যে শর্ত ভাঙতেই হলো

আরহান আর সাদিয়ার বিয়ে হয়েছিল পরিবারের চাপে। দুজনেরই সম্মতি ছিল না, কিন্তু পরিবারের সম্মান আর চাপের কাছে কেউ দাঁড়াতে পারেনি। বিয়ের পর দুজনেই একটা স্পষ্ট শর্তে একমত হয়েছিল—একে অপরের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। একই বাড়িতে থাকবে, কিন্তু আলাদা জগতে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

তারা ঢাকার উত্তরায় একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল। দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট। আরহান নিয়েছিল বড়টা, সাদিয়া ছোটটা। রান্নাঘর আর বসার ঘর ছিল যৌথ। কিন্তু কেউ সেখানে বেশি সময় কাটাত না।

সাদিয়া রাত জেগে কাজ করত। সে একটা প্রাইভেট ফার্মে গ্রাফিক ডিজাইনার। ডেডলাইন মানেই তার জন্য রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা। আরহান সকালে উঠে চা বানাত। তার অভ্যাস ছিল ভোর ছয়টার মধ্যে উঠে কেটলিতে পানি গরম করা, দুটো কাপে চা ঢালা। এক কাপ নিজের, আরেক কাপ রেখে দিত সাদিয়ার রুমের সামনে টেবিলে। কথা বলত না। শুধু রেখে যেত।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

প্রথম কয়েক সপ্তাহ তারা একে অপরকে এড়িয়ে চলত। সাদিয়া রাতে কাজ শেষ করে ঘুমাত, আরহান সকালে অফিসে চলে যেত। সন্ধ্যায় একে অপরের মুখোমুখি হলে শুধু নম্র অভিবাদন। “আসসালামু আলাইকুম।” “ওয়ালাইকুম সালাম।” এর বেশি কিছু না।

কিন্তু অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করল।

এক রাত সাদিয়া কাজ করতে করতে হঠাৎ লক্ষ করল, রান্নাঘরে কেউ চা বানাচ্ছে না। আরহান সেদিন অফিস থেকে দেরি করে এসেছিল। সাদিয়া নিজেই কেটলি চালিয়ে চা বানিয়ে নিল। দুটো কাপ। এক কাপ নিজের টেবিলে রাখল, আরেক কাপ আরহানের রুমের সামনে। পরদিন সকালে আরহান সেটা দেখে অবাক হয়েছিল। কিন্তু কিছু বলেনি।

আরেকদিন আরহান লক্ষ করল, সাদিয়া রাতে কাজ করতে করতে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। মাইগ্রেন। সে নিজে থেকে পানির গ্লাস আর ওষুধ নিয়ে গিয়ে টেবিলে রেখে দিল। সাদিয়া তাকিয়ে দেখল, চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু ধন্যবাদও বলল না। আরহান চলে গেল।

ছোট ছোট দুষ্টুমি শুরু হল ধীরে ধীরে।

একদিন সাদিয়া আরহানের চায়ের কাপে অতিরিক্ত চিনি মিশিয়ে দিল। আরহান খেয়ে মুখ কুঁচকে ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না। পরদিন সে সাদিয়ার চায়ে লবণ মিশিয়ে দিল। সাদিয়া এক চুমুক নিয়েই থেমে গেল। তারপর দুজনেই হেসে ফেলল। প্রথমবারের মতো একসঙ্গে হাসল।

সেই হাসিটা দুজনেরই মনে গেঁথে গেল।

সাদিয়া রাতে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে আরহানের রুমের দিকে তাকাত। দরজা আধখোলা থাকত। আরহান পড়তে বসত বা ল্যাপটপে কিছু দেখত। তার চুলগুলো এলোমেলো থাকত, চশমা পরে থাকত। সাদিয়ার মনে হত, এই মানুষটা তার স্বামী, অথচ সে তাকে চেনেই না।

আরহানেরও একই অবস্থা। সে সকালে চা বানাতে বানাতে সাদিয়ার রুমের দিকে তাকাত। সাদিয়া তখনও ঘুমাত। তার চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে থাকত, মুখটা শান্ত দেখাত। আরহানের বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্মাত। সে চায়ের কাপ রেখে চলে যেত।

এক সপ্তাহ পর সাদিয়া প্রথমবার আরহানের সঙ্গে কথা বলল চায়ের বাইরে।

“তোমার চায়ের স্বাদ খারাপ লাগে না?” সে জিজ্ঞেস করল এক সন্ধ্যায়।

আরহান অবাক হয়ে তাকাল। “কেন লাগবে?”

“কারণ আমি ইচ্ছাকৃতভাবে চিনি বেশি দিই।”

আরহান হাসল। “আমিও লবণ দিই।”

দুজনেই হেসে উঠল। সেই হাসিটা ঘরের নীরবতা ভেঙে দিল।

তারপর থেকে রাতের খাবার কখনো কখনো একসঙ্গে হত। কথা কম। কিন্তু নীরবতা আর অস্বস্তিকর লাগত না। সাদিয়া তার কাজের কথা বলত, আরহান তার অফিসের গল্প শোনাত। ছোট ছোট কথা। কিন্তু সেই কথাগুলোই তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি করছিল।

এক রাত সাদিয়া কাজ শেষ করে রান্নাঘরে এল পানি খেতে। আরহান তখন চা বানাচ্ছিল। দুজনের হাত একসঙ্গে কেটলির হাতলে পড়ল। দুজনেই থেমে গেল। চোখাচোখি হল। সাদিয়ার গালে একটা হালকা লালি ছড়িয়ে পড়ল। আরহান দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।

কিন্তু সেই স্পর্শের অনুভূতি দুজনেরই শরীরে লেগে রইল।

সাদিয়া রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। বুক ধড়ফড় করছিল। সে নিজেকে বলল, এটা কিছু না। শুধু একটা স্পর্শ। কিন্তু তার শরীর অন্য কথা বলছিল। আরহানের হাতের উষ্ণতা এখনও তার ত্বকে অনুভূত হচ্ছিল।

আরহানও সেই রাত ঘুমাতে পারেনি। সে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। সাদিয়ার হাতের ছোঁয়া তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে নিজেকে বলল, তারা শুধু সহকর্মী। না, সহবাসী। বিয়ে হয়েছে, কিন্তু সম্পর্ক নেই। অথচ তার মন অন্য কিছু চাইছিল।

দিনগুলো এভাবেই কাটতে লাগল। ছোট ছোট দুষ্টুমি বাড়তে লাগল। সাদিয়া আরহানের শার্টের বোতাম খুলে রাখত। আরহান সাদিয়ার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে দিত। দুজনেই রাগ দেখাত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হাসত।

একদিন সাদিয়া রাতে কাজ করতে করতে হঠাৎ আরহানের রুমে ঢুকে পড়ল। “চা লাগবে?”

আরহান তাকিয়ে দেখল। সাদিয়া লুজ টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে আছে। চুলগুলো বেঁধে রাখা। তার গলায় একটা সরু চেইন দুলছে। আরহানের চোখ সেই চেইনে আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।

“হ্যাঁ,” সে বলল।

সাদিয়া চা বানিয়ে এনে দিল। দুজনে পাশাপাশি বসল। কথা হল কম। কিন্তু নীরবতায় একটা উষ্ণতা ছিল। সাদিয়ার হাঁটু আরহানের হাঁটুর সঙ্গে প্রায় ছুঁয়ে ছিল। কেউ সরল না।

সেই রাত থেকে তাদের মধ্যে একটা অঘোষিত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হল। তারা একে অপরের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে একে অপরকে খুঁজত।

আরহান সাদিয়ার রাত জাগার অভ্যাস নিয়ে মাথা ঘামাত। সাদিয়া আরহানের সকালের চায়ের অভ্যাস নিয়ে ভাবত। দুজনেই জানত, তারা আলাদা জগতে বাস করছে। কিন্তু সেই জগতের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছিল।

এক সন্ধ্যায় সাদিয়া হঠাৎ বলল, “তুমি কি কখনো ভাবো, আমরা কেন এই শর্তে আছি?”

আরহান চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “কারণ আমরা দুজনেই স্বাধীনতা চাই।”

সাদিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিন্তু তার চোখে অন্য কিছু ছিল। আরহান সেটা দেখতে পেল। সে নিজেকে বলল, এদিকে তাকানো যাবে না। কিন্তু তার চোখ ফিরে ফিরে সাদিয়ার দিকেই যাচ্ছিল।

রাতে সাদিয়া বিছানায় শুয়ে ভাবছিল। আরহানের কণ্ঠস্বর তার কানে বাজছিল। তার হাসি। তার হাতের ছোঁয়া। সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। সে জানত, এই অনুভূতি বিপজ্জনক। কিন্তু থামাতে পারছিল না।

আরহানও সেই রাত জেগেছিল। সে সাদিয়ার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়েছিল। দরজা বন্ধ। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, সাদিয়াও জেগে আছে। দুজনেই একে অপরকে চাইছে। অথচ কেউ স্বীকার করতে চাইছে না।

বন্ধুত্বটা এভাবেই গভীর হচ্ছিল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে একটা গোপন আকর্ষণও। যে আকর্ষণ দুজনকেই অস্থির করে তুলছিল। তারা এখনও একে অপরের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু রাতের নীরবতায় তাদের শরীর আর মন একে অপরকে ডাকত।

সাদিয়া এক রাত আরহানের রুমে চা নিয়ে গেল। আরহান তখন শার্ট খুলে ফেলেছে। বুকের পেশিগুলো আলোর নিচে স্পষ্ট। সাদিয়ার চোখ সেখানে আটকে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। সে দ্রুত তাকিয়ে নিল অন্যদিকে। কিন্তু আরহান দেখে ফেলেছিল।

দুজনের চোখাচোখি হল। নীরবতা ঘন হয়ে উঠল। সাদিয়া চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। তাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল। এইবার কেউ হাত সরায়নি।

সাদিয়ার শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। আরহানের চোখে একটা গভীর ক্ষুধা দেখা গেল। সে সাদিয়ার হাত ধরে ফেলল ধীরে। সাদিয়া সরল না। বরং এক ধাপ এগিয়ে গেল।

কিন্তু ঠিক তখনই আরহানের ফোন বেজে উঠল। মুহূর্তটা ভেঙে গেল। সাদিয়া হাত ছাড়িয়ে নিল, চা রেখে চলে গেল।

রুমে ফিরে সে দরজা বন্ধ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বুকের ভিতর ঝড় বইছিল। সে জানত, আর বেশিদিন এই দেয়াল আটকে রাখা যাবে না।

আরহানও সেই রাত ঘুমায়নি। সাদিয়ার হাতের উষ্ণতা তার হাতে লেগে ছিল। তার গন্ধ। তার চোখের সেই চাহনি। সে জানত, তারা শুধু বন্ধু নয় আর। কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তন দুজনকেই গিলে ফেলতে চলেছে।

সাদিয়ার অসুস্থতা এল হঠাৎ করেই। এক রাত সে কাজ করতে করতে মাথা ঘুরে উঠল। জ্বর চলে এল। শরীর কাঁপতে লাগল। সে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল।

আরহান রাতে চা বানাতে গিয়ে দেখল সাদিয়ার রুমের আলো জ্বালা। দরজায় কড়া নাড়ল। কোনো সাড়া পেল না। ভিতরে ঢুকে দেখল সাদিয়া বিছানায় শুয়ে আছে, কপালে ঘাম। শরীর গরম।

সে দ্রুত কাজে নেমে পড়ল। ভেজা কাপড় দিয়ে কপাল মুছল। ওষুধ এনে দিল। পানি খাওয়াল। সারারাত তার পাশে বসে থাকল। সাদিয়া মাঝে মাঝে অচেতন অবস্থায় কিছু বলত। আরহানের নাম ডাকত। আরহান তার হাত ধরে থাকত।

“আমি এখানে আছি,” সে ফিসফিস করে বলত।

সাদিয়ার জ্বর সকালের দিকে একটু কমল। কিন্তু আরহান ঘুমায়নি। সে চেয়ারে বসে সাদিয়ার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। তার চুলগুলো কপালে লেগে আছে। ঠোঁট শুকনো। আরহান আঙুল দিয়ে চুল সরিয়ে দিল। সাদিয়ার ত্বকের উষ্ণতা তার আঙুলে লেগে রইল।

দুপুরের দিকে সাদিয়া চোখ খুলল। আরহানকে দেখে অবাক হল।

“তুমি এখানে কেন?” তার গলা শুকনো।

“তুমি অসুস্থ।”

সাদিয়া চুপ করে থাকল। আরহান পানি এগিয়ে দিল। সাদিয়া খেয়ে বলল, “ধন্যবাদ।”

আরহান মাথা নাড়ল। “স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।”

কথাটা সাদিয়ার বুকে বাজির মতো বিঁধল। সে চোখ ফিরিয়ে নিল। আরহান উঠে চলে গেল। সাদিয়া বিছানায় শুয়ে সেই কথাটা বারবার শুনতে থাকল। স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব। শুধু দায়িত্ব। আর কিছু না।

রাগ জন্মাল ধীরে ধীরে। সে ভাবল, সারারাত পাশে বসে থেকেও সে শুধু দায়িত্বের কথা বলল। কোনো আবেগ নেই। কোনো অনুভূতি নেই। সাদিয়ার চোখে জল এসে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

পরের কয়েকদিন সাদিয়া আরহানের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল। চায়ের কাপ এলেও নিত না। রান্নাঘরে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিত। আরহান কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করল। সাদিয়া শুধু মাথা নাড়ত বা চুপ থাকত।

বাড়ির নীরবতা ভারী হয়ে উঠল। আরহান সেটা সহ্য করতে পারছিল না। আগে যে নীরবতা স্বস্তির ছিল, এখন তা বিষের মতো লাগছিল। সে রাতে ঘুমাতে পারত না। সাদিয়ার রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত। দরজা বন্ধ। কোনো আওয়াজ নেই।

এক রাত আরহান আর সহ্য করতে না পেরে সাদিয়ার রুমে ঢুকে পড়ল। সাদিয়া বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। আরহানকে দেখে চোখ তুলে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।

“কেন কথা বলছ না?” আরহানের গলায় ক্লান্তি।

সাদিয়া বই রাখল। “তুমি বলেছ, স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছ। তাহলে আর কী কথা বলার আছে?”

আরহান চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে বলল, “আমি ভুল বলেছি।”

সাদিয়া তাকাল। “কী ভুল?”

“আমি শুধু দায়িত্ব পালন করতে বসে থাকিনি।” আরহানের চোখে একটা গভীরতা। “আমি তোমার পাশে থাকতে চেয়েছিলাম। তোমার জ্বর দেখে আমার ভয় করেছিল।”

সাদিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না।

আরহান এক ধাপ এগিয়ে এল। “আমি জানি আমরা শর্ত বেঁধেছিলাম। কিন্তু আমি আর সেই শর্ত মানতে পারছি না।”

সাদিয়া উঠে বসল। তার চুলগুলো কাঁধে এলোমেলো। আরহানের চোখ সেই চুলে আটকে গেল। সে আরও এগিয়ে গেল। সাদিয়ার গালে হাত রাখল। সাদিয়া চোখ বন্ধ করে দিল।

“তুমি রাগ করছ কেন?” আরহান ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

“কারণ তুমি আমাকে শুধু দায়িত্ব মনে করো।” সাদিয়ার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

আরহান তার থুতনিতে আঙুল দিয়ে মুখ তুলে ধরল। “আমি তোমাকে দায়িত্ব মনে করি না। আমি তোমাকে চাই।”

সাদিয়ার শ্বাস আটকে গেল। আরহান তার ঠোঁটের কাছে এল। থেমে গেল এক মুহূর্ত। সাদিয়া চোখ খুলে তাকাল। তারপর নিজে থেকেই ঠোঁট এগিয়ে দিল।

চুমুটা প্রথমে হালকা ছিল। তারপর গভীর হয়ে উঠল। আরহানের হাত সাদিয়ার কোমরে গিয়ে পড়ল। সাদিয়ার হাত আরহানের ঘাড়ে জড়িয়ে গেল। দুজনেই ক্ষুধার্ত ছিল। দীর্ঘদিনের দমবন্ধ অনুভূতি একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

আরহান সাদিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও শুয়ে পড়ল পাশে। তাদের শরীর একে অপরের সঙ্গে লেগে গেল। আরহানের হাত সাদিয়ার টি-শার্টের নিচে ঢুকে গেল। সাদিয়ার ত্বক গরম। আরহান তার বুকের ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল। সাদিয়া একটা আওয়াজ করল।

তারা একে অপরের কাপড় খুলতে লাগল। ধীরে ধীরে। প্রতিটি স্পর্শ ছিল আগুনের মতো। আরহান সাদিয়ার গলায় চুমু দিল। সাদিয়া তার পিঠে নখ বসিয়ে দিল। দুজনের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

আরহান সাদিয়ার চোখের দিকে তাকাল। “তুমি কি চাও?”

সাদিয়া মাথা নাড়ল। “চাই।”

তারা একে অপরকে গ্রহণ করল। গভীরভাবে। উষ্ণভাবে। রাতভর তাদের শরীর কথা বলল। যে কথা মুখে বলা যায় না। সাদিয়ার নখ আরহানের পিঠে দাগ কেটে দিল। আরহানের ঠোঁট সাদিয়ার শরীরের প্রতিটি অংশে চুমু দিল। তারা ক্লান্ত হয়ে একে অপরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকল।

সকালে সাদিয়া চোখ খুলল। আরহান তার পাশে ঘুমাচ্ছে। তার হাত সাদিয়ার কোমরে জড়ানো। সাদিয়া আঙুল দিয়ে আরহানের চুল সরিয়ে দিল। তার মনে হল, এই মানুষটা এখন আর শুধু স্বামী নয়। কিছু অনেক বেশি।

কিন্তু বাইরের জীবন অপেক্ষা করছিল।

সাদিয়া সুস্থ হয়ে কাজে ফিরল। অফিসে তার সহকর্মী রাফিদ একদিন তাকে ডেকে বলল, “সাদিয়া, আমার এক আত্মীয় তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। বিয়ের প্রস্তাব।”

সাদিয়া অবাক হয়ে তাকাল। “আমি তো বিয়ে করা।”

রাফিদ মাথা নাড়ল। “জানি। কিন্তু শুনেছি তোমরা আলাদা থাকো। পরিবার জানে। তারা মনে করছে হয়তো তুমি আবার….”

সাদিয়া চুপ করে গেল। সে জানত, পরিবারের কেউ কেউ তাদের সম্পর্কের অবস্থা জানে। কিন্তু এভাবে প্রস্তাব আসবে ভাবেনি।

সে বাড়ি ফিরে আরহানকে বলল। আরহান শুনে চুপ করে গেল। তার চোখে একটা অন্ধকার ছায়া পড়ল।

“তুমি কী বলবে?” আরহান জিজ্ঞেস করল।

সাদিয়া তাকাল। “আমি কিছু বলিনি এখনো।”

আরহান উঠে দাঁড়াল। “বলো না। বলো যে তুমি বিয়ে করা।”

সাদিয়া তার গলায় টান শুনতে পেল। সে এগিয়ে গিয়ে আরহানের হাত ধরল। “আমি বলব। কিন্তু তুমি কি ভয় পাচ্ছ?”

আরহান সাদিয়ার চোখের দিকে তাকাল। “হ্যাঁ। আমি ভয় পাচ্ছি তোমাকে হারানোর।”

সাদিয়া তার বুকে মাথা রাখল। “আমি যাব না কোথাও।”

সেই রাত তারা আবার একসঙ্গে কাটাল। আরও গভীরভাবে। আরহান সাদিয়াকে জড়িয়ে ধরে বারবার চুমু দিল। সাদিয়ার শরীরে তার হাত ঘুরে বেড়াল। তারা কথা বলল কম। শরীর দিয়েই সব বলল। সাদিয়া আরহানের ওপর উঠে বসল। তার চুলগুলো আরহানের বুকে ছড়িয়ে পড়ল। আরহান তার কোমর চেপে ধরল। দুজনেই চূড়ান্ত সুখের কাছে পৌঁছাল আবার।

পরদিন সাদিয়া অফিসে গিয়ে রাফিদকে স্পষ্ট করে বলল, “আমি বিয়ে করা। আর আমি আমার স্বামীর সঙ্গেই থাকব।”

রাফিদ অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু আর কিছু বলল না।

বাড়ি ফিরে সাদিয়া আরহানকে জানিয়ে দিল। আরহান তাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। “আমি আর তোমাকে আলাদা জগতে রাখতে চাই না।”

সাদিয়া হাসল। “আমিও না।”

সেই রাত থেকে তাদের শর্ত ভেঙে গেল। তারা এক রুমে ঘুমাতে শুরু করল। সকালে আরহান চা বানাত দুজনের জন্য। সাদিয়া রাতে কাজ করত আরহানের পাশে বসে। মাঝে মাঝে কাজ ফেলে আরহানের গলায় হাত দিয়ে চুমু দিত। আরহান ল্যাপটপ বন্ধ করে সাদিয়াকে কোলে তুলে নিত।

তাদের রোম্যান্স গভীর থেকে গভীরতর হল। একদিন বিকেলে বৃষ্টি ছাড়াই আকাশ মেঘলা ছিল। তারা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে একে অপরকে চুমু দিল। আরহানের হাত সাদিয়ার শাড়ির আঁচলের নিচে ঢুকে গেল। সাদিয়া আরহানের শার্টের বোতাম খুলে দিল। তারা সেখানেই একে অপরকে নিয়ে নিল। দাঁড়িয়ে। উত্তেজনায়। ক্ষুধায়।

সাদিয়ার পিঠ জানালায় ঠেকছিল। আরহান তার পা তুলে ধরেছিল। দুজনের শ্বাস মিশে যাচ্ছিল। সাদিয়া আরহানের নাম ডাকছিল ফিসফিসিয়ে। আরহান তার কানে বলছিল, “তুমি আমার।”

রাতে তারা আবার একসঙ্গে শুয়েছিল। সাদিয়া আরহানের বুকে মাথা রেখে বলল, “আমরা কি সত্যিই একে অপরকে ভালোবাসি?”

আরহান তার চুলে চুমু দিয়ে বলল, “আমি জানি না কবে শুরু হয়েছে। কিন্তু এখন আমি ছাড়া তোমাকে ভাবতে পারি না।”

সাদিয়া চোখ তুলে তাকাল। “আমিও।”

তারা আবার চুমু দিল। এবার ধীরে। গভীরে। ভালোবাসার সঙ্গে। শরীর আবার জেগে উঠল। আরহান সাদিয়াকে তার ওপর তুলে নিল। সাদিয়া আরহানের ভিতরে নেমে এল। দুজনেই চোখ বন্ধ করে একে অপরের ছন্দে মিশে গেল। রাতভর তারা থামল না। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকল জড়িয়ে।

সকালে আরহান চা বানিয়ে এনে সাদিয়াকে জাগাল চুমু দিয়ে। সাদিয়া হেসে উঠল। “এভাবেই কি প্রতিদিন জাগাবে?”

আরহান মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। এখন থেকে।”

তারা জানত, পরিবার হয়তো কিছু বলবে। সমাজ হয়তো প্রশ্ন করবে। কিন্তু তারা আর একে অপরকে ছাড়বে না। একই বাড়িতে থেকেও যে আলাদা জগত তৈরি করেছিল, সেই জগত এখন এক হয়ে গেছে। গভীরভাবে। উষ্ণভাবে। সম্পূর্ণভাবে।

সাদিয়া আরহানের হাত ধরে বলল, “আর কখনো বোলো না শুধু দায়িত্ব।”

আরহান হাসল। “বলব না। বলব শুধু এটা—তুমি আমার সব।”

তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। বাইরে সূর্য উঠছিল। ভিতরে তাদের পৃথিবী নতুন করে গড়ে উঠছিল। কোনো শর্ত ছাড়া। কোনো দেয়াল ছাড়া। শুধু দুজন মানুষ। আর তাদের গভীর, উত্তপ্ত ভালোবাসা।

....
👁 9