জাইয়ান রহমানের জীবন ছিল একরকম নিখুঁত। ঢাকার গুলশানের এক উঁচু অফিস ভবনের সপ্তম তলায় তার আর্কিটেকচার ফার্মের নামে প্লেট লাগানো। তেত্রিশ বছর বয়সে তিনি ইতিমধ্যেই কয়েকটি বড় প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করেছেন। মানুষ তাকে চেনে ঠান্ডা, দূরত্ব রক্ষা করা, কাজপাগল মানুষ হিসেবে। অফিসের সবাই জানে, জাইয়ানের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো মেয়ের স্থান নেই। কেউ যদি কখনো জিজ্ঞেস করে, তিনি শুধু হালকা হেসে বলেন, “সময় নেই।”
সেদিন সকালে অফিসে নতুন ডিজাইনার যোগ দিয়েছিল রুহাইনা আহমেদ। চব্বিশ বছরের মেয়েটির চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত আত্মবিশ্বাস। চুলে হালকা ঢেউ, সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। সে যখন কনফারেন্স রুমে ঢুকে নিজের পরিচয় দিল, জাইয়ানের চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তিনি তার দিকে তাকিয়েছিলেন এমনভাবে যেন কেউ হঠাৎ করে দীর্ঘদিনের চেনা মুখ দেখে ফেলেছে। তারপরই তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
“জাইয়ান স্যার, এনার ডিজাইন পোর্টফোলিও দেখেছি। ভালো,” এইচআর ম্যানেজার বলল।
জাইয়ান মাথা নেড়ে শুধু বললেন, “কাজে লাগান।” তার গলায় কোনো উষ্ণতা ছিল না।
রুহাইনা প্রথম দিন থেকেই টের পেল কিছু একটা ঠিক নেই। জাইয়ান তাকে এড়িয়ে চলতেন। করিডোরে দেখা হলে তিনি অন্যদিকে তাকাতেন। মিটিংয়ে রুহাইনা কিছু বললে তিনি চোখ তুলে তাকাতেন না। আবার কখনো হঠাৎ করে তার কাজের খুঁত ধরতেন এমনভাবে যেন তিনি ইচ্ছে করেই রেগে যাচ্ছেন।
একদিন রুহাইনা একটা রেন্ডারিং জমা দিল। জাইয়ান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা কি ডিজাইন নাকি রঙের খেলা? আবার করুন।”
রুহাইনার গালে রক্ত চড়ে গেল। সে শান্ত গলায় বলল, “স্যার, ক্লায়েন্টের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ীই করেছি।”
জাইয়ান তার দিকে তাকালেন। সেই তাকানোতে ছিল এক অদ্ভুত তীব্রতা। তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, “তাহলে আরও ভালো করুন।”
অফিসের অন্যরা ফিসফিসিয়ে বলাবলি করত। কেউ বলত জাইয়ান স্যার নতুন মেয়েটাকে পছন্দ করেন না। কেউ বলত হয়তো তিনি সবাইকেই এভাবে টেস্ট করেন। রুহাইনা নিজেও ভাবত, এই মানুষটা তাকে দেখতে পারে না। অথচ কখনো কখনো তার চোখে অন্য কিছু দেখা যেত। একদিন রুহাইনার মাথাব্যথা করেছিল। সে ডেস্কে মাথা রেখে বসেছিল। জাইয়ান দূর থেকে দেখে এসে দাঁড়ালেন।
“কী হয়েছে?” তার গলায় একটা চাপা উদ্বেগ ছিল।
“কিছু না স্যার। মাথাব্যথা।”
জাইয়ান এক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “বাড়ি যান। আজ আর কাজ নেই।” তারপর দ্রুত চলে গেলেন। রুহাইনা অবাক হয়ে তার পিছু পিছু তাকিয়ে রইল। এত ক্ষণ যে মানুষটা তাকে এড়িয়ে চলছিল, সেই মানুষটাই হঠাৎ করে তার অসুস্থতাতে অস্থির হয়ে উঠল।
সন্ধ্যায় অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলে রুহাইনা একা বসে কাজ করছিল। জাইয়ান তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন মেয়েটা এখনো আছে। তিনি কাছে এসে বললেন, “এত রাত পর্যন্ত থাকার দরকার নেই।”
রুহাইনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, আগামীকালের প্রেজেন্টেশনটা শেষ করতে চাই।”
জাইয়ান তার মুখের দিকে তাকালেন। আলোর নিচে রুহাইনার চোখদুটো আরও গভীর মনে হচ্ছিল। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তারপর ধীরে বললেন, “চালু রাখুন। আমিও আছি।”
সেই রাতে তারা কথা কমই বলল। কিন্তু বাতাসে এক ধরনের টান ছিল। জাইয়ানের নজর বারবার রুহাইনার দিকে চলে যাচ্ছিল। রুহাইনাও টের পাচ্ছিল। তার বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল। এই মানুষটা তাকে অপছন্দ করে—এটা সে নিশ্চিত ছিল। কিন্তু কেন তাহলে তার চোখে এত অস্থিরতা?
পরের কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল। একদিন রুহাইনা অফিসের ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিচে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা। জাইয়ানও সেখানে এসে দাঁড়ালেন। দুজনেই চুপচাপ। হঠাৎ জাইয়ান বললেন, “আপনার নামটা... রুহাইনা।”
“জি স্যার।”
“আগে কোথাও শুনেছি বলে মনে হয়।”
রুহাইনা হালকা হেসে বলল, “হয়তো স্যার। অনেক রুহাইনা আছে।”
জাইয়ান আর কিছু বললেন না। কিন্তু তার চোখে একটা ছায়া নেমে এসেছিল। সেই ছায়া রুহাইনার মনে গেঁথে রইল।
অফিসে ফিরে রুহাইনা নিজের ডেস্কে বসে ভাবতে লাগল। এই মানুষটার আচরণ বোঝা যায় না। কখনো এত ঠান্ডা, কখনো এত উদ্বিগ্ন। সে জানত না যে জাইয়ানের ঘরে একটা পুরোনো ছবি আছে। সেই ছবিতে একটা ছোট্ট মেয়ে হাসছে। আর সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ তার সামনে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাইয়ান সেদিন রাতে বাসায় ফিরে সেই ছবির দিকে তাকিয়েছিলেন অনেকক্ষণ। তার বুকের ভিতর একটা পুরোনো ব্যথা জেগে উঠেছিল। তিনি নিজেকে বারবার বলছিলেন, দূরে থাকো। কিন্তু রুহাইনার মুখ তার চোখের সামনে থেকে সরছিল না।
রুহাইনা সেদিন ঘুমাতে গিয়েও ভাবছিল। জাইয়ান স্যার তাকে অপছন্দ করেন—এটাই সত্যি। কিন্তু কেন তাহলে তার সামান্য অসুস্থতাতেও তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন? কেন তার চোখে কখনো কখনো এমন তাকানো থাকে যেন তিনি কিছু হারিয়ে ফেলেছেন?
সে জানত না, সত্যিটা আরও গভীর। আর সেই সত্যি জানার আগে তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য টান তৈরি হতে শুরু করেছে। যে টান দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
পরের সপ্তাহে একটা বড় প্রজেক্ট এল। জাইয়ান নিজেই রুহাইনাকে টিমে নিলেন। সবাই অবাক হল। রুহাইনা আরও বেশি বিভ্রান্ত হল। এই মানুষটা কি তাকে কাছে টানছে, নাকি আরও পরীক্ষা করছে?
প্রজেক্টের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা আরও কাছাকাছি আসতে বাধ্য হল। দেরি করে অফিস ছাড়া, একসঙ্গে ডিজাইন নিয়ে আলোচনা, কখনো কখনো একই কফি কাপ থেকে দুজনেই চুমুক দেওয়া—এসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলো রুহাইনার বুকের ভিতর একটা আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। জাইয়ানের গায়ের গন্ধ, তার গভীর কণ্ঠস্বর, তার হাতের শিরাগুলো যখন কাগজের উপর দিয়ে যায়—সবকিছুই রুহাইনাকে অস্থির করে তুলছিল।
একদিন রাতে কাজ করতে করতে রুহাইনার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। সে হালকা মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছিল। জাইয়ান লক্ষ করলেন। তিনি কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“রুহাইনা।”
নামটা তার মুখ থেকে এমনভাবে বেরোল যেন তিনি অনেকদিন ধরে এই নামটা বলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রুহাইনা চোখ তুলে তাকাল। জাইয়ানের চোখে ছিল এক অদ্ভুত নরম ভাব। তার হাত এখনো রুহাইনার কাঁধে। গরম। ভারী।
“বাড়ি যান,” জাইয়ান ধীরে বললেন। “আজ আর নয়।”
রুহাইনা উঠে দাঁড়াল। দুজনের মধ্যে দূরত্ব খুব কম। জাইয়ানের শ্বাস তার গায়ে লাগছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল তিনি আরও কাছে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু তিনি পিছিয়ে গেলেন।
রুহাইনা সেদিন বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করল—এই মানুষটা আমাকে অপছন্দ করে? নাকি অন্য কিছু?
সে জানত না উত্তর। কিন্তু তার শরীর জানত। জাইয়ানের স্পর্শের অনুভূতি এখনো তার কাঁধে লেগে আছে। আর সেই অনুভূতি তাকে রাতভর ঘুমাতে দেয়নি।
প্রজেক্টের কাজ যত এগোচ্ছিল, জাইয়ান আর রুহাইনার মধ্যে দূরত্ব তত কমছিল। অথচ জাইয়ান ইচ্ছে করেই মাঝে মাঝে দেয়াল তুলে দিতেন। একদিন রুহাইনা একটা ডিজাইন নিয়ে গর্ব করে তার কেবিনে ঢুকল। জাইয়ান স্ক্রিন দেখে বললেন, “এটা হবে না। আবার করুন।”
রুহাইনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। “স্যার, আমি কি সবসময়ই ভুল করি? নাকি আপনি ইচ্ছে করেই আমার সবকিছু নাকচ করেন?”
জাইয়ান চুপ করে তার দিকে তাকালেন। তার চোখে একটা ঝড় উঠেছিল। তিনি ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে রুহাইনার খুব কাছে এসে বললেন, “আপনি জানেন না কী করছেন।”
“তাহলে বলুন,” রুহাইনা পিছু হটল না। “আমাকে কেন এভাবে দেখেন? কখনো এত রেগে, কখনো এত... উদ্বিগ্ন হয়ে?”
জাইয়ানের চোখ তার ঠোঁটের দিকে নেমে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে জানালার কাছে চলে গেলেন। “কাজে মন দিন, রুহাইনা। ব্যক্তিগত কিছু নিয়ে আলোচনার সময় নেই।”
রুহাইনা কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ডেস্কে বসল। তার হাত কাঁপছিল। এই মানুষটার কাছাকাছি গেলে তার শরীরে যে অনুভূতি হয়, তা সে আর অস্বীকার করতে পারছিল না। রাতের পর রাত সে জাইয়ানের কথা ভেবে কাটাত। তার গভীর চোখ, তার কণ্ঠস্বর, তার হাতের স্পর্শ—সবকিছু মিলিয়ে একটা আগুন জ্বলছিল ভিতরে।
এক সপ্তাহ পর রুহাইনার হালকা জ্বর এল। সে অফিসে এসেও মাথা ঘোরাচ্ছিল। জাইয়ান লক্ষ করে ফেললেন। তিনি সরাসরি এসে বললেন, “চলুন। আমি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।”
“দরকার নেই স্যার—”
“বললাম চলুন।” তার গলায় কোনো আপস ছিল না।
গাড়িতে চুপচাপ বসে রুহাইনা জাইয়ানের হাতের দিকে তাকিয়েছিল। স্টিয়ারিং ধরে থাকা সেই হাতগুলো শক্তিশালী। রুহাইনার মনে হল, এই হাত যদি তার গায়ে ওঠে... চিন্তাটাই তাকে লজ্জায় ফেলে দিল।
জাইয়ান তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজেই ওষুধ কিনে আনলেন। রুহাইনা বিছানায় শুয়েছিল। জাইয়ান পাশে চেয়ারে বসে তার কপালে হাত দিলেন। হাতটা ঠান্ডা ছিল না। গরম। যত্নশীল।
“জ্বর আছে,” তিনি বললেন। তার কণ্ঠস্বর নরম। “বিশ্রাম নিন।”
রুহাইনা চোখ খুলে তাকাল। জাইয়ানের মুখ খুব কাছে। “আপনি কেন এত... চিন্তিত?”
জাইয়ান উত্তর দিলেন না। শুধু তার চুল থেকে একটা সুতো সরিয়ে দিলেন। তার আঙুল রুহাইনার গালের উপর দিয়ে হালকা সরে গেল। সেই স্পর্শে রুহাইনার শরীর কেঁপে উঠল। জাইয়ান যেন নিজেই অবাক হয়ে হাত সরিয়ে নিলেন।
“আমি চলে যাচ্ছি,” তিনি উঠে দাঁড়ালেন। “কেউ থাকলে খবর দেবেন।”
রুহাইনা তার পিছু পিছু তাকিয়ে রইল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর সে বুঝতে পারল—এই মানুষটা তাকে অপছন্দ করে না। একেবারেই না। বরং উল্টোটা। কিন্তু কিছু একটা তাকে আটকে রেখেছে।
পরের দিন রুহাইনা সুস্থ হয়ে অফিসে এল। কাজের ফাঁকে জাইয়ানের কেবিনে যেতে হল কিছু ফাইলের জন্য। জাইয়ান তখন বাইরে ছিলেন। রুহাইনা ফাইল খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ একটা ড্রয়ার খুলে ফেলল। ভিতরে একটা পুরোনো ফ্রেম করা ছবি। ছবিতে একটা ছোট্ট মেয়ে হাসছে। পাশে একজন তরুণ ছেলে। রুহাইনা ছবিটার দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে গেল। সেই ছোট্ট মেয়েটা... সে নিজেই। তার শৈশবের ছবি।
হাতে কাঁপতে কাঁপতে সে ছবিটা নামিয়ে দেখল। পেছনে কিছু লেখা নেই। কিন্তু সে নিশ্চিত। এই ছবি তার বাবার পুরোনো অ্যালবামেও ছিল। কিন্তু এটা জাইয়ানের ঘরে কেন?
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলল। জাইয়ান ঢুকে এসে থমকে গেলেন। তার চোখ ছবিতে গিয়ে পড়ল। রুহাইনার হাতে।
রুহাইনা ধীরে বলল, “এটা... আমার ছবি। ছোটবেলার।”
জাইয়ান দরজা বন্ধ করে দিলেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। “রাখুন ওটা।”
“কেন আপনার কাছে আমার ছবি?” রুহাইনার গলা কাঁপছিল। “আপনি কি আমার পরিবারকে চিনতেন?”
জাইয়ান জানালার দিকে পিছু হটলেন। “হ্যাঁ।”
“কতদিন আগে?”
“অনেক।” তার গলা শুকনো। “আপনি তখন খুব ছোট ছিলেন।”
রুহাইনা ছবিটা টেবিলে রেখে কাছে এগিয়ে গেল। “তাহলে কেন আমাকে এড়িয়ে চলছেন? কেন এত অদ্ভুত আচরণ?”
জাইয়ান তার দিকে তাকালেন। চোখে একটা গভীর যন্ত্রণা। “কারণ আমি এমন একজনকে হারিয়েছি, যার জন্য আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি।”
রুহাইনার বুক ধড়ফড় করছিল। “কে?”
জাইয়ান চুপ করে রইলেন। রুহাইনা আরও কাছে এল। এখন দুজনের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব। “বলুন।”
জাইয়ানের হাত উঠে এসে রুহাইনার গাল স্পর্শ করল। তার আঙুল কাঁপছিল। “তুমি... তুমি তার মতো দেখতে। না। তুমি তার ছোট বোন। আর আমি...”
কথা শেষ হল না। রুহাইনা তার হাত ধরে ফেলল। “আমার বোন? আমার তো কোনো—”
“তোমার বড় আপারা,” জাইয়ান ফিসফিসিয়ে বললেন। “ফারিহা। আমরা... আমরা একসঙ্গে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমি দেরি করেছিলাম সেদিন। আর সে...”
রুহাইনার চোখ ছলছল করে উঠল। সে মনে করতে পারল। তার বড় আপার মৃত্যুর কথা। গাড়ি দুর্ঘটনা। পরিবার তখন অনেক কষ্টে ছিল। সে নিজে তখন মাত্র ছয় বছরের।
জাইয়ানের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। রুহাইনা আর সহ্য করতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে জাইয়ানের বুকে মুখ লুকোল। জাইয়ানের হাত তার কোমরে জড়িয়ে গেল। শক্ত করে। যেন সে যদি ছেড়ে দেয় তাহলে রুহাইনাও হারিয়ে যাবে।
দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রুহাইনার গায়ে জাইয়ানের বুকের ধুকপাল। গরম। ভারী। জাইয়ানের হাত তার পিঠে ঘষে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। রুহাইনার শরীরে কাঁপুনি উঠল। এই স্পর্শ শুধু সান্ত্বনা নয়। এর ভিতরে আরও কিছু আছে। গভীর। বিপজ্জনক।
জাইয়ান হঠাৎ তার চিবুক তুলে ধরলেন। দুজনের চোখাচোখি। তারপর তিনি ঝুঁকে পড়লেন। রুহাইনার ঠোঁটে তার ঠোঁট এসে পড়ল। প্রথমে হালকা। তারপর গভীর। ক্ষুধার্ত। রুহাইনা তার জিভের স্বাদ পেল। জাইয়ানের হাত তার কোমর চেপে ধরল। রুহাইনার হাত উঠে গেল তার ঘাড়ে। চুমুটা দীর্ঘ হচ্ছিল। গরম হচ্ছিল। জাইয়ানের শরীর তার শরীরের সঙ্গে লেগে ছিল। রুহাইনা টের পাচ্ছিল তার উত্তেজনা।
হঠাৎ জাইয়ান সরে গেলেন। শ্বাসকষ্টে। “না... এটা ঠিক না।”
রুহাইনা তার হাত ধরে রাখল। “কেন?”
“কারণ আমি তোমার আপার স্মৃতি নিয়ে বাঁচি। আর তুমি...”
“আমি আলাদা,” রুহাইনা বলল। তার গলায় দৃঢ়তা। “আমি ফারিহা না। আমি রুহাইনা। আর আপনি যে অনুভূতি আমার ভিতরে জাগিয়েছেন, সেটা আমি অস্বীকার করতে পারব না।”
জাইয়ান তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর আবার টেনে নিলেন কাছে। এবারের চুমু আরও গভীর। তার হাত রুহাইনার শার্টের নিচে ঢুকে গেল। গরম ত্বক। রুহাইনা একটা আওয়াজ করে উঠল। জাইয়ানের আঙুল তার কোমর ঘেঁষে উঠছিল। রুহাইনার হাঁটু দুর্বল হয়ে আসছিল।
কেবিনের বাইরে কেউ হাঁটার শব্দ পেয়ে দুজনে সরে গেল। জাইয়ান শ্বাস নিয়ে বললেন, “আজ রাতে... আমার বাসায় এসো। সব খুলব।”
রুহাইনা মাথা নাড়ল। তার ঠোঁট এখনো ফোলা। শরীর কাঁপছে। সে জানত, আজ রাতের পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।
জাইয়ানের অ্যাপার্টমেন্ট ছিল বনানীতে। রুহাইনা দরজায় কড়া নাড়তেই তিনি খুলে দিলেন। সাদা শার্টের হাত গুটানো। চোখে একটা অস্থিরতা। রুহাইনা ঢুকেই বুঝল বাড়িটা একাকীত্বে ভরা। কয়েকটা বই, একটা সোফা, আর দেয়ালে সেই পুরোনো ছবি।
জাইয়ান তাকে বসতে বললেন। নিজে পাশে বসলেন। “ফারিহার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে ডিজাইন পড়ত। আমি আর্কিটেকচার। আমরা একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতাম। বিয়ের কথাও হয়েছিল।”
রুহাইনা চুপ করে শুনছিল।
“সেদিন আমি তাকে নিতে দেরি করেছিলাম। রাস্তায় জ্যাম। সে একাই বেরিয়ে পড়েছিল। আর... দুর্ঘটনা।” জাইয়ানের গলা ভেঙে গেল। “আমি যদি সময়মতো পৌঁছতাম... সে বাঁচত হয়তো।”
রুহাইনা তার হাত ধরল। “আপনি দোষী নন।”
“আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি কখনো। তোমার পরিবারকেও মুখ দেখাতে পারিনি। তোমার বাবা আমাকে দোষ দেননি। কিন্তু আমি নিজেই দূরে সরে গিয়েছিলাম। আর সেই ছবিটা... তোমার ছোটবেলার। ফারিহা একদিন দিয়েছিল। বলেছিল, ‘এই দেখ আমার ছোট বোন। একদিন তোকে দেখাব।’ সেই ছবিটা আমি রেখে দিয়েছিলাম।”
রুহাইনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে জাইয়ানের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার কোলে উঠে বসল। “আমি আমার আপাকে হারিয়েছি। কিন্তু আপনাকে হারাতে চাই না।”
জাইয়ানের হাত তার কোমরে জড়িয়ে গেল। “তুমি জানো না আমি কতটা ভেঙে গেছি ভিতরে।”
“তাহলে আমাকে ভাঙতে দাও,” রুহাইনা ফিসফিসিয়ে বলল। “আর আমাকে জোড়া লাগাতে দাও।”
জাইয়ান আর সংযম রাখতে পারলেন না। তিনি রুহাইনাকে তুলে নিয়ে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। বিছানায় শুইয়ে তার উপর ঝুঁকে পড়লেন। চুমুটা এবার ছিল ক্ষুধার্ত। রুহাইনার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে তিনি তার গলায় চুমু দিচ্ছিলেন। রুহাইনার শরীর কেঁপে উঠছিল প্রতিটি স্পর্শে।
জাইয়ানের হাত তার ব্রায়ের আন্ডার দিয়ে ঢুকে গেল। গরম ত্বক। রুহাইনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জাইয়ান তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন, “তুমি যদি বলো থামতে... আমি থামব।”
“থামবেন না,” রুহাইনা তার চুল আঁকড়ে ধরল। “আর কখনো থামবেন না।”
জাইয়ান তার বাকি পোশাক খুলে ফেললেন। রুহাইনার নগ্ন শরীরের উপর তার চোখ ঘুরছিল। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে তার স্তনে মুখ রাখলেন। জিভ দিয়ে স্পর্শ করলেন। রুহাইনার পিঠ বাঁকা হয়ে উঠল। জাইয়ানের হাত নিচে নামছিল। তার আঙুল রুহাইনার উরু ঘেঁষে ভিতরে ঢুকে গেল। রুহাইনা একটা আওয়াজ করে উঠল। জাইয়ান তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত সুন্দর শব্দ...”
রুহাইনা তাকে টেনে নিল কাছে। জাইয়ানের শার্ট খুলে ফেলল। তার বুকের পেশিগুলো শক্ত। রুহাইনা সেখানে চুমু দিল। জাইয়ান আর অপেক্ষা করলেন না। তিনি নিজেকে প্রস্তুত করে রুহাইনার ভিতরে ঢুকে গেলেন ধীরে। রুহাইনার নখ তার পিঠে ফুটে গেল। দুজনেই একসঙ্গে শ্বাস নিলেন।
জাইয়ান নড়তে শুরু করলেন। প্রথমে ধীরে। তারপর গভীর। রুহাইনার পা তার কোমরে জড়িয়ে ছিল। প্রতিটি ধাক্কায় রুহাইনার ভিতর থেকে আওয়াজ বেরোচ্ছিল। জাইয়ান তার ঠোঁট চেপে ধরলেন। চুমু আর শরীরের মিলন একসঙ্গে চলছিল। ঘামে ভিজে যাচ্ছিল দুজনের শরীর। জাইয়ানের হাত রুহাইনার চুল আঁকড়ে ধরেছিল। রুহাইনা তার নাম ডাকছিল বারবার।
শেষের দিকে জাইয়ানের গতি বেড়ে গেল। রুহাইনার শরীর কেঁপে উঠল প্রচণ্ডভাবে। সে চিৎকার করে উঠল। জাইয়ানও তার সঙ্গে মিলিত হলেন। দুজনেই একে অপরকে চেপে ধরে রইলেন অনেকক্ষণ। শ্বাসকষ্টে। ঘামে। সম্পূর্ণ।
পরে জাইয়ান তার পাশে শুয়ে রুহাইনার চুল আঙুল দিয়ে আঁচড়াচ্ছিলেন। “আমি ভয় পাচ্ছিলাম,” তিনি বললেন। “যে তোমাকে ভালোবাসলে ফারিহার স্মৃতির প্রতি অবিচার হবে।”
রুহাইনা তার বুকে মুখ রেখে বলল, “আপা চাইত আপনি সুখী হোন। আমি জানি।”
জাইয়ান তার কপালে চুমু দিলেন। “আমি তোমাকে ভালোবাসি, রুহাইনা। এতদিন ধরে নিজেকে আটকে রেখেছি। আর পারছি না।”
রুহাইনা উঠে তার উপর উঠে বসল। চুলগুলো কাঁধে এলোমেলো। “তাহলে আর আটকাবেন না।”
জাইয়ান হেসে উঠলেন প্রথমবারের মতো সত্যিকারের হাসি দিয়ে। তিনি রুহাইনাকে আবার নিচে নামিয়ে এনে চুমু দিলেন। এবারের চুমুতে ছিল প্রতিশ্রুতি। রাতভর তারা একে অপরকে চিনল নতুন করে। শরীর দিয়ে। মন দিয়ে। যন্ত্রণা দিয়ে। ভালোবাসা দিয়ে।
সকালে রোদ উঠলে জাইয়ান রুহাইনাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “অফিসে গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেব। তুমি আমার।”
রুহাইনা হেসে বলল, “আগে নাস্তা করুন। তারপর পৃথিবী জানান।”
জাইয়ান তার ঠোঁটে আরেকটা চুমু দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। জানালা দিয়ে ঢাকার আকাশ দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। কোনো মেঘ নেই। কোনো অন্ধকার নেই। শুধু আলো। আর দুজন মানুষ, যারা হারানোর ভয় কাটিয়ে একে অপরকে পেয়েছে।
রুহাইনা বিছানায় শুয়ে জাইয়ানের পিছু পিছু তাকিয়ে রইল। তার শরীরে এখনো গত রাতের চিহ্ন। মনে এখনো সেই গভীর অনুভূতি। সে জানত, এখন থেকে তাদের গল্প নতুন করে লেখা শুরু হবে। যন্ত্রণা থাকবে হয়তো। কিন্তু ভালোবাসা থাকবে আরও বেশি। গভীর। উষ্ণ। আর একেবারে তাদের নিজেদের।
....