সমুদ্র সাক্ষী অমর মিলন

কক্সবাজারের বিশাল সমুদ্র সৈকত। সূর্যাস্তের লাল আলোয় ঢেউগুলো যেন সোনালি স্বপ্নের মতো ভেঙে পড়ছে। রাহাত দাঁড়িয়ে ছিল একা, তার হাতে একটা পুরনো ক্যামেরা। ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছে সে। চাকরির চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, সবকিছু থেকে দূরে। সমুদ্র তার একমাত্র বন্ধু এখন।

kxz

হঠাৎ একটা মেয়ের হাসি ভেসে এল বাতাসে। রাহাত ঘুরে তাকাল। দূরে, জলের কাছে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার লম্বা চুল বাতাসে উড়ছে, লালচে আভা পড়েছে তার মুখে। সে একটা সাদা ফ্রক পরে, পায়ে খালি। ঢেউ এসে তার পা ধুয়ে দিচ্ছে। মেয়েটি হাসছে, যেন সমুদ্রের সাথে কথা বলছে।

রাহাতের ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিক করে উঠল। মেয়েটি ঘুরে তাকাল। তার চোখ দুটো গভীর সমুদ্রের মতো। “কে আপনি?” তার কণ্ঠস্বর মিষ্টি, কিন্তু সাহসী।

kx/춺'

“আমি... শুধু একজন ভ্রমণকারী।” রাহাত লজ্জা পেয়ে বলল।

মেয়েটি হেসে এগিয়ে এল। “আমি আয়েশা। এই সমুদ্র আমার ছোটবেলার সঙ্গী। আপনি কি ছবি তুলছিলেন?”

সেই প্রথম দেখা। আয়েশা কক্সবাজারের একটা ছোট হোটেলে কাজ করে। তার বাবা মারা গেছে অনেক আগে। মা অসুস্থ। সে একা লড়াই করে চলেছে। রাহাত ঢাকার একটা আইটি কোম্পানির প্রোগ্রামার। কিন্তু তার মনটা সবসময় সমুদ্রের দিকে টানে।

সেই সন্ধ্যায় তারা একসাথে হাঁটল। ঢেউয়ের গর্জনের মাঝে কথা বলল। আয়েশা বলল, “সমুদ্র কখনো মিথ্যা বলে না। সে সবকিছু নিয়ে যায়, আবার ফিরিয়েও দেয়।”

রাহাত অনুভব করল, তার হৃদয়ে কিছু একটা জেগে উঠছে।

পরের কয়েকদিন তারা একসাথে কাটাল। সকালে সমুদ্র সৈকতে হাঁটা, দুপুরে মাছ ধরা নৌকায় ভ্রমণ, সন্ধ্যায় বালিয়াড়িতে বসে গল্প। আয়েশা গান গাইত। তার গলায় পুরনো বাংলা গান— “সমুদ্রের গান”। রাহাত শুনত মুগ্ধ হয়ে।

একদিন ঝড় এল। আকাশ কালো হয়ে গেল। রাহাত আয়েশাকে নিয়ে একটা ছোট কেবিনে আশ্রয় নিল। বৃষ্টির শব্দে তারা কাছাকাছি বসল। আয়েশার চোখে ভয় আর আকাঙ্ক্ষা মিশে ছিল।

“আমি ভয় পাই না ঝড়কে,” আয়েশা ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু একা থাকতে ভয় লাগে।”

রাহাত তার হাত ধরল। “আমি আছি।”

সেই রাতে প্রথমবার তারা কাছাকাছি হল। আয়েশার ঠোঁটে সমুদ্রের লবণের স্বাদ। তাদের শরীর জড়িয়ে গেল ঢেউয়ের মতো। বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে তাদের প্রেমের ছন্দ। রাহাত আয়েশার কানে ফিসফিস করল, “তুমি আমার সমুদ্র।”

সকালে আয়েশা লজ্জায় মুখ লুকাল। কিন্তু তার চোখে আনন্দ। “এটা স্বপ্ন নয় তো?”

“না, এটা আমাদের বাস্তব।” রাহাত বলল।

রাহাতকে ঢাকায় ফিরতে হল। কাজের জন্য। আয়েশা কাঁদল না, কিন্তু তার চোখে জল। “ফিরে এসো। সমুদ্র অপেক্ষা করবে।”

ঢাকায় ফিরে রাহাতের মন পড়ে থাকল সমুদ্রে। প্রতি রাতে ফোন। আয়েশা বলত তার দিনের গল্প। হোটেলের কাজ, মায়ের চিকিৎসা, সমুদ্রের নতুন ঢেউ। রাহাত প্রমিস করল, “আমি শীঘ্রই ফিরব।”

কিন্তু জীবন সহজ নয়। রাহাতের বাবা-মা তার জন্য পাত্রী দেখতে শুরু করল। আয়েশার কথা বলতে গিয়ে সে ভয় পেল। আয়েশা গরিব ঘরের মেয়ে। সমাজ মানবে না।

একদিন আয়েশা ফোন করে বলল, “আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু তুমি যদি না ফেরো, সমুদ্র আমাকে নিয়ে নেবে।”

রাহাতের বুকে ব্যথা। সে ছুটে গেল কক্সবাজারে।

ফিরে এসে দেখল আয়েশা অসুস্থ। মা’র চিকিৎসার চাপে সে নিজেকে ভুলে গেছে। রাহাত তাকে নিয়ে হাসপাতালে। ডাক্তার বলল, “স্ট্রেস আর অপুষ্টি।”

রাহাত সব ছাড়ল। চাকরি ছেড়ে দিল। কক্সবাজারে একটা ছোট কটেজ ভাড়া নিল। আয়েশাকে সুস্থ করল। তারা আবার সমুদ্রের কাছে গেল।

“তুমি আমার জন্য সব ছেড়ে দিলে?” আয়েশা অবাক।

“তুমি আমার সব।” রাহাত জড়িয়ে ধরল তাকে।

তাদের প্রেম গভীর হল। রাতের পর রাত তারা সমুদ্রের সামনে বসে। আয়েশা তার শরীর দিয়ে রাহাতকে ভালোবাসত। তাদের মিলন ছিল সমুদ্রের মতো উন্মাদ, তীব্র আর অমর। ঢেউয়ের শব্দে তাদের নিঃশ্বাস মিশে যেত। আয়েশার নরম স্তন, তার কোমরের বাঁক, সবকিছু রাহাতের জন্য। রাহাত আয়েশার প্রতিটি অংশ চুমু খেত, যেন সমুদ্রের প্রতিটি ফোঁটা।

“আমি তোমার,” আয়েশা বলত। “চিরকাল।”

খবর ছড়িয়ে পড়ল। রাহাতের পরিবার এল। বাবা রাগ করলেন, “এই মেয়ে তোমার সাথে মানাবে না।”

আয়েশা কাঁদল। “আমি চলে যাব। তুমি ফিরে যাও।”

কিন্তু রাহাত অটল। “সমুদ্র যেমন কখনো পিছু হটে না, আমিও না।”

সে আয়েশাকে বিয়ে করল। ছোট একটা অনুষ্ঠান সমুদ্রের সামনে। মা সুস্থ হয়ে উঠলেন। রাহাত একটা ছোট অনলাইন বিজনেস শুরু করল। আয়েশা তার সাথে।

বছর গড়াল। তাদের একটা সন্তান হল— সমুদ্র নাম। ছেলেটা সমুদ্রের ধারে খেলত। রাহাত আর আয়েশা বুড়ো হয়েও হাত ধরে হাঁটত।

একদিন আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ডাক্তার বলল, ক্যান্সার। রাহাত ভেঙে পড়ল না। সে আয়েশাকে নিয়ে সমুদ্রের কাছে বসল।

“আমি চলে গেলেও, আমি তোমার সাথে থাকব। ঢেউয়ের মধ্যে, বাতাসে।” আয়েশা দুর্বল কণ্ঠে বলল।

রাহাত কাঁদল। “তুমি অমর। আমাদের প্রেম অমর।”

আয়েশা চলে গেল। কিন্তু রাহাত প্রতিদিন সমুদ্রের কাছে যেত। তার ছবি তুলত। ছেলেকে গল্প শোনাত আয়েশার।

বছরের পর বছর। রাহাত বুড়ো হয়ে গেল। একদিন ঝড়ের রাতে সে সমুদ্রে নেমে গেল। “আয়েশা, আমি আসছি।”

সমুদ্র তাকে জড়িয়ে নিল। পরদিন সকালে ঢেউয়ে ভেসে এল দুটো শরীর— রাহাত আর আয়েশার আত্মা যেন এক হয়ে গেছে।

সমুদ্রের অমর প্রেম। যা কখনো শেষ হয় না।

 

....
👁 141