প্রেমের প্রথম ছায়া

বটগাছের নিচে যখন প্রথমবার তোমার চোখে চোখ পড়লো, তখন মনে হলো যেন বসন্তের প্রথম ফুলটি ফুটে উঠেছে আমার বুকের ভিতর।

kxz

গ্রামের পুরনো বটগাছটা ছিল আমাদের গুরতে গ্রামের হৃদয়। তার বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে যেন আকাশকে জড়িয়ে ধরতো। নিচে ঘন ছায়া, চারপাশে সবুজ ঘাস আর দূরে নদীর কলকল শব্দ। সেই ছায়ায় বসে আমি প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় একটা পুরনো বই নিয়ে বসতাম। কিন্তু সেদিন বইয়ের পাতায় চোখ ছিল না। কারণ সে এসেছিল।

তার নাম আসেসে। গ্রামের অন্য প্রান্তের মেয়ে। চোখ দুটো যেন দুটো তারা, আর হাসিটা ছিল নরম বাতাসের মতো। সে একটা সাদা শাড়ি পরে, চুল খোলা, হাতে একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে বটগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমি নাম রাহাত। গ্রামের সাধারণ একটা ছেলে, যে শহরের কলেজে পড়ে কিন্তু ছুটিতে গ্রামে ফিরে আসে।

kx/춺'

“দাদা, এখানে বসলে কি অসুবিধা হবে?” তার কণ্ঠস্বর ছিল মিষ্টি ঘণ্টার মতো।

আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “না না, একদম না। বসো। এই বটগাছ তো সবার।”

সে লজ্জায় একটু হাসলো। তারপর আমার থেকে কিছুটা দূরে ঘাসের ওপর বসলো। সেই মুহূর্ত থেকেই আমার হৃদয়ের ছন্দ বদলে গেল। কথা বলতে বলতে আমরা জানতে পারলাম, সে তার দাদুর জন্য কিছু ঔষধি পাতা খুঁজতে এসেছে। আর আমি? আমি শুধু তার কথা শুনছিলাম। তার গল্প, তার স্বপ্ন, তার গ্রামের ছোট ছোট আনন্দের কথা।

সেদিন সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত আমরা কথা বললাম। যখন সে উঠে চলে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ বললো, “কাল আবার আসবো। যদি তুমি থাকো…”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “অবশ্যই থাকবো।”

এভাবেই শুরু হলো আমাদের গল্প। প্রতি সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে দেখা হতো। কখনো সে তার পড়াশোনার গল্প বলতো, কখনো আমি শহরের অভিজ্ঞতা শোনাতাম। কখনো আমরা চুপ করে শুধু নদীর শব্দ শুনতাম। তার চোখে চোখ রাখলেই মনে হতো পৃথিবীর সব সৌন্দর্য এক জায়গায় জড়ো হয়েছে।

একদিন বৃষ্টি এলো। আমরা দুজনেই ভিজে গেলাম, কিন্তু বটগাছের ঘন পাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে হাসতে হাসতে বললাম, “বৃষ্টিও আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে।” সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো, “রাহাত, তোমার সাথে কথা বলতে খুব ভালো লাগে।”

সেই দিন থেকে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে থাকলো। আমি তার জন্য ছোট ছোট উপহার নিয়ে আসতাম — কখনো একটা ফুল, কখনো একটা বইয়ের পাতা যেখানে তার পছন্দের কবিতা লেখা। সে আমার জন্য রান্না করে আনতো — তার হাতের মিষ্টি পায়েস আর লুচি। আমরা বটগাছের নিচে বসে খেতাম, আর হাসতাম।

গ্রামের মানুষজন ধীরে ধীরে টের পাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের প্রেম ছিল এতটাই নির্মল যে কেউ কিছু বলতো না। শুধু তার দাদু একদিন আমাকে ডেকে বলেছিলেন, “বাবা, আসেসেকে সুখে রাখিস। ওর হৃদয়টা খুব নরম।”

আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।

দিনগুলো যত যাচ্ছিল, আমাদের ভালোবাসা তত গভীর হচ্ছিল। এক সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে বসে সে আমার হাত ধরলো। তার হাতটা ঠান্ডা, কিন্তু স্পর্শটা ছিল আগুনের মতো উষ্ণ। “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি,” ফিসফিস করে বললো সে।

আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। “আমিও তোমাকে ভালোবাসি, আসেসে। অনেক অনেক বেশি। তুমি না থাকলে এই বটগাছও শুকিয়ে যাবে আমার কাছে।”

আমরা পরিকল্পনা করলাম ভবিষ্যতের। আমি শহরে চাকরি করবো, সে পড়াশোনা শেষ করবে। তারপর একসাথে থাকবো। কিন্তু জীবন তো সবসময় সোজা পথে চলে না।

একদিন খবর এলো যে আসেসের বাবা তাকে অন্য গ্রামে বিয়ে দিতে চান। সে কান্নায় ভেঙে পড়লো বটগাছের নিচে। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “কিছু হবে না। আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলবো।”

সেই রাতে আমি তার বাড়িতে গেলাম। তার বাবা প্রথমে রাগ করলেন, কিন্তু যখন আমাদের ভালোবাসার গল্প শুনলেন, আর দেখলেন আসেসে কতটা কষ্ট পাচ্ছে, তখন তিনি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, “যদি তোরা সত্যি করে ভালোবাসিস, তাহলে আমি বাধা দিব না।”

সেই দিনটা ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন। বটগাছের নিচে আমরা দুজন বসে স্বপ্ন দেখছিলাম। সূর্য ডুবছিল, নদীতে সোনালি আলো পড়ছিল, আর আমরা হাত ধরে হাসছিলাম।

সময় যত এগোতে লাগলো, আমাদের প্রেম আরও পাকা হতে থাকলো। আমরা একসাথে গ্রামের উৎসবে গেলাম, একসাথে বৃষ্টিতে ভিজলাম, একসাথে চাঁদের আলোয় হাঁটলাম। আসেসে আমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে সত্যিকারের ভালোবাসা হয় — শুধু কথায় নয়, কাজে, বিশ্বাসে, আর ছোট ছোট যত্নে।

এক বছর পর আমরা বিয়ে করলাম। বটগাছের নিচেই আমাদের ছোট অনুষ্ঠান হলো। গ্রামের সবাই এসেছিল। সেই বটগাছটা যেন আমাদের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

আজও, অনেক বছর পর, আমরা দুজন সেই বটগাছের নিচে বসি। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখের ভালোবাসা একটুও কমেনি। আসেসে আমার কাঁধে মাথা রেখে বলে, “রাহাত, তুমি না থাকলে এই জীবনটা অসম্পূর্ণ থাকতো।”

আমি তার চুলে হাত বুলিয়ে বলি, “তুমি আমার জীবনের প্রথম আর শেষ আলো, আসেসে।”

আর বটগাছটা নীরবে দাঁড়িয়ে আমাদের গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকে।

....
👁 330