প্রেমের চিরকালীন আলো

ঢাকার যানজটে আটকে থাকা একটা সাদা প্রাইভেট কারের ভিতর বসে রাহাত তার ফোনটা বারবার চেক করছিল। আজ তার বিয়ের তৃতীয় বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু অফিসের মিটিং শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আয়েশা নিশ্চয়ই বাসায় অপেক্ষা করছে। তার মনে পড়ল প্রথম দেখার দিনটার কথা।

kxz

রাহাত একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার। বয়স ৩২। লম্বা, সুঠাম চেহারা, চোখে চশমা। আয়েশা তার চেয়ে চার বছরের ছোট। চিকিৎসকের মেয়ে, কিন্তু নিজে পড়াশোনা শেষ করে একটা স্কুলে শিক্ষিকা। তাদের বিয়ে হয়েছিল পারিবারিকভাবে, কিন্তু প্রথম দেখাতেই দুজনের চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল।

বাসায় ঢুকতেই আয়েশা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে হালকা নীল সালোয়ার কামিজ। চুল খোলা, চোখে হালকা কাজল। “আজকে এত দেরি?” তার গলায় অভিমান মেশানো। রাহাত হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল। “সরি জান। মিটিং ছিল। কিন্তু আজ আমাদের অ্যানিভার্সারি। ভুলিনি।”

kx/춺'

আয়েশা তার বুকে মাথা রেখে বলল, “তোমার জন্য রান্না করেছি। তোমার প্রিয় ইলিশ মাছ আর ভাত। চলো খাই।”

রাতের খাবারের পর তারা বারান্দায় বসল। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু দূরের আলোর ঝলকানি যেন তাদের নিজস্ব আকাশ। রাহাত আয়েশার হাত ধরে বলল, “তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল তুমি যেন চাঁদের আলো। শান্ত, কিন্তু উজ্জ্বল।”

আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করল। “আর তুমি? তোমার চোখ দুটো দেখে মনে হয়েছিল, এই মানুষটার সাথে পুরো জীবন কাটাতে পারব।”

তাদের প্রথম রাতের কথা মনে পড়ল দুজনেরই। বিয়ের পর প্রথমবার যখন একা হয়েছিল, আয়েশা খুব লজ্জা পাচ্ছিল। রাহাত ধীরে ধীরে তার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দিব না।” সেই রাতে তারা শুধু কাছাকাছি হয়ে ঘুমিয়েছিল, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমে গিয়েছিল অনেক।

পরের দিন সকালে রাহাত অফিসে যাওয়ার আগে আয়েশাকে বলল, “এই উইকেন্ডে আমরা কোথাও ঘুরতে যাই। শুধু তুমি আর আমি।”

আয়েশার চোখ চকচক করে উঠল। “কোথায়?”

“চট্টগ্রাম। সমুদ্রের কাছে।”

শুক্রবার সকালে তারা ট্রেনে উঠল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন। আয়েশা জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। রাহাত তার হাত ধরে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রেখেছিল। ট্রেনের ভিতর হালকা ঝাঁকুনিতে আয়েশা তার কাঁধে মাথা রাখল। “এমন মুহূর্তগুলোতে মনে হয় পুরো দুনিয়া আমাদের।”

রাহাত তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি আমার পুরো দুনিয়া।”

ট্রেনে যেতে যেতে তারা অনেক কথা বলল। আয়েশা বলল তার ছোটবেলার কথা। কীভাবে তার বাবা তাকে পড়াশোনায় উৎসাহ দিত। রাহাত বলল তার প্রথম চাকরির কথা, কীভাবে সে স্বপ্ন দেখত একটা সুন্দর সংসারের।

চট্টগ্রাম পৌঁছে তারা হোটেলে চেক ইন করল। সমুদ্রের কাছাকাছি একটা রিসোর্ট। বিকেলে তারা সমুদ্রের তীরে হাঁটছিল। ঢেউগুলো পায়ের কাছে এসে ভেঙে যাচ্ছিল। আয়েশার শাড়ির আঁচল উড়ছিল বাতাসে। রাহাত তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট আয়েশার ঘাড়ে ছুঁয়ে গেল।

“ঠান্ডা লাগবে না?” আয়েশা লজ্জায় বলল।

“তোমার শরীরের উষ্ণতায় সব ঠান্ডা উধাও হয়ে যায়,” রাহাত ফিসফিস করে বলল।

সন্ধ্যায় তারা রিসোর্টের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। চাঁদ উঠেছে। আয়েশার চোখে চাঁদের আলো পড়ে যেন জ্বলছে। রাহাত তার হাতে একটা ছোট বাক্স দিল। “এটা তোমার জন্য।”

ভিতরে একটা সুন্দর নেকলেস। হীরার লকেট। আয়েশার চোখে পানি চলে এল। “এত সুন্দর কেন তুমি?”

“কারণ তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার।”

সেই রাতে তাদের মধ্যে যেন নতুন করে প্রেম জেগে উঠল। রাহাত আয়েশাকে ধীরে ধীরে চুমু খেল। তার ঠোঁট থেকে গলায়, গলা থেকে কাঁধে। আয়েশা তার বুকে হাত রেখে কাঁপছিল। “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রাহাত।”

“আমিও জান। তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”

তাদের শরীর এক হয়ে গেল চাঁদের আলোয়। ধীর, মধুর, গভীর। প্রতিটা স্পর্শে যেন প্রেমের নতুন স্তর খুলে যাচ্ছিল। আয়েশা তার কানে ফিসফিস করে বলছিল, “আরও কাছে এসো… আমাকে পুরোপুরি নাও।”

রাত গভীর হলো। তারা ঘুমিয়ে পড়ল একে অপরকে জড়িয়ে।

পরদিন সকালে তারা সমুদ্রে নামল। পানিতে খেলা করতে করতে আয়েশা হাসছিল। রাহাত তাকে কোলে তুলে ঘুরাল। “তুমি আমার শিশু।”

“আর তুমি আমার রাজকুমার।”

চট্টগ্রাম থেকে ফিরে আসার পর তাদের জীবনে একটা ছোট পরিবর্তন এল। আয়েশা গর্ভবতী হয়েছে। প্রথমে সে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু রাহাত তাকে আশ্বস্ত করল। “আমরা একসাথে এই যাত্রা করব।”

গর্ভাবস্থায় রাহাত আয়েশার যত্ন নিত। রাতে তার পা টিপে দিত, সকালে নাস্তা বানিয়ে দিত। আয়েশা বলত, “তুমি এত ভালোবাসো কী করে?”

“কারণ তুমি আমার সবকিছু।”

নয় মাস পর তাদের একটা সুন্দর মেয়ে হলো। নাম রাখলেন ‘আরিশা’। আরিশাকে কোলে নিয়ে আয়েশা রাহাতের দিকে তাকিয়ে হাসল। “এখন আমাদের পরিবার পূর্ণ।”

কিন্তু জীবন সবসময় মসৃণ নয়। রাহাতের অফিসে প্রমোশনের জন্য অনেক চাপ। সে রাত করে বাসায় ফিরত। আয়েশা একা একা আরিশাকে সামলাত। একদিন ঝগড়া হয়ে গেল।

“তুমি আর আমাদের সময় দাও না!” আয়েশা চোখের পানি ফেলে বলল।

রাহাত চুপ করে রইল। পরদিন সে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এল। “চলো, গ্রামে যাই। তোমার দাদার বাড়িতে।”

আয়েশার দাদার বাড়ি নোয়াখালীর একটা গ্রামে। সেখানে গিয়ে তারা শান্তি পেল। গ্রামের সবুজ মাঠ, নদীর ধার, পাখির ডাক। রাহাত আর আয়েশা হাত ধরে হাঁটত। আরিশা তাদের সাথে খেলত।

এক সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে রাহাত বলল, “আমি ভুল করেছিলাম। কাজের চাপে তোমাকে অবহেলা করেছি। ক্ষমা চাই জান।”

আয়েশা তার গালে হাত রেখে বলল, “ভুল সবার হয়। কিন্তু তুমি যে ফিরে এসেছ, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট।”

সেই রাতে গ্রামের ঘরে তারা আবার নতুন করে এক হয়ে গেল। চাঁদের আলো ঘরে ঢুকছিল। আয়েশার শরীর যেন আরও সুন্দর লাগছিল রাহাতের কাছে। প্রতিটা চুমুতে, প্রতিটা আলিঙ্গনে তাদের প্রেম নতুন করে জন্ম নিচ্ছিল।

“তুমি আমার চাঁদ,” রাহাত বলল।

“আর তুমি আমার আকাশ,” আয়েশা জবাব দিল।

গ্রাম থেকে ফিরে তারা নতুন করে সংসার শুরু করল। রাহাত অফিসের চাপ কমাল। আয়েশা স্কুলে ফিরে গেল। আরিশা বড় হতে লাগল। বছর গড়িয়ে গেল। তাদের দশম বিয়ের বার্ষিকীতে তারা আবার চট্টগ্রাম গেল।

এবার আরিশাও সাথে। কিন্তু রাতে যখন আরিশা ঘুমিয়ে পড়ত, রাহাত আর আয়েশা বারান্দায় বসে পুরনো দিনের কথা বলত। “এখনো তোমাকে দেখলে আমার হৃদয় দ্রুত চলে,” রাহাত বলল।

আয়েশা হেসে বলল, “আর আমি তোমার চোখে এখনো সেই প্রথম দিনের রাহাতকে দেখি।”

তাদের প্রেম কখনো পুরনো হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়েছে। ঝগড়া হয়েছে, কান্না হয়েছে, কিন্তু ভালোবাসা কখনো কমেনি।

একদিন আয়েশা রাহাতকে বলল, “যদি আরেকটা জন্ম হয়, তাহলে আবার তোমাকেই বেছে নেব।”

রাহাত তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমিও। চিরকাল তোমার সাথে।”

তাদের গল্প চলতে থাকল। চাঁদের আলোয়, সমুদ্রের ঢেউয়ে, গ্রামের নদীতে, ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়—সবখানে তাদের প্রেম ছড়িয়ে ছিল। আয়েশার চোখে সেই চাঁদের আলো কখনো নিভেনি

....
👁 78