রাত দুইটার অচেনা মানুষ

মাহিরা আর শেহরিয়ারের সংসারটা দেখতে একদম সাধারণ। ঢাকার একটা শান্ত আবাসিক এলাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাট। শেহরিয়ার একজন মাঝারি মানের ব্যবসায়ী—পোশাকের কাঁচামাল আমদানি করে ছোটখাটো দোকানদারদের কাছে সরবরাহ করে। মাহিরা ঘর সামলায়, মাঝে মাঝে অনলাইনে হাতের কাজ বিক্রি করে। সকালে একসঙ্গে নাস্তা, রাতে টিভির সামনে বসে কথা—এমনই চলছিল তাদের দিনগুলো।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

কিন্তু মাহিরা লক্ষ করেছিল কিছুদিন ধরে। রাত দুইটার দিকে শেহরিয়ার বিছানা থেকে উঠে চুপচাপ বেরিয়ে যায়। দরজার কব্জা খুলতে খুলতে যে শব্দ হয়, সেটাও সে কমায়। ফিরে আসে ভোর চারটার আগে। মাহিরা একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “এত রাতে কোথায় যাও?” শেহরিয়ার হেসে বলেছিল, “ব্যবসার কাজ। একটা কনসাইনমেন্ট আটকে গেছে পোর্টে। সকালে সকালে ম্যানেজ করতে হয়।” কথাটা শুনে মাহিরা আর কিছু বলেনি। বিশ্বাস করতে চেয়েছিল।

একদিন সকালে শেহরিয়ার অফিসে যাওয়ার পর মাহিরা তার পুরোনো ব্যাগটা গুছাতে গিয়েছিল। ব্যাগের ভিতরের পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের কার্ড বেরিয়ে এল। পুরোনো, কোণগুলো ভাঙা। কার্ডে শেহরিয়ারের ছবি। নাম লেখা আছে ঠিকই—শেহরিয়ার আহমেদ। কিন্তু পেশার ঘরে লেখা কিছু এমন, যা তার বর্তমান জীবনের সঙ্গে মিলছে না। মাহিরা কার্ডটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল কেউ তার বুকের ভিতরটা চেপে ধরেছে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

সেদিন রাতে শেহরিয়ার বাড়ি ফিরলে মাহিরা কিছু বলল না। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখল। শেহরিয়ার এসে তার কোমরে হাত রাখল পেছন থেকে। “কী হয়েছে আজ? একটু চুপচাপ মনে হচ্ছে।” মাহিরা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে জল ছিল না, কিন্তু কণ্ঠস্বরটা ভারী। “কিছু না। ক্লান্ত লাগছে।”

শেহরিয়ার তাকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। মাহিরার চুলের গন্ধ নিল। “আমার মাহিরা ক্লান্ত হলে আমি আর কিছু সহ্য করতে পারি না।” তার হাত মাহিরার পিঠ বেয়ে নামতে লাগল। মাহিরা প্রতিরোধ করল না। শেহরিয়ারের স্পর্শ তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিত সবসময়। সেদিনও দিল। তারা ঘরের লাইট নিভিয়ে বিছানায় গেল। শেহরিয়ার মাহিরার জামা খুলতে খুলতে চুমু খেল তার গলায়, কাঁধে, বুকে। মাহিরা তার চুল আঁকড়ে ধরেছিল। তাদের শরীর একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল যেন কোনো গোপন কথা নেই তাদের মধ্যে। কিন্তু মাহিরার মনের এক কোণে সেই কার্ডটা জ্বলজ্বল করছিল।

পরের কয়েকদিন মাহিরা নজর রাখতে লাগল। শেহরিয়ার রাতদুপুরে বেরোয়। কখনো মোটরসাইকেল নিয়ে, কখনো হেঁটে। মাহিরা এক রাতে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল—শেহরিয়ার রাস্তার মোড়ে একটা কালো গাড়িতে উঠছে। গাড়িটা চলে যায় অন্ধকারের দিকে। ফিরে এসে সে আবার আগের মতোই শান্ত। মাহিরা জিজ্ঞেস করলে বলে, “কাজ।”

মাহিরা সিদ্ধান্ত নিল সত্য জানবেই। সে শেহরিয়ারের ফোন চেক করার চেষ্টা করল একদিন। পাসওয়ার্ড জানত না। শেহরিয়ারের ল্যাপটপ খুলে দেখল—কোনো সন্দেহজনক মেইল নেই। শুধু ব্যবসার হিসাব। কিন্তু সেই কার্ডের কথা ভুলতে পারছিল না।

এক সন্ধ্যায় শেহরিয়ার বাড়ি এসে মাহিরাকে বলল, “চলো আজ বাইরে খাই।” তারা একটা শান্ত রেস্তোরাঁয় গেল। শেহরিয়ার মাহিরার হাত ধরে রেখেছিল পুরো সময়। “তুমি আমার সবকিছু,” সে বলেছিল। মাহিরা তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে ভালোবাসা আছে, মিথ্যা নেই বলে মনে হয়। কিন্তু মিথ্যা তো আছেই।

বাড়ি ফিরে তারা আবার কাছাকাছি এল। শেহরিয়ার মাহিরাকে বিছানায় শুইয়ে তার শরীরের প্রতিটি অংশ চুমু দিয়ে স্পর্শ করল। মাহিরাও সাড়া দিল পুরোপুরি। তাদের ভালোবাসা শারীরিকভাবে গভীর ছিল সবসময়—গরম, আকুল, নিঃশ্বাস মেশানো। সেদিনও শেহরিয়ার মাহিরার কানে কানে বলেছিল, “আমি তোমাকে হারাতে পারি না।” মাহিরা তার পিঠে নখ বসিয়েছিল উত্তরে। কিন্তু মনে মনে সে জানত—কিছু একটা লুকানো আছে। আর সেই লুকোনোর পেছনে অন্য কোনো নারী নেই। এটা সে নিশ্চিত। কারণ শেহরিয়ার যখন তাকে স্পর্শ করে, তখন তার চোখে অন্য কারও ছায়া থাকে না। শুধু মাহিরা থাকে।

মাহিরা সিদ্ধান্ত নিল পরের রাতে সে অনুসরণ করবে।

রাত দুইটা বেজে গেছে। শেহরিয়ার উঠে পোশাক পরছে চুপচাপ। মাহিরা বিছানায় শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। শেহরিয়ার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলে মাহিরা উঠে দ্রুত জামাকাপড় পরল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় এল। শেহরিয়ার ইতিমধ্যে মোড় পার হয়ে গেছে। মাহিরা দূর থেকে অনুসরণ করতে লাগল।

শেহরিয়ার একটা পুরোনো গ্যারেজের সামনে থামল। সেখানে কয়েকজন লোক অপেক্ষা করছিল। তারা কথা বলল সংক্ষেপে। তারপর সবাই ভিতরে ঢুকল। মাহিরা দূর থেকে দেখছিল। কিছুক্ষণ পর একটা ভ্যান এল। লোকজন কিছু বাক্স নামাল। শেহরিয়ার সেগুলো পরীক্ষা করছিল। মাহিরা কাছে যেতে পারছিল না। ভয় পাচ্ছিল।

একঘণ্টা পর শেহরিয়ার বেরিয়ে এল। মাহিরা আগেভাগে বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। শেহরিয়ার এসে তার পাশে শুতে গেল। মাহিরা ঘুমের ভান করল। কিন্তু তার হৃদয় দুরুদুরু করছিল।

পরের দিন মাহিরা সিদ্ধান্ত নিল সরাসরি জিজ্ঞেস করবে। সন্ধ্যায় শেহরিয়ার বাড়ি এলে মাহিরা টেবিলে সেই পুরোনো পরিচয়পত্র রেখে দিল। শেহরিয়ার এসে দেখল। তার মুখের রং বদলে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর শান্ত হয়ে গেল।

“কোথায় পেলে?” সে জিজ্ঞেস করল।

 

“তোমার ব্যাগে,” মাহিরা বলল। “এটা কী?”

শেহরিয়ার চেয়ারে বসল। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “আমি তোমাকে সব বলব। কিন্তু আগে প্রতিশ্রুতি দাও—তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে।”

মাহিরা মাথা নাড়ল। শেহরিয়ার গল্প শুরু করল। অনেক বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর সে একটা বিশেষ দায়িত্বে যুক্ত হয়েছিল। দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু কাজ। নাম প্রকাশ হয় না এমন কাজ। সেই সময়ের পরিচয়পত্র এটা। পরে সে কাজ ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছে। কিন্তু কিছু পুরোনো দায়িত্ব এখনো মাঝে মাঝে ডাকে। রাতের বেলা সেই কাজগুলো সারতে হয়। কোনো অপরাধ নয়। বরং কিছু লোককে সাহায্য করা, কিছু তথ্য পৌঁছে দেওয়া—এমন কাজ যা প্রকাশ্যে করা যায় না।

মাহিরা শুনছিল নিঃশব্দে। “কেন আমাকে বলনি?”

 

“কারণ তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইনি। আর… আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি আমাকে দেখে ভয় পাবে।”

মাহিরা উঠে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। “আমি ভয় পাইনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছি তুমি কেন আমাকে ছেড়ে রাতে বেরোও।”

শেহরিয়ার তার হাত ধরল। “আমার একমাত্র ভয় ছিল তোমাকে হারানোর। অন্য কিছু নয়।”

সেই রাতে তাদের কথোপকথন অনেকক্ষণ চলল। শেহরিয়ার আরও কিছু বিস্তারিত বলল—কী ধরনের সাহায্য সে করে, কেন সেটা গোপন রাখতে হয়। মাহিরা বুঝতে পারল এটা কোনো পরকীয়া নয়। কোনো লুকানো সম্পর্ক নয়। এটা একটা পুরোনো দায়িত্বের বোঝা যা সে এখনো বহন করে।

কথা শেষ হলে শেহরিয়ার মাহিরাকে জড়িয়ে ধরল। “এখনো আমাকে চাও?” মাহিরা উত্তর দিল না কথায়। সে শেহরিয়ারের ঠোঁটে চুমু দিল গভীরভাবে। তাদের চুমু দীর্ঘ হয়ে উঠল। শেহরিয়ার মাহিরাকে তুলে বিছানায় নিয়ে গেল। সেদিন তাদের মিলন ছিল আগের চেয়েও গভীর। শেহরিয়ার মাহিরার শরীরের প্রতিটি অংশকে চিনত যেন নতুন করে। মাহিরাও সাড়া দিয়েছিল পুরোপুরি—নিঃশ্বাস, আওয়াজ, আঁকড়ে ধরা। তারা একে অপরকে বলেছিল বারবার “আমি তোমার”, “তুমি আমার”। ঘামে ভেজা শরীর, জড়ানো হাত, মিশে যাওয়া নিঃশ্বাস—সেই রাতটা তাদের জন্য নতুন করে শুরু হওয়ার রাত হয়ে গেল।

তবু মাহিরার মনে প্রশ্ন ছিল। এই কাজ কি সত্যিই শেষ হবে কখনো? শেহরিয়ার কি কখনো পুরোপুরি ফিরে আসবে শুধু তার কাছে?

পরের কয়েক সপ্তাহ শেহরিয়ার আর রাতে বেরোয়নি। মাহিরা লক্ষ করেছিল। একদিন সে জিজ্ঞেস করল, “কাজ শেষ?” শেহরিয়ার মাথা নাড়ল। “একটা অংশ শেষ। বাকিটা অন্যরা সামলাবে। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—আর তোমাকে একা ছাড়ব না রাতে।”

মাহিরা তার কাঁধে মাথা রাখল। “আমি ভয় পাইনি তোমার কাজের জন্য। আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না বলে।”

শেহরিয়ার তার চিবুক তুলে ধরল। “বিশ্বাস করি। এখন আরও বেশি।”

তারা একসঙ্গে একটা ছুটির পরিকল্পনা করল। শহরের বাইরে একটা শান্ত জায়গায় গেল কয়েকদিনের জন্য। সেখানে কোনো ব্যবসা নেই, কোনো গোপন ফোনকল নেই। শুধু তারা দুজন। সকালে একসঙ্গে হাঁটা, দুপুরে ঘুম, বিকেলে কথা। রাতে আকাশের নিচে বসে থাকা।

সেই ছুটিতে তাদের ভালোবাসা নতুন করে ফুটে উঠল। এক রাতে শেহরিয়ার মাহিরাকে বলল, “আমি যখন সেই কাজ করতাম, তখন মনে হত পৃথিবীটা খুব বড় আর আমি একা। তোমাকে পাওয়ার পর মনে হয় পৃথিবীটা শুধু আমাদের দুজনের।” মাহিরা তার বুকে কান পেতে শুয়েছিল। শেহরিয়ারের হৃদস্পন্দন শুনছিল।

তারা সেই রাতে দীর্ঘক্ষণ একে অপরকে স্পর্শ করল। শেহরিয়ার মাহিরার শরীরকে চুমু দিয়ে ঢেকে দিল—গলা থেকে শুরু করে নাভি পর্যন্ত, তারপর আরও নিচে। মাহিরা তার চুল আঁকড়ে ধরেছিল, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছিল। শেহরিয়ার মাহিরার চোখের দিকে তাকিয়েছিল যখন তারা একসঙ্গে মিশেছিল। সেই তাকানোর মধ্যে ছিল গভীর ভালোবাসা আর ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার মতো একটা নরম অনুভূতি। মাহিরাও তাকে আঁকড়ে ধরেছিল দুই হাতে—যেন আর ছাড়বে না। তাদের শরীরের তাপ, ঘামের গন্ধ, মিশে যাওয়া শ্বাস—সবকিছু মিলে একটা গভীর, গরম রাত তৈরি করেছিল যেখানে কোনো গোপন কথা অবশিষ্ট ছিল না।

বাড়ি ফিরে এসে মাহিরা লক্ষ করল শেহরিয়ার সত্যিই বদলেছে। রাতের বেলা আর বেরোয় না। ব্যবসার কাজে মনযোগ দিচ্ছে বেশি। একদিন সে মাহিরাকে বলল, “আমি চাই আমাদের একটা পরিবার হোক। পুরোপুরি।” মাহিরা হেসেছিল। “আগে থেকেই তো আছি আমরা।” শেহরিয়ার তার কপালে চুমু দিয়েছিল। “আরও ঘনিষ্ঠ করে।”

মাহিরা এখন আর সেই পুরোনো পরিচয়পত্র নিয়ে ভাবে না। সে জানে তার স্বামীর একটা অতীত আছে যা সে গোপন রেখেছিল ভালোবাসার কারণেই। আর সেই গোপনীয়তার পেছনে কোনো অন্য নারী ছিল না—শুধু একটা দায়িত্ব আর ভয় ছিল তাকে হারানোর। এখন সেই ভয় কেটে গেছে।

এক সন্ধ্যায় তারা বারান্দায় বসেছিল। শেহরিয়ার মাহিরার হাত ধরেছিল। “তুমি আমাকে পুরোপুরি পেয়েছ এখন,” সে বলেছিল। মাহিরা তার কাঁধে মাথা রেখে উত্তর দিয়েছিল, “আমি তো সবসময় পেয়েছি। শুধু জানতাম না পুরোটা।”

রাত গভীর হলে তারা আবার একে অপরের কাছে এল। এবার আর কোনো প্রশ্ন নেই চোখে। শুধু চাওয়া আর পাওয়া। শেহরিয়ার মাহিরাকে ধীরে ধীরে খুলেছিল, চুমু দিয়েছিল, ভালোবেসেছিল যেন প্রথমবারের মতো। মাহিরাও সাড়া দিয়েছিল পুরো শরীর দিয়ে—আওয়াজ চেপে রাখেনি, আঁকড়ে ধরেছিল শক্ত করে। তাদের মিলন ছিল গভীর, দীর্ঘ আর গরম। শেষে তারা জড়িয়ে শুয়েছিল। শেহরিয়ার মাহিরার কানে বলেছিল, “আর কোনো রাতে আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।” মাহিরা চোখ বুজে উত্তর দিয়েছিল, “আমি জানি।”

এভাবেই তাদের সংসার আবার ভরে উঠল আগের চেয়েও বেশি আলোয়। গোপন কথা শেষ হয়েছিল। বাকি ছিল শুধু দুজনের গভীর ভালোবাসা—যা রাতের অন্ধকারেও আলো দিত।

....
👁 10