সাত বছর আগের সেই গ্রীষ্মের দুপুরে ঢাকার গুলশানের এক বাড়ির আঙিনায় গোলাপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। নাবিহ আর রিদওয়ানার বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারের আত্মীয়স্বজন সব এসে জড়ো হয়েছিল। রিদওয়ানার মা হাসিমুখে মেয়ের হাতে মেহেদি লাগাতে বসেছিলেন। রিদওয়ানা সেদিন সাদা সালোয়ার-কামিজে চুপচাপ বসেছিল। তার চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত আনন্দ। নাবিহকে সে ভালোবাসত। নাবিহের চোখের দিকে তাকালেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠত। নাবিহ কথা কম বলত, কিন্তু যখন বলত, তার কণ্ঠস্বরটা যেন তার শরীরের প্রতিটা স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ত।
বিয়ের মাত্র তিন দিন আগে রাতের বেলা নাবিহ ফোন করল। রিদওয়ানা তখন ছাদে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়েছিল। নাবিহের কণ্ঠস্বর শুনেই তার হৃদয়টা দ্রুত স্পন্দিত হতে শুরু করল। কিন্তু নাবিহ যা বলল, তাতে তার পৃথিবীটা থেমে গেল।
“রিদওয়ানা… আমি যেতে পারব না।”
রিদওয়ানা প্রথমে বুঝতেই পারেনি। “কী বলছো তুমি?”
“বিয়েটা হবে না। আমি চলে যাচ্ছি। কোনো প্রশ্ন করো না।”
ফোন কেটে গেল। রিদওয়ানা বারবার কল করল। নাবিহ আর ধরল না। পরের দিন সকালে নাবিহের বাবা-মা এসে ক্ষমা চাইল। তারাও কিছু জানে না। নাবিহ রাতের বেলাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। কোনো চিঠি নেই, কোনো বার্তা নেই। শুধু একটা খালি ঘর আর একটা ভেঙে পড়া মেয়ে।
রিদওয়ানা সেদিন থেকে কথা বলা বন্ধ করে দিল। তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। বাবা চেয়ারে বসে মাথা নিচু করে ছিলেন। আত্মীয়স্বজনেরা ফিসফিস করে কথা বলছিল। কেউ বলেছিল হয়তো অন্য কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে, কেউ বলেছিল ব্যবসার কোনো সমস্যা। কিন্তু কেউই সত্যিটা জানত না। রিদওয়ানা শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল নিজের কাছে—জীবনে আর কখনো নাবিহের মুখ দেখবে না। সেই মুখ, যে মুখের দিকে তাকিয়ে সে এতদিন স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মুখকে সে মুছে ফেলবে নিজের স্মৃতি থেকে।
পরের কয়েক মাস রিদওয়ানা ঘর থেকে বেরোত না। তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল। রাতের পর রাত সে জেগে থাকত। নাবিহের কণ্ঠস্বর তার কানে বাজত। নাবিহের হাতের স্পর্শ—যে স্পর্শ সে মাত্র কয়েকবার পেয়েছিল—তার ত্বকে জ্বলত। একবার নাবিহ তার চুলের আঁচড় সরিয়ে কপালে চুমু দিয়েছিল। সেই চুমুর উষ্ণতা এখনো তার শরীরে লেগে আছে। সে সেই অনুভূতিকে ঘৃণা করতে শিখল। ভালোবাসাকে ঘৃণা করতে শিখল।
দুই বছর পর রিদওয়ানা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো। সে নিজেকে পড়াশোনায় ডুবিয়ে দিল। রাত জেগে পড়ত, দিনে হাসপাতালে কাজ করত। তার সহপাঠীরা তাকে ‘আয়রন লেডি’ বলে ডাকত। কেউ তার কাছে আসতে সাহস পেত না। রিদওয়ানাও কাউকে কাছে আসতে দিত না। তার হৃদয়টা যেন একটা বন্ধ দরজার ভেতর আটকে ছিল।
সাত বছর কেটে গেল। রিদওয়ানা এখন একজন সফল চিকিৎসক। ঢাকার এক নামকরা হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট। তার হাতের স্পর্শে রোগীরা আশ্বস্ত হয়। তার কণ্ঠস্বরে শান্তি পায়। কিন্তু রাতের বেলা যখন সে একা হয়, তখন সেই পুরনো ক্ষতটা আবার জেগে ওঠে। নাবিহের নাম কেউ উচ্চারণ করলেও তার শরীর শক্ত হয়ে যায়।
নাবিহ এদিকে পরিবারের ব্যবসা সামলাচ্ছিল। তার বাবার কাপড়ের ব্যবসা। নাবিহ চুপচাপ কাজ করত। কথা কম, হাসি কম। তার চোখে একটা গভীর বিষাদ লেগে থাকত। কেউ জানত না কেন সে সেদিন চলে গিয়েছিল। তার মা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, নাবিহ শুধু মাথা নেড়ে উত্তর দিত না।
একদিন নাবিহের ছোট বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান হলো। পরিবারের সবাই ডাকা হলো। রিদওয়ানার পরিবারও আমন্ত্রিত। রিদওয়ানা যেতে চায়নি। কিন্তু তার মা জোর করলেন। “এতদিন পর সবাইকে দেখা হোক। তুমি এখন সফল। কারো সামনে মাথা নত করার কিছু নেই।”
রিদওয়ানা সাদা রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পরে গেল। চুল আলগা করে রেখেছিল। মেকআপ কম। তার চোখে ছিল এক ধরনের শীতল দৃঢ়তা। হলরুমে ঢোকার মুহূর্তেই তার নজরে পড়ল নাবিহ। নাবিহ কালো পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়েছিল এক কোণে। সাত বছর পরও তার চেহারা প্রায় একই। শুধু চোখের নিচে একটু ক্লান্তি, আর চোয়ালের রেখা আরও শক্ত।
রিদওয়ানার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিল। নাবিহের দিকে তাকাল না। কিন্তু নাবিহ তাকিয়েছিল। তার চোখে যে অপরাধবোধ ছিল, তা লুকানোর চেষ্টা করেও লোকানো যাচ্ছিল না। রিদওয়ানার দিকে তাকিয়ে নাবিহের হাত কেঁপে উঠল। সে এক পা এগোতে গিয়ে থেমে গেল।
সারা সন্ধ্যা রিদওয়ানা অন্যদের সাথে কথা বলল, হাসল, অভিনন্দন জানাল। কিন্তু তার মন ছিল নাবিহের ওপরেই। নাবিহও দূর থেকে তাকে দেখছিল। দুজনের চোখাচোখি হলে রিদওয়ানা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিত। নাবিহের চোখে সেই পুরনো আগুনটা এখনো জ্বলছিল—শুধু এখন তার সাথে মিশে আছে গভীর অনুশোচনা।
অনুষ্ঠান শেষের দিকে রিদওয়ানার মা আর নাবিহের মা একসাথে বসে কথা বলছিলেন। রিদওয়ানা দূর থেকে দেখছিল। তার মায়ের চোখে একটা অদ্ভুত আশা দেখে সে বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সে জানত না যে সেই রাতটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে আবার।
রিদওয়ানা বাড়ি ফিরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। সে জল মুছে ফেলল। “আমি আর কাঁদব না,” সে নিজেকে বলল। “আর কখনো না।”
কিন্তু সেই রাতে তার স্বপ্নে নাবিহ এসেছিল। নাবিহ তার হাত ধরেছিল, তার কপালে চুমু দিয়েছিল, তার কানে ফিসফিস করে বলেছিল—ক্ষমা করে দাও। রিদওয়ানা স্বপ্নেই তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল। জেগে উঠে সে দেখল বালিশ ভিজে গেছে।
সাত বছরের ক্ষত আবার রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল। আর রিদওয়ানা জানত না যে এই ক্ষত সারাতে নাবিহকেই আবার তার জীবনে ফিরে আসতে হবে।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও রিদওয়ানার মন শান্ত হচ্ছিল না। বাড়ি ফিরে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। ছাদের ওপর চাঁদ উঠেছে, কিন্তু সে জানালা দিয়ে তাকিয়েও কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। নাবিহের চোখ তার সামনে ভেসে উঠছিল বারবার। সেই চোখে অপরাধবোধ ছিল, কিন্তু তার সাথে ছিল আরেকটা অনুভূতি—যেন সে এখনো রিদওয়ানাকে চায়। রিদওয়ানার শরীর কেঁপে উঠল সেই চিন্তায়। সে বালিশে মুখ গুঁজে নিজেকে শাসিয়ে উঠল। “তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে। ভুলে যেও না।”
পরের দিন সকালে রিদওয়ানার মা তার ঘরে ঢুকলেন। মুখে একটা অদ্ভুত হাসি। “রিদওয়ানা, নাবিহের মা ফোন করেছে। তারা আজ বিকেলে আসতে চায়।”
রিদওয়ানা উঠে বসল। “কেন?”
মা চুপ করে থাকলেন একটু। তারপর আস্তে বললেন, “তারা আবার… প্রস্তাব দিয়েছে। নাবিহ নিজেই চেয়েছে।”
রিদওয়ানার হাত কেঁপে উঠল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল। “না। আমি রাজি নই।”
মা তার হাত ধরলেন। “মেয়ে, শুধু একবার শুনে দেখ। সাত বছর পার হয়ে গেছে। তুমি এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছ। যদি মনে হয় না, তাহলে না করে দিও। কিন্তু সুযোগটা দিয়ে দেখ।”
রিদওয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ভেতরটা দোলাচ্ছিল। নাবিহের মুখ, নাবিহের কণ্ঠস্বর, নাবিহের হাতের স্পর্শ—সব মিলেমিশে একটা ঝড় তুলছিল। সে শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু মনে মনে একটা শর্ত তৈরি করে নিল।
বিকেল পাঁচটার দিকে নাবিহের পরিবার এল। নাবিহও এসেছে। কালো শার্ট আর প্যান্ট পরে। চুপচাপ। রিদওয়ানা ড্রয়িং রুমে ঢুকেই তার চোখের সাথে চোখ পড়ল। নাবিহ দাঁড়িয়ে উঠল। তার গলায় কথা আটকে গেল মনে হলো। রিদওয়ানা তাকে এড়িয়ে গিয়ে মায়ের পাশে বসল।
নাবিহের মা কথা শুরু করলেন। “রিদওয়ানা, আমরা জানি আমরা অনেক বড় ভুল করেছি। নাবিহ সেদিন যা করেছে, তার কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু সে এখনো… তোমাকেই চায়। আমরা আবার তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি।”
রিদওয়ানার বাবা চুপচাপ বসে ছিলেন। মাও কিছু বললেন না। সবাই রিদওয়ানার দিকে তাকিয়ে আছে। রিদওয়ানা ধীরে মাথা তুলে নাবিহের দিকে তাকাল। নাবিহ তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে সেই একই অপরাধবোধ, আর তার নিচে গভীর এক আকুতি।
রিদওয়ানা শান্ত গলায় বলল, “আমি রাজি। কিন্তু একটা শর্তে।”
সবাই থমকে গেল। নাবিহের চোখ বড় হয়ে গেল।
“নাবিহকে আমাকে বলতে হবে—সেদিন কেন চলে গিয়েছিল। কোনো মিথ্যা ছাড়া। পুরো সত্যি।”
নাবিহের মা দ্রুত বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই বলবে।”
কিন্তু নাবিহ চুপ করে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রিদওয়ানা উঠে দাঁড়াল। “আজ নয়। কাল। একা। আমি শুনতে চাই।”
সবাই রাজি হয়ে গেল। নাবিহ শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার চোখে ভয় মেশানো একটা স্বস্তি দেখা গেল।
পরের দিন বিকেলবেলা রিদওয়ানা নাবিহের বাড়িতে গেল না। সে বলল, “নদীর ধারে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে। সেখানে দেখা করব।” সে জানত জনাকীর্ণ জায়গায় নাবিহ পুরোপুরি খুলতে পারবে না। আর সে চায় না কেউ তাদের কথা শুনুক।
সন্ধ্যা নামছিল যখন রিদওয়ানা নদীর পাড়ে পৌঁছাল। গাছের ছায়ায় একটা বেঞ্চ ছিল। নাবিহ ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে তার শার্টের হালকা সুবাস ভেসে আসছিল। রিদওয়ানার শরীর অজান্তেই শিউরে উঠল।
নাবিহ পাশ ফিরে তাকাল। “এসেছ।”
রিদওয়ানা মাথা নেড়ে বেঞ্চে বসল। নাবিহও পাশে বসল। দুজনের মধ্যে একটু ফাঁক রেখে। কিন্তু সেই ফাঁকটাও যেন গরম হয়ে উঠছিল।
রিদওয়ানা সোজাসুজি বলল, “বলো।”
নাবিহ কিছুক্ষণ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার হাত মুঠো করা। তারপর আস্তে আস্তে কথা শুরু করল।
“সেদিন… আমার বাবার ব্যবসায় একটা বড় সমস্যা হয়েছিল। টাকা দেনা। যারা টাকা দিয়েছিল, তারা হুমকি দিচ্ছিল। তারা বলেছিল, যদি আমি বিয়ে করি, তাহলে তোমার পরিবারকেও জড়াবে। আমি… আমি তোমাকে সেই বিপদে ফেলতে পারিনি।”
রিদওয়ানার চোখ কুঁচকে গেল। “তাহলে বললেই তো পারতে। আমাকে বললেই পারতে।”
নাবিহ মাথা নেড়ে উঠল। “আমি ভয় পেয়েছিলাম। তুমি যদি জানতে, তাহলে তুমি বিয়ে বাতিল করতে না। তুমি আমার সাথে থাকতে চাইতে। আর আমি পারতাম না তোমাকে সেই ঝুঁকিতে রাখতে। তাই… চুপ করে চলে গেলাম।”
রিদওয়ানার ভেতরটা উত্তাল হয়ে উঠল। রাগ, কষ্ট, আর একটা অদ্ভুত স্বস্তি একসাথে। সে উঠে দাঁড়াল। “সাত বছর। সাতটা বছর আমি প্রতিদিন মরেছি। আর তুমি ভেবেছ এটাই ভালো?”
নাবিহও উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল চকচক করছিল। “আমি জানি। আমি প্রতিদিন নিজেকে শাস্তি দিয়েছি। তোমার মুখ মনে পড়লেই আমার বুক ফেটে যেত। আমি তোমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। পারিনি।”
রিদওয়ানা তার দিকে এগোল এক পা। “তাহলে এখন কেন ফিরে এলে?”
নাবিহ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল। “কারণ আমি আর পারছি না। তোমাকে না দেখে, তোমার গন্ধ না নিয়ে, তোমার হাত না ছুঁয়ে আমি আর বাঁচতে পারছি না। রিদওয়ানা… আমি এখনো তোমাকে চাই। প্রচণ্ডভাবে চাই।”
রিদওয়ানার শ্বাস আটকে গেল। নাবিহ তার কাছে এসে দাঁড়াল। দুজনের মধ্যে এখন মাত্র এক হাতের ব্যবধান। নাবিহের শরীরের উষ্ণতা তার ত্বকে লাগছিল। রিদওয়ানার চোখ নাবিহের ঠোঁটের দিকে চলে গেল অজান্তেই। নাবিহও তার দিকে তাকিয়ে আছে সেই একই তীব্রতায়।
নাবিহ আস্তে হাত বাড়িয়ে রিদওয়ানার চুলের একটা কাকড়া সরিয়ে দিল। তার আঙুলের ছোঁয়ায় রিদওয়ানার গা শিউরে উঠল। সে পিছু হটল না। নাবিহ আরও একটু কাছে এল। তার কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলল, “আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”
রিদওয়ানা মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। তার নিজের চোখেও জল। “আমি জানি না। কিন্তু… আমি তোমাকে এখনো চাই। এতদিন পরও।”
নাবিহ আর সহ্য করতে পারল না। সে তার কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। রিদওয়ানার হাত অজান্তেই নাবিহের বুকে পড়ল। দুজনের শরীর প্রায় লেগে গেল। নাবিহ মাথা নিচু করল। তার ঠোঁট রিদওয়ানার ঠোঁটের কাছে এল। বাতাস যেন থেমে গেল।
রিদওয়ানা চোখ বন্ধ করে দিল। নাবিহের ঠোঁট তার ঠোঁটে ছুঁয়ে গেল—আলতো করে, যেন জিজ্ঞেস করছে। তারপর চাপ বাড়ল। রিদওয়ানার হাত নাবিহের ঘাড়ে উঠে গেল। নাবিহ তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চুমুটা গভীর হয়ে উঠল। সাত বছরের ক্ষুধা, কষ্ট, ভালোবাসা—সব একসাথে বেরিয়ে এল সেই চুমুতে। নাবিহের জিভ তার ঠোঁট সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রিদওয়ানা গোঙানি চেপে ধরল। তার শরীর নাবিহের শরীরের সাথে মিশে যেতে চাইছিল।
নাবিহ চুমু ভেঙে তার গাল বেয়ে কানে চুমু দিল। “আমি তোমাকে হারাতে চাই না আবার,” সে ফিসফিস করে বলল। তার গরম শ্বাস রিদওয়ানার কানে লাগছিল। রিদওয়ানার হাঁটু দুর্বল হয়ে আসছিল।
রিদওয়ানা তার বুকে মুখ রেখে বলল, “তাহলে আর কখনো চুপ করে চলে যেও না।”
নাবিহ তার চিবুক তুলে চোখের দিকে তাকাল। “কখনো না। প্রতিজ্ঞা করছি।”
দুজনে আবার জড়িয়ে ধরল একে অপরকে। নদীর বাতাস তাদের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। দূরে কোনো নৌকার আলো জ্বলছিল। কিন্তু তাদের জগততে আর কিছু ছিল না। শুধু একে অপরের উষ্ণতা, একে অপরের হৃদস্পন্দন।
রিদওয়ানার মনে হচ্ছিল, সাত বছরের দেয়ালটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু সে জানত, পুরো সত্যিটা হয়তো এখনো বাকি আছে। নাবিহের চোখে এখনো একটা ছায়া ছিল। সেই ছায়াটা কী—তা জানতে হলে আরও সময় লাগবে।
সেই রাতে বাড়ি ফিরে রিদওয়ানা আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার ঠোঁট একটু ফুলে আছে। চোখে একটা নতুন আলো। সে নিজেকে বলল, “এবার দেখি তুমি কতটা সত্যি বলতে পারো, নাবিহ।”
আর দূরে, নাবিহের ঘরে, নাবিহ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রিদওয়ানার গন্ধ এখনো নিজের শার্টে খুঁজছিল। তার বুকের ভেতরটা একই সাথে শান্ত আর অশান্ত ছিল। কারণ সে জানত—পুরো সত্যিটা বলতে গেলে রিদওয়ানাকে হয়তো আবার হারাতে হতে পারে।
নদীর পাড়ে সেই চুমুর পর থেকে রিদওয়ানার রাতগুলো আর আগের মতো ছিল না। নাবিহের স্পর্শ তার ত্বকে লেগে ছিল। তার ঠোঁটের উষ্ণতা, তার বুকের ধুকধুকানি—সব মিলেমিশে একটা আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল তার ভেতরে। কিন্তু সেই আগুনের সাথে ছিল একটা অস্বস্তি। নাবিহ পুরো সত্যি বলেছে কি না, সে নিশ্চিত হতে পারছিল না।
পরের দিন নাবিহ ফোন করল। গলায় একটা নতুন ধরনের নরম ভাব। “রিদওয়ানা, আজ রাতে আমার সাথে দেখা করবে? একা?”
রিদওয়ানা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “কোথায়?”
“আমার ফ্ল্যাটে। কেউ নেই।”
রিদওয়ানার হৃদয়টা দ্রুত স্পন্দিত হতে শুরু করল। সে জানত এটা বিপজ্জনক। কিন্তু সে না বলতে পারল না।
সন্ধ্যা সাতটায় সে নাবিহের ফ্ল্যাটে পৌঁছাল। দরজা খুলতেই নাবিহ দাঁড়িয়েছিল। সাদা পাঞ্জাবি, চুল একটু এলোমেলো। তার চোখে সেই তীব্র ক্ষুধা, যেটা দেখে রিদওয়ানার হাঁটু দুর্বল হয়ে এল।
নাবিহ কিছু না বলে তার হাত ধরে ভেতরে টেনে নিল। দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই সে রিদওয়ানাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। চুমুটা এবার আর আলতো ছিল না। ক্ষুধার্ত, গভীর, দাবিদার। রিদওয়ানার হাত নাবিহের চুলে গিয়ে জড়িয়ে গেল। নাবিহ তার কোমর চেপে ধরে উঁচু করে তুলল একটু। দুজনের শরীর একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছিল।
চুমু ভেঙে নাবিহ তার গলায় মুখ রাখল। “আমি সারাদিন শুধু তোমাকে ভেবেছি,” সে ফিসফিস করে বলল। তার গরম শ্বাস রিদওয়ানার কানে কাঁপুনি ধরাল। “তোমার গন্ধ, তোমার স্বাদ… আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
রিদওয়ানা তার বুকের ওপর মাথা রেখে বলল, “আগে বলো। পুরো সত্যিটা। সেদিন শুধু দেনার হুমকি ছিল না, তাই না?”
নাবিহ থেমে গেল। তার শরীর একটু শক্ত হয়ে উঠল। সে রিদওয়ানাকে নিয়ে সোফায় বসল। দুজনের হাঁটু ছুঁয়ে আছে। নাবিহ তার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “ছিল আরও কিছু। আমার বাবার ব্যবসার পার্টনার… সে আমাকে বলেছিল, যদি আমি বিয়ে করি, তাহলে তোমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তোমার বাবার চাকরি, তোমার পড়াশোনা—সব। আমি জানতাম তুমি ছাড়বে না। তাই… আমি নিজে থেকে সরে গেলাম। আর একটা কথা। সেই সময় আমি একটা দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। হাসপাতালে তিন মাস কাটিয়েছি। কেউ জানত না। আমি চাইনি তুমি জান। কারণ আমি ভেবেছিলাম, তুমি যদি জানতে যে আমি আহত, তাহলে তুমি আরও শক্ত হয়ে আমার পাশে দাঁড়াতে। আর আমি পারতাম না তোমাকে সেই বিপদে ফেলতে।”
রিদওয়ানার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে নাবিহের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। “তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি। আমাকে সুযোগ দাওনি।”
নাবিহ তার গালে হাত রেখে জল মুছে দিল। “আমি ভুল করেছি। প্রতিদিন সেই ভুলের শাস্তি নিজে নিজে দিয়েছি। কিন্তু এখন… এখন আমি আর দূরে থাকতে পারছি না।”
রিদওয়ানা তার দিকে তাকাল। চোখে রাগ, কষ্ট, আর গভীর ভালোবাসা একসাথে। সে আস্তে করে নাবিহের পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে শুরু করল। নাবিহ থমকে গেল। “রিদওয়ানা…”
“চুপ করো,” সে ফিসফিস করে বলল। “আজ আর কোনো কথা নয়। আজ শুধু তুমি আর আমি।”
নাবিহ আর দেরি করল না। সে রিদওয়ানাকে তুলে নিয়ে শোবার ঘরে নিয়ে গেল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। চুমুগুলো এবার গলায়, কলারে, কাঁধে ছড়িয়ে পড়ল। রিদওয়ানার কামিজের বোতাম খুলে নাবিহ তার ত্বকে মুখ রাখল। গরম ঠোঁট, নরম জিভ—সব মিলে রিদওয়ানার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। সে নাবিহের চুল আঁকড়ে ধরে গোঙাতে লাগল।
নাবিহ উঠে তার চোখের দিকে তাকাল। “বলো যদি থামতে চাও।”
রিদওয়ানা মাথা নাড়ল। “থামো না। আজ আর থেমো না।”
দুজনের পোশাক খুলে গেল একটু একটু করে। নাবিহের হাত রিদওয়ানার শরীরের প্রতিটা অংশে ঘুরে বেড়াল—যেন সাত বছরের ক্ষুধা মেটাতে চাইছে। রিদওয়ানাও পিছিয়ে রইল না। তার নখ নাবিহের পিঠে দাগ কেটে দিল। দুজনের শ্বাস একসাথে মিশে গেল। যখন নাবিহ তার ভেতরে প্রবেশ করল, রিদওয়ানার চোখ বন্ধ হয়ে এল। ব্যথা আর সুখ একসাথে। নাবিহ থেমে গেল এক মুহূর্ত। “ব্যথা করছে?”
রিদওয়ানা তার ঘাড়ে মুখ রেখে বলল, “চলো… থেমো না।”
নাবিহ আস্তে আস্তে নড়তে শুরু করল। গভীর, ধীর, তারপর দ্রুত। রিদওয়ানার পা তার কোমরে জড়িয়ে গেল। দুজনের শরীর একই তালে দোল খেতে লাগল। নাবিহ তার কানে ফিসফিস করে বলছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি… এতদিন ধরে… শুধু তোমাকে।” রিদওয়ানাও তার নাম ধরে ডাকছিল। ঘরের বাতাস গরম হয়ে উঠেছিল তাদের শ্বাসে।
শেষে যখন দুজনে একসাথে চূড়ান্ত সুখের শিখরে পৌঁছাল, রিদওয়ানার নখ নাবিহের পিঠে গেঁথে গেল। নাবিহ তার ঠোঁটে মুখ রেখে গোঙাল। কিছুক্ষণ দুজনে জড়িয়ে শুয়ে রইল। ঘামে ভেজা শরীর, জড়ানো হাত, শান্ত হৃদস্পন্দন।
নাবিহ তার কপালে চুমু দিয়ে বলল, “এবার আর কখনো ছাড়ব না। বিয়ে করব। শিগগির।”
রিদওয়ানা তার বুকে মুখ রেখে হাসল। “শর্ত আছে। এবার কোনো গোপন কথা রাখবে না।”
নাবিহ হেসে তার চিবুক তুলে চুমু দিল। “প্রতিজ্ঞা। পুরো জীবনের।”
পরের কয়েক সপ্তাহে সবকিছু দ্রুত এগোতে লাগল। দুই পরিবার আবার একসঙ্গে বসল। এবার কোনো বাধা নেই। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো। রিদওয়ানা তার পুরনো প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলল হাসিমুখে। নাবিহ আর চুপচাপ থাকে না। সে প্রতিদিন ফোন করে, প্রতি রাতে দেখা করে, প্রতি মুহূর্তে রিদওয়ানাকে মনে করায় যে সে এখন আর একা নয়।
বিয়ের আগের রাতে নাবিহ রিদওয়ানার বাড়ির ছাদে উঠে এল চুপিচুপি। চাঁদের আলোয় দুজনে জড়িয়ে দাঁড়াল। নাবিহ তার কানে বলল, “সাত বছর আগে আমি তোমাকে হারিয়েছিলাম। এবার জীবনভর রাখব।”
রিদওয়ানা তার বুকে মুখ রেখে বলল, “এবার আমিও ছাড়ব না।”
দুজনে আবার চুমু দিল—এবার আর কোনো ভয় নেই, কোনো ছায়া নেই। শুধু ভালোবাসা, শুধু উষ্ণতা, শুধু একে অপরের।
বিয়ের দিন রিদওয়ানা লাল রঙের পোশাক পরে নাবিহের পাশে দাঁড়াল। নাবিহের চোখে জল ছিল। রিদওয়ানারও। কিন্তু এবার সেই জল সুখের। যখন তাদের হাত জোড়া লাগল, রিদওয়ানার মনে হলো—সাত বছরের কষ্ট, অপেক্ষা, অপমান—সব শেষ। এখন শুধু শুরু। তাদের গল্পের আসল শুরু।
রাতের বেলা নতুন ঘরে ঢুকে নাবিহ দরজা বন্ধ করে রিদওয়ানাকে জড়িয়ে ধরল। “এবার পুরো রাত আমার,” সে ফিসফিস করে বলল।
রিদওয়ানা হেসে তার ঠোঁটে চুমু দিয়ে উত্তর দিল, “পুরো জীবন।”
আর সেই রাতে আবার তাদের শরীর মিলল—আরও গভীরভাবে, আরও ভালোবাসায় ভরে। বাইরে ঢাকার রাত জেগে ছিল। ভেতরে দুজন মানুষ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল অবশেষে।
....