কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সেদিন যেন চাঁদের আলো পড়েছিল। রাত নয়টা। ট্রেন ছাড়তে আর মাত্র কয়েক মিনিট। সাইফুল্লাহ হাতে একটা ছোট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে ছিল একটা অদ্ভুত শান্তি। ২৮ বছরের এই যুবকটি যেন নিজের ভেতরে একটা সমুদ্র লুকিয়ে রেখেছিল — গভীর, শান্ত, কিন্তু ঢেউয়ে ভরা।
হঠাৎ একটা মৃদু, মিষ্টি গলা ভেসে এলো: “ভাইয়া… এটা কি এসি টু টায়ারের কেবিন?”
সাইফ ঘুরে তাকাল। আর তাকিয়েই তার হৃদয় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নুসরাত। ফর্সা গায়ের রং, লম্বা কালো চুল বাতাসে উড়ছে, বড় বড় চোখে লজ্জা আর অসহায়তা মিশে আছে। সাদা সালোয়ার কামিজে তাকে দেখাচ্ছিল যেন চাঁদের আলোয় ভেজা একটা ফুল।
সাইফ হাসল। তার হাসিতে ছিল সূর্যের উষ্ণতা। “হ্যাঁ, এটাই। আপনার সিট কোনটা?”
নুসরাত টিকিট বাড়িয়ে দিল। সাইফ দেখল — ১২বি। তার নিজের সিট ১২এ। পাশাপাশি।
“আসুন, আমি আপনার ব্যাগটা তুলে দিই।” সাইফের আঙুল যখন নুসরাতের হাতের কাছে এলো, দুজনেরই হৃদয়ে একটা হালকা কাঁপুনি উঠল।
ট্রেন চলতে শুরু করল। বাইরে অন্ধকার রাত, ভেতরে দুটো অচেনা হৃদয়।
প্রথমে কেউ কথা বলছিল না। কিন্তু নুসরাতের চোখ বারবার সাইফের দিকে চলে যাচ্ছিল। সাইফও চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন কোনো অদৃশ্য সুতো তাদের বেঁধে দিয়েছে।
অবশেষে নুসরাত ফিসফিস করে বলল, “আপনার নাম কী?”
“সাইফুল্লাহ… সাইফ বলে ডাকো।” “আমি নুসরাত।”
সেই প্রথম ‘তুমি’ সম্বোধন। দুজনেই হাসল। আর সেই হাসিতে যেন হাজার তারা জ্বলে উঠল কেবিনের ভেতর।
রাত বাড়তে লাগল। তারা কথা বলছিল অফুরন্ত। নুসরাত বলছিল তার স্বপ্নের কথা — ছোট্ট শিশুদের জন্য একটা স্কুল খুলতে চায় সে। সাইফ বলছিল তার কোডিংয়ের প্যাশনের কথা, কিন্তু তার চেয়েও বড় প্যাশন — কাউকে পুরোপুরি ভালোবাসার।
“আমি বিশ্বাস করি,” সাইফ বলল, “প্রেম এমন একটা জিনিস, যা একবার হলে সারাজীবন চলে। শুধু সঠিক মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া দরকার।”
নুসরাত লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “আমারও তাই মনে হয়…”
রাত দুটোর দিকে নুসরাত ঘুমিয়ে পড়ল। তার মাথা আস্তে আস্তে সাইফের কাঁধে হেলে পড়ল। সাইফ নড়ল না। শুধু খুব আলতো করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর নিজের চাদরটা খুলে নুসরাতের গায়ে ঢেকে দিল।
সেই মুহূর্তে সাইফ বুঝতে পারল — এই মেয়েটাই তার জীবনের অর্ধেক।
সকাল হলো। চট্টগ্রামের কাছাকাছি। নুসরাত জেগে উঠে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “আমি… সরি… আপনার কাঁধে…”
সাইফ তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমার কাঁধটা যদি তোমার মাথার জন্য সবসময় থাকতে পারত, তাহলে আমি ধন্য হয়ে যেতাম।”
নুসরাতের চোখে জল চলে এলো। এত সুন্দর কথা সে আগে কখনো শোনেনি।
ট্রেন থামলে সাইফ বলল, “আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিব।” নুসরাত রাজি হয়ে গেল। পথে তারা আরও অনেক কথা বলল। সাইফ নুসরাতের হাত ধরল না, কিন্তু তার চোখ দিয়ে যেন হাজার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে সাইফ বলল, “নুসরাত, আজকের এই যাত্রা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রা হয়ে রইল। আবার দেখা হবে তো?”
নুসরাত হাসল। তার হাসিতে লজ্জা, আনন্দ আর একটু আশা মিশে ছিল। “ইনশাআল্লাহ…”
সেই রাত থেকে তাদের প্রেমের যাত্রা শুরু।
প্রথম মেসেজ: নুসরাত: “আজকের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার কাঁধটা এখনো মনে পড়ছে। ☺️”
সাইফ: “আর তোমার চুলের গন্ধ আমার কাছে এখনো লেগে আছে।”
প্রতি রাতে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। সাইফ নুসরাতকে কবিতা শোনাত। নুসরাত সাইফকে গানের লাইন পাঠাত। তাদের কথায় ছিল না কোনো অশ্লীলতা, শুধু বিশুদ্ধ আবেগ।
একদিন নুসরাত বলল, “আমার খুব ইচ্ছে পাহাড় দেখার। মেঘের সাথে কথা বলার।”
সাইফ উত্তর দিল, “তাহলে চলো, আমরা বান্দরবান চলে যাই। শুধু তোমার আর আমার জন্য।”
নুসরাত ভয় পেয়েছিল, কিন্তু সাইফের ভালোবাসায় বিশ্বাস করে রাজি হয়ে গেল।
বান্দরবান। নীলগিরির চূড়ায় সূর্যাস্তের সময়। চারদিকে লাল-কমলা আকাশ। সাইফ নুসরাতের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
“নুসরাত,” সাইফের গলা কাঁপছিল, “প্রথমবার তোমাকে দেখার পর থেকে আমার হৃদয় বলছে — এই মেয়েটাই আমার। এই মেয়েটার জন্য আমি সবকিছু দিতে পারি। তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।”
নুসরাতের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছিল। “সাইফ… আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। প্রথম রাত থেকেই। তোমার কাঁধে মাথা রাখার পর থেকেই আমার মনে হয়েছে — এই ছেলেটাই আমার আশ্রয়।”
সাইফ খুব আস্তে নুসরাতকে কাছে টেনে নিল। তাদের প্রথম চুমু। নরম, গভীর, আবেগে ভরা। চুমুতে ছিল পাহাড়ের হাওয়া, তারার আলো, আর দুটো হৃদয়ের মিলনের সুর। নুসরাতের ঠোঁট কাঁপছিল, সাইফ তার চুলে আঙুল চালিয়ে দিচ্ছিল। সময় যেন থেমে গিয়েছিল।
ফিরে আসার পর তাদের প্রেম আরও গভীর হলো।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বৃষ্টির দিন। দুজনে ভিজে একাকার। সাইফ নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোমার ভেজা চুলে বৃষ্টির ফোঁটা দেখে মনে হয় যেন স্বর্গ থেকে ফুল ঝরছে।”
নুসরাত সাইফের বুকে মাথা রেখে বলল, “তোমার বুকের শব্দ আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর সুর। এই সুর শুনতে শুনতে আমি সারাজীবন কাটাতে চাই।”
কক্সবাজারের রিসোর্টে নুসরাতের জন্মদিন। ঘরে শুধু মোমবাতির আলো। সাইফ নুসরাতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“আজ থেকে তুমি আমার। আমার প্রতিটা শ্বাসে, প্রতিটা স্বপ্নে, প্রতিটা মুহূর্তে।”
নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে সাইফকে জড়িয়ে ধরল। সেই রাতে তারা প্রথমবার পুরোপুরি এক হয়ে গেল। খুব ধীরে, খুব ভালোবেসে। প্রত্যেকটা স্পর্শ ছিল ভালোবাসার কবিতা। নুসরাতের শরীর কেঁপে উঠছিল আনন্দে। সাইফ তার কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল, “তুমি আমার রানী… আমার সবকিছু…”
নুসরাতের চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। “আমি তোমার… চিরকালের জন্য।”
কিন্তু ভালোবাসার পথে কাঁটা থাকবেই।
নুসরাতের বাবা জানতে পেরে রেগে গেলেন। নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে সাইফকে ফোন করল। সাইফ পরের দিনই চট্টগ্রাম চলে এলো। নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে বাবার সামনে দাঁড়াল।
“স্যার, আমি নুসরাতকে শুধু ভালোবাসি না, আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। আমি তাকে সুখী করতে চাই প্রতিদিন। আমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত তার নামে উৎসর্গ করব।”
নুসরাতের বাবা প্রথমে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু সাইফের চোখের সততা, নুসরাতের কান্না আর দুজনের ভালোবাসার গভীরতা দেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন।
বিয়ে হলো। খুব সুন্দর, খুব আবেগঘন অনুষ্ঠান। নুসরাতকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গের পরী নেমে এসেছে। সাইফ তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আজ থেকে তুমি আমার ঘর, আমার হৃদয়, আমার সবকিছু।”
বিয়ের পর তাদের জীবন হয়ে উঠল স্বপ্নের মতো।
প্রতি সকালে সাইফ নুসরাতের কপালে চুমু দিয়ে অফিস যেত। রাতে ফিরে এসে দুজনে ছাদে বসে তারা দেখত। নুসরাত সাইফের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকত। সাইফ তার চুলে হাত বুলিয়ে দিত আর ফিসফিস করে বলত, “তোমাকে ভালোবাসি… প্রতিদিন আরও বেশি করে।”
এক বছর পর নুসরাত মা হতে চলেছে। সাইফ তার পেটে হাত রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ফসল আসছে। তুমি আমাকে যে জীবন দিয়েছ, তার জন্য কৃতজ্ঞতায় আমি শেষ নেই।”
নুসরাত সাইফের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, “তোমার ভালোবাসায় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী।”
তারা আজও একসাথে। ঢাকা-চট্টগ্রামের সেই ট্রেনের যাত্রা থেকে শুরু হয়ে তাদের প্রেম হয়ে উঠেছে অমর, চিরকালীন। প্রতিটা রাতে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। প্রতিটা সকালে নতুন করে প্রেমে পড়ে।
প্রেম মানে শুধু শরীর নয় — প্রেম মানে দুটো আত্মার গভীর মিলন, যা কোনো দূরত্ব, কোনো বাধা মানে না। সাইফ আর নুসরাতের প্রেম সেই চিরন্তন সত্যের জীবন্ত উদাহরণ।
....