রাত নয়টা বাজে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। চট্টগ্রামে মায়ের কাছে যাচ্ছে সে। অফিসের ছুটি নিয়ে তিন দিনের জন্য। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে প্রেম বলতে কিছু নেই। শুধু কাজ, ঘুম আর কফি।
ট্রেনটা ঢুকল। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস। এসি চেয়ার কোচ। রাহাত তার সিট খুঁজে বসল—২৩এ। জানালার পাশে। বাইরে ঢাকার আলো ঝলমল করছে। ট্রেন ছাড়ার আগে শেষবার মোবাইল চেক করল। কোনো মেসেজ নেই।
পাশের সিটটা খালি ছিল। ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা মেয়ে এসে বসল। বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। লম্বা চুল, হালকা মেকআপ, সাদা সালোয়ার কামিজ। চোখে একটা নরম আলো। রাহাত একবার তাকাল, তারপর জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“এক্সকিউজ মি, এটা কি ২৩বি?” মেয়েটার গলা মিষ্টি।
রাহাত মাথা ঘুরিয়ে বলল, “হ্যাঁ। আপনি বসুন।”
মেয়েটা বসল। তার নাম ছিল আয়েশা। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। ঢাকায় একটা সেমিনারে গিয়েছিল। দুজনের মধ্যে প্রথমে কোনো কথা হলো না। ট্রেন চলতে শুরু করল। রাতের ঢাকা পিছনে ফেলে।
এক ঘণ্টা পর আয়েশা বলল, “চা খাবেন? ট্রেনে চা খুব ভালো হয়।”
রাহাত হাসল। “হ্যাঁ, নিন।”
দুজনে চা নিল। কথা শুরু হলো। আয়েশা বলল তার গ্রামের কথা, চট্টগ্রামের পাহাড়, সমুদ্র। রাহাত বলল তার ঢাকার একাকীত্বের কথা। আয়েশার চোখে একটা কৌতূহল। রাহাতের গলায় একটা নরমতা।
রাত বাড়ছিল। ট্রেনের আলো মৃদু। অনেক যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছে। আয়েশা তার শালটা গায়ে জড়িয়ে নিল। “ঠান্ডা লাগছে।”
রাহাত তার জ্যাকেটটা খুলে দিল। “এটা নিন।”
আয়েশা হাসল। “থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি খুব ভদ্র।”
কথায় কথায় তারা জানল দুজনের অনেক মিল। দুজনেই বই পড়তে ভালোবাসে। আয়েশা রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, রাহাত নজরুলের। আয়েশা বলল, “জীবনটা তো একটা ট্রেনের মতো। কখনো সোজা, কখনো বাঁক নেয়।”
রাহাত তাকিয়ে রইল তার চোখে। “আর কখনো কখনো দুটো ট্রেন পাশাপাশি চলে, তারপর আলাদা হয়ে যায়।”
আয়েশার গাল লাল হয়ে গেল। সে জানালার বাইরে তাকাল। বাইরে অন্ধকার মাঠ, দূরে কোনো গ্রামের আলো।
মাঝরাতে ট্রেন একটা স্টেশনে থামল। অনেকে নেমে গেল। কোচটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু দুজন। রাহাত উঠে দরজা বন্ধ করে দিল। “এখন একটু শান্তি।”
আয়েশা তার দিকে তাকাল। “আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগছে। ঢাকায় কেউ নেই তো?”
রাহাত মাথা নাড়ল। “না। একা।”
আয়েশা তার হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। “আমিও।”
সেই স্পর্শে রাহাতের শরীরে একটা শিহরণ। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। ট্রেনের মৃদু দোলায় তাদের হৃদয় দুলছিল। রাহাত আয়েশার হাতটা ধরে রাখল। আয়েশা সরিয়ে নিল না।
“আপনি খুব সুন্দর,” রাহাত ফিসফিস করে বলল।
আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করল। কিন্তু তার ঠোঁটে হাসি। “আপনিও।”
রাহাত সাহস করে তার কাঁধে হাত রাখল। আয়েশা তার বুকে মাথা রাখল। ট্রেন চলছিল। বাইরে হাওয়া বইছে। দুজনের শরীর একসাথে উষ্ণ হয়ে উঠল। রাহাত আয়েশার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আয়েশা চোখ বন্ধ করে উপভোগ করল।
“এটা কি স্বপ্ন?” আয়েশা জিজ্ঞাসা করল।
“না, বাস্তব। ট্রেনের বাস্তব।”
রাহাত তার ঠোঁটে আলতো চুমু দিল। আয়েশা প্রথমে চমকে উঠল, তারপর সাড়া দিল। চুমুটা গভীর হলো। তাদের হাত একে অপরের শরীরে ঘুরতে লাগল। রাহাত আয়েশার কোমর জড়িয়ে ধরল। আয়েশা তার বুকে হাত রাখল। ট্রেনের দোলায় তাদের শরীর দুলছিল।
আয়েশা ফিসফিস করে বলল, “আমি কখনো এমন করিনি... কিন্তু আপনার সাথে ভালো লাগছে।”
রাহাত তার কানে বলল, “আমিও। তুমি আমার জীবনের প্রথম সত্যিকারের রোমান্স।”
তাদের আলিঙ্গন আরও ঘনিষ্ঠ হলো। রাহাত আয়েশার সালোয়ারের উপর দিয়ে তার পিঠে হাত বুলাল। আয়েশা শিউরে উঠল। তারা আবার চুমু খেল। এবার আরও আবেগে। রাহাতের হাত আয়েশার বুকে চলে গেল। আয়েশা নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, “আস্তে...”
কিন্তু তার শরীর বলছিল অন্য কথা। ট্রেনের অন্ধকার কোচে দুজন এক হয়ে গেল। রাহাত আয়েশাকে তার কোলে টেনে নিল। তাদের শরীর মিলেমিশে একাকার। আয়েশার নরম ঠোঁট, তার উষ্ণ শ্বাস, রাহাতের শক্ত বাহু—সবকিছু মিলে এক অপূর্ব সুর তৈরি করল।
ঘণ্টাখানেক পর তারা ক্লান্ত হয়ে একে অপরের কোলে শুয়ে রইল। আয়েশা রাহাতের বুকে হাত রেখে বলল, “এটা কি ভুল?”
রাহাত তার চুলে চুমু খেয়ে বলল, “না। এটা ভাগ্য।”
ট্রেন চট্টগ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে। ভোর হচ্ছে। আয়েশা উঠে বসল। তার চুল এলোমেলো, গাল লাল। রাহাত তাকে সাহায্য করল সাজতে।
“চট্টগ্রামে নেমে আমরা কী করব?” আয়েশা জিজ্ঞাসা করল।
রাহাত হাসল। “প্রথমে তোমাকে তোমার বাসায় পৌঁছে দিব। তারপর দেখা যাবে।”
আয়েশা তার হাত ধরল। “আমি চাই তুমি আমার সাথে থাকো কয়েকদিন। মা-বাবা নেই এখন।”
রাহাত অবাক হয়ে তাকাল। “সত্যি?”
“হ্যাঁ। এই ট্রেন যাত্রা আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে।”
ট্রেন চট্টগ্রাম স্টেশনে থামল। দুজনে হাত ধরে নামল। সকালের আলোয় তাদের মুখে হাসি। রাহাতের মা ফোন করলেন। সে বলল, “মা, আমি একটু দেরি করে যাব। একজনের সাথে দেখা করতে হবে।”
আয়েশা হাসল। তারা ট্যাক্সি নিয়ে আয়েশার বাসার দিকে রওনা হলো।
আয়েশার বাসা সমুদ্রের কাছাকাছি একটা ছোট ফ্ল্যাট। দুজনে ঢুকল। আয়েশা দরজা বন্ধ করে রাহাতকে জড়িয়ে ধরল। “এখন আর ভয় নেই।”
তারা আবার মিলিত হলো। এবার আর ট্রেনের তাড়াহুড়ো নয়। ধীরে, আবেগে। আয়েশার শরীর রাহাতের হাতে ফুলের মতো ফুটে উঠল। রাহাত তার প্রতিটা অংশ চুমু খেল। আয়েশা আর্তনাদ করে উঠল আনন্দে। তাদের শরীর এক হয়ে গেল। ঘাম, নিঃশ্বাস, চুমু—সব মিলে এক অমর স্মৃতি।
দিনগুলো কাটতে লাগল। সকালে সমুদ্রের ধারে হাঁটা, বিকেলে পাহাড়ে, রাতে একে অপরের কোলে। আয়েশা রান্না করত, রাহাত তার সাথে হাত লাগাত। তারা গল্প করত, হাসত, চুমু খেত।
একদিন আয়েশা বলল, “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
রাহাত তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমিও তোমাকে। এই ট্রেন যাত্রা আমার জীবনের সেরা যাত্রা।”
তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিল।
ঢাকায় তাদের ছোট সংসার। আয়েশা এখন ঢাকায় চাকরি করে। রাহাতের সাথে প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম যায়। তাদের প্রথম সন্তান আসছে। রাতে বিছানায় শুয়ে তারা সেই ট্রেনের কথা বলে।
“মনে আছে সেই রাতের কথা?” আয়েশা হাসে।
রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরে। “কখনো ভুলব না। তুমি আমার হৃদয়ের এক্সপ্রেস।”
....