স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমাদের প্রথম রাতে, আমার শাশুড়ি বললেন তিনি এতটাই অসুস্থ বোধ করছেন যে একা ঘুমাতে ভয় লাগছে। তাই বাধ্য হয়েই আমরা আমাদের বাসর রাতের ঘরটা তাকে ছেড়ে দিলাম।
কিন্তু পরদিন সকালে বিছানার চাদরের নিচে যা খুঁজে পেলাম, তা আমাকে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল।
বিয়ের অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজনের ভিড়, দোয়া, খাওয়াদাওয়া আর অসংখ্য কৃত্রিম হাসির পর আমি শুধু একটু শান্তি চাইছিলাম। ভারী লেহেঙ্গা খুলে, গয়নাগুলো নামিয়ে, নিজের স্বামীর পাশে বসে নতুন জীবনের প্রথম রাতটা কাটাতে চাইছিলাম।
আমার নাম রুপালী। আর সেদিন রাতেই আমি চৌধুরী পরিবারে বিয়ে হয়ে এসেছিলাম—এক পুরোনো সম্ভ্রান্ত পরিবার, যাদের আভিজাত্যের আড়ালে সবসময় চাপা গুঞ্জন আর পারিবারিক গোপন রহস্য লুকিয়ে থাকত।
আমার স্বামী মিস্টার ইয়াসিন ভদ্র, শান্ত স্বভাবের মানুষ হলেও, তার মা নাজমা বেগম ছিলেন অন্যরকম। বিধবা এই নারী সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পছন্দ করতেন।
তার কথার সামনে পরিবারের কেউ খুব একটা প্রতিবাদ করার সাহস পেত না।
সেই রাতে আমরা শহরের বাইরে তাদের পুরোনো লেকপাড়ের বাড়িতে পৌঁছালাম। জায়গাটা আমাদের বাসর রাতের জন্যই ঠিক করা হয়েছিল।
আমি তখন ভীষণ ক্লান্ত। শুধু ওজু করে, ভারী সাজগোজ তুলে, নিজের স্বামীর পাশে একটু নিশ্চিন্তে বসতে চাইছিলাম।
ঠিক তখনই ইয়াসিন অস্বস্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রুপালী… একটা কথা বলব? রাগ করো না প্লিজ।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?”
সে নিচু গলায় বলল, “আম্মুর শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। অনুষ্ঠান শেষে উনার মাথা ঘুরছে। আমরা কি আজ রাতের জন্য উনাকে আমাদের রুমটা ছেড়ে দিতে পারি?”
আমি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“মানে?” আমি ধীরে বললাম। “তুমি চাও, আমাদের বাসর রাতে আমি নিজের ঘর ছেড়ে দিই?”
ইয়াসিন তাড়াতাড়ি বলল, “রুপালী, আম্মুর অবস্থা ভালো না। গেস্টরুমটা আবার বাথরুম থেকে অনেক দূরে। শুধু আজকের রাতের জন্য প্লিজ।”
আমার না বলা উচিত ছিল।
কিন্তু তখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। নতুন সংসারের প্রথম রাতেই অশান্তি করতে চাইনি। তাই নিজের কষ্ট চেপে রেখে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।
আমি একাই গেস্টরুমে চলে গেলাম।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম তখন, যখন দেখলাম ইয়াসিনও আমার সঙ্গে এলো না।
সে শুধু বলল, “আমি একটু আম্মুকে দেখে আসছি।”
তারপর দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
সেই রাতটা আমি একা কাটিয়েছিলাম।
বিয়ের ভারী গয়নাগুলো খুলতে খুলতে আয়নায় নিজের মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি যেন অন্য একজন মানুষ হয়ে গেছি।
পরদিন খুব সকালে আমার ঘুম ভাঙল। মনটা তখনও অদ্ভুত ভারী লাগছিল।
বাইরে বেরিয়ে দেখি ইয়াসিন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছে। কিন্তু নাজমা বেগমকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মু কোথায়?”
ইয়াসিন স্বাভাবিক গলায় বলল, “উনি ফজরের পরই চলে গেছেন। বললেন মাথাব্যথা করছে, আর আমাদের বিরক্ত করতে চান না।” মাথাব্যথা।
কী অদ্ভুত সুবিধাজনক একটা অজুহাত!
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন অস্বস্তি জমতে লাগল।
আমি আমাদের ঘরের দিকে হাঁটলাম। ভাবলাম নিজের জিনিসপত্র নিয়ে আসব, আর হয়তো ঘরটাকে আবার নিজের মতো গুছিয়ে নেব।
কিন্তু দরজা খুলেই আমি থমকে দাঁড়ালাম।
ক্রিম রঙের বিছানার চাদরের ওপর ছোট্ট গোল কিছু একটা সকালের আলোয় চকচক করছিল।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।
একটা মুক্তোর কানের দুল।
আমি সেটা হাতে তুলে নিলাম।
এটা আমার নয়।
আমার বিয়ের গয়নাগুলো ছিল পাথরের কাজ করা। কিন্তু নাজমা বেগম পুরো অনুষ্ঠানে মুক্তোর দুল পরেছিলেন।
ঠিক তার পাশেই বালিশের সঙ্গে লেগে ছিল একটা লম্বা বাদামী চুল। সেটাও আমার নয়।
আমার চুল কালো।
হৃদপিণ্ডটা জোরে ধকধক করতে লাগল। হাত কাঁপছিল, তবুও আমি দুল আর চুল দুটো হাতে তুলে নিলাম।
কিন্তু এরপর যা দেখলাম, তাতে যেন আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল।
কমফর্টারের কোণার নিচে কোনোমতে লুকিয়ে রাখা ছিল একটি ব্যবহৃত কনডমের খালি মোড়ক।
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
মাথার ভেতর একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই স্বাভাবিক উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
গত রাতে এই বিছানায় কে ছিল?
কেন ইয়াসিন আমার পাশে ঘুমাতে এলো না?
কেন নাজমা বেগম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে আমাদের ঘরটাই চাইলেন?
হঠাৎ করেই পুরো ঘটনাটা সাজানো, পরিকল্পিত একটা নাটক বলে মনে হতে লাগল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে মোড়কটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরলাম। এটা শুধু আমার বাসর রাত নষ্ট হওয়ার ঘটনা ছিল না। এটা ছিল আরও ভয়ংকর,
আরও অন্ধকার এক সত্যের শুরু। সকালের আলোটা তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। লেকপাড়ের সেই পুরোনো বাড়িটা যেন আগের চেয়ে আরও নীরব, আরও ভারী লাগছিল আমার কাছে। হাতে ধরা মুক্তোর দুল আর সেই লম্বা বাদামী চুলটা আমি বারবার দেখছিলাম, যেন এগুলো সত্যি না হয়ে কোনো ভুল দৃষ্টি হয়।
কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি।
আমি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরটা আরেকবার খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। বিছানার চাদরটা অগোছালো, বালিশের কভারটা একটু কুঁচকে আছে, আর পাশের টেবিলের উপর পানির গ্লাসটা অর্ধেক খালি। সাধারণভাবে দেখলে এটা শুধু একটা ব্যবহৃত ঘর, কিন্তু আমার চোখে তখন এটা হয়ে গিয়েছিল একটা লুকানো সত্যের সাক্ষী।
আমি দরজার দিকে তাকালাম।
ইয়াসিন তখনও রান্নাঘরে। কেটলির শব্দ আসছিল দূর থেকে। খুব স্বাভাবিক, খুব শান্ত একটা সকাল যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু আমার ভেতরে কিছু একটা অস্থির হয়ে উঠছিল।
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরের দিকে গেলাম।
ইয়াসিন আমাকে দেখে একটু হেসে বলল, “ঘুম ভেঙে গেছে? চা বানাচ্ছি।”
তার কণ্ঠে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু আমার চোখ তার মুখে আটকে গেল। আমি খেয়াল করলাম, তার চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ, আর চুলগুলোও একটু এলোমেলো।
আমি হাতের দুলটা তার সামনে তুলে ধরলাম।
“এটা কার?” আমার গলা কাঁপছিল না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সবকিছু কেঁপে উঠছিল।
ইয়াসিন একবার তাকিয়ে বলল, “এটা? জানি না তো।”
খুব সহজ উত্তর। খুব দ্রুত বলা উত্তর।
আমি আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলাম। “আর এই চুলটা?”
সে এবার একটু থমকে গেল।
মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য।
তারপর বলল, “হয়তো আম্মুর থেকে পড়েছে।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
নাজমা বেগমের চুল ছিল সাদা আর হালকা ধূসর। আর আমার হাতে থাকা চুলটা ছিল ঘন, বাদামী, তরুণ কারও।
আমি কিছু বললাম না।
ইয়াসিন আবার বলল, “তুমি অকারণে ভাবছো। কালকে অনেক ক্লান্ত ছিলে, তাই মাথায় এসব আসছে।”
তার কথা শেষ হতেই সে চা ঢালতে লাগল, যেন সবকিছুই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমি স্বাভাবিক ছিলাম না।
আমি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
আমার পায়ের নিচে মেঝেটা যেন নড়ছে, এমন লাগছিল। আমি আবার সেই ঘরের দিকে গেলাম যেখানে আমরা গত রাতে থাকিনি।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত থমকে গেলাম।
হাত বাড়িয়ে দরজাটা খুলতেই আবার সেই দৃশ্য চোখে ভেসে উঠল।
বিছানা।
চাদর।
আর সেই ছোট ছোট অস্বস্তিকর চিহ্নগুলো।
আমি বিছানার এক কোণে বসে পড়লাম।
হাতে ধরা জিনিসগুলো এখন ভারী লাগছিল, যেন এগুলো শুধু প্রমাণ না, বরং কোনো অন্ধকার গল্পের শুরু।
হঠাৎ দরজার শব্দ হলো।
আমি চমকে উঠে তাকালাম।
নাজমা বেগম।
তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন না।
কিন্তু তার ঘরের দরজা খোলা।
আমি ধীরে ধীরে সেই ঘরের দিকে গেলাম, যেটা গত রাতে তাকে দেওয়া হয়েছিল।
ভেতরে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।
ঘরটা একদম গোছানো, বিছানা ঠিক করা, যেন কেউ খুব সকালে উঠে দ্রুত সব ঠিক করে চলে গেছে।
না, এটা অসুস্থ মানুষের ঘর নয়।
না, এটা হঠাৎ চলে যাওয়ার ঘরও না।
আমি আলমারির দিকে তাকালাম।
সেটা আধা খোলা।
আমি এগিয়ে গিয়ে খুলতেই দেখলাম, ভেতরে কিছু কাপড় এলোমেলোভাবে রাখা, আর এক পাশে একটি ছোট পার্স।
পার্সটা খুলতেই আমার হাত থেমে গেল।
ভেতরে কিছু রসিদ, কিছু চাবি, আর একটা ছোট কাগজ।
কাগজটা খুলে আমি পড়লাম।
লেখা ছিল খুব ছোট করে—
“সব ঠিক রাখতে হবে। কেউ যেন কিছু না বোঝে।”
আমি কাগজটা ধরে রইলাম।
এবার আমার বুকের ভেতর ভয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
এটা শুধু ভুল বোঝাবুঝি না।
এটা শুধু অস্বস্তিকর রাত না।
এটা কোনো পরিকল্পনা।
আমি পেছনে ফিরে তাকালাম।
ঠিক তখনই ইয়াসিন দরজায় এসে দাঁড়াল।
তার মুখে আগের মতোই শান্ত ভাব, কিন্তু চোখ দুটো একটু শক্ত।
সে বলল, “তুমি এখানে কি করছো?”
আমি কিছু বললাম না।
শুধু হাতে ধরা কাগজটা তার দিকে তুলে ধরলাম।
ইয়াসিন এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তার মুখের ভাব বদলাল না, কিন্তু চোখের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল, “এটা তুমি কোথায় পেলে?”
আমি এবার স্পষ্টভাবে বললাম, “এই ঘরে।”
একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।
লেকের দিক থেকে হালকা বাতাস আসছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরে যেন সব থেমে গেছে।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করল।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রুপালী, তুমি কিছুই বুঝছো না।”
আমি বললাম, “তাহলে বুঝিয়ে দাও।”
সে একটু চুপ করে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল, “সবকিছু তুমি এখনই জানলে ঠিক হবে না।”
এই কথাটা আমার ভেতরটা ছিঁড়ে দিল।
আমি সামনে এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।
“মানে কি ইয়াসিন? আমি তোমার বউ, আর তুমি আমাকে সত্যি বলবে না?”
সে চোখ নামিয়ে নিল।
প্রথমবার আমি তার মধ্যে দ্বিধা দেখলাম।
কিন্তু সেই দ্বিধার ভেতরেও একটা লুকানো ভয় ছিল, যা আমাকে আরও অস্থির করে তুলল।
ঠিক তখনই দূর থেকে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীরে ধীরে, ভারীভাবে।
আমরা দুজনেই দরজার দিকে তাকালাম। আর পরের মুহূর্তেই যা দেখলাম, তা আমার পুরো জীবনটাকে আবার নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। দরজার বাইরে সেই ভারী পায়ের শব্দটা যত এগিয়ে আসছিল, আমার বুকের ভেতরের ধকধক শব্দটাও ততটাই দ্রুত হয়ে উঠছিল। আমি আর ইয়াসিন দুজনেই দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু আমাদের কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। যেন শব্দের থেকেও ভারী কোনো অদৃশ্য চাপ আমাদের শ্বাস আটকে রেখেছে।
ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল।
আর ভেতরে ঢুকলেন নাজমা বেগম।
আমি এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে গেলাম, কারণ তিনি যে এত সকালে আবার ফিরে আসবেন সেটা আমি একদমই আশা করিনি। তার মুখে আগের মতোই সেই কঠোর শান্ত ভাব, চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা। কিন্তু সবচেয়ে অস্বাভাবিক ছিল তার আচরণ—একদম স্বাভাবিক, যেন কিছুই ঘটেনি, যেন গত রাতের কোনো ঘটনা নেই, কোনো লুকানো সত্য নেই।
তিনি ঘরের ভেতর ঢুকে আমাদের দুজনকে একসাথে দেখে একটু থামলেন, তারপর ধীর গলায় বললেন, “তোমরা এখানে কি করছো?”
তার কণ্ঠ ছিল এতটাই স্থির, যেন এটা সাধারণ একটা সকাল, আর আমরা শুধু ভুল করে অন্য ঘরে ঢুকে পড়েছি।
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
ইয়াসিনও চুপ।
আমি শুধু হাতে ধরা সেই কাগজটা একটু শক্ত করে ধরলাম।
নাজমা বেগমের চোখটা মুহূর্তের জন্য আমার হাতে গেল, তারপর আবার আমার মুখে। তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন আমি কিছু একটা জেনে ফেলেছি, কিন্তু সেটা স্বীকার করতে চাইছিলেন না।
তিনি একটু এগিয়ে এসে আলমারির দরজাটা বন্ধ করে দিলেন, যেন ভেতরের কিছু ঢেকে দিতে চান।
তারপর বললেন, “রাতটা খুব অস্বস্তিকর ছিল। আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি, তাই সকালে ঘর গুছিয়ে রেখে গেছি।”
খুব সাধারণ একটা ব্যাখ্যা।
খুব বেশি অনুশীলিত একটা মিথ্যা।
আমি এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না।
“আম্মু,” আমার গলা একটু কেঁপে উঠল, “এই ঘরে গত রাতে আসলে কি হয়েছিল?”
একটা মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
নাজমা বেগম আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে এবার একটা অদ্ভুত কঠোরতা।
“তুমি কি বলতে চাও?” তিনি ধীরে বললেন।
আমি এবার কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
তিনি কাগজটা নিলেন, একবার দেখলেন, তারপর ধীরে ধীরে সেটাকে ভাঁজ করে নিজের হাতে রেখে দিলেন।
তার মুখে কোনো ভয় নেই, কোনো অস্বস্তি নেই।
শুধু এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ।
তিনি বললেন, “এই বাড়িতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। বাইরে থেকে যেটা দেখা যায়, সেটাই সত্যি।”
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
বাইরে থেকে যা দেখা যায়, সেটাই সত্যি।
মানে কি?
আমি এবার ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, সে কিছু জানে। সবকিছু না হলেও কিছুটা জানে। কিন্তু সে বলতে চাইছে না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “ইয়াসিন, তুমি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছো?”
সে মাথা তুলল না।
নাজমা বেগম এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইয়াসিন, বাইরে যাও।”
এই একটা বাক্যেই ইয়াসিন যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়তে শুরু করল। সে আমার দিকে একবার তাকাল, চোখে কিছু একটা বলতে চাওয়ার চেষ্টা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি আর নাজমা বেগম মুখোমুখি রইলাম।
এইবার ঘরের ভেতর বাতাসটাও ভারী হয়ে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর বসলেন।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি নতুন বউ, রুপালী। কিছু জিনিস তোমাকে এখনই বোঝার দরকার নেই।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিন্তু আমি তো এই ঘরেরই অংশ এখন। আমার অধিকার আছে জানার।”
তিনি একটু হেসে উঠলেন, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
“অধিকার?” তিনি বললেন, “এই বাড়িতে অধিকার নয়, ধৈর্য কাজ করে।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
তারপর তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “তুমি যেটা পেয়েছো, সেটা ভুলভাবে দেখছো। মুক্তোর দুলটা আমার না, আর চুলটা… সেটাও অনেক পুরোনো একটা ভুল বোঝাবুঝির অংশ।”
আমি বললাম, “আর কনডমের মোড়ক?”
এইবার তার চোখ একটু সরল।
মাত্র এক মুহূর্ত।
তারপর আবার স্বাভাবিক।
“তুমি কি প্রমাণ করতে পারবে এটা এই ঘরের?” তিনি বললেন।
আমি থেমে গেলাম।
কারণ সত্যি বলতে আমার কোনো শক্ত প্রমাণ ছিল না। শুধু সন্দেহ, শুধু চিহ্ন, শুধু অনুভূতি।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
আমার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, “রুপালী, তুমি যদি এই বাড়িতে শান্তি চাও, তাহলে কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো।”
তার এই কথা আমাকে ভয় দেখানোর জন্য বলা হয়নি, বরং যেন একটা সতর্কতা।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এই বাড়িতে সত্য জানতে চাওয়া সহজ কাজ না।
তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর থেমে বললেন, “আর হ্যাঁ, ইয়াসিনকে বেশি চাপ দিও না। সে সবসময় সবার ভালো চায়।”
এই কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন।
আমি একা রয়ে গেলাম ঘরের ভেতর।
চারপাশে সেই একই বিছানা, সেই একই বাতাস, কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবীটা পুরোপুরি বদলে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে বিছানায় বসলাম।
মনে হচ্ছিল, এই বাড়ির প্রতিটা দেয়াল কিছু না কিছু লুকিয়ে রাখছে।
আর আমি সেই লুকানো জিনিসগুলোর মাঝখানে আটকে পড়েছি।
বিকেলের দিকে ইয়াসিন আবার এলো।
এইবার তার মুখে আগের মতো শান্ত ভাব নেই। একটু ক্লান্ত, একটু চিন্তিত।
সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি এখনো রেগে আছো?”
আমি বললাম, “আমি রেগে না, আমি বিভ্রান্ত।”
সে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।
আমার পাশে বসে বলল, “রুপালী, আমি চাই তুমি আমাকে একটু সময় দাও।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“সময়?” আমি বললাম, “আমি তো গত রাত থেকেই অপেক্ষা করছি, ইয়াসিন। আর এখন তোমার আম্মু বলছে সবকিছু স্বাভাবিক।”
সে মাথা নিচু করল।
তারপর বলল, “সবকিছু স্বাভাবিক না।”
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর আবার একটা শক দিল।
আমি বললাম, “তাহলে সত্যি কি?”
সে চুপ।
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর সে খুব নিচু গলায় বলল, “এই বাড়ির কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো বাইরে থেকে বোঝা যায় না।”
আমি বললাম, “নিয়ম মানে কি? মানুষ বদলানো?”
সে চমকে উঠল।
তার চোখ আমার দিকে উঠল।
এইবার তার চোখে আমি ভয় দেখলাম।
সেই ভয়টা আমার জন্য না, বরং যেন নিজের ভেতরের কিছু লুকানোর ভয়।
আমি এবার ধীরে ধীরে বললাম, “ইয়াসিন, আমি তোমার স্ত্রী। তুমি আমাকে কি ভয় পাচ্ছো?”
সে উঠে দাঁড়াল।
তার হাত কাঁপছিল।
“আমি ভয় পাচ্ছি না,” সে বলল, “আমি শুধু চাই তুমি এখানে টিকে থাকো।”
আমি হেসে ফেললাম।
কিন্তু সেটা হাসি ছিল না, ছিল অবিশ্বাস।
“টিকে থাকা?” আমি বললাম, “এটা কি কোনো যুদ্ধ?”
সে কিছু বলল না।
শুধু দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই বাইরে আবার কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
এইবার ধীরে নয়।
নিয়মিত, স্থির, পরিকল্পিত।
ইয়াসিন দরজার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “সে আবার এসেছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে?”
সে উত্তর দিল না।
শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলতেই আমি যা দেখলাম, সেটা আমাকে প্রথমবারের মতো বুঝিয়ে দিল—এই গল্পটা শুধু সন্দেহ বা ভুল বোঝাবুঝির না, এটা এমন কিছু, যা আমার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে। ঠিক তখনই বাইরে আবার কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
এইবার শব্দটা আগের মতো এলোমেলো না, বরং খুব ধীর, খুব নিয়ন্ত্রিত, যেন কেউ ইচ্ছা করেই আমাদের প্রতিটা শ্বাস শুনে নিতে চাইছে। ইয়াসিন দরজার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর আমি তার পেছনে থেকে দেখছিলাম তার শরীরটা একটু শক্ত হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তার মধ্যে যে অস্বস্তি আমি প্রথমবার স্পষ্টভাবে অনুভব করলাম, সেটা আমাকে আরও ভয় পাইয়ে দিল।
দরজাটা খুলল।
ভেতরে ঢুকলেন একজন মাঝবয়সী পুরুষ। পরনে সাদা শার্ট, হাতে একটা ছোট ব্যাগ। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখে একধরনের ক্লান্ত অথচ অভিজ্ঞ দৃষ্টি। তাকে দেখে প্রথমে মনে হলো তিনি হয়তো কোনো ডাক্তার বা পারিবারিক পরিচিত কেউ।
তিনি ভেতরে ঢুকেই একবার চারপাশ দেখে বললেন, “নাজমা বেগম কোথায়?”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই মানুষটা এখানে কেন, আর কেনই বা এত সহজভাবে নাম ধরে ডাকছেন?
ইয়াসিন ধীরে বলল, “উনি বাইরে গেছেন… আপনি কে?”
লোকটা একটু থেমে আমাদের দুজনের দিকে তাকাল, তারপর শান্ত গলায় বলল, “আমি ডক্টর রাহাত। গত রাতে আমাকে ডাকা হয়েছিল।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথায় যেন একটা ঝড় বয়ে গেল।
ডাক্তার? গত রাতে? কে ডাকল?
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম, কিন্তু তার মুখ দেখে কিছুই বোঝা গেল না। বরং তার চোখে এখন একটা চাপা ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ডক্টর রাহাত ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম নাজমা বেগমের অবস্থা খারাপ ছিল, তাই দ্রুত এসেছিলাম। কিন্তু এসে দেখি কিছুই পরিষ্কার না।”
তিনি থেমে গেলেন, তারপর আমার দিকে তাকালেন।
“আপনি কি নতুন বউ?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।
তিনি একটু সময় নিয়ে বললেন, “এই বাড়ির ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলা হয়নি, তাই না?”
এই প্রশ্নটা আমার শরীর ঠান্ডা করে দিল।
ইয়াসিন দ্রুত বলল, “ডাক্তার, আপনি এসব কেন বলছেন? কোনো সমস্যা নেই।”
ডক্টর রাহাত এবার ইয়াসিনের দিকে তাকালেন। তার চোখে এবার একটু কঠোরতা।
“সমস্যা নেই?” তিনি ধীরে বললেন, “গত রাতে আমাকে ফোন করে বলা হয়েছিল একজন মহিলা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, অস্বাভাবিক আচরণ করছেন, আর তাকে নজরে রাখতে হবে।”
আমি একধাপ পিছিয়ে গেলাম।
অস্বাভাবিক আচরণ?
নাজমা বেগম?
আমি মনে করতে চেষ্টা করলাম গত রাতের প্রতিটা মুহূর্ত। তিনি তো শুধু আমাদের ঘরটা চেয়েছিলেন। অসুস্থতার অজুহাত দিয়েছিলেন।
কিন্তু এখন এই ডাক্তার বলছেন অন্য কিছু।
ইয়াসিন এবার হঠাৎ বলে উঠল, “এটা ভুল বোঝাবুঝি। কেউ হয়তো আপনাকে ভুল তথ্য দিয়েছে।”
ডক্টর রাহাত একটু হাসলেন, কিন্তু সেই হাসি ছিল খুব তীক্ষ্ণ।
“ভুল তথ্য?” তিনি বললেন, “তাহলে আমি যেই প্রেসক্রিপশন আর রিপোর্ট রেখে গিয়েছিলাম, সেটা কার জন্য ছিল?”
এইবার ঘরের ভেতর নীরবতা আরও ভারী হয়ে গেল।
আমি লক্ষ্য করলাম ইয়াসিনের হাত কাঁপছে।
এটা প্রথমবার আমি তার মধ্যে এমন কিছু দেখলাম, যেটা লুকানো যায় না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “ডাক্তার সাহেব… আপনি আসলে কি বলতে চাইছেন?”
ডক্টর রাহাত আমার দিকে তাকালেন।
তারপর খুব ধীরে বললেন, “এই বাড়িতে একটা দীর্ঘদিনের চিকিৎসা চলছে। মানসিক চিকিৎসা। আর নাজমা বেগম তার অংশ।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল।
মানসিক চিকিৎসা?
আমি নাজমা বেগমকে যেভাবে দেখেছি, তিনি তো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকা একজন মানুষ। বরং অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।
ডক্টর রাহাত আবার বললেন, “তিনি মাঝে মাঝে বাস্তব আর কল্পনা মিশিয়ে ফেলেন। তাই তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। বিশেষ করে রাতে।”
আমি এবার ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি এটা জানো?” আমার গলা কাঁপছিল।
সে কোনো উত্তর দিল না।
এই নীরবতা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর।
ডক্টর রাহাত ধীরে ধীরে বললেন, “আর গত রাতে যেটা ঘটেছে, সেটা সাধারণ ঘটনা না। কেউ একজন তাকে বাইরে বের হতে সাহায্য করেছে।”
এই কথাটা বলার সাথে সাথে তিনি সরাসরি ইয়াসিনের দিকে তাকালেন।
সবকিছু থেমে গেল।
আমি যেন হঠাৎ করে একটা অন্ধকার গর্তে পড়ে গেলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মানে কি?”
ডক্টর রাহাত এবার পরিষ্কারভাবে বললেন, “মানে হচ্ছে, তিনি যেভাবে এই ঘরে থাকার কথা ছিল, সেভাবে ছিলেন না। কেউ তাকে ঘর বদলাতে সাহায্য করেছে।”
আমার চোখ ইয়াসিনের দিকে আটকে গেল।
তার মুখ এখন ফ্যাকাশে।
সে ধীরে বলল, “আমি শুধু আমার আম্মুর কথা ভেবেছিলাম…”
আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলাম, “তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছো!”
ঘরের ভেতর বাতাস যেন কেঁপে উঠল।
ডক্টর রাহাত এবার শান্তভাবে বললেন, “ম্যাডাম, আবেগ পরে। আগে সত্যটা বুঝতে হবে।”
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “গত রাতে এই ঘরে কি হয়েছিল?”
ডক্টর রাহাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “আমি নিশ্চিত না, কিন্তু সম্ভবত এখানে শুধু একজন ছিল না।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথা পুরোপুরি ঘুরে গেল।
শুধু একজন না?
তাহলে আর কে?
ঠিক তখনই দরজার বাইরে আবার একটা শব্দ শোনা গেল।
এইবার কারও দৌড়ে আসার শব্দ।
সবাই একসাথে দরজার দিকে তাকালাম।
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
আর ভেতরে ঢুকলেন নাজমা বেগম।
কিন্তু এইবার তার চেহারা আগের মতো ছিল না।
চোখে অস্থিরতা, চুল এলোমেলো, আর শ্বাস ভারী।
তিনি ঢুকেই ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কেন তাকে সব বললে?”
তার কণ্ঠে এবার আর সেই নিয়ন্ত্রণ নেই।
বরং ছিল ভয়।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
এটা সেই একই নারী, যিনি সকালেও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।
ডক্টর রাহাত ধীরে বললেন, “নাজমা, আপনাকে শান্ত হতে হবে।”
কিন্তু তিনি থামলেন না।
তিনি হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি কি সত্যিই জানতে চাও গত রাতে কি হয়েছিল?” তিনি বললেন।
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।
তিনি একটু এগিয়ে এলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “এই বাড়িতে গত রাতে শুধু আমি ছিলাম না… আর ইয়াসিনও না।”
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
তিনি বললেন, “আর একজন ছিল।”
আমার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে গেল।
“কে?” আমি ফিসফিস করে বললাম।
নাজমা বেগম আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার স্বামী যাকে কখনো তোমাকে বলতে চায়নি।”
এই কথার পর ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো।
ইয়াসিন চোখ বন্ধ করে ফেলল।
ডক্টর রাহাত ধীরে মাথা নাড়লেন, যেন তিনি আগেই কিছু জানতেন।
আর আমি বুঝতে পারলাম—
এই গল্প এখন আর শুধু সন্দেহের না।
এটা এমন একটা সত্য, যেটা আমার পুরো জীবনটাই ভেঙে দিতে পারে। নাজমা বেগমের শেষ কথাটা ঘরের ভেতর এমনভাবে ঝুলে রইল, যেন বাতাসও সেটা হজম করতে পারছে না। “তোমার স্বামী যাকে কখনো তোমাকে বলতে চায়নি” এই বাক্যটার পর আমার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল, কিন্তু শরীরটা যেন একেবারে স্থির হয়ে গেল, নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। আমি শুধু ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম, কারণ আমার ভেতরের সব প্রশ্ন এখন তার দিকেই ছুটে যাচ্ছিল, আর তার মুখের সেই অপরাধবোধ যেন প্রতিটা সেকেন্ডে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ডক্টর রাহাত এবার আর চুপ রইলেন না। তিনি এক পা এগিয়ে এসে খুব শান্ত গলায় বললেন, “নাজমা, আপনি এখনই থামুন। এটা এমন জায়গা না যেখানে আপনি আবেগে সব কিছু ভেঙে ফেলবেন।”
কিন্তু নাজমা বেগম এবার আর আগের সেই শক্ত, নিয়ন্ত্রিত নারী ছিলেন না। তার চোখে অস্থিরতা, কণ্ঠে কাঁপুনি, আর পুরো শরীরের ভঙ্গিতে একটা ভেঙে পড়া মানুষের ছাপ। তিনি হঠাৎ ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই সত্যটা কখনো যেন বাইরে না যায়।”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল, কিন্তু তার চোখে কোনো আত্মবিশ্বাস ছিল না। বরং ছিল একটা মানুষ, যে অনেকদিন ধরে কিছু একটা চেপে রাখছে আর এখন সেটা ভেঙে পড়ার ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না, তাই কাঁপা গলায় বললাম, “কেউ কি আমাকে বলবে এখানে আসলে কি হচ্ছে? আমি কি কোনো গল্পের অংশ, নাকি কোনো লুকানো নাটকের চরিত্র?”
ডক্টর রাহাত একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর বললেন, “আপনি ভুল কিছু ভাবছেন না, রুপালী। আপনি সত্যিই এমন একটা পরিবারের ভেতরে এসেছেন, যেখানে কিছু সত্যকে বছরের পর বছর ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর একটা শীতল ঢেউ বয়ে গেল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কিসের সত্য?”
এইবার নাজমা বেগম ধীরে ধীরে বসলেন বিছানার পাশে। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু কণ্ঠটা তিনি যতটা সম্ভব স্থির রাখার চেষ্টা করলেন। “এই বাড়ির ইতিহাস সহজ না,” তিনি বললেন, “আর ইয়াসিন সবসময় চেষ্টা করেছে তোমাকে নিরাপদে রাখতে।”
আমি হেসে ফেললাম, কিন্তু সেটা হাসি ছিল না, ছিল অবিশ্বাস আর কষ্টের মিশ্রণ। “নিরাপদে রাখতে?” আমি বললাম, “আমার বাসর রাতে আমাকে একা রেখে, একটা অদ্ভুত ঘরে পাঠিয়ে, আর এখন বলছেন নিরাপদে রাখতে?”
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “রুপালী, প্লিজ আমাকে একটু শুনো…”
আমি তার কথা কেটে দিয়ে বললাম, “না, এখন আর শুনতে চাই না। এখন আমি সত্য জানতে চাই।”
এইবার নাজমা বেগম চোখ বন্ধ করলেন, তারপর খুব ধীরে বললেন, “তোমার স্বামী… তার একটা অতীত আছে, যেটা সে কখনোই তোমাকে বলতে চায়নি।”
এই কথাটা যেন আমার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর ফেলে দিল। আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম, আর সে এবার চোখ সরিয়ে নিল।
ডক্টর রাহাত আবার বললেন, “আমি সরাসরি বলি। ইয়াসিনের জীবনে একসময় এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা তার পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেই ঘটনার পর থেকেই এই বাড়ির অনেক নিয়ম, অনেক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।”
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “কেমন ঘটনা?”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। এই নীরবতা এবার আগের চেয়েও ভারী।
ইয়াসিন হঠাৎ বলল, “আমার একটা বোন ছিল।”
এই প্রথমবার তার মুখ থেকে সরাসরি কিছু সত্য বের হলো। আমি চমকে তার দিকে তাকালাম।
সে বলল, “সে… আর আমাদের মধ্যে নেই।”
এই বাক্যটা বলার সময় তার গলা ভেঙে গেল।
আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “তার সাথে কি হয়েছে?”
নাজমা বেগম এবার মুখ ঢেকে ফেললেন।
ডক্টর রাহাত নিচু গলায় বললেন, “সে একসময় এই বাড়িতেই… অস্বাভাবিকভাবে মারা যায়। আর সেই ঘটনার পর নাজমা বেগম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু তবুও সবকিছু পরিষ্কার হচ্ছিল না। “তার সাথে আমার কী সম্পর্ক?” আমি বললাম।
এইবার ইয়াসিন আমার দিকে তাকাল।
তার চোখ লাল হয়ে গেছে।
সে বলল, “তোমার সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই… কিন্তু তোমাকে যেভাবে এখানে আনা হয়েছে, সেটা একই ধরনের একটা ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই আমরা…”
সে থেমে গেল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “মানে?”
ডক্টর রাহাত এবার খুব স্পষ্টভাবে বললেন, “এই বাড়িতে আগে একবার এমন একজন নতুন বউ এসেছিল, যাকে এই পরিবারের অতীতের সাথে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। আর সেই ঘটনা ভালোভাবে শেষ হয়নি।”
এই কথাটা শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “তাহলে কি আমাকে ব্যবহার করা হচ্ছে?”
এই প্রশ্নটা ঘরের বাতাসে ঝুলে রইল।
ইয়াসিন কিছু বলল না।
নাজমা বেগম মাথা নিচু করে রইলেন।
ডক্টর রাহাত ধীরে বললেন, “না, ব্যবহার নয়… বরং নিয়ন্ত্রণ।”
এই শব্দটা আমার মাথায় আঘাত করল।
নিয়ন্ত্রণ।
আমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠলাম। “আমি কোনো খেলনার পুতুল না যে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে!”
আমার কণ্ঠ এত জোরে ছিল যে ঘরের বাতাস কেঁপে উঠল।
ইয়াসিন সামনে এসে বলল, “রুপালী, তুমি ভুল বুঝছো…”
আমি এবার চিৎকার করে বললাম, “আমি কিছুই ভুল বুঝছি না! আমি শুধু জানতে চাই গত রাতে এই ঘরে কি হয়েছিল!”
এইবার নাজমা বেগম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
তার চোখে এবার এক ধরনের ক্লান্ত সত্য।
তিনি বললেন, “গত রাতে আমি সত্যিই অসুস্থ ছিলাম… কিন্তু শুধু শরীর না, মনও।”
আমি থেমে গেলাম।
তিনি বললেন, “আমি এখানে থাকতে চাইনি। তাই আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই বাড়ির কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে এই নিয়ম বানায়?”
তিনি চুপ করে গেলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এই পরিবার নিজেই।”
এই কথাটা যেন সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল।
আমি আবার ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
এবার সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি তোমাকে শুধু বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
আমি বললাম, “থেকে?”
সে বলল, “সত্য থেকে।”
এই কথাটা শুনে আমার ভেতরটা ভেঙে গেল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আবার একটা শব্দ শোনা গেল।
এইবার কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে না।
বরং ধীরে ধীরে দরজাটা নিজে থেকেই খুলে যাচ্ছে।
সবাই একসাথে দরজার দিকে তাকালাম।
আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম
এই গল্পের সবচেয়ে বড় সত্য এখনো শুরুই হয়নি। ধীরে ধীরে দরজাটা নিজে থেকেই খুলে যাচ্ছিল, যেন কেউ বাইরে থেকে ঠেলে দিচ্ছে না, বরং ভেতরের কোনো অদৃশ্য চাপেই দরজাটা সরে যাচ্ছে। আমরা সবাই একসাথে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু কারও মুখে কোনো শব্দ ছিল না, এমনকি শ্বাসের শব্দটাও যেন ওই মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠেছিল। আমি অনুভব করছিলাম, এই দরজার ওপারে যা আসছে, সেটা শুধু একজন মানুষ না, বরং পুরো গল্পের শেষ বা শুরু।
দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল।
আর ভেতরে ঢুকল এক তরুণী।
তার বয়স খুব বেশি হলে পঁচিশের মতো হবে, পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, কিন্তু চোখ দুটো ছিল অদ্ভুতভাবে শান্ত আর গভীর। তাকে দেখে প্রথমে মনে হলো সে পথ ভুল করে ঢুকে পড়েছে, কিন্তু তার দৃষ্টি সরাসরি আমার দিকে এসে থেমে গেল, আর সেই মুহূর্তেই আমার ভেতরে একটা অজানা শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল।
সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি দেরি করে ফেলিনি তো?”
এই কথাটা শুনে নাজমা বেগমের মুখ এক মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।
ইয়াসিন যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল।
ডক্টর রাহাত এক ধাপ পিছিয়ে গেলেন।
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, শুধু ওই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কে?”
মেয়েটা একটু হেসে বলল, “আমাকে এখানে সবাই একসময় চিনত।”
তারপর সে নাজমা বেগমের দিকে তাকাল।
“আপনি তো বলেছিলেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে,” সে বলল।
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে ঘরের ভেতর বাতাস আরও ভারী হয়ে গেল।
নাজমা বেগম কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি এখানে কেন এসেছো?”
মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
তারপর বলল, “কারণ আপনি যেটা লুকাতে চেয়েছিলেন, সেটা আর লুকানো যাচ্ছে না।”
আমি এবার আর চুপ থাকতে পারলাম না।
“কারা আপনি?” আমি জোর দিয়ে বললাম।
মেয়েটা এবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে কোনো শত্রুতা ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের সহানুভূতি, যা আমাকে আরও অস্থির করে তুলল।
সে বলল, “আমি সেই মানুষ, যার জায়গায় আপনি এখন আছেন।”
এই কথাটা যেন আমার মাথায় বজ্রপাত করল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “মানে কি?”
ইয়াসিন এবার ধীরে ধীরে বলল, “থামো…”
কিন্তু মেয়েটা থামল না।
সে বলল, “আমি ছিলাম ইয়াসিনের স্ত্রী।”
এই কথার পর ঘরের ভেতর যেন সময় থেমে গেল।
আমি অনুভব করলাম আমার পায়ের নিচের মাটি একটু নড়ে গেল।
আমি ধীরে ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
তার চোখে এবার ভয় নয়, বরং অপরাধবোধের এক গভীর স্তর।
মেয়েটা আবার বলল, “আমার নাম ছিল সুমাইয়া।”
এই নামটা শোনার সাথে সাথে নাজমা বেগম চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ করো!”
কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু বেরিয়ে এসেছে।
ডক্টর রাহাত চোখ বন্ধ করে ফেললেন, যেন তিনি এই মুহূর্তটা এড়াতে চেয়েছিলেন।
আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না, শুধু টুকরো টুকরো সত্যগুলো ভেঙে ভেঙে আমার সামনে আসছিল।
আমি বললাম, “আপনি… ইয়াসিনের স্ত্রী ছিলেন?”
সুমাইয়া মাথা নেড়ে বলল, “ছিলাম।”
তারপর ধীরে ধীরে বলল, “আর আমি এখানে এই বাড়িতেই থাকতাম।”
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “কিন্তু তাহলে… আপনি এখন?”
সে একটু থেমে গেল।
তার চোখে এবার হালকা কষ্ট।
“আমি মারা গিয়েছিলাম,” সে খুব শান্তভাবে বলল।
এই কথাটা শুনে আমার শরীর পুরো ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি এক ধাপ পিছিয়ে গেলাম।
“না… এটা সম্ভব না,” আমি বললাম।
ইয়াসিন এবার হঠাৎ বলল, “রুপালী, বসো…”
কিন্তু আমি বসিনি।
আমি চিৎকার করে বললাম, “তুমি আমাকে কি বলোনি? এটা কি কোনো পাগলামি?”
সুমাইয়া ধীরে ধীরে বলল, “আমি জানি এটা শুনতে কঠিন। কিন্তু আমি এখানে সত্য বলার জন্যই এসেছি।”
ডক্টর রাহাত এবার বললেন, “এটা বাস্তবতার অংশ নয়, মানসিক চাপের প্রতিফলন হতে পারে…”
কিন্তু সুমাইয়া তার কথা কেটে দিয়ে বলল, “না ডাক্তার, আমি বাস্তব।”
এই কথাটা এমনভাবে বলা হলো যে কেউ আর কিছু বলার সাহস পেল না।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এলো।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “আপনি যদি সত্যিই… মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে এখন এখানে কেন?”
সে আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল, “কারণ গত রাতটা আবার রিপিট করা হয়েছে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমি থমকে গেলাম।
রিপিট করা হয়েছে?
মানে কি?
সে ধীরে ধীরে বলল, “এই বাড়িতে কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো ঠিক একইভাবে আবার ঘটে। শুধু মানুষ বদলায়।”
আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালাম।
“এটা কি কোনো রসিকতা?” আমি বললাম।
সে মাথা নাড়ল।
“না,” সে বলল, “এটা একটা প্যাটার্ন।”
নাজমা বেগম এবার ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
তার চোখে এবার কোনো শক্তি নেই।
শুধু ক্লান্তি।
তিনি বললেন, “আমি চাইনি এটা আবার হোক।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি আবার হোক?”
সুমাইয়া ধীরে ধীরে বলল, “একজন নতুন বউ আসে… সন্দেহ শুরু হয়… সত্য লুকানো থাকে… আর শেষ পর্যন্ত কেউ না কেউ হারিয়ে যায়।”
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর ছুরির মতো ঢুকে গেল।
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি কি জানো এসব?” আমি বললাম।
সে এবার আর লুকাল না।
সে বলল, “হ্যাঁ।”
এই একটা শব্দ।
সবকিছু ভেঙে দিল।
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
ঘরের ভেতর শুধু বাতাস চলছিল।
তারপর সুমাইয়া আবার বলল, “আমি এখানে এসেছি কারণ আমি চাই না তোমার সাথে একই ঘটনা ঘটুক।”
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “মানে কি?”
সে আমার দিকে এগিয়ে এল।
তার চোখ সরাসরি আমার চোখে।
“কারণ তুমি এখন সেই জায়গায় আছো, যেখানে আমি ছিলাম,” সে বলল।
এই কথাটা শেষ হতেই নাজমা বেগম হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“তুমি এখানে আসতে পারতে না,” তিনি বললেন।
সুমাইয়া শান্ত গলায় বলল, “আমি যদি না আসতাম, তাহলে সত্য আবার চাপা পড়ে যেত।”
ঠিক তখনই বাইরে আবার একটা শব্দ শোনা গেল।
এইবার দরজায় ধাক্কা নয়।
বরং কারও ধীরে ধীরে হাঁটার শব্দ।
ধাপে ধাপে।
ঘরের দিকে আসছে।
সবাই দরজার দিকে তাকালাম।
আর আমি বুঝতে পারলাম—
এই বাড়ির ভেতরে এখন শুধু মানুষ না, অতীতও হাঁটছে। ঘরের ভেতরে সেই ধীর পায়ের শব্দটা যত কাছে আসছিল, ততই মনে হচ্ছিল পুরো বাড়িটা যেন শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। আমরা সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু কেউ নড়ছি না, যেন নড়লেই কোনো অদৃশ্য নিয়ম ভেঙে যাবে। সুমাইয়া এক পা সামনে এগিয়ে গেল, তার চোখ স্থির, আর নাজমা বেগম চুপচাপ বসে আছেন যেন বহুদিন ধরে প্রস্তুত ছিলেন এই মুহূর্তটার জন্য।
ইয়াসিনের মুখ ফ্যাকাশে, আর আমি বুঝতে পারছি এই ঘরের ভেতরের সত্য আর বাইরের বাস্তবতা আর আলাদা কিছু থাকবে না। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।
ভেতরে ঢুকল একটি ছায়ামূর্তি।
প্রথমে মুখ দেখা গেল না, শুধু লম্বা এক ছায়া, তারপর আলো পড়তেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো একজন বৃদ্ধ মানুষ। বয়স প্রায় সত্তরের মতো, পরনে সাদা পাঞ্জাবি, হাতে একটা পুরোনো লাঠি। কিন্তু তার চোখ ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস শান্ত, স্থির, আর এমন একটা গভীরতা, যেন তিনি বহু বছর ধরে এই মুহূর্তটাই দেখছেন।
তিনি ঘরে ঢুকেই বললেন, “সবাই এখানে জড়ো হয়েছে, ভালোই হয়েছে।”
তার কণ্ঠ এতটাই শান্ত ছিল যে ভয়টা আরও বেড়ে গেল।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কে?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে বললেন, “এই বাড়ির শুরু যেখান থেকে, আমি সেখান থেকেই আছি।”
নাজমা বেগম হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি এখানে আসতে পারেন না,” তিনি কাঁপা গলায় বললেন।
বৃদ্ধ লোকটা একটু হাসলেন।
“আমি তো কখনো যাইনি,” তিনি বললেন, “তোমরা সবাই শুধু ভুলে যাওয়ার অভিনয় করো।”
এই কথাটা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল।
ইয়াসিন ধীরে বলল, “চাচা…”
এই প্রথম সে সম্মানসূচকভাবে ডাকল।
বৃদ্ধ লোকটা মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, ইয়াসিন। তুমি এখনও সত্য থেকে পালাচ্ছো।”
সুমাইয়া এবার এগিয়ে গেল।
“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “তুমি যাকে মানুষ বলে ভাবো, তুমি সেটা না।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে ঘরের ভেতর ঠান্ডা নেমে এলো।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “মানে কি?”
বৃদ্ধ লোকটা লাঠিটা মেঝেতে ঠুকলেন।
“এই বাড়িতে কিছু ঘটনা শুধু ঘটে না,” তিনি বললেন, “সেগুলো আবার তৈরি করা হয়।”
আমি থমকে গেলাম।
তিনি বললেন, “প্রতিবার যখন নতুন বউ আসে, তখন পুরোনো ঘটনা আবার শুরু হয়। কারণ এখানে একটা শর্ত আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিসের শর্ত?”
তিনি ধীরে বললেন, “একটা মৃত্যু লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যতদিন সেটা প্রকাশ না পাবে, ততদিন এই চক্র চলবে।”
এই কথাটা যেন আমার মাথায় আঘাত করল।
সুমাইয়া ধীরে বলল, “আমি সেই মৃত্যু।”
ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনি কি বলছেন?”
সে বলল, “আমাকে মেরে ফেলা হয়েছিল… আর সেটা দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল।”
নাজমা বেগম এবার চিৎকার করে উঠলেন, “না! এটা মিথ্যা!”
বৃদ্ধ লোকটা তার দিকে তাকালেন।
“মিথ্যা না, নাজমা,” তিনি বললেন, “তুমি সবচেয়ে বেশি জানো।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে নাজমা বেগম বসে পড়লেন।
তার চোখে পানি।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখানে কিছু একটা ভয়ংকর সত্য আছে, যেটা সবাই লুকাতে চেয়েছিল।
আমি ধীরে ধীরে ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি কি জানো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে মাথা নিচু করল।
“আমি সব জানতাম না,” সে বলল, “কিন্তু কিছু জানতাম।”
এই কথাটা আমার ভেতর ভেঙে দিল।
আমি চিৎকার করে বললাম, “তাহলে তুমি আমাকে এখানে কেন আনলে?”
সে বলল, “কারণ যদি তুমি না আসতে, তাহলে এটা কখনো শেষ হতো না।”
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, “শেষ হওয়ার একটাই উপায় আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“সত্যটা স্বীকার করা।”
এই কথাটা শুনে সুমাইয়া এগিয়ে এল।
“তারা আমাকে ভুলভাবে দোষী বানিয়েছিল,” সে বলল, “কারণ তারা চেয়েছিল ঘটনাটা ঢেকে রাখতে।”
নাজমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তুমি আমাদের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিলে…”
সুমাইয়া শান্তভাবে বলল, “না, আমি শুধু মরেছিলাম।”
ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে গেল।
আমি এবার ধীরে ধীরে বললাম, “তাহলে আসল ঘটনা কি?”
বৃদ্ধ লোকটা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর বললেন, “সেদিন রাতে একটা ঝগড়া হয়েছিল। সত্য লুকানোর চেষ্টা, ভয়, আর ভুল সিদ্ধান্ত… আর সেখান থেকেই মৃত্যু।”
তিনি থামলেন।
তারপর বললেন, “আর সেই মৃত্যুকে লুকাতে গিয়ে তারা একটা চক্র তৈরি করেছে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, এখন সবকিছু এক জায়গায় আসছে।
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি কি তোমার বোনের মতো আমাকে হারাতে দিতে চেয়েছিলে?” আমি বললাম।
সে চুপ।
এই চুপ থাকাটাই উত্তর ছিল।
ঠিক তখনই সুমাইয়া আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চোখ সরাসরি আমার চোখে।
“তুমি এখনো বাঁচতে পারো,” সে বলল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিভাবে?”
সে বলল, “এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাও।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে দরজার দিকে একটা বাতাসের ঝাপটা এলো।
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
বাইরে অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর যেন কিছু ডাকছে।
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “যাও। এই চক্র এখানেই থামাতে হবে।”
নাজমা বেগম কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না।
ইয়াসিন শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
আমি দরজার দিকে তাকালাম।
এক পা বাড়ালাম।
এই মুহূর্তে আমার সিদ্ধান্তই সব।
যদি আমি বেরিয়ে যাই, গল্প শেষ।
আর যদি না যাই, তাহলে আমি এই গল্পের আরেকটা অধ্যায় হয়ে যাব।
আমি গভীর শ্বাস নিলাম।
আর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু পা আর সামনে যাচ্ছে না। বাইরের অন্ধকারটা শুধু অন্ধকার ছিল না, যেন একটা চাপা নীরবতা আমাকে ডাকছে আবার ফিরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের ভেতর সবাই চুপ, কেউ কিছু বলছে না, শুধু আমার শ্বাসের শব্দটাই সবচেয়ে বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমি যদি এক পা বাইরে দিই, তাহলে এই বাড়ির সাথে আমার সব সম্পর্ক ছিঁড়ে যাবে, আর যদি না দিই, তাহলে আমি এই অদ্ভুত সত্যের ভেতরেই আটকে যাব।
সুমাইয়া ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
তার কণ্ঠ এবার আগের মতো শক্ত না, বরং খুব শান্ত, প্রায় মানবিক।
“তুমি যদি বের হয়ে যাও, তাহলে অন্তত তুমি বাঁচবে,” সে বলল।
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আর তুমি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে একটু হেসে ফেলল।
“আমি তো আগেই থেমে গেছি,” সে বলল।
এই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ব্যথা অনুভব করলাম। সে যেন জীবিত আর মৃতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গল্প, যেটা শেষ হয়নি, শুধু বারবার ফিরে আসছে।
নাজমা বেগম হঠাৎ বলে উঠলেন, “রুপালী, তুমি বের হয়ে যেও না।”
তার কণ্ঠে এবার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, বরং ভাঙা ভয়।
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।
“কেন?” আমি বললাম।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “কারণ তুমি চলে গেলে, এই সব আবার শুরু হবে।”
এই কথাটা আমার মাথায় ঢুকে গেল।
মানে কি?
আমি না থাকলেই আবার শুরু হবে?
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
তার লাঠির শব্দটা ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
“এটাই চক্র,” তিনি বললেন, “নতুন মানুষ আসে, পুরোনো সত্য চাপা পড়ে, আর একটা জীবন আবার নষ্ট হয়।”
আমি ধীরে বললাম, “আমি কেন?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“কারণ তুমি নির্বাচিত নও,” তিনি বললেন, “তোমাকে আনা হয়েছে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “তুমি আমাকে বেছে আননি?”
সে খুব নিচু গলায় বলল, “না।”
এই একটা শব্দই আমার পুরো পৃথিবী ভেঙে দিল।
আমি চিৎকার করে বললাম, “তাহলে কে?”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
নাজমা বেগম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “এই বাড়ির নিয়ম নিজেই।”
আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
“বাড়ি নিজে মানুষ নির্বাচন করে?” আমি বললাম।
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “যেখানে অপরাধ চাপা থাকে, সেখানে বাস্তবতা নিজে গল্প তৈরি করে।”
সুমাইয়া এবার আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি যদি থেকে যাও,” সে বলল, “তাহলে তুমি শুধু নতুন বউ থাকবে না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে কি হবো?”
সে ধীরে বলল, “তুমি চক্রের অংশ হয়ে যাবে।”
এই কথাটা আমার শরীর ঠান্ডা করে দিল।
আমি পেছনে তাকালাম।
ইয়াসিন এখনো চুপ।
আমি বললাম, “তুমি কি চাও আমি কী করি?”
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে পানি।
“আমি চাই তুমি বাঁচো,” সে বলল।
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার ভেতরের রাগ একটু কমে গেল, কিন্তু সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
কারণ কেউ যখন এত দেরিতে সত্য বলে, তখন সেই সত্যের ভেতরেও কিছু লুকানো থাকে।
বৃদ্ধ লোকটা আবার বললেন, “সময় কম।”
আমি দরজার দিকে তাকালাম।
বাইরের অন্ধকার এখন আর ভয়ংকর লাগছিল না, বরং মুক্তির মতো লাগছিল।
কিন্তু মুক্তি আর সত্য—দুটো একসাথে থাকে না।
আমি ধীরে ধীরে এক পা বাইরে রাখলাম।
ঠিক তখনই সুমাইয়া আমার হাত ধরল।
তার হাত ঠান্ডা, কিন্তু দৃঢ়।
“একটা কথা মনে রেখো,” সে বলল।
আমি তাকালাম।
সে বলল, “তুমি যদি সত্য জানো, তাহলে তুমি আর আগের তুমি থাকবে না।”
আমি থমকে গেলাম।
নাজমা বেগম পেছন থেকে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তুমি গেলে সব শেষ হয়ে যাবে না… শুধু আবার শুরু হবে।”
এই কথাটা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।
শেষ নাকি শুরু?
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
মনে হলো, এই বাড়ির প্রতিটা দেয়াল আমাকে টেনে ধরছে, আবার ঠেলে দিচ্ছে।
আমি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সবাই চমকে উঠল।
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, “তুমি ফিরে এসেছো।”
আমি বললাম, “আমি যেতে পারছি না… কারণ আমি জানতে চাই সত্যটা শেষ কোথায়।”
এই কথাটা বলার সাথে সাথে ঘরের ভেতর আলোটা একটু কমে গেল।
সুমাইয়া হাসল না, কাঁদল না, শুধু মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে তুমি এখন আমাদের অংশ।”
এই কথাটা শুনে আমি বুঝলাম—
আমি আর বাইরে নেই।
আমি এখন এই গল্পের ভেতরে।
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, “তাহলে শেষ অধ্যায় শুরু করা যাবে।”
নাজমা বেগম চুপ করে গেলেন।
ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আর আমি বুঝতে পারলাম—
এই গল্প এখন শেষের দিকে না, বরং সবচেয়ে গভীর জায়গায় ঢুকে গেছে।
বৃদ্ধ লোকটা ধীরে বললেন, “তুমি যে সত্য জানতে চাও, সেটা এই ঘরের নিচে লুকানো আছে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “নিচে মানে?”
তিনি বললেন, “এই বাড়ির নিচে।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার মাথায় একটা ভয়ংকর ছবি ভেসে উঠল।
ঘরের নিচে কিছু আছে।
কিছু যা বছরের পর বছর চাপা পড়ে আছে।
সুমাইয়া ধীরে বলল, “আমি সেখানে গিয়েছিলাম… তারপর আর বের হতে পারিনি।”
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম—
এই গল্প শেষ হবে না দরজায়।
শেষ হবে নিচে।
আমি গভীর শ্বাস নিলাম।
আর বললাম, “নিয়ে যাও।”
বৃদ্ধ লোকটা মাথা নেড়ে বললেন, “তাহলে এবার সত্যের মুখোমুখি হতে হবে।”
আর ঠিক তখনই মেঝের একটা অংশ ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করল।
যেন নিচ থেকে কেউ ডাকছে। মেঝের নিচ থেকে যে কাঁপনটা উঠছিল, সেটা আর সাধারণ কোনো শব্দ মনে হচ্ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, পুরো বাড়িটা যেন নিজের ভেতরের কোনো পুরোনো সত্যকে জেগে উঠতে দিচ্ছে না, আবার থামাতেও পারছে না। আমি স্থির দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার পায়ের নিচে সেই কাঁপন ধীরে ধীরে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় জমা হচ্ছে, যেন ঠিক এখানেই কিছু লুকিয়ে রাখা ছিল বহু বছর ধরে।
বৃদ্ধ লোকটা লাঠি মেঝেতে ঠুকলেন।
“এটাই জায়গা,” তিনি বললেন।
নাজমা বেগম চোখ বন্ধ করে ফেললেন, যেন এই মুহূর্তটা তিনি বহুদিন ধরে এড়িয়ে আসছিলেন। ইয়াসিন আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে এখন আর কোনো লুকানোর চেষ্টা নেই, শুধু ক্লান্তি আর ভয়। সুমাইয়া আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে কোনো আবেগ নেই, যেন সে জানে এখন যা হবে, সেটা থামানো আর সম্ভব না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “এখানে কি আছে?”
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “সত্য।”
তারপর তিনি মেঝের একটা কোণ দেখালেন, যেখানে কাঠের ফ্লোর একটু আলাদা লাগছিল। পুরোনো, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাখা। ইয়াসিন ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, তারপর হাত দিয়ে সেই অংশটা টেনে তুলল। কাঠের একটা অংশ সরে যেতেই নিচে একটা ছোট সিঁড়ি দেখা গেল, যা অন্ধকারের ভেতরে নেমে গেছে।
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল।
নাজমা বেগম ফিসফিস করে বললেন, “না… এটা খোলা উচিত না ছিল।”
সুমাইয়া ধীরে বলল, “এটাই একমাত্র সত্য।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তুমি আগে জানাতে,” আমি বললাম।
সে নিচু গলায় বলল, “আমি জানলে কি তুমি আসতে?”
এই কথাটা আমার বুকের ভেতর একটা আঘাত দিল।
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “নিচে নামলে আর ফেরার সিদ্ধান্ত সহজ থাকবে না।”
আমি এক মুহূর্ত থেমে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে বললাম, “আমি নামব।”
কেউ কিছু বলল না।
আমি প্রথম পা ফেললাম সিঁড়িতে।
ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে নিচ থেকে, যেন বহুদিনের বন্ধ কোনো জায়গা হঠাৎ খুলে গেছে। ধীরে ধীরে আমি নিচে নামতে লাগলাম। আমার পেছনে ইয়াসিন, তারপর সুমাইয়া, তারপর নাজমা বেগম আর বৃদ্ধ লোকটা।
প্রতিটা ধাপে অন্ধকার আরও গভীর হচ্ছিল।
নিচে পৌঁছে দেখি একটা ছোট ঘর।
পুরোনো দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, আর মাঝখানে একটা কাঠের চেয়ার।
চেয়ারটার সাথে বাঁধা একটা পুরোনো ডায়েরি।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।
ডায়েরিটা খুললাম।
প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিল—
“এই বাড়িতে সত্য লুকানো হয় না, শুধু বারবার নতুনভাবে জন্ম নেয়।”
আমি পাতা উল্টাতে লাগলাম।
প্রতিটা পাতায় একই পরিবারের গল্প।
একই ঘটনা বারবার।
নতুন বউ আসে।
সন্দেহ তৈরি হয়।
একটা মৃত্যু হয়।
আর সবাই বলে এটা দুর্ঘটনা।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—
এটা কোনো একবারের ঘটনা না।
এটা একটা চক্র।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “এটা কি সত্যি?”
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “হ্যাঁ।”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
“তাহলে সুমাইয়া…” আমি বললাম।
সে মাথা নিচু করে বলল, “সে আগের চক্রের অংশ।”
আমি ধীরে ধীরে সুমাইয়ার দিকে তাকালাম।
সে এবার প্রথমবার হাসল না, কাঁদল না।
শুধু বলল, “আমি এখানে আটকে গিয়েছিলাম।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, সে জীবিত না মৃত, মাঝামাঝি কিছু।
আমি বললাম, “তাহলে এখন কি হবে?”
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “চক্র ভাঙতে হবে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিভাবে?”
তিনি বললেন, “যে সত্যটা লুকানো হয়েছিল, সেটা স্বীকার করে।”
নাজমা বেগম হঠাৎ কান্না করে উঠলেন।
“আমি করেছিলাম,” তিনি বললেন, “আমি ভুল করেছিলাম।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “সেদিন একটা ঝগড়া হয়েছিল… আমি চেয়েছিলাম সব ঢেকে ফেলতে… তাই সত্য লুকিয়েছিলাম।”
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
তিনি বললেন, “সুমাইয়ার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না… সেটা ছিল ভয়, রাগ, আর ভুল সিদ্ধান্তের ফল।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে সুমাইয়া চোখ বন্ধ করল।
তার শরীরটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।
আমি চিৎকার করে বললাম, “এটা কি হচ্ছে?”
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “সত্য প্রকাশ হচ্ছে। চক্র ভাঙছে।”
ইয়াসিন হঠাৎ আমার হাত ধরল।
“রুপালী, এখনই উঠে যাও,” সে বলল।
আমি বললাম, “না।”
আমি এবার আর ভয় পাচ্ছিলাম না।
আমি বললাম, “আমি সত্য দেখতে চাই।”
সুমাইয়া আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে এবার শান্তি।
“ধন্যবাদ,” সে বলল।
তারপর ধীরে ধীরে সে মিলিয়ে যেতে লাগল।
নাজমা বেগম মাটিতে বসে পড়লেন।
বৃদ্ধ লোকটা বললেন, “চক্র শেষ।”
আমি চারপাশে তাকালাম।
ঘরটা ধীরে ধীরে আলোর দিকে ফিরছে।
আমি বুঝতে পারলাম—
এই বাড়ির ভয় শেষ হলো।
কিন্তু আমার জীবন এখন আর আগের মতো থাকবে না।
আমি উপরে উঠলাম।
বাইরে বের হলাম।
সকাল হয়ে গেছে।
সূর্যের আলো লেকের উপর পড়ছে।
ইয়াসিন আমার পাশে দাঁড়িয়ে।
সে ধীরে বলল, “এখন তুমি চলে যাবে?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
তারপর বললাম, “না।”
সে অবাক হয়ে তাকাল।
আমি বললাম, “কারণ সত্য জানার পর পালানো যায় না… শুধু বাঁচা যায়।”
সে ধীরে মাথা নেড়ে দিল।
নাজমা বেগম দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর বৃদ্ধ লোকটা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিলেন।
বাড়িটা এখন আগের মতোই ছিল।
কিন্তু ভেতরের গল্পটা বদলে গেছে।
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকালাম।
এইবার ভয় নেই।
শুধু বাস্তবতা। আর আমি জানি সব গল্প শেষ হয় না।
কিছু গল্প শুধু সত্য হয়ে যায়।
সমাপ্ত -