লাল গোলাপের প্রতিশ্রুতি

রাহাত কলেজ থেকে ফিরছিল। তার বয়স ২২। সাধারণ একটা ছেলে — পড়াশোনা করে, ছবি আঁকে, আর একা একা সময় কাটায়। আজ তার জন্মদিন। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। মা-বাবা গ্রামের বাড়িতে। বন্ধুরা সবাই নিজেদের জগতে ব্যস্ত।

kxz

রাস্তার একটা ছোট ফুলের দোকান থেকে সে একটা সুন্দর লাল গোলাপ কিনল। নিজের জন্য। “আজ অন্তত একটা ফুল পেলাম,” মনে মনে হাসল সে।

হঠাৎ আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। রাহাত দৌড়ে একটা বড় বটগাছের নিচে আশ্রয় নিল। সেখানে ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল একটি মেয়ে। সাদা সালোয়ার কামিজ, লম্বা চুল ভিজে কপালে লেপটে আছে। তার হাতে একটা পুরনো উপন্যাস। চোখ দুটো যেন বৃষ্টির মতোই স্বচ্ছ।

kx/춺'

তাদের চোখাচোখি হলো। মেয়েটি হালকা হাসল।

“বৃষ্টি তো অনেকক্ষণ ধরে আসছে,” রাহাত বলল।

“হ্যাঁ। আমি আয়েশা। তোমাকে কলেজে দেখেছি। ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট, তাই না?”

রাহাত অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ। আমি রাহাত।”

কথা শুরু হলো। বৃষ্টির শব্দের মাঝে তাদের কথা মিশে যাচ্ছিল। আয়েশা বলল সে লেখিকা হতে চায়। ছোট ছোট গল্প লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে। রাহাত বলল সে ছবি আঁকে, বিশেষ করে প্রকৃতি আর মানুষের আবেগ।

রাহাতের পকেট থেকে লাল গোলাপের একটা পাপড়ি বেরিয়ে পড়ল। আয়েশা দেখে ফেলল।

“ফুলটা কার জন্য?”

রাহাত লজ্জা পেয়ে বলল, “আজ আমার জন্মদিন। নিজেকেই দিয়েছি।”

আয়েশার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট চকলেট বের করে দিল।

“শুভ জন্মদিন, রাহাত। আজ থেকে আমিও তোমার জন্মদিন মনে রাখব।”

সেই মুহূর্তে রাহাতের হৃদয়ে একটা নতুন অনুভূতি জেগে উঠল। সে গোলাপটা আয়েশার হাতে তুলে দিল।

“এটা তোমার। আজ তুমিই আমার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে দিলে।”

আয়েশা ফুলটা নিয়ে গন্ধ শুঁকল। তার গালে হালকা লাল আভা। বৃষ্টি থামলে তারা একসাথে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরল। সারা পথ তাদের কথা শেষই হচ্ছিল না।

প্রথম দেখা থেকে প্রেম

পরের দিন কলেজে দেখা হলো আবার। আয়েশা তার ডায়েরিতে সেই লাল গোলাপের একটা পাপড়ি রেখে দিয়েছিল। তারা লাইব্রেরিতে একসাথে বসে পড়তে শুরু করল। রাহাত তাকে তার আঁকা একটা ছবি দেখাল — একটা ফুল যার পাপড়িতে আয়েশার মুখটা মিশে আছে।

আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করল। “এটা কি আমি?”

“হ্যাঁ। তোমাকে দেখে মনে হয়েছে তুমি একটা ফুল। যেটা প্রতিদিন নতুন করে ফোটে।”

তারপর থেকে তাদের প্রতিদিন দেখা হতো। কখনো নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখত, কখনো ছোট চায়ের দোকানে বসে গল্প করত। রাহাত প্রতিবার একটা করে ফুল নিয়ে আসত। কখনো গোলাপ, কখনো চামেলি, কখনো বনফুল।

একদিন বিকেলে তারা পুরনো একটা বাগানে গেল। আয়েশা বলল, “রাহাত, আমার বাবা খুব কড়া। তিনি জানলে খুব রাগ করবেন।”

রাহাত তার হাত ধরে বলল, “আমি অপেক্ষা করব। যতদিন লাগে। শুধু তুমি আমার পাশে থাকো।”

সেই বাগানে প্রথমবার তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। আয়েশার মাথা রাহাতের বুকে। তার হৃদস্পন্দন শুনতে শুনতে আয়েশা ফিসফিস করে বলল, “তোমার ভালোবাসা আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে।”

সংঘাত ও দূরত্ব

কিন্তু সুখ সবসময় স্থায়ী হয় না। আয়েশার বাবা একদিন তাদের দেখে ফেললেন। তিনি খুব রেগে গেলেন। আয়েশাকে বাড়িতে আটকে রাখলেন। ফোন বন্ধ করে দিলেন।

রাহাত পাগলের মতো হয়ে গেল। প্রতিদিন আয়েশাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেত। একদিন আয়েশা জানালা দিয়ে দেখল। রাহাত হাতে লাল গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কাগজে লিখে জানালা দিয়ে ফেলে দিল — “আমি অপেক্ষা করছি।”

আয়েশা চিঠিটা পড়ে কাঁদল। সে তার বাবার সাথে অনেক কথা বলল। বলল, “বাবা, রাহাত আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে। সে প্রতিদিন ফুল দিয়ে আমার দিনগুলোকে সুন্দর করে।”

বাবা প্রথমে রাজি হলেন না। কিন্তু রাহাত একদিন সাহস করে তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“স্যার, আমি আয়েশাকে শুধু ভালোবাসি না, তাকে সম্মান করি। আমি তাকে সুখী করতে চাই।”

আয়েশার বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ফুল সুন্দর, কিন্তু টেকে না। তোমার ভালোবাসা যদি টেকে, তাহলে দেখা যাবে।”

তারপর থেকে তারা আবার দেখা করার অনুমতি পেল। কিন্তু শর্ত ছিল — বিয়ে করতে হবে।

বিয়ে ও নতুন জীবন

দুই বছর পর তারা বিয়ে করল। সাধারণ একটা অনুষ্ঠান। আয়েশা তার সালোয়ারে লাল গোলাপের ডিজাইন করেছিল। রাহাত তাকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ দিয়ে বরণ করল।

বিয়ের পর তাদের ছোট্ট একটা ঘর। রাহাত চাকরি পেল একটা স্কুলে আর্ট টিচার হিসেবে। আয়েশা লিখতে শুরু করল। তার প্রথম বইয়ের নাম ছিল “ফুলের প্রতিশ্রুতি”।

প্রতি সকালে রাহাত আয়েশার বালিশের পাশে একটা ফুল রেখে দিত। আয়েশা ঘুম থেকে উঠে ফুলটা দেখে হাসত। তারা অনেক স্বপ্ন দেখত — একটা সুন্দর বাড়ি, সন্তান, একসাথে বুড়ো হওয়া।

কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না। আয়েশা গর্ভবতী হলো। কিন্তু জটিলতা দেখা দিল। ডাক্তার বললেন ঝুঁকি আছে। রাহাত সারারাত তার পাশে বসে থাকত। তার হাত ধরে বলত, “তুমি আর আমাদের বাচ্চা দুজনেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমাদের জন্য লড়ব।”

অবশেষে একটা সুন্দর মেয়ে হলো। নাম রাখলেন “গোলাপি”।

চিরকালের প্রতিশ্রুতি

বছর গড়িয়ে গেল। গোলাপি বড় হলো। আয়েশা তার বই লিখে সফল হলো। কিন্তু একদিন আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ডাক্তার বললেন, ক্যান্সার। সময় বেশি নেই।

রাহাত ভেঙে পড়ল। কিন্তু আয়েশার সামনে হাসত। প্রতিদিন তার জন্য ফুল নিয়ে আসত। হাসপাতালের বেডে বসে তার হাত ধরে গল্প বলত। তাদের প্রথম দেখার কথা, বৃষ্টির দিনের কথা, প্রথম চুমুর কথা।

একদিন আয়েশা দুর্বল গলায় বলল, “রাহাত, আমি চলে গেলে তুমি কাঁদবে না। আমাদের মেয়েকে সামলাবে। আর প্রতি বছর আমার জন্মদিনে একটা লাল গোলাপ আমার কবরে দিও।”

রাহাত কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি চলে গেলে আমি আর ফুল কিনব না। কারণ তুমিই আমার সবচেয়ে সুন্দর ফুল।”

আয়েশা চলে গেল। কিন্তু তার চলে যাওয়ার আগে শেষবার হেসে বলল, “আমি তোমার বুকের ভিতর চিরকাল ফুটে থাকব।”

রাহাত একা হয়ে গেল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রাখল। প্রতি বছর আয়েশার জন্মদিনে আর তাদের প্রথম দেখার দিনে কবরে লাল গোলাপ দিত। গোলাপিকে সব গল্প শোনাত।

বছরের পর বছর কেটে গেল। রাহাত বুড়ো হয়ে গেল। একদিন সে আয়েশার কবরের পাশে বসে শেষ নিঃশ্বাস নিল। তার হাতে ছিল একটা লাল গোলাপ।

লোকে বলে, এখনো প্রতি বছর সেই কবরের দুই পাশে দুটো লাল গোলাপ ফুটে ওঠে। যেন রাহাত আর আয়েশা এখনো একে অপরের পাশে আছে। তাদের ভালোবাসা কখনো শুকিয়ে যায়নি।

শেষ

....
👁 644