লন্ডনে ছিল। এখন ব্যবসা শুরু করতে চায় বাংলাদেশে। মাধুরী বলল তার কাজের কথা। দুজনেই এড়িয়ে গেল পুরনো কথা। কিন্তু চোখে চোখে কিছু একটা ছিল। তূর্য জানত মাধুরীর পরিবার কী করেছে তার পরিবারের সাথে। সে জানত। কিন্তু এখন নয়। এখন সময় লাগবে।
পরের কয়েকদিন তূর্য মাধুরীর অফিসের কাছাকাছি ঘুরত। কখনো কফি নিয়ে যেত। কখনো দুপুরের খাবার। মাধুরী প্রথমে একটু দূরে থাকত। তারপর অভ্যস্ত হয়ে গেল। তূর্য তার সাথে হাঁটত। রমনা পার্কের পাশ দিয়ে। কখনো ধানমন্ডির লেকের ধারে। কথা হত অনেক। তূর্য জানত কীভাবে কথা বলতে হয়। সে শুনত। মাধুরী কথা বলত তার কাজের কথা। শিশুরা কীভাবে স্কুলে আসে না। পরিবারগুলো কীভাবে লড়াই করে। তূর্য মাথা নেড়ে শুনত। ভেতরে তার মন অন্য জায়গায় থাকত।
একদিন মাধুরী বলল, “তুমি কেন ফিরলে আসলে?”
তূর্য হাসল। “দেশ তো দেশই। বহুদিন পর।”
মাধুরী তাকাল। “শুধু তাই?”
তূর্য চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আর কিছু আছে। সময়মতো বলব।”
মাধুরীর পরিবার জানল তূর্য ফিরেছে। তার বাবা, আবুল হোসেন, একদিন ফোন করল। “তূর্য, শুনলাম তুমি এসেছ। একদিন বাসায় এসো।” তূর্য গেল। উত্তরার বাড়িতে। বড় বাড়ি। গাড়ি দুটো। মাধুরীর মা হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল। ছোট ভাই রাতের খাবারে বসল। কথা হল ব্যবসার। আবুল হোসেন বলল, “তুমি যদি কিছু করতে চাও, বলো। আমরা সাহায্য করব।” তূর্য মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানাল। ভেতরে তার রক্ত গরম হচ্ছিল। এই মানুষগুলোই তার বাবার ব্যবসা নষ্ট করেছিল। জমি দখল করেছিল। মামলা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে রেখেছিল যতদিন না তার বাবা সব হারিয়ে মারা যায়। তূর্য তখন বিদেশে। কিছু করতে পারেনি। এখন পারবে।
রাতের খাবার শেষে মাধুরী তাকে গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিল। “তুমি কি সত্যিই ব্যবসা করতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“আমার বাবা সাহায্য করতে চায়।”
তূর্য বলল, “দেখি।”
পরের সপ্তাহে তূর্য মাধুরীর সাথে আরও সময় কাটাতে লাগল। তারা একসাথে সিনেমা দেখতে গেল। একসাথে চা খেল। মাধুরী হাসত বেশি। তূর্য দেখত সে হাসছে। তার হাসি দেখে তূর্যের মনে হত সে হয়তো ভুল পথে আছে। কিন্তু সে থামল না। সে মাধুরীর কাছে এসে গেল আরও। হাত ধরল একদিন। মাধুরী হাত ছাড়ল না। তারা কথা বলল রাত পর্যন্ত ফোনে। মাধুরী বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি আর ফিরবে না।”
তূর্য বলল, “ফিরেছি।”
মাধুরীর বন্ধুরা জিজ্ঞেস করত, “তূর্য আবার এসেছে কেন?” মাধুরী বলত, “জানি না। হয়তো পুরনো সবকিছু ঠিক করতে।” তূর্য শুনত এসব কথা। হাসত নিজের মনে। পুরনো সবকিছু ঠিক করা নয়। পুরনো সবকিছু শেষ করা।
একদিন তারা চট্টগ্রাম গেল। মাধুরীর কাজের সূত্রে। তূর্য সাথে গেল। সমুদ্রের ধারে বসল দুজনে। ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তূর্য বলল, “আমার বাবা এখানে একটা গুদাম রাখতে চেয়েছিল একসময়। হয়নি।” মাধুরী তাকাল। কিছু বলল না। তূর্য জানত সে বুঝতে পারছে না। ভালোই। এখনো সময় হয়নি।
ঢাকায় ফিরে তূর্য তার পরিকল্পনা এগিয়ে নিল। সে আবুল হোসেনের কিছু ব্যবসায়িক অংশীদারের সাথে দেখা করল। তথ্য সংগ্রহ করল। কাগজপত্র দেখল। দেখল কীভাবে তার বাবার জমি অন্য নামে তোলা হয়েছে। কীভাবে মামলাগুলো কেনা হয়েছে। সব প্রমাণ তার কাছে জমা হতে লাগল। রাতে সে একা বসত ল্যাপটপ খুলে। মাধুরী ফোন করত। তূর্য কথা বলত নরম গলায়। মাধুরী বলত, “তুমি কেমন আছ?” তূর্য বলত, “ভালো। তুমি?”
মাধুরী একদিন বলল, “আমার মনে হয় তুমি আমাকে আবার কাছে পেতে চাও।”
তূর্য চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “হয়তো।”
মাধুরী হাসল ফোনের ওপাশে। তূর্য জানত সে ভুল বুঝছে। কিন্তু সে থামল না। সম্পর্ক গভীর হতে লাগল। চুমু হল একদিন সন্ধ্যায়। মাধুরীর চোখে জল এল। তূর্য মুছে দিল। ভেতরে তার মন বলছিল, থামো। কিন্তু সে থামল না।
দুই মাস কেটে গেল। তূর্য মাধুরীর জীবনের অংশ হয়ে গেল। তার পরিবারও তাকে মেনে নিল। আবুল হোসেন ব্যবসার প্রস্তাব দিল। তূর্য বলল, “চিন্তা করছি।” আসলে সে চিন্তা করছিল অন্য কিছু। কীভাবে সব শেষ করবে। কীভাবে আবুল হোসেনের ব্যবসা ভেঙে দেবে। কীভাবে সেই জমি ফিরিয়ে নেবে। মাধুরী এসব জানত না। সে শুধু জানত তূর্য তার কাছে আছে। তূর্য তাকে ভালোবাসে হয়তো। তূর্য নিজেও কখনো কখনো ভুলে যেত তার আসল উদ্দেশ্য। মাধুরীর হাসিতে। তার কথায়। তার স্পর্শে।
এক রাতে তূর্য মাধুরীর বাসায় গেল। তারা ছাদে বসল। শহরের আলো জ্বলছে। মাধুরী মাথা রাখল তার কাঁধে। “আমি সুখী,” সে বলল। তূর্য কিছু বলল না। তার হাত মাধুরীর চুলে বুলিয়ে দিল। ভেতরে ঝড় চলছিল। সে জানত শিগগিরই সব বলতে হবে। কিন্তু এখনো নয়। এখনো কিছু প্রমাণ বাকি। কিছু ব্যবস্থা বাকি।
তূর্য সিলেটে গেল একবার। চাচা-চাচির সাথে দেখা করতে। তারা বলল, “কী করছ ঢাকায়?” তূর্য বলল, “ব্যবসা।” চাচা বলল, “সাবধানে থেকো। ওই পরিবারের সাথে জড়িয়ো না।” তূর্য হাসল। “জানি।” সে ফিরে এল ঢাকায়। মাধুরীর কাছে। মাধুরী স্টেশনে এসেছিল। জড়িয়ে ধরল। তূর্য তার গন্ধ নিল। ভেতরে বলল, আর অল্প সময়। শুধু অল্প সময়।
তৃতীয় মাসে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হল। তারা একসাথে থাকতে শুরু করল কখনো কখনো। তূর্যের অ্যাপার্টমেন্টে। মাধুরী রান্না করত। তূর্য টেবিল সাজাত। তারা কথা বলত ভবিষ্যতের কথা। মাধুরী বলত, “তুমি কি এখানেই থাকবে?” তূর্য বলত, “দেখি।” মাধুরী বিশ্বাস করত। তূর্য জানত বিশ্বাস ভাঙতে হবে একদিন। কিন্তু এখনো সে দিন আসেনি।
তূর্যের কাছে সব প্রমাণ জমা হল শেষ পর্যন্ত। কাগজপত্র। সাক্ষী। ব্যাংক হিসাব। সব। সে এক রাতে বসল। ঠিক করল কাল বলবে। মাধুরীকে। সব। তারপর দেখা যাবে কী হয়। সে ফোন করল মাধুরীকে। “কাল রাতে এসো। কথা আছে।” মাধুরী বলল, “কী কথা?” তূর্য বলল, “গুরুত্বপূর্ণ।” মাধুরী রাজি হল। তূর্য ফোন রেখে জানালার বাইরে তাকাল। শহর ঘুমাচ্ছে। সে ঘুমাতে পারল না সে রাতে। তার মনে শুধু একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। প্রতিশোধ। আর মাধুরী। দুটো একসাথে থাকতে পারে না। একটা বেছে নিতে হবে। কিন্তু কোনটা? সে জানত না। শুধু জানত কাল রাতে সব বদলে যাবে।
কাল রাত আসেনি এখনো। তূর্য দিন কাটাল অপেক্ষায়। সে মাধুরীর অফিসের সামনে গেল না সেদিন। একা বসল বাসায়। কাগজপত্র সাজাল আবার। সব ঠিক আছে কিনা দেখল। বিকেলে মাধুরী ফোন করল। “তুমি কেমন আছ? কাল কী কথা?” তূর্য বলল, “সব বলব। তুমি শুধু এসো।” মাধুরীর গলায় উত্তেজনা। সে হয়তো ভাবছে তূর্য কিছু প্রস্তাব দেবে। বিয়ের হয়তো। তূর্য জানত তা নয়।
সন্ধ্যা নামল। তূর্য রান্না করল না। বাইরে থেকে খাবার আনাল। মাধুরী এল সাতটার দিকে। হাতে একটা ব্যাগ। হাসিমুখে। “কী ব্যাপার এত গোপন?” তূর্য দরজা খুলে বলল, “ভেতরে এসো।” তারা বসল সোফায়। তূর্য চা বানাল। মাধুরী চা খেতে খেতে বলল, “আজকাল তুমি একটু অন্যরকম লাগছ।” তূর্য তাকাল। “কী রকম?” “জানি না। যেন কিছু লুকিয়ে রাখছ।” তূর্য হাসি দিল না। সে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। “লুকিয়ে রাখছিলাম। এখন বলব।”
মাধুরী সোজা হয়ে বসল। তূর্য শুরু করল। “আমি বিদেশ থেকে ফিরেছি শুধু তোমার জন্য নয়। আসলে আমার পরিবারের জন্য।” মাধুরী চুপ করে শুনল। তূর্য বলতে লাগল। তার বাবার ব্যবসার কথা। সিলেটের চা বাগানের জমি। ঢাকার গুদাম। চট্টগ্রামের একটা জাহাজ ভাড়ার চুক্তি। সব কীভাবে নষ্ট হল। কীভাবে আবুল হোসেনের লোকেরা মামলা দিল। কীভাবে সাক্ষী কিনল। কীভাবে ব্যাংক ঋণ আটকে দিল। তার বাবা কীভাবে সব হারাল। মা কীভাবে অসুস্থ হল। শেষে বাবা মারা গেল হার্ট অ্যাটাকে। তূর্য তখন লন্ডনে পড়াশোনা করছিল। কিছু করতে পারেনি। শুধু শুনেছে। দেখেছে দূর থেকে।
মাধুরীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “তুমি কী বলছ?”
“সত্যি বলছি। তোমার বাবার লোকেরাই করেছে। প্রমাণ আছে আমার কাছে।” তূর্য টেবিল থেকে একটা ফোল্ডার নিল। খুলে রাখল। কাগজপত্র। ছবি। ব্যাংক স্টেটমেন্ট। মাধুরী দেখল। হাত কাঁপছিল তার। “এগুলো… এগুলো মিথ্যা হতে পারে।”
“না। সত্যি। আমি দুই বছর ধরে জোগাড় করেছি।”
মাধুরী উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে হাঁটতে লাগল। “তাহলে তুমি আমার কাছে এসেছ কেন? প্রতিশোধ নিতে?” তূর্য মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। “প্রথমে হ্যাঁ। তোমার পরিবারের কাছাকাছি আসতে। তথ্য পেতে। তারপর… তারপর তুমি।” মাধুরী থেমে গেল। তাকাল তূর্যের দিকে। “আমাকে ব্যবহার করেছ?”
“প্রথমে হ্যাঁ। পরে না। পরে আমি… আমি তোমাকে সত্যিই কাছে পেয়েছি।”
মাধুরীর চোখে জল এল। সে বসল। মাথা নিচু করল। তূর্য কাছে গেল। হাত বাড়াল। মাধুরী হাত সরিয়ে নিল। “থামো। আমাকে ছুঁয়ো না।” তূর্য থেমে গেল। ঘরে নীরবতা। শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। মাধুরী বলল, “আমার বাবা এমন কাজ করতে পারে না।”
“পারে। করেছে। আমি দেখিয়েছি।”
মাধুরী ফোল্ডারটা হাতে নিল। পাতা উল্টাতে লাগল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তূর্য দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। সে জানত মাধুরীকে সময় দিতে হবে। অনেকক্ষণ পর মাধুরী বলল, “তুমি কী করতে চাও এখন?”
“আমি চাই তোমার বাবার ব্যবসা ভেঙে যাক। জমি ফিরে আসুক। যেভাবে আমার বাবার সব নষ্ট হয়েছে, সেভাবে।”
মাধুরী তাকাল। “আমাকে দিয়ে?”
“না। তোমাকে দিয়ে নয়। কিন্তু তুমি জানবে।”
মাধুরী উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ হাতে নিল। “আমি যাচ্ছি।” তূর্য দরজার সামনে দাঁড়াল। “থামো। কথা শেষ হয়নি।” মাধুরী বলল, “আমার কাছে শেষ। তুমি আমাকে ভালোবাসো না। তুমি শুধু ব্যবহার করেছ।” তূর্য বলল, “প্রথমে হ্যাঁ। এখন না। এখন আমি জানি না কী করব।” মাধুরী দরজা খুলল। বেরিয়ে গেল। তূর্য পিছু নিল না। দরজা বন্ধ হল। ঘরটা খালি হয়ে গেল।
সে রাতে তূর্য ঘুমাতে পারল না। সে বারবার মাধুরীর মুখ দেখছিল মনে মনে। তার চোখের জল। তার কণ্ঠস্বর। সে ভাবল সে ভুল করেছে হয়তো। বলেছে বলে। কিন্তু বলেছে তো সত্যি। মিথ্যা বলে আর কতদিন রাখত? পরদিন সকালে সে মাধুরীকে ফোন করল। মাধুরী ধরল না। বার্তা পাঠাল। কোনো জবাব এল না। তূর্য অফিসে গেল না। বাসায় বসল। বিকেলে মাধুরীর বাসায় গেল। গেটের সামনে দাঁড়াল। রক্ষী বলল, “আপা বাইরে যাননি। কিন্তু আপনাকে দেখাবেন না বলেছেন।” তূর্য ফিরে এল।
তিন দিন কেটে গেল। মাধুরী কোনো খবর দিল না। তূর্য তার কাজ চালিয়ে গেল। আবুল হোসেনের ব্যবসার বিরুদ্ধে কাগজপত্র জমা দিল কোথাও কোথাও। লোকজনকে জানাল। গুজব ছড়াল। আবুল হোসেনের কিছু অংশীদার সরে দাঁড়াল। শেয়ারের দাম কমল। তূর্য দেখল খবরের কাগজে। একটু সন্তুষ্টি পেল। কিন্তু মাধুরীর কথা মনে হলে সে সন্তুষ্টি উবে গেল।
চতুর্থ দিনে মাধুরী ফোন করল। গলা শুকনো। “আমরা দেখা করব। কথা বলতে হবে।” তূর্য বলল, “কোথায়?” “তোমার বাসায়।” মাধুরী এল সন্ধ্যায়। চোখ লাল। তূর্য দরজা খুলল। মাধুরী ভেতরে এল। বসল। বলল, “আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছি। সে অস্বীকার করেছে। বলেছে সব মিথ্যা।” তূর্য বলল, “সে বলবেই।” মাধুরী বলল, “আমি কিছু লোকের সাথে কথা বলেছি। পুরনো কর্মচারী। কেউ কেউ বলেছে তোমার কথা সত্যি হতে পারে।” তূর্য চুপ করে রইল। মাধুরী বলল, “তুমি কী চাও আমার কাছ থেকে?”
“কিছু না। আমি শুধু সত্যি বলেছি। এখন তুমি সিদ্ধান্ত নাও।”
মাধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু আমার পরিবার…” তূর্য বলল, “আমি জানি। আমিও একসময় পরিবার হারিয়েছি।” মাধুরী তাকাল। “তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো? নাকি শুধু প্রতিশোধের অংশ?” তূর্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “প্রথমে প্রতিশোধ। পরে তুমি। এখন দুটোই। আমি জানি না কোনটা বেশি।” মাধুরী উঠে দাঁড়াল। “তাহলে আমাকে সময় দাও। আমি ভাবব।” সে চলে গেল। তূর্য দরজা বন্ধ করল। জানালার পাশে দাঁড়াল। শহরের আলো দেখল। ভাবল, এখন কী হবে।
পরের কয়েকদিন তূর্য আর মাধুরী দেখা করল না। শুধু মাঝে মাঝে মেসেজ। মাধুরী বলত, “আমি এখনো ভাবছি।” তূর্য বলত, “সময় নাও।” তূর্য তার কাজ চালিয়ে গেল। আবুল হোসেনের একটা বড় চুক্তি বাতিল হল। খবরে এল। তূর্য দেখল। খুশি হল না খুব একটা। মাধুরী হয়তো দেখেছে। তার কী অবস্থা হচ্ছে জানি না।
একদিন মাধুরী এল আবার। রাতে। তূর্যের বাসায়। সে বলল, “আমি বাবাকে বলেছি সব। সে রেগে গেছে। বলেছে তোমাকে দূর করে দিতে।” তূর্য বলল, “তুমি কী বললে?” মাধুরী বলল, “আমি বলেছি আমি জানি না। আমি দেখব।” তূর্য কাছে গেল। এবার মাধুরী হাত সরাল না। তূর্য তার হাত ধরল। “আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিন্তু আমি আমার পরিবারের কথাও ভুলতে পারি না।” মাধুরী বলল, “তাহলে বেছে নাও। আমাকে নাকি প্রতিশোধ।” তূর্য চুপ করে রইল। সে জানত এটাই আসল প্রশ্ন। সে জানত না উত্তর।
তারা সে রাতে কথা বলল অনেকক্ষণ। মাধুরী বলল তার ছোটবেলার কথা। কীভাবে তার বাবা তাকে ভালোবাসত। কীভাবে পরিবার একসাথে থাকত। তূর্য বলল তার বাবার কথা। কীভাবে বাবা তাকে নিয়ে সিলেটের বাগানে ঘুরত। কীভাবে মা রান্না করত। সব শেষ হয়ে গেছে। মাধুরী শুনল। তার চোখে আবার জল এল। তূর্য মুছে দিল। এবার সে সরাল না। তারা কাছাকাছি বসল। কথা কম হল। শুধু বসে রইল। বাইরে শহর জেগে আছে। ভেতরে দুজন মানুষ তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
তূর্য সে রাতে ঠিক করল সে আর তাড়াহুড়ো করবে না। প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু মাধুরীকে না হারিয়ে। কীভাবে হবে জানে না। কিন্তু চেষ্টা করবে। মাধুরী বলল, “আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু আমার বাবাকেও হারাতে চাই না।” তূর্য বলল, “আমি জানি।” তারা আলাদা হল সে রাতে। কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা নয়। মাধুরী গেল। তূর্য দরজায় দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। ভাবল, এখনো সময় আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার। প্রতিশোধ নাকি মাধুরী। নাকি দুটোই কোনোভাবে। সে জানত না। শুধু জানত তার হৃদয় দুদিকে টানছে। একদিকে তার বাবার মুখ। অন্যদিকে মাধুরীর হাসি। দুটোই সত্যি। দুটোই তার।
সপ্তাহখানেক কেটে গেল। তূর্য আর মাধুরী নিয়মিত দেখা করতে লাগল আবার। কিন্তু আগের মতো সহজ নয়। মাধুরীর চোখে প্রশ্ন থাকে। তূর্যের চোখে দ্বিধা। তারা কথা বলে ব্যবসার। কাজের। কিন্তু মূল কথা এড়িয়ে যায়। তূর্য তার পরিকল্পনা ধীরে চালায়। আবুল হোসেনের ব্যবসায় চাপ বাড়ায়। কিন্তু পুরোপুরি ভাঙে না। সে অপেক্ষা করে মাধুরীর সিদ্ধান্তের।
একদিন আবুল হোসেন তূর্যকে ডাকল। উত্তরার বাড়িতে। তূর্য গেল। আবুল হোসেন একা বসল ঘরে। বলল, “তুমি আমার মেয়ের সাথে যা করছ, থামাও। আর আমার ব্যবসায় হাত দিয়ো না।” তূর্য বলল, “আমি সত্যি বলেছি মাধুরীকে। আপনি জানেন কী করেছেন।” আবুল হোসেন হাসল। “প্রমাণ থাকলে আদালতে যান। নয়তো দূর হন।” তূর্য উঠে দাঁড়াল। “আমি যাব। কিন্তু মাধুরীকে আমি ছাড়ব না।” আবুল হোসেন বলল, “সে আমার মেয়ে। সে সিদ্ধান্ত নেবে।” তূর্য চলে এল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবল, এখনো সময় আছে। কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছে।
সে রাতে মাধুরী এল তূর্যের বাসায়। সে বলল, “বাবা বলেছে তোমাকে ছেড়ে দিতে।” তূর্য বলল, “তুমি কী চাও?” মাধুরী চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “আমি তোমাকে চাই। কিন্তু আমি আমার পরিবারও চাই।” তূর্য বলল, “দুটো একসাথে সম্ভব নয় হয়তো।” মাধুরী তাকাল। “তাহলে তুমি কী বেছে নেবে?” তূর্য সোজা হয়ে বসল। “আমি প্রতিশোধ নেব। কিন্তু তোমাকে হারিয়ে নয়। আমি অন্য উপায় খুঁজব।” মাধুরী বলল, “কী উপায়?” তূর্য বলল, “আমি আদালতে যাব। প্রমাণ দেখাব। যদি জিতি, জমি ফিরে পাব। যদি হারি, হারব। কিন্তু তোমার বাবার ব্যবসা আমি আর নষ্ট করব না নিজে হাতে।” মাধুরী চুপ করে শুনল। তারপর বলল, “তুমি কি সত্যিই পারবে থামতে?” তূর্য বলল, “চেষ্টা করব। তোমার জন্য।”
পরের দিন তূর্য তার লোকজনকে জানাল থামতে। গুজব ছড়ানো বন্ধ করল। চুক্তি নষ্ট করার চেষ্টা থামাল। শুধু কাগজপত্র নিয়ে আইনজীবীর কাছে গেল। মামলা করার প্রস্তুতি নিল। আবুল হোসেন জানল। ফোন করল। “তুমি মামলা করবে?” তূর্য বলল, “হ্যাঁ। ন্যায়বিচার চাই।” আবুল হোসেন হাসল ফোনের ওপাশে। “দেখি কে জিতে।”
মাধুরী জানল সব। সে তূর্যের সাথে দেখা করল। বলল, “তুমি সত্যিই থেমেছ?” তূর্য বলল, “হ্যাঁ। এখন শুধু আদালত।” মাধুরী তার হাত ধরল। “ধন্যবাদ।” তূর্য বলল, “আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি। প্রতিশোধ পরে। যদি পাই।” মাধুরী কাছে এল। মাথা রাখল তার বুকে। তূর্য তার চুল ছুঁল। ভেতরে একটা শান্তি এল। পুরোপুরি নয়। কিন্তু কিছুটা। তার বাবার মুখ মনে পড়ল। সে মনে মনে বলল, আমি ভুলিনি। কিন্তু আমি তাকেও হারাতে চাই না যে আমাকে আবার বাঁচিয়েছে।
মাসখানেক কেটে গেল। মামলা শুরু হল। আদালতে তূর্যের প্রমাণ জমা পড়ল। আবুল হোসেনের পক্ষ থেকে অস্বীকার। শুনানি চলল। মাধুরী দুদিকেই টানাটানি হল। বাবার সাথে কথা হয় কম। তূর্যের সাথে বেশি। তারা একসাথে থাকত কখনো। কথা বলত ভবিষ্যতের। মাধুরী বলত, “যদি তুমি জিতো, কী হবে?” তূর্য বলল, “জমি ফিরবে। ব্যবসা শুরু করব। তুমি চাইলে সাথে থাকবে।” মাধুরী হাসল। “আমি থাকব।”
একদিন আদালত থেকে খবর এল। কিছু প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিছু নয়। মামলা লম্বা হবে। তূর্য জানল। হতাশ হল না। সে অপেক্ষা করতে পারে। মাধুরী তার পাশে আছে। সেইটাই বড়।
এক রাতে তারা ছাদে বসল আবার। শহরের আলো জ্বলছে। মাধুরী বলল, “তুমি কি কখনো অনুতপ্ত?” তূর্য বলল, “প্রথমে না। পরে হ্যাঁ। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি বলে।” মাধুরী বলল, “আমিও। আমার পরিবারের জন্য।” তূর্য তার হাত ধরল। “আমরা দুজনেই হারিয়েছি কিছু। এখন হয়তো কিছু ফিরে পাব।” মাধুরী মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তারা চুপ করে বসল। বাতাস বইছিল। কোনো বৃষ্টি নেই। শুধু শহরের শব্দ। দূরের গাড়ির হর্ন। কুকুরের ডাক।
তূর্য ভাবল তার সিদ্ধান্তের কথা। সে প্রতিশোধ নেবে আদালতের মাধ্যমে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। হাতে নয়। আর মাধুরীকে সে বেছে নিয়েছে। যে তাকে আবার আপন করেছে। যে তার জীবনে আলো এনেছে আবার। সে জানে না মামলায় কী হবে। জানে না আবুল হোসেন কী করবে। কিন্তু সে জানে সে একা নয় আর। মাধুরী আছে। আর সেইটাই যথেষ্ট এখনকার জন্য।
কিছুদিন পর মাধুরী বলল, “আমার বাবা আমাকে বলেছে তোমাকে ছেড়ে দিতে। নয়তো সে আমাকে ছাড়বে।” তূর্য তাকাল। “তুমি কী করবে?” মাধুরী চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি তোমাকে বেছে নেব। যদি বাবা আমাকে ছাড়ে, ছাড়ুক। আমি জানি তুমি সত্যি বলেছ। আমি দেখেছি কাগজপত্র। আমি বিশ্বাস করি।” তূর্য তার হাত শক্ত করে ধরল। “তুমি কি নিশ্চিত?” মাধুরী বলল, “হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত।”
সে রাতে তারা একসাথে থাকল। কথা কম। শুধু কাছাকাছি। তূর্য জানল তার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়েছে। প্রতিশোধ নেবে সে। কিন্তু ন্যায়ের পথে। আর মাধুরীকে সে হারাবে না। যে তাকে সত্যিই আপন করেছে। যে তার জীবনের নতুন অর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের এই শহরে, এই বিভাগে, এই মাটিতে সে আবার শুরু করবে। পরিবার হয়তো আর আগের মতো হবে না। কিন্তু নতুন কিছু গড়বে। মাধুরীর সাথে।
মামলার শুনানি চলতে থাকল। তূর্য অপেক্ষা করল। মাধুরী তার পাশে থাকল। আবুল হোসেন দূরত্ব রাখল। কিন্তু তূর্য আর মাধুরী থামল না। তারা এগিয়ে গেল। একসাথে। প্রতিশোধ আর ভালোবাসার মাঝখানে একটা রাস্তা খুঁজে পেল। যে রাস্তায় দুটোই আছে। একটু করে। ধীরে ধীরে। সত্যির ওপর ভর করে।
তূর্য একদিন মাধুরীকে বলল, “আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি। আর প্রতিশোধও নেব। কিন্তু তোমার মতো করে নয়। আমার মতো করে। ন্যায় দিয়ে।” মাধুরী হাসল। “আমি জানি। আর আমিও তোমাকে বেছে নিয়েছি।” তারা হাত ধরল। শহরের আলোতে দাঁড়িয়ে রইল। পেছনে পুরনো সব কষ্ট। সামনে অজানা দিনগুলো। কিন্তু একসাথে। বাংলাদেশের মাটিতে। যেখানে তূর্য ফিরে এসেছে। যেখানে মাধুরী তাকে আবার আপন করেছে। যেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিশোধ নয় শুধু। ভালোবাসাও। দুটোই।
....