রিয়া বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। নিচে সাদা মেঘের সমুদ্র। তার হৃদয়টা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল। ঢাকায় তার জীবন ছিল রুটিনে বাঁধা। অফিস, কোডিং, রাতে একা বারান্দায় বসে কফি খাওয়া। কিন্তু এই থাইল্যান্ড ট্যুরটা তার জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো বড় অ্যাডভেঞ্চার।
সুওয়ার্নভূমি এয়ারপোর্টে নামার পর গরম হাওয়াটা তার গায়ে লাগতেই সে হাসল। গ্রুপের সবাই বাসে উঠছে। রিয়া জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে ব্যাগ রেখে বসল। কয়েক মিনিট পর পাশের সিটে কেউ বসতেই সে মুখ তুলে তাকাল।
“মে আই সিট হিয়ার?” গভীর, মোলায়েম কণ্ঠস্বর। রিয়া চোখ তুলে দেখল — লম্বা, ফর্সা, সুগঠিত শরীর, চোখে হালকা চশমা, আর ঠোঁটের কোণে একটা স্বাভাবিক হাসি। তার নাম আরিয়ান খান। একই কোম্পানির সিনিয়র সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট। রিয়া আগে শুধু নাম শুনেছিল, কখনো কথা বলেনি।
“হ্যাঁ, অবশ্যই,” রিয়া লজ্জা লজ্জা করে বলল।
বাস চলতে শুরু করল। প্রথম কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। তারপর আরিয়ান হালকা করে বলল, “তোমার নাম রিয়া না? মার্কেটিং টিম থেকে?”
রিয়া অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ। তুমি চিনলে কীভাবে?”
“অফিসের টিম লিস্টে দেখেছি। আর... তোমার হাসিটা খুব চেনা লাগে।”
সেই কথায় রিয়ার গালটা একটু লাল হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে কথা বাড়তে লাগল। আরিয়ান বলল তার ছোটবেলার থাইল্যান্ড দেখার শখের কথা, কীভাবে বাবার সাথে ট্রাভেল ম্যাগাজিন পড়ত। রিয়া বলল তার একাকিত্বের কথা, কীভাবে সে সবসময় ভিড়ের মাঝেও একা অনুভব করে। দুজনের কথা এত সহজে মিলে গেল যে সময় কখন যে কেটে গেল তারা বুঝতেই পারল না।
হোটেলে পৌঁছে রুম অ্যাসাইনমেন্ট হলো। রিয়ার রুম ১২০৭, আরিয়ানের ১২০৮ — পাশাপাশি। সন্ধ্যায় সবাই চাও ফ্রা প্রাসাদ দেখতে গেল। সোনালি আলোয় ঝলমল করছিল পুরো প্রাসাদ। রিয়া একটা সুন্দর কোণে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল। হঠাৎ পেছন থেকে আরিয়ানের গলা ভেসে এল, “একা একা ছবি তুলছ? চলো, আমি তোমার ছবি তুলে দিই।”
দুজনে মিলে অনেক ছবি তুলল। কখনো রিয়া হাসছে, কখনো আরিয়ান তার পাশে দাঁড়িয়ে। একটা ছবিতে আরিয়ান রিয়ার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল। সেই স্পর্শে রিয়ার শরীরটা কেঁপে উঠল।
রাতে রুফটপ ডিনার। নীল আলো, মোমবাতি, আর ব্যাংককের রাতের আলোকিত আকাশ। আরিয়ান রিয়ার পাশে বসল। তারা থাই খাবার খেতে খেতে কথা বলছিল।
“জানো রিয়া,” আরিয়ান তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আজ সারাদিন তোমার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে চিনি। এরকম অনুভূতি আগে কখনো হয়নি।”
রিয়া তার গ্লাসটা নামিয়ে রেখে লজ্জায় মাথা নিচু করল। “আমারও... তুমি খুব আলাদা। তোমার কথা শুনতে ভালো লাগে।”
সেই রাতে দুজনে অনেকক্ষণ রুফটপে বসে রইল। ব্যাংককের হালকা বাতাস তাদের চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল। আরিয়ান তার হাতটা ধীরে ধীরে রিয়ার হাতের উপর রাখল। কোনো কথা বলল না, শুধু চুপ করে হাত ধরে রইল। সেই স্পর্শে দুজনের হৃদয়ই দ্রুত চলছিল।
পরের দিন — পাতায়া বিচ
সকালে পাতায়ায় পৌঁছে সবাই সমুদ্র সৈকতে নেমে পড়ল। নীল জল, সাদা বালি, আর দূরে নৌকাগুলো। রিয়া একটা হালকা সাদা ড্রেস পরে এসেছিল। আরিয়ান তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল।
“তুমি তো আজ সত্যি সত্যি সমুদ্রের দেবী হয়ে গেছ,” আরিয়ান হেসে বলল।
রিয়া লজ্জা পেয়ে হাসল। “থামো তো!”
দুজনে মিলে সমুদ্রে নামল। ঢেউ এসে তাদের ভিজিয়ে দিল। আরিয়ান রিয়াকে শেখাতে লাগল সাঁতার। তার হাত দিয়ে রিয়ার কোমর ধরে সাপোর্ট দিচ্ছিল। খুব কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছিল দুজন। একটা বড় ঢেউ এলে রিয়া ভয়ে আরিয়ানের বুকে জড়িয়ে ধরল। আরিয়ানও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কয়েক সেকেন্ড দুজনে এভাবেই রইল। সময় যেন থেমে গিয়েছিল।
সন্ধ্যায় বিচে সানসেট। লাল আকাশের নিচে দুজন পাশাপাশি বসে আছে। আরিয়ান বলল, “রিয়া, আমি জানি এটা খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর থেকে আমার মনে হচ্ছে আমি অনেকদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
রিয়া তার চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল, “আমিও আরিয়ান... তোমার সাথে থাকলে সবকিছু খুব সুন্দর লাগে।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে তার মুখটা রিয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। রিয়াও চোখ বন্ধ করল। তাদের ঠোঁট প্রথমবারের মতো ছুঁয়ে গেল। নরম, উষ্ণ, আর পুরোপুরি রোমান্টিক একটা চুমু। সানসেটের লাল আলোয় দুজনের শরীর এক হয়ে গেল যেন।
ফুকেতের দিকে যাত্রা
পরের দিন তারা ফুকেতে চলে গেল। সেখানে নৌকা ভ্রমণ, জেমস বন্ড আইল্যান্ড, আর রাতের মার্কেট। প্রতিটা মুহূর্তে দুজন আরও কাছে চলে আসছিল। রাতে বিচের পাশে হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান রিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এই ট্যুরটা শেষ হলে আমরা ঢাকায় ফিরে গেলেও এই অনুভূতি নিয়ে যাব। তুমি আমার সাথে থাকবে তো?”
রিয়া তার বুকে মাথা রেখে বলল, “হ্যাঁ... সারাজীবন।”
....