আজমাইন হাসান আর নুজাইহা রহমান। দুই পরিবারের নাম শুনলেই ঢাকার ব্যবসায়ী মহলে চোখ কপালে ওঠে। হাসান ট্রেডিং আর রহমান এন্টারপ্রাইজ—দুই পক্ষই একই লাইনে কাজ করে। চামড়া আর তৈরি পোশাকের বাজারে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাবারা যখন ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তখনও সম্পর্ক ভালো ছিল না। আজমাইনের বাবা আর নুজাইহার বাবা একসময় একসঙ্গে কাজ করতেন। তারপর টাকার হিসাব নিয়ে মনোমালিন্য। সেই থেকে দুই পরিবারের মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলছে।
আজমাইন ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে—রহমানদের ওপর ভরসা করা যায় না। নুজাইহাও শুনেছে—হাসানরা সবসময় সুযোগ সন্ধানী। স্কুলে একসঙ্গে পড়ার সময়ও তারা একে অপরকে এড়িয়ে চলত। কলেজে দেখা হলে চোখের কোণে চোখ পড়লেই মুখ ভারী হয়ে যেত। একবার ক্যাম্পাসে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আজমাইন নুজাইহার দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সেদিনের বিতর্ক শেষ হওয়ার পর করিডোরে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আজমাইন বলেছিল, “তোমাদের পরিবারের মতো মানুষ ব্যবসায় নয়, শুধু কথায় পারদর্শী।” নুজাইহা জবাব দিয়েছিল, “আর তোমরা শুধু টাকা গুনতে জানো, মানুষকে বুঝতে না।” সেদিন থেকে আর কথা হয়নি।
এখন দুজনের বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। আজমাইন বাবার ব্যবসায় হাত দিয়েছে। নুজাইহা মায়ের সঙ্গে মিলে নতুন একটা ব্র্যান্ড গড়ছে। দুই পরিবারের মধ্যে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। একটা বড় অর্ডার নিয়ে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। আদালতের বাইরে দুই বাবা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলেনি। বাড়িতে বাড়িতে শুধু একটা কথাই শোনা যায়—ওদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না।
কিন্তু জীবন সবসময় পরিকল্পনা মেনে চলে না।
একদিন সকালে আজমাইনের বাবা হঠাৎ হাসপাতালে চলে যান। হার্টের সমস্যা। অবস্থা গুরুতর। ডাক্তার বললেন, অপারেশন লাগবে। খরচ অনেক। ব্যাংক লোন আছে। ব্যবসার টাকা আটকে আছে কয়েকটা চালানে। আজমাইনের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “এখন কেউ সাহায্য করবে না। সবাই শত্রু।”
ঠিক তখনই নুজাইহার বাবা এলেন হাসপাতালে। কেউ ডাকেনি। তিনি নিজে এসে দাঁড়ালেন কেবিনের বাইরে। আজমাইনের চাচা রাগ করে বললেন, “এখানে কী করতে এসেছেন?” নুজাইহার বাবা শান্ত গলায় বললেন, “আমার ছেলেমেয়েরা এই শহরে বড় হয়েছে। তোমার ভাইয়ের অবস্থা শুনে এসেছি। টাকার দরকার হলে বলো।”
আজমাইনের মা অবাক হয়ে তাকালেন। পরে জানা গেল, নুজাইহার বাবা গোপনে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। অপারেশনের খরচের একটা বড় অংশ তিনি দিয়ে দিয়েছেন। শর্ত একটাই—দুই পরিবারের মধ্যে শত্রুতা থামতে হবে। আর সেই শর্তের অংশ হিসেবে আজমাইন আর নুজাইহার বিয়ে।
আজমাইন যখন শুনল, তার মুখ কালো হয়ে গেল। “আমি ওকে বিয়ে করব? কখনো না।” নুজাইহাও বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “আমি মরলেও হাসান পরিবারে যাব না।” কিন্তু দুই বাবা একমত। ব্যবসা বাঁচাতে, পরিবার বাঁচাতে এই বিয়ে হতেই হবে।
বিয়ের দিন এল। সাদা রঙের পোশাক, ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান। শুধু নিকট আত্মীয়। আজমাইন কালো পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়েছিল। নুজাইহা সাদা শাড়ি পরে এসেছিল। চোখে চোখ পড়লে দুজনেই মুখ ফিরিয়ে নিল। কাবিননামায় সই করার সময় আজমাইনের হাত কাঁপছিল। নুজাইহার চোখে জল এসেছিল, কিন্তু সে মুছে ফেলেছিল।
বিয়ের রাতে নতুন বাড়িতে এসে আজমাইন দরজা বন্ধ করে বলল, “শোনো। আমি এই বিয়ে চাইনি। তুমিও চাওনি। সাত দিন। শুধু সাত দিন আমরা স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করব। পরিবারের সামনে। তারপর আলাদা হয়ে যাব। তুমি তোমার বাড়ি, আমি আমার।”
নুজাইহা তাকিয়ে রইল। তার গালে লাল ছোপ। “ঠিক আছে। সাত দিন। তার বেশি একদিনও নয়।”
সেই রাতে তারা আলাদা ঘরে শুয়েছিল। আজমাইন তার ঘরে শুয়ে ভাবছিল—কেন ওর বাবা এত সহজে রাজি হল? নুজাইহা তার ঘরে শুয়ে ভাবছিল—আজমাইনের চোখে কী ছিল সেই ক্ষণিকের দৃষ্টিতে?
পরের দিন সকালে আজমাইন রান্নাঘরে ঢুকল। নুজাইহা চা বানাচ্ছিল। আজমাইন কোনো কথা না বলে ওর পছন্দের বিস্কুট বের করে রাখল টেবিলে। নুজাইহা অবাক হয়ে তাকাল। আজমাইন বলল, “পরিবারের সামনে দেখাতে হবে আমরা ভালো আছি।” তারপর চলে গেল।
দুপুরে অফিস থেকে ফিরে আজমাইন দেখল নুজাইহা বারান্দায় বসে আছে। সে ওর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থামল। “আজকের মিটিংয়ে তোমার বাবার নাম উঠেছিল। ওরা ভেবেছে আমাদের বিয়ে হয়েছে বলে ব্যবসায় মিলবে।” নুজাইহা মুখ তুলে বলল, “হবে না। তুমি জানো।” আজমাইন হাসল। সেই হাসিটা ঠান্ডা ছিল। “জানি। তাই তো সাত দিন।”
সন্ধ্যায় নুজাইহার মা ফোন করলেন। আজমাইন পাশ থেকে শুনছিল। নুজাইহা বলছিল, “সব ঠিক আছে আম্মা। ও ভালো।” ফোন কেটে আজমাইন বলল, “ভালো অভিনয়।” নুজাইহা রাগ করে বলল, “তুমিও করো।”
রাতের খাবারের সময় আজমাইন নুজাইহার প্লেটে ওর পছন্দের মাছ দিয়ে দিল। নুজাইহা চুপচাপ খেল। খাওয়ার পর আজমাইন বলল, “তোমার গান শুনতে চাও? আমি জানি কোনটা।” নুজাইহা অবাক হয়ে তাকাল। আজমাইন ফোনে একটা গান চালাল। নুজাইহার পুরনো পছন্দের গান। যেটা কলেজে সে বারবার শুনত। আজমাইন কীভাবে জানে?
নুজাইহা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কীভাবে জানলে?” আজমাইন মুখ ফিরিয়ে বলল, “শুধু মনে পড়েছে। অভিনয়ের অংশ।” তারপর চলে গেল নিজের ঘরে।
নুজাইহা বসে রইল। মনে মনে ভাবল—এটা কি শুধু অভিনয়? আজমাইনের রাগের পেছনে কি অন্য কিছু আছে? যে মানুষটা তাকে সহ্য করতে পারে না, সে কেন ওর পছন্দের জিনিস মনে রাখে?
রাত গভীর হল। আজমাইন ঘুমাতে পারছিল না। সে উঠে এসে নুজাইহার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। ভিতরে নুজাইহা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় ওর মুখ দেখা যাচ্ছে। আজমাইনের বুকের ভিতরটা চাপা চাপা ব্যথা করছে। সে জানে—এই মেয়েটাকে সে ঘৃণা করে। কিন্তু কেন ওর হাসি মনে পড়ে? কেন ওর রাগের সময়ও ওর চোখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে?
নুজাইহা পেছন ফিরে দেখল আজমাইন দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের চোখ মিলল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর আজমাইন বলল, “ঘুমাও। কাল সকালে আবার অভিনয় শুরু।” নুজাইহা কোনো জবাব দিল না। শুধু দরজা বন্ধ করে দিল।
আজমাইন ফিরে এসে শুয়ে পড়ল। মনে মনে বলল—সাত দিন। শুধু সাত দিন। তারপর সব শেষ। কিন্তু সেই রাতে তার ঘুম এল না। নুজাইহার মুখবারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। ওর গলার স্বর। ওর রাগের সময়ের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। আর সেই ক্ষণিকের নরম ভাব—যখন সে গান শুনছিল।
নুজাইহাও ঘুমাতে পারছিল না। আজমাইনের সেই গান চালানোর কথা মনে পড়ছিল। ও কীভাবে জানল? কলেজে কি ও লক্ষ্য করত? নুজাইহা নিজেই জানে না কেন তার বুকের ভিতরটা অদ্ভুত লাগছে। এই মানুষটাকে সে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু আজ রাতে ওর চোখে যেটা দেখেছে, সেটা ঘৃণা নয়। অন্য কিছু।
সাত দিনের খেলা শুরু হয়েছে। কিন্তু খেলার নিয়ম কি দুজনেই মেনে চলতে পারবে? নাকি নিয়ম ভেঙে যাবে কোনো এক রাতে?
সাত দিনের দ্বিতীয় দিন সকালে আজমাইন উঠে দেখল নুজাইহা ইতিমধ্যে রান্নাঘরে। সে চা বানিয়ে রেখেছে দুজনের জন্য। আজমাইন কোনো কথা না বলে চা নিয়ে বসল। নুজাইহা বলল, “আজ তোমার অফিসে যাওয়ার কথা। আমিও বের হব।” আজমাইন মাথা নাড়ল। “বাইরে গেলে একসঙ্গে যেয়ো। লোকে দেখুক।”
গাড়িতে উঠে দুজনে পাশাপাশি বসল। চালক সামনে। আজমাইন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। নুজাইহার হাতের গন্ধ পাশ থেকে আসছিল। হালকা একটা আতর। আজমাইনের নাকের ভিতরটা গরম হয়ে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিল। নুজাইহাও চুপ। গাড়ি চলছে। মাঝে মাঝে তাদের হাতের পিঠ একে অপরের সঙ্গে লেগে যাচ্ছিল। প্রত্যেকবার দুজনেই সরিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু শেষবার আজমাইন সরায়নি। নুজাইহার হাতের পিঠে ওর আঙুলের ছোঁয়া লেগে রইল কয়েক সেকেন্ড। নুজাইহার শ্বাস ভারী হয়ে গেল। আজমাইন মুখ ফিরিয়ে তাকাল। নুজাইহার চোখে চোখ পড়ল। কোনো কথা হল না। শুধু সেই তাকানো। গাড়ি থামার আগে আজমাইন হাত সরিয়ে নিল।
অফিসে গিয়ে আজমাইন মিটিংয়ে বসল। মাঝে মাঝে মনে পড়ছিল নুজাইহার হাতের ছোঁয়া। সে রাগ করে নিজেকে বলল—এটা অভিনয়। শুধু অভিনয়। কিন্তু শরীর মানছে না।
বিকেলে বাড়ি ফিরে আজমাইন দেখল নুজাইহা বসার ঘরে বসে আছে। টেলিভিশন চলছে না। সে শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। আজমাইন এগিয়ে গিয়ে বলল, “আজকের খবর—তোমাদের কোম্পানি একটা নতুন অর্ডার পেয়েছে। আমার বাবার অপারেশনের পর থেকে লোকে ভাবছে আমরা এক হয়ে গেছি।” নুজাইহা ঘুরে তাকাল। “তাহলে ভালো। ব্যবসা বাড়বে।” আজমাইন হাসল। “হ্যাঁ। কিন্তু আমি চাই না তোমার সাহায্য নিয়ে ব্যবসা বাড়ুক।” নুজাইহা উঠে দাঁড়াল। “আমিও চাই না তোমার দয়া।”
দুজনের মধ্যে আবার সেই পুরনো ঝগড়া শুরু হল। কথায় কথায় রাগ বাড়ল। আজমাইন বলল, “তোমরা সবসময় নিজেদের বড় ভাবো।” নুজাইহা জবাব দিল, “আর তোমরা সবসময় অন্যকে ছোট করতে চাও।” কথা কাটাকাটি বাড়তে বাড়তে আজমাইন এগিয়ে গিয়ে নুজাইহার হাত ধরল। “থামো।” নুজাইহা হাত ছাড়াতে গেল। আজমাইন ছাড়ল না। দুজনের শরীর কাছাকাছি। নুজাইহার শ্বাস আজমাইনের গায়ে লাগছে। আজমাইনের চোখ নুজাইহার ঠোঁটে আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর আজমাইন হাত ছেড়ে দিল। “যাও। ঘরে যাও।” নুজাইহা দৌড়ে চলে গেল।
রাতের খাবারে আজমাইন আবার নুজাইহার প্লেটে ওর পছন্দের জিনিস দিয়ে দিল। নুজাইহা খেল না। উঠে চলে গেল। আজমাইন একা বসে খেল। পরে উঠে নুজাইহার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ভিতরে কাঁদার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। আজমাইন দরজা খুলে ঢুকল। নুজাইহা বিছানায় মুখ গুঁজে আছে। আজমাইন বসল পাশে। “আমি... আমি চাইনি এভাবে।” নুজাইহা মুখ তুলল। চোখ লাল। “তাহলে কেন হাত ধরলে?” আজমাইন কোনো জবাব দিতে পারল না। সে শুধু নুজাইহার চুল থেকে একটা আলগা চুল সরিয়ে দিল। নুজাইহার গালে ওর আঙুল লেগে গেল। নুজাইহা সরে গেল না। আজমাইন এগিয়ে গেল। নুজাইহার ঠোঁটের কাছে এসে থামল। “বলো থামতে।” নুজাইহা বলল না। আজমাইন চুমু খেল। প্রথমে আস্তে। তারপর গভীর করে। নুজাইহার হাত আজমাইনের গলায় উঠে গেল। আজমাইনের হাত নুজাইহার কোমরে। দুজনের শরীর জড়িয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। আজমাইনের হাত নুজাইহার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। নুজাইহার ত্বক গরম। আজমাইনের ঠোঁট নুজাইহার গলায়, কানের পাশে, বুকের ওপর। নুজাইহা আঁকড়ে ধরল। শ্বাস ওঠানামা করছে। আজমাইন নুজাইহার চোখের দিকে তাকাল। “এটা কি অভিনয়?” নুজাইহা মাথা নাড়ল। “জানি না।” আজমাইন আবার চুমু খেল। আরও গভীর। আরও ক্ষুধার্ত। নুজাইহার শাড়ি খুলে গেল। আজমাইনের জামা খুলে গেল। দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। রাতভর তারা একে অপরকে চেনে নিল। আজমাইনের হাত নুজাইহার প্রতিটি অংশ ছুঁয়ে দেখল। নুজাইহার নখ আজমাইনের পিঠে দাগ কেটে দিল। শেষে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা শরীর। শ্বাস এখনও ভারী।
সকালে আজমাইন উঠে দেখল নুজাইহা ঘুমাচ্ছে। ওর চুল মুখের ওপর এলোমেলো। আজমাইন আস্তে করে চুল সরিয়ে দিল। নুজাইহা চোখ খুলল। দুজনে তাকিয়ে রইল। কোনো কথা হল না। আজমাইন উঠে চলে গেল। নুজাইহা বিছানায় শুয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—এটা কী হল? সাত দিনের অভিনয় নাকি অন্য কিছু?
তৃতীয় দিনে দুজনে আবার স্বাভাবিক অভিনয় শুরু করল। কিন্তু চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে। আজমাইন অফিস থেকে ফিরে এসে নুজাইহার জন্য ফুল কিনে আনল। নুজাইহা অবাক হয়ে বলল, “এটা কেন?” আজমাইন বলল, “অভিনয়।” কিন্তু চোখে হাসি ছিল। রাতে আবার তারা একসঙ্গে শুয়েছিল। এইবার আরও ধীর। আরও গভীর। আজমাইন নুজাইহার কানে কানে বলল, “আমি তোমাকে ঘৃণা করি।” নুজাইহা হাসল। “আমিও।” তারপর আবার জড়িয়ে ধরল।
চতুর্থ দিনে আজমাইনের বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন। সবাই খুশি। আজমাইন আর নুজাইহা একসঙ্গে বাবার সামনে দাঁড়াল। বাবা হাত ধরে বললেন, “ভালো থেকো।” আজমাইনের চোখে জল এসে গেল। নুজাইহা ওর হাত চেপে ধরল।
পঞ্চম দিনে দুজনে একসঙ্গে বের হল। পার্কে হেঁটে হেঁটে কথা বলল। পুরনো ঝগড়ার কথা। কলেজের কথা। ব্যবসার কথা। আজমাইন বলল, “আমি তোমার গান শুনতাম কলেজে। লুকিয়ে।” নুজাইহা থমকে দাঁড়াল। “কেন?” আজমাইন বলল, “জানি না। তোমার গলার স্বর পছন্দ হত। যদিও তোমাকে সহ্য করতে পারতাম না।” নুজাইহা হাসল। “আমিও তোমার বিতর্ক শুনতাম। রাগ হত। কিন্তু মনোযোগ দিতাম।”
রাতের বেলা তারা আবার এক হল। এইবার আরও কাছাকাছি। আজমাইন নুজাইহার শরীরে চুমু খেতে খেতে বলল, “সাত দিন শেষ হলে কী হবে?” নুজাইহা চোখ বন্ধ করে বলল, “জানি না।” আজমাইনের হাত নুজাইহার কোমর ঘিরে ধরল। “আমি জানতে চাই।” নুজাইহা উত্তর দিল না। শুধু ওকে আরও কাছে টানল।
ষষ্ঠ দিনে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসল। ব্যবসার কথা হল। দুই পরিবারের মিলনের কথা। আজমাইন আর নুজাইহা পাশাপাশি বসে শুনল। মাঝে মাঝে তাদের হাতের ছোঁয়া লাগছিল। কেউ কিছু বুঝতে পারছিল না। শুধু দুজনেই জানে—এই ছোঁয়া এখন আর অভিনয় নয়।
রাত গভীর হলে আজমাইন নুজাইহার ঘরে এল। দরজা বন্ধ করে জড়িয়ে ধরল। “আমি তোমাকে চাই।” নুজাইহা ওর গলায় মুখ রেখে বলল, “আমিও।” সেই রাতে তারা একে অপরকে সম্পূর্ণ দিয়ে দিল। কোনো সংকোচ নেই। কোনো ভয় নেই। শুধু দুজনের শরীর আর মন এক হয়ে গেছে। আজমাইনের চোখে জল এসেছিল শেষের দিকে। নুজাইহা মুছে দিয়েছিল।
সাত দিনের শেষ দিন সকালে আজমাইন উঠে নুজাইহার দিকে তাকাল। নুজাইহা এখনও ঘুমাচ্ছে। আজমাইনের বুকের ভিতরটা ভারী। আজ শেষ দিন। আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে উঠে চা বানাল। নুজাইহা এসে বসল। দুজনে চুপচাপ চা খেল। আজমাইন বলল, “আজ সন্ধ্যায় কথা বলব।” নুজাইহা মাথা নাড়ল।
দিনভর দুজনে আলাদা আলাদা কাজ করল। কিন্তু মন অন্য জায়গায়। আজমাইন অফিসে বসে ভাবছিল—সাত দিন আগে যে মেয়েটাকে সে ঘৃণা করত, আজ সেই মেয়েটা ছাড়া থাকতে পারছে না। নুজাইহার হাসি, ওর রাগ, ওর শরীরের গরম—সবকিছু এখন ওর ভিতরে গেঁথে গেছে। নুজাইহাও বাড়িতে বসে ভাবছিল—এই মানুষটার রাগের পেছনে কী ছিল? কেন সে এতদিন ওকে এড়িয়ে চলত? এখন মনে হচ্ছে আজমাইন ওকে চেনে। ওর পছন্দ জানে। ওর ব্যথা বোঝে।
সন্ধ্যায় দুজনে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশ পরিষ্কার। তারা পাশাপাশি। আজমাইন আগে কথা বলল। “আমি সাত দিন আগে বলেছিলাম অভিনয় করব। কিন্তু আমি অভিনয় করতে পারিনি। প্রথম রাত থেকেই।” নুজাইহা তাকাল। আজমাইন চালিয়ে গেল। “কলেজে তোমাকে দেখতাম। রাগ হত। কারণ তুমি সবসময় সঠিক কথা বলতে। আমি হেরে যেতাম। পরে যখন ব্যবসায় লড়াই শুরু হল, আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ঘৃণা করা সহজ হবে। কিন্তু পারিনি। তোমার গান মনে রেখেছিলাম। তোমার পছন্দের খাবার জানতাম। কারণ আমি লক্ষ্য করতাম।” নুজাইহার চোখে জল এসে গেল। আজমাইন হাত বাড়িয়ে ওর গাল মুছে দিল। “আমি চাই না সাত দিন শেষ হোক। আমি চাই তুমি থাকো।”
নুজাইহা কথা বলতে গিয়ে গলা বুজে এল। “আমিও... আমিও তোমাকে সহ্য করতে পারতাম না। কারণ তুমি সবসময় জিততে চাইতে। কিন্তু তোমার চোখে যখন রাগ দেখতাম, মনে হত ওর পেছনে অন্য কিছু আছে। এখন বুঝতে পেরেছি। তুমি আমাকে চাইতে। শুধু স্বীকার করতে পারতে না।” আজমাইন এগিয়ে গিয়ে নুজাইহাকে জড়িয়ে ধরল। “এখন স্বীকার করছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেকদিন ধরে।” নুজাইহা ওর বুকে মুখ রেখে বলল, “আমিও।”
দুজনে চুমু খেল। এইবার আর কোনো তাড়া নেই। কোনো লুকোনো নেই। শুধু দুজনের ভালোবাসা। রাতে তারা আবার এক হল। এইবার আরও গভীর। আরও আস্তে। আজমাইন নুজাইহার শরীরের প্রতিটি অংশকে চুমু দিয়ে বলল, “তুমি আমার।” নুজাইহা হাসল। “তুমিও আমার।” তাদের শরীর একসঙ্গে নাচল। ঘামে ভেজা বিছানা। শ্বাসের শব্দ। শেষে দুজনে জড়িয়ে শুয়ে রইল। আজমাইন নুজাইহার চুলে আঙুল চালাল। “কাল থেকে আর অভিনয় নেই। সত্যি।” নুজাইহা মাথা নাড়ল। “সত্যি।”
পরের দিন সকালে দুজনে পরিবারের সামনে দাঁড়াল। আজমাইন বলল, “আমরা থাকব। একসঙ্গে।” নুজাইহার বাবা হাসলেন। আজমাইনের বাবা চোখ মুছলেন। ব্যবসার কথা উঠল। দুই পরিবার একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিল। পুরনো শত্রুতা শেষ।
কয়েক মাস পর। আজমাইন আর নুজাইহা একসঙ্গে নতুন বাড়ি সাজাচ্ছে। নুজাইহা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। আজমাইন পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। “মনে আছে সাত দিনের কথা?” নুজাইহা হাসল। “মনে আছে। তুমি গান চালিয়েছিলে।” আজমাইন চুমু খেল ওর ঘাড়ে। “এখন প্রতিদিন চালাব।” নুজাইহা ঘুরে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। “প্রতিদিন।”
রাতে তারা বারান্দায় বসল। আজমাইন নুজাইহার মাথা কোলে নিয়ে বসল। নুজাইহা চোখ বন্ধ করে বলল, “আমাদের পরিবারের শত্রুতা যদি না থাকত, তাহলে কি আমরা এত কাছাকাছি আসতাম?” আজমাইন চুল ছুঁয়ে বলল, “হয়তো না। কিন্তু এখন আর সেই কথা ভাবি না। এখন শুধু তোমাকে ভাবি।” নুজাইহা উঠে বসল। দুজনের চোখ মিলল। আজমাইন আস্তে করে চুমু খেল। নুজাইহা ওর জিভ চেপে ধরল। চুমু গভীর হল। আজমাইনের হাত নুজাইহার কোমরে। নুজাইহার হাত আজমাইনের চুলে। দুজনে উঠে ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হল। বিছানায় শুয়ে তারা আবার একে অপরকে নিল। এইবার আরও আনন্দের সঙ্গে। আরও ভালোবাসার সঙ্গে। আজমাইনের শরীর নুজাইহার শরীরের ওপর। নুজাইহার পা আজমাইনের কোমর জড়িয়ে ধরল। দুজনের শ্বাস এক হয়ে গেল। শেষে আজমাইন নুজাইহার কানে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়ব না।” নুজাইহা হাসল। “ছাড়তে দিব না।”
বছর গেল। তাদের একটা ছেলে হল। ব্যবসা বাড়ল। দুই পরিবার এক হয়ে গেল। আজমাইন আর নুজাইহা এখনও ঝগড়া করে। সামান্য বিষয়ে। কিন্তু ঝগড়ার শেষে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। আজমাইন এখনও নুজাইহার পছন্দের গান চালায়। নুজাইহা এখনও আজমাইনের জন্য চা বানায়। আর রাতে যখন তারা একসঙ্গে শোয়, তখন আর কোনো অভিনয় থাকে না। শুধু দুজনের গভীর ভালোবাসা। যে ভালোবাসা একসময় রাগের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। এখন সেই ভালোবাসা তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
আজমাইন কখনো কখনো নুজাইহার দিকে তাকিয়ে ভাবে—যদি সেই সাত দিন না থাকত, তাহলে কি সে কখনো জানতে পারত ওর ভিতরে কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে? নুজাইহাও ভাবে—আজমাইনের রাগের পেছনে যে নরম হৃদয় ছিল, সেটা যদি না দেখত, তাহলে কি এত সুখী হতে পারত? উত্তর একটাই। তারা একে অপরের জন্য তৈরি। শত্রুতা দিয়ে শুরু হলেও ভালোবাসা দিয়ে শেষ হয়েছে। আর এই শেষটাই তাদের আসল শুরু।
....