আমার মামা—মানে আমার চাচীর স্বামী—জোর করে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন একজন গরিব শ্রমিকের সঙ্গে। অথচ আমার জন্য আগে থেকেই একজন “নিখুঁত পাত্র” ছিল, যে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা উপার্জন করত।
আমি ভেবেছিলাম, আমার জীবন বুঝি সেখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ের পরদিন সকালে যখন আমি শুধু দুইশো টাকা চেয়েছিলাম একটু সবজি কেনার জন্য… তখন মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার স্বামী এমন কিছু করলেন, যা আমাকে পুরো উঠোনের মাঝখানে হতবাক করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
সেই সাধারণ শ্রমিকের আসল পরিচয় আর সম্পদের পরিমাণ আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।
কাঁচা মাটির ঘরের ধুলোমাখা বাতাসে সকালের রোদ চিকচিক করছিল। চারদিকে এখনও চুন আর সিমেন্টের তীব্র গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। আমি—সিমরান—চুপচাপ খাটের এক কোণে বসে ছিলাম। সারারাত কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গিয়েছিল।
দেয়ালের সঙ্গে ঝুলে থাকা সস্তা বিয়ের শাড়িটার দিকে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম। শাড়িটা একটা ভাঙা প্লাস্টিকের হুকে ঝুলছিল, যেন সেটাও আমার ভাগ্যের মতো ভাঙাচোরা।
আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, শুধু আমার মামার লোভের কারণে আমার জীবন এতটা অন্ধকার মোড় নিয়েছে।
আমার মামা হাফিজুর রহমান বাইরে থেকে খুব ধার্মিক আর ভদ্র মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। মানুষ তাকে সম্মান করত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন ভীষণ স্বার্থপর আর কৌশলী।
তিনিই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন মিস্টার ইয়াসিনের সঙ্গে।
ইয়াসিনকে সবাই একজন সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবেই চিনত। তার হাত সবসময় খসখসে থাকত, নখের কোণায় সিমেন্ট জমে থাকত। কাপড়ে চুনের সাদা দাগ লেগে থাকত সবসময়।
মানুষের চোখে এই বিয়েটা ছিল অপমানের মতো। যেন অবাধ্য এক অনাথ মেয়েকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বিয়ের আগের রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে মামা সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া আমার মুখের সামনে ছেড়ে বলেছিলেন,
“তোমার নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করা উচিত, সিমরান। ইয়াসিন অন্তত পরিশ্রম করে খায়। তোমাকে না খাইয়ে রাখবে না। আর যদি তোমার বিয়ে আরিয়ানের সঙ্গে দিতাম, তাহলে ওই ছেলেটার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যেত তোমার মতো জেদি মেয়ের কারণে।”
আমি কোনো উত্তর দিইনি।
শুধু মাথা নিচু করে আমার ওড়নাটা এত শক্ত করে চেপে ধরেছিলাম যে আঙুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল।
আরিয়ান ছিল সেই মানুষ, যাকে আমি মনে মনে অনেকদিন ধরে পছন্দ করতাম। শহরের বড় কোম্পানিতে চাকরি করত, পরিপাটি পোশাক পরত, ভদ্রভাবে কথা বলত। এমন ছেলে অনেক মেয়েরই স্বপ্ন।
কিন্তু মামা সরাসরি সেই সম্পর্ক বাতিল করে দেন।
বাইরে তিনি বলেছিলেন,
“ওদের পরিবার ভালো না।”
কিন্তু আসল কারণ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
মিস্টার ইয়াসিন মামার পুরোনো ভাড়াবাড়িটা বিনা টাকায় সংস্কার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর সেই লোভেই মামা আমার জীবন নিয়ে এমন নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বিয়েটা হয়েছিল অদ্ভুত নীরবতার মধ্যে।
না ছিল কোনো আনন্দ, না কোনো হাসি, না আত্মীয়স্বজনের উচ্ছ্বাস। শুধু আশেপাশের মানুষের ফিসফিসানি কানে আসছিল।
“আহারে মেয়েটার কপাল!”
“এত সুন্দর আর শিক্ষিত মেয়ে, শেষমেশ এক রাজমিস্ত্রির ঘরে গেল!”
কথাগুলো আমার বুকের ভেতর সুঁইয়ের মতো বিঁধছিল।
আমি একবার চোখ তুলে মিস্টার ইয়াসিনের দিকে তাকিয়েছিলাম।
তিনি চুপচাপ বসে ছিলেন। মুখে কোনো হাসি ছিল না, কোনো অনুভূতিও না। যেন এই বিয়ে নিয়ে তার ভেতরে কোনো আগ্রহই নেই।
পরদিন সকাল।
ঘুম ভাঙতেই মনে হলো, আমি যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জীবনে এসে পড়েছি।
ছোট্ট টিনের ঘর। পুরোনো কাঠের টেবিল। মাথার ওপরে ঝনঝন শব্দ করা ভাঙা ফ্যান। রান্নাঘরের কোণে কয়েকটা খালি হাঁড়ি।
চারদিকে শুধু অভাবের ছাপ।
আমার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
আমি ধীরে ধীরে নিজের ব্যাগ খুললাম। ভেতরে একটাও টাকা নেই।
বিয়ের সময় আমার জমানো সামান্য টাকাগুলোও মামা নিয়ে নিয়েছিলেন।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মিস্টার ইয়াসিন। পুরোনো একটা শার্ট পরে মাথায় গামছা বাঁধছিলেন তিনি।
আমি অনেকক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমার গলা কাঁপছিল।
“শুনছেন…”
তিনি মুখ তুলে তাকালেন।
তার চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু গভীর।
আমি চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে বললাম,
“আমাকে… দুইশো টাকা দিতে পারবেন? ঘরে কোনো বাজার নেই। একটু সবজি কিনতাম… সকালের আর দুপুরের রান্নার জন্য…”
কথাগুলো বলতে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছিল।
আমি ভয় পাচ্ছিলাম, তিনি হয়তো রেগে যাবেন। কারণ কোনো গরিব শ্রমিকই কি নতুন বউয়ের মুখে বিয়ের পরদিনই টাকার কথা শুনে খুশি হয়?
কিন্তু মিস্টার ইয়াসিন সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না।
তিনি হাত থামিয়ে কপালের ঘাম মুছে কয়েক সেকেন্ড ধরে স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখের গভীরতা দেখে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
আমি একটুও বুঝতে পারিনি, পরের পাঁচ মিনিট আমার পুরো জীবন আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে চলেছে। মিস্টার ইয়াসিন কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টির ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তভাব ছিল, কিন্তু সেই শান্তির নিচে যেন অনেক অজানা গল্প লুকিয়ে আছে।
আমি অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ফেললাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো আমি খুব বড় কোনো ভুল করে ফেলেছি। বিয়ের পরদিনই টাকা চাওয়া কোনো স্বামীর ভালো লাগার কথা নয়। বিশেষ করে এমন একজন মানুষের, যাকে সবাই দিনমজুর বলে জানে।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “থাক… দরকার নেই। আমি কোনোভাবে সামলে নেব।”
কথাটা বলেই ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই পেছন থেকে শান্ত গলায় তিনি বললেন, “তুমি কি শুধু দুইশো টাকাই চেয়েছো?”
আমি থেমে গেলাম।
তার কণ্ঠে রাগ ছিল না। বরং এমন এক স্বর, যেন তিনি সত্যিই অবাক হয়েছেন।
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম। “জি…”
তিনি আর কিছু না বলে পকেট থেকে একটা পুরোনো বাটন ফোন বের করলেন। ফোনটার স্ক্রিনে অনেক আঁচড় ছিল। সাধারণ শ্রমিকদের মতোই সস্তা একটা ফোন।
আমি ভাবলাম, হয়তো তিনি কোনো সহকর্মীকে ফোন করবেন ধার চাওয়ার জন্য।
কিন্তু পরের ঘটনাটা আমাকে হতবাক করে দিল।
তিনি খুব শান্তভাবে ফোনে একটা নম্বর ডায়াল করলেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, “পাঁচ মিনিটের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আসো।”
ওপাশ থেকে কী বলা হলো, আমি শুনতে পেলাম না। শুধু দেখলাম, ইয়াসিন ছোট্ট করে বললেন, “হ্যাঁ, এখনই।”
তারপর ফোন কেটে তিনি আবার গামছাটা কাঁধে রাখলেন।
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
“কি নিয়ে আসবে?” সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
তিনি সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, “যা দরকার।”
আমি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালাম। এই ছোট্ট ঘরে কী এমন দরকার থাকতে পারে?
কিন্তু তার মুখে এমন এক নিশ্চিন্ত ভাব ছিল, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুর অভাব তার নেই।
ঠিক পাঁচ মিনিটও যায়নি।
হঠাৎ বাইরে কয়েকটা গাড়ির শব্দ ভেসে এলো।
আমি চমকে উঠলাম।
এই ভাঙাচোরা গলিতে সাধারণত রিকশা ছাড়া কিছু ঢোকে না। সেখানে একসঙ্গে এতগুলো গাড়ির শব্দ শুনে আমি দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।
তারপর যা দেখলাম, সেটা দেখে আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
আমাদের ছোট্ট উঠোনের সামনে তিনটা বড় গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে।
একটা কালো মাইক্রোবাস। একটা পিকআপ। আর একটা চকচকে সাদা প্রাইভেট কার।
পাড়ার মানুষজন মুহূর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
পিকআপ থেকে কয়েকজন লোক দ্রুত নেমে এল। সবার গায়ে পরিষ্কার ইউনিফর্ম। আচরণ এত ভদ্র আর নিয়ন্ত্রিত যে তাদের শ্রমিক বলে মনে হচ্ছিল না।
একজন মধ্যবয়স্ক লোক দৌড়ে এসে মিস্টার ইয়াসিনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
“স্যার, দেরি হয়নি তো?”
স্যার?
শব্দটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি অবিশ্বাস নিয়ে লোকটার দিকে তাকালাম। সে স্পষ্টভাবেই মিস্টার ইয়াসিনকে সম্মান করছে। শুধু সম্মান নয়… যেন ভয়ও পাচ্ছে।
ইয়াসিন শান্ত স্বরে বললেন, “সব নামিয়ে রাখো।”
তারপর একের পর এক জিনিস নামতে শুরু করল।
চালের বস্তা। ডালের প্যাকেট। বড় বড় মাছ। মাংস। তেল। ফল। সবজি। এমনকি নতুন ফ্রিজ আর রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার পর্যন্ত।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
পুরো উঠোন মুহূর্তের মধ্যে বাজারে ভরে গেল।
পাশের বাড়ির রেহানা খালা ফিসফিস করে বললেন, “এই রাজমিস্ত্রির এত টাকা কই থেকে আসল?”
আরেকজন বলল, “এই লোকটা আসলে কে?”
আমার নিজের মাথাও ঘুরছিল।
আমি ধীরে ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম। তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন এসব তার জন্য একদম সাধারণ ব্যাপার।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “এগুলো…?”
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বললেন, “তুমি তো বলেছিলে ঘরে বাজার নেই।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“কিন্তু… এত কিছু কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই সেই মধ্যবয়স্ক লোকটা একটা কালো ব্যাগ এনে ইয়াসিনের হাতে দিল।
ইয়াসিন ব্যাগটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“ধরো।”
আমি কাঁপা হাতে ব্যাগটা নিলাম।
ভেতর খুলতেই আমার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
ভেতরে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা।
আমি প্রায় হাঁপিয়ে উঠলাম। “এগুলো…?”
ইয়াসিন খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “সংসারের জন্য। যা দরকার হবে খরচ করবে।”
আমার মাথা কাজ করছিল না।
একজন সাধারণ শ্রমিকের কাছে এত টাকা কীভাবে সম্ভব?
আমি অস্ফুট স্বরে বললাম, “আপনি… আসলে কে?”
এই প্রথম তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও যেন একরাশ ক্লান্তি ছিল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “মানুষ সাধারণত যা দেখে, সত্যি সবসময় তা হয় না, সিমরান।”
আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।
ঠিক তখনই সাদা গাড়িটা থেকে আরেকজন নেমে এল। পরিপাটি স্যুট পরা একজন যুবক।
সে দ্রুত এসে সম্মানের সঙ্গে বলল, “স্যার, আজ দুপুরে বোর্ড মিটিং আছে। সবাই অপেক্ষা করছে।”
আমি মনে করলাম, হয়তো ভুল জায়গায় এসেছে।
কিন্তু ইয়াসিন বিরক্ত গলায় বললেন, “আজ না। মিটিং ক্যানসেল করো।”
লোকটা মাথা নিচু করে বলল, “জি স্যার।”
আমার হাত থেকে প্রায় ব্যাগ পড়ে যাচ্ছিল।
বোর্ড মিটিং?
স্যার?
এই মানুষটা তাহলে সত্যিই কে?
আমার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেল।
আমি মনে করতে লাগলাম, বিয়ের আগে মানুষ তাকে কীভাবে অপমান করত। মামা পর্যন্ত তাকে “গরিব রাজমিস্ত্রি” বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।
তাহলে সবটাই মিথ্যা?
কিন্তু কেন?
কেন একজন এত ধনী মানুষ নিজেকে শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দেবে?
আমার ভেতরে একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
ইয়াসিন এবার ধীরে ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এলেন।
তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে অনেক নরম।
“তুমি ভয় পাচ্ছ?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।”
তার কথার ভেতরে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা আমাকে আরও বিভ্রান্ত করে দিল।
ঠিক তখনই বাইরে হৈচৈ শুরু হলো।
আমি দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, আমার মামা হাফিজুর রহমান দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে উঠোনে ঢুকছেন।
তার মুখে বিস্ময় আর আতঙ্ক মিশে আছে।
চারপাশে এত গাড়ি আর মানুষ দেখে তিনি থমকে গেলেন।
“এইসব কী?” তিনি কাঁপা গলায় বললেন।
পাড়ার লোকজন তখন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মিস্টার ইয়াসিন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
তার চোখের শান্তভাবটা হঠাৎ বদলে গেল।
সেই চোখে এবার ঠান্ডা কঠোরতা।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি তো বলেছিলেন, আমি শুধু একজন গরিব শ্রমিক।”
মামার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে।
ইয়াসিন আবার বললেন, “এখনও কি তাই মনে হয়?”
উঠোনজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
আমার মামা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে স্যুট পরা লোকটা সামনে এসে সম্মান নিয়ে বলল, “স্যার, মিডিয়ার লোকেরা বাইরে অপেক্ষা করছে। আপনার নতুন প্রজেক্ট নিয়ে সবাই জানতে চাইছে।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
মিডিয়া?
প্রজেক্ট?
আমি যেন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম… এই মানুষটা কোনো সাধারণ শ্রমিক নন।
আর আমার মামা সম্ভবত ভয়ংকর বড় একটা ভুল করে ফেলেছেন। উঠোনজুড়ে এমন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, যেন কেউ হঠাৎ পুরো পৃথিবীর শব্দ থামিয়ে দিয়েছে। শুধু দূরে একটা কাক ডাকছিল আর টিনের চালের ওপর হালকা বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাত এখনও সেই কালো ব্যাগটা শক্ত করে ধরে আছে। ভেতরে থাকা টাকার ওজনের চেয়ে তখন অনেক বেশি ভারী লাগছিল পরিস্থিতিটা।
মামা হাফিজুর রহমানের চোখ এদিক-ওদিক ঘুরছিল। তিনি একবার গাড়িগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন, একবার স্যুট পরা লোকগুলোর দিকে, আর একবার মিস্টার ইয়াসিনের দিকে।
তার চেহারায় এমন আতঙ্ক আমি আগে কখনও দেখিনি।
মিস্টার ইয়াসিন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু এখন তার ভেতর থেকে অন্যরকম একটা ব্যক্তিত্ব বেরিয়ে আসছিল। সেই সাধারণ শ্রমিকের ভঙ্গিটা কোথাও নেই। যেন এতক্ষণ তিনি শুধু একটা মুখোশ পরে ছিলেন।
স্যুট পরা যুবকটা আবার মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, সাংবাদিকরা রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি তাদের ফিরিয়ে দেব?”
ইয়াসিন এক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, “কেউ যেন বাড়ির ভেতরে না আসে। আর আমার স্ত্রীর কোনো ছবি কেউ তুলবে না।”
স্ত্রী।
শব্দটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেন। অথচ গতকাল পর্যন্ত এই মানুষটার সঙ্গে আমার প্রায় কোনো কথাই হয়নি।
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “জি স্যার।”
তারপর ফোন বের করে দ্রুত কয়েকজনকে নির্দেশ দিতে লাগল।
মামা কাঁপা গলায় বললেন, “ইয়াসিন… ব্যাপারটা আসলে কী?”
ইয়াসিন এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।
তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটল। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে উষ্ণতার চেয়ে ঠান্ডা ব্যঙ্গ বেশি ছিল।
“আপনি তো আমাকে খুব ভালো করেই চিনতেন, তাই না?”
মামা চুপ।
পাশের বাড়ির মানুষজন ফিসফিস করতে শুরু করেছে।
“এই লোকটা তাহলে বড়লোক নাকি?”
“তাইলে এতদিন রাজমিস্ত্রির কাজ করত কেন?”
“আহারে হাফিজুর! মনে হয় বড় ফাঁদে পড়ছে!”
আমি দেখলাম মামার মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
হঠাৎ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসি দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
“সিমরান মা… দেখছিস তো? আমি বলেছিলাম, ইয়াসিন ভালো মানুষ।”
আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকালাম।
এই মানুষটাই তো গতকাল পর্যন্ত ইয়াসিনকে অপমান করছিলেন। এখন হঠাৎ এত মিষ্টি কথা?
আমার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভটা হঠাৎ জেগে উঠল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আপনি তো বলেছিলেন উনি শুধু গরিব শ্রমিক।”
মামা গলা কাঁপিয়ে বললেন, “আরে মা… আমি কি আর সব জানতাম?”
ঠিক তখনই ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “আপনি অনেক কিছুই জানতেন।”
মামা থেমে গেলেন।
ইয়াসিন এবার কয়েক পা এগিয়ে এলেন।
তার চোখদুটো ভয়ংকর ঠান্ডা হয়ে গেছে।
“আপনি জানতেন আমি কে। জানতেন আমার কত সম্পদ। এমনকি এটাও জানতেন, আমি ইচ্ছে করেই সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করি।”
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
মামা এবার স্পষ্ট কাঁপতে শুরু করলেন।
“না… মানে…”
ইয়াসিন তাকে থামিয়ে দিলেন।
“আপনি শুধু একটা জিনিস জানতেন না।”
চারপাশে সবাই নিঃশব্দ।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমি মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করতে ভালোবাসি।”
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন শূন্য হয়ে গেল।
মনে হলো, আমি যেন এই মানুষটাকে একদমই চিনি না।
ইয়াসিন আবার বললেন, “আপনি ভেবেছিলেন, আমি সাধারণ শ্রমিক বলে আমাকে ব্যবহার করা সহজ হবে। বাড়ি সংস্কারের লোভ দেখিয়ে আপনি নিজের ভাগ্নির জীবন নিয়ে ব্যবসা করেছেন।”
মামা তাড়াতাড়ি বললেন, “না না! ব্যাপারটা সেরকম না!”
“তাহলে কেমন?” ইয়াসিনের কণ্ঠ এবার আরও নিচু, কিন্তু আরও বিপজ্জনক।
মামা উত্তর দিতে পারলেন না।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা স্মৃতি ঘুরছিল।
মামা কীভাবে আমার কথা না শুনেই বিয়ে ঠিক করেছিলেন।
কীভাবে আমার কান্নাকে “মেয়েদের নাটক” বলেছিলেন।
কীভাবে তিনি বলেছিলেন, “তোর মতো মেয়েকে এর চেয়ে ভালো কেউ নেবে না।”
আমার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এতদিন আমি শুধু প্রতারিতই হইনি… আমাকে ইচ্ছা করে অপমানও করা হয়েছে।
ঠিক তখনই রাস্তার মাথায় হৈচৈ শুরু হলো।
কয়েকজন সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে ফ্ল্যাশের আলো দেখা যাচ্ছে।
পাড়ার মানুষজন আরও ভিড় করতে শুরু করেছে।
স্যুট পরা যুবকটা এসে নিচু গলায় বলল, “স্যার, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে।”
ইয়াসিন শান্তভাবে বললেন, “সবাইকে চলে যেতে বলো।”
“জি স্যার।”
তারপর লোকগুলো দ্রুত কাজ শুরু করল। আশ্চর্যের বিষয়, সবাই ইয়াসিনের কথা নিঃশর্তভাবে মেনে চলছে।
আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম।
একজন সাধারণ শ্রমিকের প্রতি কেউ এভাবে আচরণ করে না।
আমার কৌতূহল আর চেপে রাখা গেল না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আপনি আসলে কী করেন?”
ইয়াসিন আমার দিকে তাকালেন।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “নির্মাণ ব্যবসা।”
আমি অবিশ্বাস নিয়ে বললাম, “শুধু ব্যবসা করলে এত মানুষ আপনাকে ‘স্যার’ বলে?”
তিনি হালকা হাসলেন।
“ব্যবসাটা একটু বড়।”
ঠিক তখনই স্যুট পরা যুবকটা সম্মানের সঙ্গে একটা ফাইল এগিয়ে দিল।
“স্যার, সাইনটা দরকার।”
ইয়াসিন খুব স্বাভাবিকভাবে ফাইল খুলে সাইন করলেন।
আমি চোখের কোণ দিয়ে ফাইলটার ওপর লেখা নাম পড়ে ফেললাম।
“ইয়াসিন রহমান গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
এই নাম আমি আগে শুনেছি।
টিভিতে। পত্রিকায়। বড় বড় বিলবোর্ডে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় নির্মাণ কোম্পানি।
আমি হতভম্ব হয়ে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
না… এটা হতে পারে না।
একজন এত বড় ব্যবসায়ী কেন টিনের ঘরে থাকবেন? কেন শ্রমিকের মতো পোশাক পরবেন?
আমার মাথা ঘুরছিল।
ইয়াসিন যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন।
তিনি শান্ত স্বরে বললেন, “আমি ছোটবেলায় খুব গরিব ছিলাম।”
সবাই চুপ হয়ে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “আমার বাবা সত্যিকারের রাজমিস্ত্রি ছিলেন। ছোটবেলায় আমি তার সঙ্গে কাজ করেছি। মানুষের বাড়ি বানিয়েছি। রোদে পুড়েছি। না খেয়ে থেকেছি।”
তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। বরং এমন এক বাস্তবতা ছিল, যা শুনে শরীর কেঁপে ওঠে।
“যেদিন প্রথম বড় টাকা কামাই করি, সেদিন আমি নিজেকে একটা কথা দিয়েছিলাম… কখনও নিজের অতীত ভুলব না।”
আমি স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তিনি আবার বললেন, “তাই মাঝে মাঝে আমি সাধারণ শ্রমিকের মতো মানুষের মাঝে থাকি। কে মানুষকে সম্মান করে আর কে শুধু টাকার সম্মান করে… সেটা বুঝতে সুবিধা হয়।”
তার কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।
কারণ আমি নিজেও তো প্রথমে তাকে অবহেলা করেছিলাম।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি আমার জীবনের দুর্ভাগ্য।
হঠাৎ নিজের ওপর ভীষণ লজ্জা লাগতে শুরু করল।
ঠিক তখনই মামা হঠাৎ কৃত্রিম হাসি দিয়ে বললেন, “দেখলেন তো! আমি জানতাম ইয়াসিন অনেক ভালো ছেলে। তাই তো সিমরানের সঙ্গে বিয়ে দিলাম।”
আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকালাম।
এই মানুষটার লজ্জা বলে কিছু নেই?
ইয়াসিন এবার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেলেন।
“আপনি নিশ্চিত?”
মামা জোর করে হাসলেন। “অবশ্যই!”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “তাহলে আপনার ফোনটা বের করুন।”
মামা থমকে গেলেন।
“কেন?”
“বের করুন।”
তার কণ্ঠ এত ঠান্ডা ছিল যে আশেপাশের সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।
মামা কাঁপা হাতে ফোন বের করলেন।
ইয়াসিন পাশে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকালেন। “অডিওটা চালাও।”
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোনে একটা রেকর্ড চালু করল।
পরের মুহূর্তেই উঠোনে মামার কণ্ঠ ভেসে উঠল।
“সিমরানকে ওই রাজমিস্ত্রির ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে আমার বাড়িটার কাজ ফ্রি হয়ে যাবে। মেয়েটার এত অহংকার, একটু কষ্ট না পেলে মানুষ হবে না।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
পাশের মানুষজন হতভম্ব।
মামার মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।
“না… এটা মিথ্যা!”
কিন্তু রেকর্ড থামল না।
আরও শোনা গেল, “আরিয়ানের মতো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলে লাভ কী? ওরা তো আমাকে এক টাকাও দেবে না!”
চারপাশে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল।
“ছিঃ ছিঃ!”
“নিজের ভাগ্নির জীবন নিয়ে ব্যবসা করেছে!”
আমি অনুভব করলাম, আমার হাত কাঁপছে।
এতদিন যার ওপর ভরসা করেছি, সেই মানুষটা আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে প্রায়।
আমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই ইয়াসিন ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
তার কণ্ঠ এবার আগের চেয়ে অনেক নরম।
“কাঁদছ কেন?”
আমি ঠোঁট কামড়ে চোখ মুছলাম। “আমি… কাউকে চিনতে পারিনি।”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “সব মানুষকে প্রথম দেখায় চেনা যায় না, সিমরান।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
এই মানুষটা রহস্যে ভরা।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে… তার পাশে দাঁড়িয়ে আমার নিরাপদ লাগছিল।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে থামল উঠোনের সামনে।
গাড়ি থেকে নেমে এল পরিচিত একজন মানুষ।
আমার বুক ধক করে উঠল।
আরিয়ান।
সে দ্রুত এগিয়ে এসে অবাক চোখে চারপাশ দেখল।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সিমরান… তুমি ঠিক আছো?”
আমি কিছু বলার আগেই তার চোখ গিয়ে থামল ইয়াসিনের ওপর।
দুজনের চোখাচোখি হতেই আশেপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
কারণ আরিয়ানের চোখে আমি স্পষ্ট চিনতে পারলাম… বিস্ময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ও আছে।
আর তখনই আমার মনে হলো…
আরিয়ান সম্ভবত ইয়াসিনকে আগে থেকেই চিনত। আরিয়ানের চোখে সেই অদ্ভুত ভয়টা আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। যেন সে এমন কাউকে সামনে দেখছে, যাকে সে অনেক আগে থেকেই চেনে… আর যার সম্পর্কে এমন কিছু জানে, যা আমরা কেউ জানি না।
উঠোনজুড়ে তখনও চাপা গুঞ্জন চলছে। পাড়ার মানুষজন একটু দূরে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে সবকিছু দেখছে। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ আবার অবিশ্বাস নিয়ে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিয়ান ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল।
তার চোখ একবার আমার দিকে গেল, তারপর স্থির হয়ে থামল মিস্টার ইয়াসিনের মুখে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
শেষ পর্যন্ত আরিয়ানই নিচু গলায় বলল, “আপনি… এখানে?”
ইয়াসিনের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটল।
“তোমার মনে হচ্ছে, আমার এখানে থাকার কথা না?”
আরিয়ান উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছিল। সে স্পষ্ট অস্বস্তিতে পড়েছে।
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম।
আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। এমন একটা ইতিহাস, যার কিছুই আমি জানি না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “তোমরা… একে অপরকে চেনো?” আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে তাকাল। তারপর চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “হ্যাঁ। অনেকদিনের পরিচয়।”
আমার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল।
আরিয়ান শুকনো গলায় বলল, “আমি আসলে… সিমরানের সঙ্গে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
ইয়াসিন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেই দৃষ্টির মধ্যে রাগ ছিল না, কিন্তু এমন এক চাপা শক্তি ছিল, যা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
কয়েক সেকেন্ড পর তিনি শান্ত স্বরে বললেন, “কথা বলতে পারো।”
আমি অবাক হলাম।
আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো বাধা দেবেন। কিন্তু তিনি একটুও উত্তেজিত হলেন না।
বরং এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আরিয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “একটু বাইরে আসবে?”
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
চারপাশের এত মানুষের সামনে কথা বলতে অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু ইয়াসিনের দিকে তাকাতেই তিনি খুব আস্তে মাথা নাড়লেন।
আমি ধীরে ধীরে আরিয়ানের সঙ্গে উঠোনের একপাশে চলে গেলাম।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি তখনও আমাদের ওপর।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তুমি ঠিক আছো?”
আমি ঠোঁট কামড়ে বললাম, “তোমার কী মনে হয়?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি জানতাম না ব্যাপারটা এতদূর যাবে।”
আমি কষ্ট মেশানো হাসি দিলাম। “কোন ব্যাপারটা? আমার জীবনটা এভাবে বদলে যাওয়া?”
আরিয়ান মাথা নিচু করল।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি কি আগে থেকেই ইয়াসিনকে চিনতে?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “চিনতাম।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কীভাবে?”
আরিয়ান একবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিনের দিকে তাকাল। ইয়াসিন তখনও স্থিরভাবে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “তুমি যাকে সাধারণ শ্রমিক ভাবছো… তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একজন।”
আমি ধীরে বললাম, “সেটা তো এখন বুঝতেই পারছি। কিন্তু তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?”
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
তার মুখে এমন এক অস্বস্তি ফুটে উঠল, যেন সে এমন একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছে, যা বলা উচিত না।
আমি এবার একটু জোর দিয়ে বললাম, “সত্যিটা বলো, আরিয়ান।”
সে গভীর শ্বাস নিল।
“আমি আগে ইয়াসিন রহমান গ্রুপে চাকরি করতাম।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম।
“কি?”
“হ্যাঁ। পাঁচ বছর আগে আমি তাদের কোম্পানিতে জুনিয়র অফিসার ছিলাম।”
আমার মাথার ভেতর যেন শব্দ হচ্ছিল।
আরিয়ান আবার বলল, “তখনই প্রথম আমি উনাকে দেখি। কিন্তু উনি সাধারণ মালিকদের মতো না।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, “মানে?”
সে নিচু গলায় বলল, “উনি মানুষকে পরীক্ষা করেন।”
এই একই কথা কিছুক্ষণ আগে ইয়াসিনও বলেছিলেন।
আমার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
আরিয়ান আবার বলতে শুরু করল, “কোম্পানিতে অনেক বড় বড় কর্মকর্তা ছিল। সবাই ইয়াসিন স্যারের সামনে ভদ্র আচরণ করত। কিন্তু একদিন উনি সাধারণ কর্মচারীর পোশাক পরে অফিসে আসেন।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
“কেউ চিনতে পারেনি। বরং অনেকে তাকে অপমান করেছিল। তখন উনি শুধু চুপচাপ দেখেছিলেন কে কেমন আচরণ করে।”
আমি ধীরে বললাম, “তারপর?”
আরিয়ান তিক্ত হাসল।
“পরদিন পুরো অফিস বদলে গিয়েছিল।”
তার চোখে অদ্ভুত একটা ভয় ফুটে উঠল।
“যারা ছোট মানুষ ভেবে অপমান করেছিল, তারা সবাই চাকরি হারায়। আর যারা সম্মান দিয়েছিল, তাদের পদোন্নতি হয়।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, ইয়াসিন আসলে কেমন মানুষ।
তিনি শুধু ধনী নন… মানুষের ভেতরটা পড়তে জানেন।
ঠিক তখনই পেছন থেকে শান্ত গলা ভেসে এলো।
“আমার সম্পর্কে এত গল্প হচ্ছে?”
আমি চমকে ঘুরে তাকালাম।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
তার মুখে হালকা হাসি, কিন্তু চোখে সেই গভীরতা।
আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
আমি প্রথমবার খেয়াল করলাম, আরিয়ান সত্যিই তাকে ভয় পায়।
ইয়াসিন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “আরিয়ান, তোমার নতুন চাকরিটা কেমন চলছে?”
আরিয়ান অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি জানেন?”
“আমি অনেক কিছুই জানি।”
তার গলায় কোনো অহংকার ছিল না। কিন্তু কথাগুলো শুনে আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আরিয়ান শুকনো গলায় বলল, “ভালো চলছে।”
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন, “তুমি এখনও আগের মতোই সৎ আছো তো?”
প্রশ্নটা শুনে আরিয়ানের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালাম।
এদের মাঝে নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো ইতিহাস আছে।
কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটা মোটরবাইক দ্রুত এসে বাড়ির সামনে থামল।
একজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে নেমে এল।
স্যুট পরা লোকগুলোর একজন তাকে থামাতে যাচ্ছিল, কিন্তু লোকটা চিৎকার করে বলল, “স্যার! বড় সমস্যা হয়েছে!”
ইয়াসিনের চোখ সরু হয়ে গেল।
“কি হয়েছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “গুলশানের সাইটে আগুন লেগেছে!”
চারপাশে সবাই চমকে উঠল।
আমি দেখলাম, ইয়াসিনের মুখের শান্তভাব মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
তার চোখ ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“কিভাবে?”
লোকটা গিলল। “কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়েছে বলে সন্দেহ হচ্ছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “কেউ মারা গেছে?”
“না স্যার। কিন্তু ক্ষতি অনেক।”
আমি প্রথমবার তার চোখে চাপা রাগ দেখতে পেলাম।
ভয়ংকর রাগ।
তিনি ধীরে ধীরে ফোন বের করলেন।
তার কণ্ঠ এবার সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
ঠান্ডা। কঠিন। আদেশ দেওয়ার মতো।
“পুরো সাইট সিল করে দাও। কেউ বের হতে পারবে না।”
ওপাশ থেকে কী বলা হলো জানি না।
তিনি আবার বললেন, “আর সিসিটিভি ফুটেজ আমার কাছে পাঠাও। এখনই।”
ফোন কেটে তিনি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি বুঝতে পারছিলাম, তার মাথার ভেতর তখন প্রচণ্ড কিছু চলছে।
ঠিক তখনই আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “স্যার… আপনি কি মনে করেন, ওরা আবার শুরু করেছে?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আমি অনেকদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম।”
আরিয়ান আতঙ্কিত গলায় বলল, “তাহলে সিমরানও বিপদে পড়তে পারে।”
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
“মানে?”
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
কিন্তু ইয়াসিন এবার খুব ধীরে আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে প্রথমবার স্পষ্ট উদ্বেগ দেখলাম।
তিনি নিচু গলায় বললেন, “আজ থেকে তুমি কখনও একা কোথাও যাবে না।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কেন?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটার কাঁচ ধীরে ধীরে নামল।
ভেতরে বসে থাকা একজন মানুষ দূর থেকে স্থির চোখে আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি লোকটার মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না।
কিন্তু জানি না কেন… তাকে দেখেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আর ঠিক তখনই ইয়াসিনের কণ্ঠ শুনলাম।
খুব নিচু, কিন্তু ভয়ংকর কঠিন।
“ওরা আমাকে খুঁজে পেয়েছে।” “ওরা আমাকে খুঁজে পেয়েছে।”
মিস্টার ইয়াসিনের মুখ থেকে কথাটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। আমি স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখ তখন রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটার দিকে।
গাড়িটার কাঁচ আবার ধীরে ধীরে উঠে গেল।
তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটা শব্দ করে রাস্তা ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গাড়িটা চলে যাওয়ার পরও আমার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা কমল না।
বরং আরও বেড়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “ওরা কারা?”
ইয়াসিন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। কপালের রগগুলো টান টান।
মনে হচ্ছিল, তিনি অনেক পুরোনো কোনো দুঃস্বপ্ন আবার সামনে দেখতে পাচ্ছেন।
আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “স্যার… যদি সত্যিই ওরা হয়, তাহলে দেরি করা ঠিক হবে না।”
ইয়াসিন এবার খুব ধীরে তার দিকে তাকালেন।
“আমি জানি।”
তারপর তিনি পাশের স্যুট পরা লোকটার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
“রফিক, আজ থেকেই সিকিউরিটি ডাবল করো। বাড়ির আশেপাশে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না।”
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “জি স্যার।”
আমি হতবাক হয়ে সব শুনছিলাম।
এই পুরো ব্যাপারটা যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো লাগছিল।
কাল পর্যন্ত যাকে সাধারণ রাজমিস্ত্রি ভাবতাম, আজ তার চারপাশে নিরাপত্তা, শত্রু, বড় ব্যবসা, ষড়যন্ত্র—সবকিছু ঘুরছে।
আমার মাথা কাজ করছিল না।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কি কোনো বিপদে আছেন?”
ইয়াসিন এবার আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখের কঠিনভাবটা হঠাৎ একটু নরম হয়ে এলো।
“আমি বিপদে থাকলে সমস্যা না।”
তিনি থামলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “কিন্তু তোমার কোনো ক্ষতি হোক, সেটা আমি চাই না।”
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
এই মানুষটা এত রহস্যময়, এত কঠিন… অথচ তার কথার ভেতরে এমন এক নিরাপত্তা আছে, যা আমাকে অজান্তেই শান্ত করে দেয়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে মামার কণ্ঠ ভেসে এলো।
“এইসব ঝামেলার মধ্যে আমার ভাগ্নিকে জড়ানোর দরকার কী?”
আমি ঘুরে তাকালাম।
মামা এখনও উঠোনেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আগের সেই আত্মবিশ্বাসী ভাব আর নেই। বরং মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।
“আপনি এখনও এখানে?”
মামা গলা খাঁকারি দিলেন। “আমি তো শুধু সিমরানের ভালো চাই।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর জমে থাকা রাগ আবার জেগে উঠল।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, “আমার ভালো?”
মামা একটু থমকে গেলেন।
আমি এবার সামনে এগিয়ে এলাম।
“আপনি কখনও আমার ভালো চাননি। যদি চাইতেন, তাহলে আমার জীবন নিয়ে ব্যবসা করতেন না।”
চারপাশের মানুষজন আবার ফিসফিস করতে শুরু করল।
মামা বিব্রত মুখে বললেন, “সিমরান, তুই ভুল বুঝছিস।”
আমি তিক্ত হাসলাম। “না মামা। এতদিন ভুল বুঝেছিলাম। এখন ঠিক বুঝতে পারছি।”
তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
ঠিক তখনই ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “আপনি এখন যেতে পারেন।”
কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হলেও এর ভেতরে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে মামা আর কিছু বলার সাহস পেলেন না।
তিনি শুধু আমার দিকে একবার তাকালেন। তারপর দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমি তাকিয়ে দেখলাম, পাড়ার মানুষজনও তার দিকে কেমন ঘৃণার চোখে তাকাচ্ছে।
একসময় যাকে সবাই সম্মান করত, আজ সেই মানুষটাই সবার সামনে অপমানিত হয়ে চলে গেল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে… আমার একটুও খারাপ লাগল না।
বরং বুকের ভেতর জমে থাকা একটা ভার যেন একটু হালকা হলো।
ঠিক তখনই ইয়াসিন নিচু গলায় বললেন, “তুমি ভেতরে যাও।”
আমি তার দিকে তাকালাম। “আর আপনি?”
“আমার কিছু কাজ আছে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, তিনি সেই আগুনের ঘটনার কথা বলছেন।
কিন্তু জানি না কেন, তাকে একা যেতে দিতে ইচ্ছে করছিল না।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কি সত্যিই ঠিক আছেন?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
“তুমি আমার জন্য চিন্তা করছ?”
আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
“না… মানে…”
তিনি ছোট্ট করে হেসে বললেন, “চিন্তা করো না। আমি এসবের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই লড়ছি।”
তার কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন যেন টনটন করে উঠল।
কত বড় জীবন কাটিয়েছেন এই মানুষটা?
কত কষ্ট দেখেছেন?
আমি বুঝতে পারছিলাম, তার ভেতরে এমন অনেক গল্প আছে, যা এখনও আমার অজানা।
ঠিক তখনই আরিয়ান ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
“সিমরান, তোমার সঙ্গে একটু আলাদা কথা ছিল।”
আমি তাকালাম।
ইয়াসিনও চুপচাপ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমি ধীরে বললাম, “কি কথা?”
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তুমি কি সত্যিই এই বিয়ে মেনে নিতে পারবে?”
প্রশ্নটা শুনে আমি থমকে গেলাম।
সে আবার বলল, “তুমি তো অন্য জীবন চেয়েছিলে। স্বাভাবিক জীবন।”
আমি কিছু বললাম না।
কারণ সত্যি বলতে, আমি নিজেও জানতাম না আমার অনুভূতি কী।
কাল পর্যন্ত আমি ইয়াসিনকে ঘৃণা করতাম।
আজ তাকে বুঝতে শুরু করেছি।
আর এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমার পুরো পৃথিবী বদলে গেছে।
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি দেরি করে ফেলেছি, তাই না?”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
সে তিক্ত হাসল। “আমি যদি আগে বুঝতাম তোমার মামা কী করছে… তাহলে হয়তো সব বদলে দিতে পারতাম।”
আমি নিচু গলায় বললাম, “এখন এসব বলে লাভ কী?”
সে উত্তর দিল না।
ঠিক তখনই ইয়াসিন ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
তার মুখে কোনো রাগ নেই। কিন্তু অদ্ভুত এক স্থিরতা আছে।
তিনি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “তুমি এখনও সিমরানকে পছন্দ করো?”
আমার বুক ধক করে উঠল।
আরিয়ানও চমকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।
শেষ পর্যন্ত আরিয়ান ধীরে মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ।”
চারপাশের বাতাস যেন মুহূর্তে জমে গেল।
আমি হতভম্ব হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি।
কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো… ইয়াসিন একটুও রাগলেন না।
তিনি শুধু শান্তভাবে বললেন, “সৎ উত্তর দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
আরিয়ান এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
“কিন্তু আমি কখনও সিমরানের ক্ষতি চাইনি।”
ইয়াসিন মাথা নাড়লেন। “আমি জানি।”
আমি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।
এই দুই মানুষের সম্পর্ক আসলে কী?
তাদের কথাবার্তার ভেতরে এমন একটা বোঝাপড়া আছে, যা সাধারণ না।
ঠিক তখনই ইয়াসিন বললেন, “আরিয়ান, তুমি কি এখনও আমাকে বিশ্বাস করো?”
আরিয়ান এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
“হ্যাঁ স্যার।”
ইয়াসিন ধীরে বললেন, “তাহলে আজ রাত থেকে সিমরানের নিরাপত্তার দায়িত্ব তোমার।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “কি?”
আরিয়ানও চমকে উঠল। “স্যার?”
ইয়াসিন এবার গম্ভীর গলায় বললেন, “ওরা যদি সত্যিই ফিরে এসে থাকে, তাহলে আমার কাছের মানুষদের টার্গেট করবে।”
আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আমার জন্য এত বিপদ কেন হবে?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “কারণ তুমি এখন আমার দুর্বলতা।”
কথাটা শুনে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সেই চোখে এবার কোনো রহস্য ছিল না।
ছিল শুধু সত্যি।
আমি প্রথমবার অনুভব করলাম… এই মানুষটা সত্যিই আমাকে নিয়ে ভাবছে।
ঠিক তখনই ইয়াসিনের ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন কানে দিতেই ওপাশ থেকে কারও আতঙ্কিত গলা ভেসে এলো।
“স্যার! আমরা ফুটেজ পেয়েছি!”
ইয়াসিনের চোখ সরু হয়ে গেল। “কে করেছে?”
ওপাশের কথা শুনে তার মুখ মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে তিনি খুব নিচু গলায় বললেন, “আমি আসছি।”
ফোন কেটে তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি বুঝতে পারছিলাম, কিছু একটা ভয়ংকর হয়েছে।
আমি ধীরে বললাম, “কি হয়েছে?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “আগুনটা দুর্ঘটনা ছিল না।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“তাহলে?”
তিনি খুব ধীরে বললেন, “ফুটেজে যে মানুষটাকে দেখা গেছে… সে পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।”
আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আরিয়ান আতঙ্কিত চোখে ফিসফিস করে বলল, “অসম্ভব…”
কিন্তু ইয়াসিনের চোখে আমি বুঝতে পারলাম… তিনি জানেন এটা অসম্ভব না।
আর ঠিক তখনই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
পুরো উঠোন অন্ধকারে ডুবে গেল।
চারপাশে মানুষজন চমকে উঠল।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
অন্ধকারের মাঝখানে হঠাৎ খুব কাছে কারও ফিসফিস গলা শুনলাম।
“মিস্টার ইয়াসিন… এবার আপনার পালা।”
আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে পুরো উঠোনে হঠাৎ হইচই শুরু হয়ে গেল।
অন্ধকারের ভেতর মানুষজন দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাচ্ছে, কেউ আবার ভয়ে চিৎকার করছে।
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত আমার কবজি ধরে ফেলল।
আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম।
পরের মুহূর্তেই পরিচিত গলা শুনলাম।
“সিমরান, আমি।”
মিস্টার ইয়াসিন।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে তার শার্ট শক্ত করে চেপে ধরলাম। অন্ধকারের মধ্যেও অনুভব করতে পারছিলাম, তিনি একদম স্থির হয়ে আছেন।
যেন এই ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি আগেও বহুবার লড়েছেন।
কয়েক সেকেন্ড পর চারপাশে কয়েকটা শক্তিশালী টর্চ জ্বলে উঠল।
ইয়াসিনের লোকজন দ্রুত পুরো উঠোন ঘিরে ফেলেছে।
রফিক চিৎকার করে বলল, “সবাই সাবধান! কেউ বাইরে যাবে না!”
আমি এখনও কাঁপছিলাম।
ইয়াসিন খুব নিচু গলায় বললেন, “ভয় পেও না। আমি আছি।”
তার কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরের আতঙ্কটা একটু কমল।
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ আবার ফিরে এলো।
চারপাশ আলোয় ভরে উঠতেই সবাই দ্রুত এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করল।
কিন্তু আশেপাশে সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেল না।
যেন অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটাও মিলিয়ে গেছে।
রফিক এসে বলল, “স্যার, পুরো এলাকা চেক করেছি। কাউকে পাওয়া যায়নি।”
ইয়াসিনের চোখ ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“ওরা কাছেই আছে।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। “আপনি এত নিশ্চিত কীভাবে?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “কারণ এই কণ্ঠ আমি আগে শুনেছি।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কে সে?”
ইয়াসিন উত্তর দিলেন না।
বরং তিনি স্থির চোখে অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মনে হচ্ছিল, তার মাথার ভেতর অনেক পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসছে।
ঠিক তখনই আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল, “স্যার… তাহলে কি রিয়াজ সত্যিই বেঁচে আছে?”
নামটা শুনেই আমি খেয়াল করলাম, ইয়াসিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
আমি ধীরে বললাম, “রিয়াজ কে?”
ইয়াসিন এবার খুব ধীরে আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যা আমি আগে দেখিনি।
তিনি শান্ত গলায় বললেন, “যে মানুষটা একসময় আমার সবচেয়ে কাছের ছিল।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “আজ থেকে ছয় বছর আগে আমি শুধু ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তখন আমার সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষ ছিল রিয়াজ।”
তিনি থামলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “আমি তাকে ভাইয়ের থেকেও বেশি বিশ্বাস করতাম।”
তার কণ্ঠের ভেতরের কষ্টটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম।
“কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি, সে আমার কোম্পানির টাকা পাচার করছে। শুধু তাই না… আমার ব্যবসা ধ্বংস করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম।
“আমি তাকে থামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে পালিয়ে যায়। তারপর এক রাতে তার গাড়ি পাহাড়ি রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়।”
আরিয়ান নিচু গলায় বলল, “সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে।”
ইয়াসিন ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। আমিও তাই ভেবেছিলাম।”
আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত শীতলতা নেমে এলো।
“তাহলে… সে এখন ফিরে এসেছে?”
ইয়াসিন এবার সরাসরি উত্তর দিলেন।
“হয়তো প্রতিশোধ নিতে।”
চারপাশের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, আমি অজান্তেই খুব বড় একটা যুদ্ধের মাঝে এসে পড়েছি।
ঠিক তখনই ইয়াসিনের ফোন আবার বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে দ্রুত কিছু বলা হলো।
তার মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।
“কি বলছ?”
ওপাশের কথা শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “আমি এখনই আসছি।”
ফোন কেটে তিনি রফিকের দিকে তাকালেন।
“গাড়ি বের করো।”
আমি দ্রুত বললাম, “কি হয়েছে?”
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর নিচু গলায় বললেন, “আমার পুরোনো ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণ হয়েছে।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“কেউ আহত হয়েছে?”
“দুইজন।”
তার গলায় চাপা রাগ স্পষ্ট।
আমি বুঝতে পারছিলাম, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে।
ঠিক তখনই তিনি হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি আমার সঙ্গে যাবে।”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। “আমি?”
“হ্যাঁ।”
আরিয়ান দ্রুত বলল, “স্যার, এটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
ইয়াসিন শান্ত গলায় বললেন, “ওকে একা রেখে যাওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ।”
আমি আর কিছু বললাম না।
কয়েক মিনিট পর আমরা গাড়িতে উঠলাম।
রাতের শহর দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছিল।
গাড়ির ভেতর চাপা নীরবতা।
আমি বারবার ইয়াসিনের দিকে তাকাচ্ছিলাম।
তার মুখ সম্পূর্ণ কঠিন।
চোখদুটো স্থির।
মনে হচ্ছিল, তিনি এখন আর শুধু ব্যবসায়ী নন… যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একজন মানুষ।
হঠাৎ আমি ধীরে বললাম, “আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “নিজের জন্য না।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
তিনি আবার জানালার বাইরে তাকালেন।
“যাদের আমি নিজের মানুষ ভাবি… তাদের হারানোর ভয় পাই।”
কথাটা শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল।
এই মানুষটা কখন যেন আমার হৃদয়ের ভেতরে জায়গা করে ফেলেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
একসময় গাড়ি বিশাল একটা ফ্যাক্টরির সামনে এসে থামল।
চারপাশে আগুনের পোড়া গন্ধ।
দমকলের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
কর্মচারীরা আতঙ্কিত মুখে দৌড়াদৌড়ি করছে।
আমরা নামতেই সবাই সম্মান নিয়ে সরে দাঁড়াল।
“স্যার!”
ইয়াসিন দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেলেন।
আমি তার পেছন পেছন হাঁটছিলাম।
ঠিক তখনই হঠাৎ ওপরের ভাঙা কাঁচের দিক থেকে একটা শব্দ এলো।
আমি মুখ তুলে তাকাতেই দেখলাম, একটা ভারী লোহার পাইপ ওপর থেকে পড়ে আসছে।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে আমি নড়তেও পারলাম না।
ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াসিন ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
ধাম!
পাইপটা আমাদের পাশেই পড়ল।
চারপাশে চিৎকার শুরু হয়ে গেল।
আমি আতঙ্কে কাঁপছিলাম।
ইয়াসিন আমাকে শক্ত করে ধরে আছেন।
তার কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনার রক্ত…”
তিনি যেন সেটা গুরুত্বই দিলেন না।
বরং চারপাশে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, “সব দরজা বন্ধ করো!”
তার কণ্ঠে এমন রাগ ছিল যে সবাই থমকে গেল।
ঠিক তখনই ওপরের ভাঙা অংশে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল।
লোকটা কালো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
“অনেকদিন পর দেখা হলো, ইয়াসিন।”
আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইয়াসিন স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
“রিয়াজ।”
লোকটা হেসে উঠল।
“তুমি এখনও আগের মতোই বুদ্ধিমান।”
আমি অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
রিয়াজের চোখ হঠাৎ আমার দিকে গেল।
“এই মেয়েটার জন্যই তুমি দুর্বল হয়ে গেছো, তাই না?”
ইয়াসিনের চোখ মুহূর্তে ভয়ংকর হয়ে উঠল।
“তার নাম মুখে আনবে না।”
রিয়াজ হেসে বলল, “দেখলে? এটাই তোমার সমস্যা। তুমি মানুষকে ভালোবাসতে শুরু করেছ।”
আমি অনুভব করলাম, ইয়াসিনের হাত আরও শক্ত হয়ে গেছে।
রিয়াজ ধীরে ধীরে বলল, “তোমার সবকিছু ধ্বংস করতে আমি ফিরে এসেছি।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন, “তুমি আগেও হেরেছিলে।”
“না,” রিয়াজ হাসল, “আগে আমি লোভী ছিলাম। এবার আমি শুধু প্রতিশোধ চাই।”
হঠাৎ সে পকেট থেকে একটা রিমোট বের করল।
আমার বুক ধক করে উঠল।
ইয়াসিন গর্জে উঠলেন, “রিয়াজ!”
কিন্তু ততক্ষণে সে বোতামে চাপ দিয়েছে।
পুরো ভবন কেঁপে উঠল।
চারদিকে বিস্ফোরণের শব্দ।
মানুষ চিৎকার করতে লাগল।
আমি আতঙ্কে ইয়াসিনকে জড়িয়ে ধরলাম।
তিনি দ্রুত আমাকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন।
চারপাশে ধোঁয়া আর আগুন।
হঠাৎ একটা ভাঙা অংশ আমাদের সামনে পড়ে রাস্তা আটকে দিল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “আমরা কি বের হতে পারব?”
ইয়াসিন আমার মুখ দুহাতে ধরে বললেন, “আমার দিকে তাকাও।”
আমি কাঁপা চোখে তার দিকে তাকালাম।
তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন, “তুমি কিছু হবে না। আমি থাকতে তোমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।”
জানি না কেন… সেই মুহূর্তে আমি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলাম।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরিয়ানের গলা ভেসে এলো।
“স্যার!”
ইয়াসিন দ্রুত শব্দের দিকে এগোলেন।
কয়েক মিনিটের ভয়ংকর লড়াইয়ের পর আমরা অবশেষে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
আমি হাঁপাচ্ছিলাম।
পেছনে পুরো ফ্যাক্টরি আগুনে জ্বলছে।
পুলিশ এসে গেছে।
চারপাশে বিশৃঙ্খলা।
ঠিক তখনই পুলিশ একজন আহত লোককে ধরে নিয়ে এলো।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম… সে রিয়াজ।
তার পায়ে গুলি লেগেছে।
রিয়াজ রক্তাক্ত মুখে হাসছিল।
সে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি জিতেছো।”
ইয়াসিন ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি কখনও তোমার শত্রু হতে চাইনি।”
রিয়াজ তিক্ত হাসল। “কিন্তু আমি সবসময় তোমার মতো হতে চেয়েছিলাম।”
পুলিশ তাকে নিয়ে চলে গেল।
চারপাশ ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল।
আমি ক্লান্ত শরীরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই ইয়াসিন ধীরে ধীরে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তার কপালের রক্ত এখনও শুকায়নি।
তিনি খুব আস্তে বললেন, “ভয় পেয়েছিলে?”
আমার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
হঠাৎ তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।
“আমি ভেবেছিলাম… আপনাকে হারিয়ে ফেলব।”
কয়েক সেকেন্ড তিনি স্থির হয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমি তার বুকের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
তিনি নিচু গলায় বললেন, “আমি এতদিন শুধু বেঁচে ছিলাম, সিমরান।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
তিনি খুব ধীরে বললেন, “কিন্তু তোমাকে পাওয়ার পর প্রথমবার মনে হচ্ছে… আমি সত্যিই একটা জীবন পেয়েছি।”
আমার চোখ আবার ভিজে উঠল।
দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
নতুন সকাল।
নতুন জীবন।
কয়েক মাস পর…
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
বাতাসে হালকা রোদ।
পেছন থেকে ইয়াসিন এসে শান্তভাবে আমার পাশে দাঁড়ালেন।
তার মুখে আগের সেই কঠিনভাব নেই।
বরং অদ্ভুত প্রশান্তি।
আমি হেসে বললাম, “জানেন, এখনও বিশ্বাস হয় না… আমি সেই গরিব শ্রমিকের স্ত্রী।”
তিনি হেসে ফেললেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “আর আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না… এত কষ্টের পরও কেউ আমাকে ভালোবাসতে পেরেছে।”
আমি তার হাত শক্ত করে ধরলাম।
দূরে আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
আর আমি মনে মনে বুঝলাম…
কিছু মানুষকে প্রথম দেখায় চেনা যায় না।
কারণ তাদের আসল পরিচয় লুকিয়ে থাকে হৃদয়ের গভীরে।
সমাপ্ত।
....