চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল সেই রাতটা, আর তার চোখ দুটোয় তাকিয়ে আমার হৃদয়টা যেন হারিয়ে গেল অনন্ত নীলিমায়।
ঢাকার একটা ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, আরিফ। রাত দুটো বাজে। চারপাশে নীরবতা। শুধু দূরের রাস্তায় কোনো একটা গাড়ির হর্নের আওয়াজ মাঝে মাঝে ভেসে আসছিল। আমার হাতে এক কাপ কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পাশের বাসার ছাদ থেকে একটা মেয়ের নরম গানের সুর ভেসে এল। “তুমি যে আমার...” — সেই গানটা শুনে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
আমি মুখ তুলে তাকালাম। ছাদের রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। চাঁদের আলো তার মুখে পড়ে যেন রূপকথার পরী বানিয়ে দিয়েছে। লম্বা চুল, সাদা সালোয়ার কামিজ, আর চোখ দুটো... আহা, সেই চোখে যেন পুরো আকাশটা ধরা আছে। তার নাম ছিল নাফিসা। আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে। দুই বছর ধরে দেখছি, কিন্তু কখনো এত কাছ থেকে দেখিনি।
“কে?” — সে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।
“আমি... আরিফ। পাশের বাড়ির।”
সে হাসল। সেই হাসিতে যেন ফুল ফুটে উঠল রাতের অন্ধকারে। “জানি। তুমি রাত জেগে লেখো, না?”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “তুমি জানো কী করে?”
“ছাদ থেকে তোমার ঘরের আলো দেখা যায়। আর কখনো কখনো কীবোর্ডের শব্দও।”
সেই রাত থেকে আমাদের কথা শুরু। প্রথমে ছাদে ছাদে, তারপর ফোনে, তারপর একদিন চিঠিতে। হ্যাঁ, চিঠি। আমি পুরনো দিনের মানুষ। নাফিসা বলত, “তোমার চিঠিগুলো পড়লে মনে হয় সময় থেমে গেছে।”
দিন যায়। ঢাকার বর্ষা নামে। আমরা দুজন মিরপুরের একটা ছোট ক্যাফেতে বসে চা খাই। তার হাতটা আমার হাতের উপর রাখে। “আরিফ, তুমি কখনো ভয় পাও না?”
“কীসের?”
“এই ভালোবাসার। আমাদের পরিবার... তুমি জানো তো আমার বাবা খুব কড়া।”
আমি তার চোখে তাকিয়ে বলি, “ভয় পেলে তো ভালোবাসাই হয় না, নাফিসা।”
সে লজ্জায় মাথা নিচু করে। তার গালে লাল আভা। বৃষ্টির ফোঁটা জানালা দিয়ে পড়ছে। আমরা দুজন চুপ করে বসে থাকি। শুধু হাতে হাত। সেই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীটা যেন আমাদের দুজনের জন্যই থেমে গেছে।
কয়েক মাস পর। আমি একটা ছোট চাকরি করি সফটওয়্যার কোম্পানিতে। নাফিসা পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি সাহিত্য। সে প্রায়ই বলে, “তোমার লেখাগুলো আমাকে পড়াও। আমি তোমার মিউজ হয়ে যাব।”
একদিন আমরা সোনারগাঁওয়ের দিকে বেড়াতে গেলাম। বাসে করে। তার মাথাটা আমার কাঁধে। বাসের জানালা দিয়ে বাইরের সবুজ মাঠ দেখতে দেখতে সে ফিসফিস করে বলল, “আরিফ, আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারি না।”
আমার বুকটা ভরে গেল। আমি তার কপালে আলতো করে চুমু খেলাম। কেউ দেখেনি। কিন্তু আমাদের দুজনের জগতে সেই মুহূর্তটা ছিল সবচেয়ে বড়।
কিন্তু ভালোবাসার পথ কখনো সোজা হয় না। নাফিসার বাবা জানতে পারলেন। একদিন সন্ধ্যায় তিনি আমার বাবার কাছে এসে বললেন, “তোমার ছেলে আমার মেয়ের পিছনে ঘুরছে। এটা চলবে না। আমরা ভিন্ন সমাজের।”
আমার বাবা চুপ করে রইলেন। কিন্তু আমি ছাড়লাম না। রাতে নাফিসাকে ফোন করে বললাম, “আমরা পালিয়ে যাব।”
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “না আরিফ। আমি তোমাকে হারাতে চাই না। কিন্তু বাবাকে কষ্ট দিতে চাই না।”
সেই রাতটা আমি কাঁদলাম। প্রথমবারের মতো। কিন্তু পরের দিন সকালে নাফিসা আমাকে একটা চিঠি পাঠাল। “আজ রাতে ছাদে আসো। আমি অপেক্ষা করব।”
রাত এল। ছাদে গিয়ে দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে জল। কিন্তু ঠোঁটে হাসি। “আরিফ, আমি বাবার সাথে কথা বলেছি। বলেছি যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তিনি রাজি হয়েছেন... শর্তে।”
“কী শর্ত?”
“তুমি যদি একটা ভালো চাকরি করো, আর আমাদের বাড়ির সম্মান রাখো, তাহলে...”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। চাঁদের আলো আমাদের দুজনকে ঢেকে দিল। সেই রাতে আমরা প্রথমবার একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়েছিলাম। নরম, মধুর, অনন্তকালের মতো। তার ঠোঁটে ছিল বৃষ্টির স্বাদ আর ফুলের গন্ধ।
সময় এগোতে থাকে। আমি চাকরিতে প্রমোশন পেলাম। নাফিসা তার পড়াশোনা শেষ করল। আমরা বিয়ে করলাম। ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান। শুধু কাছের মানুষজন। তার বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “দেখো বাবা, মেয়েটাকে কষ্ট দিও না।”
আমি মাথা নিচু করে বললাম, “কখনো না, আব্বু।”
বিয়ের পর আমরা একটা ছোট ফ্ল্যাট নিলাম মিরপুরে। সকালে নাফিসা চা বানায়, আমি তার পেছনে দাঁড়িয়ে তার কানে কানে বলি, “তুমি ছাড়া এই জীবন অসম্পূর্ণ।” সে লজ্জায় হাসে।
কিন্তু জীবন শুধু মধু দিয়ে তৈরি নয়। একদিন নাফিসা অসুস্থ হয়ে পড়ল। জ্বর। ডাক্তার বললেন, “টাইফয়েড।” আমি সারারাত তার মাথায় পানি দিলাম। তার হাত ধরে বসে রইলাম। সে দুর্বল গলায় বলল, “আরিফ, তুমি যদি না থাকতে...”
“চুপ করো। তুমি ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের অনেক স্বপ্ন আছে।”
সে সুস্থ হয়ে উঠল। তারপর একদিন সে আমাকে বলল, “আমি মা হতে চাই।”
নয় মাস পর। হাসপাতালের বেডে নাফিসা আমার হাত চেপে ধরে আছে। তার কপালে ঘাম। ডাক্তার বললেন, “একটা মেয়ে।” আমি কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে কোলে নিলাম। নাফিসা হাসল। “নাম রাখব আয়েশা।”
আমাদের ছোট্ট সংসার। আয়েশা বড় হতে থাকে। সে যখন প্রথম “আব্বু” বলে ডাকে, নাফিসা আর আমি দুজনেই কেঁদে ফেলি। ছুটির দিনগুলোতে আমরা তিনজন সাভারের দিকে বেড়াতে যাই। আয়েশা ফুল তুলে আনে, নাফিসা তার মাথায় পরিয়ে দেয়। আমি দুজনকে দেখে ভাবি — এটাই তো স্বর্গ।
বছর গড়ায়। আমরা বুড়ো হতে থাকি। কিন্তু প্রেমটা একই থাকে। রাতে ছাদে বসে আমরা চাঁদ দেখি। নাফিসা আমার কাঁধে মাথা রাখে। “আরিফ, সেই প্রথম রাতটা মনে আছে?”
“কোন রাত?”
“যেদিন প্রথম তোমার সাথে কথা হয়েছিল। চাঁদের আলোয়।”
আমি তার চুলে হাত বুলাই। “সেই রাত থেকেই তো আমি তোমার হয়ে গিয়েছিলাম।”
একদিন নাফিসা অসুস্থ হয়ে পড়ল। বয়স হয়েছে। ডাক্তার বললেন, “হার্টের সমস্যা।” আমি তার পাশে বসে তার হাত ধরে থাকি। আয়েশা এসে কাঁদে। নাফিসা দুর্বল হাতে আমার গাল ছুঁয়ে বলে, “কাঁদো না। আমি তো সবসময় তোমার সাথে থাকব। চাঁদের আলোয়।”
সেই রাতে সে চলে গেল। চাঁদটা সেই রাতেও উজ্জ্বল ছিল। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম। আয়েশা আমাকে জড়িয়ে ধরল। “আব্বু, আম্মু তো আকাশে আছে।”
বছর কেটে যায়। আমি এখনো সেই ছাদে বসি। চিঠি লিখি নাফিসাকে। যদিও সে আর পড়তে পারে না। কিন্তু আমি জানি, সে পড়ে। চাঁদের আলোয়।
একদিন আয়েশা একটা ছেলেকে নিয়ে এল। “আব্বু, এ হলো রাহাত। আমি ওকে ভালোবাসি।”
আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। তার চোখে সেই একই আলো। আমি হাসলাম। “ভালোবাসো। কিন্তু কখনো ছেড়ে দিও না।”
রাতে আমি একা বসে চাঁদ দেখি। নাফিসার কথা মনে পড়ে। “তুমি দেখো, আমাদের মেয়েও তোমার মতোই সাহসী।”
চাঁদটা হাসে। যেন নাফিসাই হাসছে।
আমার জীবনটা শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু প্রেমটা কখনো শেষ হয় না। সেই প্রথম রাতের চাঁদের আলো আজও আমার বুকে জ্বলছে।
....