বাসর রাতের পালিয়ে যাওয়া বউ

আমার বিয়ের রাতে, বৃদ্ধা কাজের মহিলাটি দরজায় খুব আস্তে টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, যদি বাঁচতে চাও, তাহলে এখনই কাপড় বদলে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাও তাড়াতাড়ি করো, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই।

kxz

বিয়ের রাত একজন মেয়ের জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত হওয়ার কথা। আমি আয়নার সামনে বসে ছিলাম। ঠোঁটের লাল লিপস্টিক তখনও টাটকা, মাথার সোনার চুলের কাঁটাগুলো ঘরের হলুদ আলোয় ঝলমল করছিল।

উঠোনের ওপাশ থেকে ঢাক-ঢোলের শেষ শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। বাসরঘরের চারপাশে টাঙানো লাল কাপড়গুলো নরম আলোয় এমনভাবে জ্বলছিল, যেন আগুনের আভা ছড়িয়ে আছে। অবশেষে বাড়ির সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল। দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। পায়ের শব্দ থেমে গেছে। পুরো বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।

kx/춺'

কিন্তু আমার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুতেই থামছিল না।
সারাটা সন্ধ্যা আমার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঠিক নেই। আমার শাশুড়ি শাহানা বেগম অকারণে অতিরিক্ত হাসছিলেন, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো মায়া ছিল না।

শেষবার যখন সবাই মিলে দোয়া পড়ল, তখন মিস্টার ইয়াসিন প্রায় আমার দিকেই তাকাননি। অথচ যখনই কেউ আমার সামনে শরবত বা দুধের গ্লাস এনে রাখছিল, তার চোখ বারবার সেদিকে চলে যাচ্ছিল। এমনকি অতিথিদের সামনে যখন তিনি আমার হাত ধরেছিলেন, তখন তার হাত ছিল বরফের মতো ঠান্ডা। নার্ভাস নয়… অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
খুব আস্তে। খুব সাবধানে। যেন ভয়ে ভয়ে।

আমি কেঁপে উঠলাম। এত রাতে আমার ঘরের সামনে কারও থাকার কথা নয়। ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে অল্প ফাঁক করতেই একটি চোখ, একটি কুঁচকানো গাল আর অন্ধকারে ঢাকা মুখ দেখতে পেলাম।

বাড়ির পুরোনো পরিচারিকা হালিমা খাতুন। এই বাড়িতে বোধহয় সবার চেয়ে বেশি বছর তিনি কাটিয়েছেন। কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীর, শুকনো হাত, চুপচাপ মুখ। সারাদিন মাথা নিচু করে অতিথিদের চা-নাশতা দিচ্ছিলেন।

কিন্তু কয়েকবার আমি লক্ষ্য করেছি, তিনি আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন, যেন কিছু বলতে চান, অথচ সাহস পাচ্ছেন না। এখন তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।

তিনি দরজার আরও কাছে এসে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, “মা… যদি বাঁচতে চাও, তাহলে এখনই কাপড় বদলে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি করো। দেরি কইরো না।” এক মুহূর্তের জন্য আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, তিনি এখনই বলবেন এটা ভুল বোঝাবুঝি হয়তো কোনো কুসংস্কার… কিংবা একটা বাজে মজা। কিন্তু তিনি শুধু কাঁপা আঙুল ঠোঁটের ওপর রেখে ইশারা করলেন। চুপ। ঠিক তখনই আমি শব্দটা শুনতে পেলাম। পায়ের আওয়াজ। একজন পুরুষের ধীর, ভারী পায়ের শব্দ করিডোর ধরে এগিয়ে আসছে। ধীরে… নিশ্চিন্তভাবে… অবিচলভাবে। আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল কাঁচের হালকা ঠোকাঠুকির আওয়াজ।

আমার স্বামী। আমি জানি না, সেই মুহূর্তে আমাকে কী বাঁচিয়েছিল ভয়, প্রবৃত্তি, নাকি হালিমা খাতুনের চোখের সেই আতঙ্ক। কিন্তু আমি আর কিছু ভাবিনি। কোনো শব্দ না করে দরজা বন্ধ করলাম। তাড়াহুড়ো করে গয়নাগুলো খুলে ফেললাম, ভারী বিয়ের শাড়িটা খুলে সাধারণ একটা কাপড় পরে নিলাম। হাত এত কাঁপছিল যে ওড়নার ফিতা বাঁধতেও কষ্ট হচ্ছিল। লাল বেনারসিটা বিছানার নিচে গুঁজে দিলাম, হাতের পিঠ দিয়ে লিপস্টিক মুছে ফেললাম, তারপর আবার দরজা খুললাম। হালিমা খাতুন তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি অবাক করার মতো শক্ত হাতে আমার কবজি চেপে ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনের সরু একটা করিডোরে, যেটা আমি আগে কখনও দেখিনি। ভেতরে ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে বাতাস। পুরোনো কাঠ আর বৃষ্টির গন্ধ।

পায়ের নিচে প্রতিটা তক্তা এমন শব্দ করছিল, যেন পুরো বাড়ি জেগে উঠবে। আমাদের পেছনে তখন বাসরঘরের সামনে এসে পায়ের শব্দ থেমে গেছে।
তারপর দরজার হাতল নড়ার শব্দ পেলাম।

আমি ভয়ে প্রায় চিৎকার করে ফেলছিলাম, কিন্তু হালিমা খাতুন আমার হাত আরও শক্ত করে ধরে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন। করিডোরের শেষে একটা বাঁকা কাঠের দরজা ছিল, যেটা পুরোনো ঝুড়ি আর জিনিসপত্র দিয়ে অর্ধেক ঢাকা। তিনি দরজাটা ঠেলে খুলতেই ঠান্ডা রাতের বাতাস হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

আমি বের হওয়ার আগেই তিনি আবার আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে এমন এক ভয় ছিল, যা শুধু সত্য জানার পরই মানুষের চোখে আসে।
তিনি ফিসফিস করে বললেন,
সোজা দৌড়াইবা। পেছনে তাকাইবা না। কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করতাছে। যা-ই শুনো, পেছনে ফিরবা না।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম কে অপেক্ষা করছে? কেন? আর মিস্টার ইয়াসিন ওই কাঁচের গ্লাসে কী নিয়ে আসছিলেন? কিন্তু ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটা দরজা সজোরে খুলে যাওয়ার শব্দ এলো।

আমি দৌড় দিলাম।

বাড়ির পেছনের পাথরের পথটা বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে ছিল। বাগানের লণ্ঠনের ভাঙা হলুদ আলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছিল। চারপাশের ছায়াগুলোকে মনে হচ্ছিল কেউ যেন হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরতে চাইছে। বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বলছিল। হৃদস্পন্দনের শব্দ এত জোরে কানে বাজছিল যে অন্য কিছু শুনতেই পাচ্ছিলাম না।

তারপর হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“তানিশা!”
মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠ। আমি আরও জোরে দৌড়ালাম। গলির শেষ মাথায় একটা রাস্তার বাতির নিচে মোটরসাইকেল নিয়ে একজন মাঝবয়সী লোক অপেক্ষা করছিল। কালো জ্যাকেট পরা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “দ্রুত ওঠেন।”

আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি। তার পিছনে উঠে বসলাম। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মোটরসাইকেলটা রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে চলল। বাতাস এসে মুখে আঘাত করছিল। কখন যে চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে, বুঝতেই পারিনি। রাস্তার ফাঁকা মোড়গুলো পেরিয়ে যাওয়ার সময় হাতে থাকা চুড়িগুলো একে অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করছিল। আমি বারবার ভেবেছিলাম, এখনই হয়তো পেছনে গাড়ির আলো দেখা যাবে। হয়তো মিস্টার ইয়াসিন এসে দাঁড়াবেন, সেই ঠান্ডা হাসিটা হেসে জিজ্ঞেস করবেন আমি কেন সব নষ্ট করে দিলাম।
লোকটা অনেকক্ষণ কিছু বলল না। শুধু যখনই আয়নায় কোনো গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছিল, তখনই সে মোটরসাইকেলের গতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

অবশেষে আমরা থামলাম।

কোনো থানা নয়। কোনো হোটেলও নয়। শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে, পুরোনো একটা ছোট গির্জার সামনে। প্রবেশপথের ওপরে ঝুলে থাকা ম্লান বাতিটা বারবার জ্বলে-নিভে উঠছিল, যেন যেকোনো সময় নিভে যাবে।

আমি মোটরসাইকেল থেকে নেমে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কে?”
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই অন্ধকার থেকে আরেকটা ছায়া বেরিয়ে এলো। হালিমা খাতুন।
তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। এক হাতে বুক চেপে ধরে আছেন, আর অন্য হাতে একটা মরিচা ধরা টিনের বাক্স এত শক্ত করে ধরে আছেন যে আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে গেছে।

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,
“মা… আমার আরও আগেই সত্যিটা বলা উচিত ছিল। আজ রাতের আগেই।” তারপর তিনি গির্জার মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলেন। বাক্সটা আমাদের মাঝখানে রেখে খুললেন।

ভেতরে কিছু পুরোনো ছবি, ভাঁজ করা কাগজ, একটা ছোট রেকর্ডার আর একটা সিল করা খাম ছিল। প্রথম ছবিতে দেখা গেল, বিয়ের লাল শাড়ি পরা এক তরুণী মিস্টার ইয়াসিনের পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে। দ্বিতীয় ছবিতে আরেকজন নারী। তার মাথায় ঠিক সেই একই সোনার কাঁটা, যেটা কিছুক্ষণ আগেও আমার চুলে ছিল।

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

হালিমা খাতুন কাঁপতে কাঁপতে খামটা তুলে আমার হাতে দিলেন। খামের ওপরে মিস্টার ইয়াসিনের হাতের লেখায় লেখা ছিল!

চলবে..? আপনাদের রেসপন্স পেলে পরবর্তী অংশ আজকেই আপলোড করা হবে। গির্জার ভেতরের বাতাসটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা ছিল। পুরোনো কাঠের বেঞ্চগুলো অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আর মাথার ওপরে ঝুলে থাকা ভাঙা কাঁচের জানালা দিয়ে চাঁদের আলো মেঝেতে ফ্যাকাসে দাগ কেটে পড়ছিল। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল। সেই শব্দটা এত নির্জন লাগছিল যে আমার বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
আমার হাত তখনও কাঁপছিল। খামটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এটা খুললেই হয়তো এমন কিছু জানতে পারব, যেটা জানার পর আমার জীবন আর কখনও আগের মতো থাকবে না।
হালিমা খাতুন ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল অনেক দূর দৌড়ে এসেছেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলের লোকটা গির্জার দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল, যেন কেউ আমাদের অনুসরণ করছে কি না সেটা দেখছে।
আমি অবশেষে খামটা খুললাম।
ভেতরে একটা মাত্র কাগজ।
সাদা কাগজে কালো কালিতে লেখা কয়েকটা লাইন।
“যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি এখনও বেঁচে আছো। আর যদি বেঁচে থাকো, তাহলে বুঝে নিও হালিমা তোমাকে বিশ্বাস করেছে। আমি জানি না, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে কি না। কিন্তু আজ রাতে যদি তুমি ওই দুধ খেতে, তাহলে আগামীকাল সূর্য ওঠার আগেই তোমার মৃত্যু হতো।”
আমার শরীর হিম হয়ে গেল।
আমি বাকিটা পড়তে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড থেমে গেলাম। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
“তুমি তৃতীয় মেয়ে নও। তুমি চতুর্থ।”
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
মনে হচ্ছিল গির্জার মেঝেটা হঠাৎ দুলে উঠেছে। আমি কাগজটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।
হালিমা খাতুন চোখ নামিয়ে বললেন, “আমি আর চুপ থাকতে পারি নাই মা।”
আমি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালাম।
“এর মানে কী?”
তিনি উত্তর দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। যেন এত বছরের জমে থাকা ভয় তার গলায় আটকে আছে।
“এই বাড়িতে তোমার আগেও তিনজন বউ আইছিল।”
আমার বুকের ভেতর ধপ করে উঠল।
“কিন্তু সবাই জানে মিস্টার ইয়াসিনের এটা প্রথম বিয়ে।”
“কারণ কেউ বাঁচে নাই।”
গির্জার ভেতরের বাতাসটা যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি পেছনে এক পা সরে গেলাম। মাথার ভেতর তখন একসাথে শত প্রশ্ন ঘুরছে। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে কেউ কিছু জানল না কীভাবে? মৃতদেহগুলো কোথায় গেল? পুলিশ? প্রতিবেশীরা?
মোটরসাইকেলের লোকটা এবার এগিয়ে এলো। শান্ত গলায় বলল, “সবাই জানছিল তারা অসুস্থ ছিল। কেউ বলছে আত্মহত্যা করছে। কেউ বলছে পালাইছে। কিন্তু সত্যি কেউ জানে নাই।”
আমি তার দিকে তাকালাম। “আপনি কে?”
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমার নাম রফিক। আমি আগে ইয়াসিন সাহেবের ড্রাইভার ছিলাম।”
তার চোখে একটা চাপা রাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
“প্রথম মেয়েটারে আমি নিজের চোখে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম। তখনও সে বাঁচার চেষ্টা করতেছিল।”
আমার হাত থেকে প্রায় চিঠিটা পড়ে যাচ্ছিল।
“তারপর?”
রফিক নিচের দিকে তাকাল।
“হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যায়।”
গির্জার দেয়ালের পাশে দাঁড়ানো মোমবাতির আলোটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। যেন বাতাস ছাড়াই কেউ সেটাকে ছুঁয়ে গেছে।
হালিমা খাতুন টিনের বাক্স থেকে একটা ছোট রেকর্ডার বের করলেন। পুরোনো ধরনের ক্যাসেট রেকর্ডার। হাত এত কাঁপছিল যে বোতাম চাপতেও কষ্ট হচ্ছিল।
তারপর হঠাৎ একটা নারীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আমার খুব ঘুম পাইতাছে… ইয়াসিন বলছে এটা শুধু নার্ভ শান্ত করার ওষুধ…”
কণ্ঠটা দুর্বল ছিল। আতঙ্কে ভরা।
তারপর আরেকটা পুরুষ কণ্ঠ।
মিস্টার ইয়াসিন।
“চুপচাপ খাও। তাহলেই সব সহজ হবে।”
আমার বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।
রেকর্ডারের শব্দ হঠাৎ কেঁপে উঠল। তারপর একটা ভাঙা চিৎকার।
এরপর নিস্তব্ধতা।
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লাম। মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল।
আমি আজ রাতে মরতে যাচ্ছিলাম।
হালিমা খাতুন চোখ মুছলেন।
“প্রথম দুইজনের সময় আমি কিছু বলতে পারি নাই। আমি ভয় পাইছিলাম। শাহানা বেগম সব সামলাই ফেলত।”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “শাহানা বেগমও জানেন?”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“এই বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ যদি কেউ হয়… তাইলে উনিই।”
আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
হঠাৎ বাইরে মোটরের শব্দ ভেসে এলো।
রফিক দ্রুত দরজার দিকে তাকাল।
“ওরা আসছে।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“এখন কী হবে?”
রফিক দ্রুত গির্জার পাশের একটা ছোট ঘরের দিকে ইশারা করল।
“ওইখানে লুকান।”
আমি দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ছোট অন্ধকার ঘর। পুরোনো বই আর কাঠের গন্ধ। একটা সরু জানালা দিয়ে বাইরে দেখা যাচ্ছিল।
কয়েক সেকেন্ড পর কালো একটা গাড়ি এসে গির্জার সামনে থামল।
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
গাড়ি থেকে প্রথমে নামলেন শাহানা বেগম।
তার মুখের হাসিটা এবার আর ভদ্র ছিল না। ঠান্ডা। নিষ্ঠুর। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে স্থির।
তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন মিস্টার ইয়াসিন।
তার হাতে এখনও সেই কাঁচের গ্লাস।
আমি ভয়ে জমে গেলাম।
তিনি চারপাশে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “তানিশা, আমি জানি তুমি এখানে আছো।”
আমার হাত মুখ চেপে ধরল। মনে হচ্ছিল এখনই চিৎকার বেরিয়ে যাবে।
শাহানা বেগম বিরক্ত গলায় বললেন, “আমি শুরুতেই বলছিলাম, ওই বুড়িটারে বিশ্বাস করা ঠিক না।”
হালিমা খাতুন গির্জার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছোট, দুর্বল শরীরটা কাঁপছিল। কিন্তু তিনি পালাননি।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“তুমি অনেক বড় ভুল করছো হালিমা।”
হালিমা খাতুন কাঁপা গলায় বললেন, “আল্লাহর ভয় করেন।”
ইয়াসিন ঠান্ডা হাসলেন।
“আল্লাহ অনেক আগেই এই বাড়ি ছেড়ে গেছে।”
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
শাহানা বেগম হঠাৎ চিৎকার করে বললেন, “মেয়েটারে খুঁজে বের করো!”
আর ঠিক তখনই বাইরে আরও দুজন লোক গাড়ি থেকে নেমে গির্জার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
আমার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছিল। মাথা কাজ করছিল না। যদি তারা আমাকে খুঁজে পায়?
রফিক আস্তে করে ঘরের দরজার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “পেছনের জানালা দিয়া বের হন। এখনই।”
আমি জানালার দিকে এগোলাম। কিন্তু ঠিক তখনই গির্জার ভেতর একটা বিকট শব্দ হলো।
তারপর হালিমা খাতুনের চিৎকার।
আমি থমকে গেলাম।
জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, হালিমা খাতুন মেঝেতে পড়ে আছেন। শাহানা বেগম তার দিকে নিচু হয়ে কিছু বলছেন। আর ইয়াসিন স্থির চোখে চারপাশে তাকিয়ে আছেন।
হঠাৎ তার চোখ সরাসরি আমার জানালার দিকে উঠে এলো।
আমার শরীর জমে গেল।
মনে হলো তিনি আমাকে দেখেছেন।
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।
তারপর তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন, “তানিশা… তুমি যত দূরেই পালাও না কেন… শেষ পর্যন্ত সবাই এই বাড়িতেই ফিরে আসে।”
আমার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ল।
রফিক হঠাৎ আমার হাত ধরে টেনে বলল, “এখন না গেলে আর পারবেন না!”
আমি আর পেছনে তাকাইনি।
জানালা দিয়ে বের হয়ে অন্ধকারের মধ্যে দৌড় দিলাম।
পেছনে শুধু গির্জার ঘণ্টার ভারী শব্দ বাজছিল।
আর সেই শব্দের মাঝেই আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম—
কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। খুব ধীরে। খুব কাছে থেকে। আমি দৌড়াচ্ছিলাম। শুধু দৌড়াচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার আমার পেছনে ছুটে আসছে। গির্জার পেছনের ভাঙা পথটা কাদায় ভরে ছিল। বৃষ্টির পুরোনো পানি জমে ছোট ছোট গর্ত হয়ে আছে। কয়েকবার পিছলে পড়তে পড়তেও কোনোমতে নিজেকে সামলেছি। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড এমনভাবে ধকধক করছিল যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বের হয়ে আসবে। ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু আমি থামিনি। কারণ আমি জানতাম, থামা মানেই মৃত্যু।
পেছনে কোথাও মানুষের চিৎকার ভেসে আসছিল। কে কী বলছে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু একটা কণ্ঠ আমি পরিষ্কার চিনতে পারছিলাম। মিস্টার ইয়াসিন। তার গলায় কোনো রাগ ছিল না, কোনো তাড়াহুড়োও না। বরং ভয়ংকর শান্ত একটা স্বর। যেন সে জানে আমি শেষ পর্যন্ত পালাতে পারব না। সেই স্বরটাই আমাকে আরও আতঙ্কিত করে তুলছিল।
রফিক আমার কয়েক কদম সামনে দৌড়াচ্ছিল। মাঝে মাঝে পিছনে তাকিয়ে দেখছিল আমি ঠিক আছি কি না। রাস্তার পাশে বিশাল পুরোনো গাছগুলো বাতাসে দুলছিল। চাঁদের আলো মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল, তখন পুরো রাস্তা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। আমি শুধু রফিকের ছায়া অনুসরণ করে দৌড়াচ্ছিলাম।
কিছুদূর যাওয়ার পর একটা পুরোনো টিনের বাড়ির সামনে এসে রফিক থামল। বাড়িটার চারপাশে ঝোপঝাড়। দেখে মনে হচ্ছিল বহু বছর কেউ এখানে থাকে না। সে দ্রুত দরজা খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে বলল। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে একদম অন্ধকার। রফিক একটা ছোট লণ্ঠন জ্বালাতেই ঘরটা ধীরে ধীরে আলোকিত হলো।
পুরোনো কাঠের টেবিল। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। কোণায় একটা ভাঙা আলমারি। আর ঘরের ভেতর এমন এক গন্ধ, যেন অনেকদিন ধরে এখানে সূর্যের আলো ঢোকেনি।
আমি দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। শরীর তখনও কাঁপছে।
রফিক দরজা বন্ধ করে বাইরে কিছুক্ষণ কান পেতে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এসে বলল, “কিছুক্ষণের জন্য নিরাপদ।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “হালিমা খাতুন… উনি…”
কথাটা শেষ করতে পারলাম না।
রফিক চোখ নামিয়ে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “ওনারে আর বাঁচতে দিব না ওরা।”
আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। সেই বৃদ্ধা মহিলা, যিনি নিজের জীবন বিপদে ফেলে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন…
আমার চোখে পানি চলে এলো।
রফিক নিচু গলায় বলল, “উনি অনেক বছর ধইরা এই পাপের বোঝা বইতেছিল।”
আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, “আসল সত্যিটা কী?”
রফিক টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো জগ থেকে পানি ঢেলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরলাম। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল।
সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“প্রথমে আমি কিছুই বুঝি নাই। আমি তখন ইয়াসিন সাহেবের নতুন ড্রাইভার। বড়লোক পরিবার। সবাই সম্মান করত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হইত খুব ধার্মিক, ভদ্র মানুষ। কিন্তু এই বাড়ির ভেতরে কী হইত, কেউ জানত না।”
সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
“প্রথম স্ত্রী ছিল সামিয়া নামের একটা মেয়ে। গ্রামের সাধারণ পরিবার থেইকা বিয়ে হইছিল। খুব শান্ত মেয়ে আছিল। বিয়ের পর প্রথম দুই সপ্তাহ সব ঠিক আছিল। তারপর একদিন মাঝরাতে আমারে ডাক পড়ল। ইয়াসিন সাহেব কইল, দ্রুত গাড়ি বের করতে।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম।
“আমি যখন গাড়ির পিছনের দরজা খুললাম… দেখি সামিয়া আপা আধমরা অবস্থায় পড়ে আছে। মুখে ফেনা। চোখ আধখোলা। মনে হচ্ছিল কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারতেছে না।”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
“হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যায়। পরে সবাইরে বলা হয়, হার্ট অ্যাটাক।”
“কেউ সন্দেহ করেনি?”
রফিক তিক্ত হেসে বলল, “টাকা থাকলে মানুষ অনেক কিছু বিশ্বাস করে।”
ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
“তারপর দ্বিতীয় স্ত্রী আসে। নাম ছিল নুসরাত। এইবার আমি কিছুটা খেয়াল করা শুরু করি। কারণ বিয়ের আগের রাতেই আমি শুনছিলাম শাহানা বেগম ইয়াসিন সাহেবরে কইতেছে, ‘এইবার যেন আগেরবারের মতো ভুল না হয়।’ তখনও বুঝি নাই কথার মানে।”
আমি নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“নুসরাত আপাও মারা যায়। একইভাবে। তারপর সবাইরে বলা হয় সে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। আত্মহত্যা করছে।”
আমার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর সত্যি স্পষ্ট হতে লাগল।
“আর তৃতীয়জন?”
রফিক এবার চুপ হয়ে গেল।
তার চোখে অদ্ভুত একটা দুঃখ দেখা গেল।
“তৃতীয়জনের নাম ছিল মেহরিন।”
কথাটা বলার সময় তার গলাটা কেঁপে উঠল।
আমি বুঝতে পারলাম, এই মেয়েটার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল।
“উনি আলাদা আছিল। খুব সাহসী মেয়ে। বিয়ের কয়েকদিন পরই কিছু একটা টের পাইছিল। একদিন গোপনে আমারে ডাইকা জিজ্ঞেস করছিল, এই বাড়িতে আগে কি আর কোনো মেয়ে আছিল?”
আমি ফিসফিস করে বললাম, “তারপর?”
“আমি ভয় পাইছিলাম। কিছু কই নাই। কিন্তু উনি নিজেই খুঁজতে শুরু করে। একদিন রাতে উনি বাড়ির নিচতলার পুরোনো স্টোররুমে ঢুইকা কিছু পাইছিল।”
“কি?”
রফিক ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।
“মাটির নিচে কবর।”
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে হঠাৎ বাতাস জোরে বইতে শুরু করল। টিনের চাল কাঁপতে লাগল।
“ওই বাড়ির নিচে তিনজন মেয়ের লাশ চাপা আছিল।”
আমার হাত থেকে গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল।
মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী ঘুরছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। বিছানার পাশে বসে পড়লাম।
“না… না এটা সম্ভব না…”
রফিক শান্ত গলায় বলল, “আমি নিজেও প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। কিন্তু নিজের চোখে দেখছি।”
“পুলিশ?”
সে তিক্ত হাসল।
“মেহরিন আপা পুলিশে যাওয়ার আগেই উনিও হারায় যায়।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“মানে… উনিও মারা গেছে?”
রফিক কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার নীরবতাই সব বলে দিল।
কিছুক্ষণ পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল।
আমি মাথা চেপে ধরে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছে। আজ রাতেও যদি হালিমা খাতুন আমাকে না বাঁচাতেন… তাহলে হয়তো আমিও ওই কবরগুলোর একটায় শুয়ে থাকতাম।
হঠাৎ বাইরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে এলো।
রফিক সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
তার মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।
“ওরা কাছাকাছি আইছে।”
আমার বুক আবার ধড়ফড় করতে শুরু করল।
“এখন কী করব?”
রফিক দ্রুত আলমারির ভেতর থেকে একটা পুরোনো ব্যাগ বের করল। ভেতরে কিছু কাপড়, টাকা আর একটা ছোট টর্চ ছিল।
“ভোর হওয়ার আগেই এই শহর ছাড়তে হবে।”
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “কোথায় যাব?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “একজন মানুষ আছে। যিনি সব জানেন।”
“কে?”
রফিক উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আমরা দুজনেই জমে গেলাম।
একটা না।
দুইটা গাড়ি।
তারপর ধীরে ধীরে কারও পায়ের শব্দ।
টিনের বাড়িটার চারপাশে মানুষ হাঁটছে।
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
রফিক লণ্ঠন নিভিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল।
বাইরে থেকে কারও গলা ভেসে এলো।
“রফিক… দরজা খোল।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠটা চিনতে পারলাম।
মিস্টার ইয়াসিন।
তার স্বর আগের মতোই শান্ত। যেন তিনি রাগ করেননি। যেন তিনি শুধু আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছেন।
“আমি জানি তানিশা ভেতরে আছে।”
আমার শরীর কাঁপতে লাগল।
রফিক খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “যা-ই হোক, শব্দ করবেন না।”
তারপর সে ধীরে ধীরে কোমর থেকে একটা ছোট পিস্তল বের করল।
আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকালাম।
বাইরে আবার ইয়াসিনের কণ্ঠ শোনা গেল।
“তুমি ভুল করছো রফিক। এই মেয়েও শেষ পর্যন্ত মরবেই। যেমন বাকিরা মরছে।”
আমার বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
হঠাৎ শাহানা বেগমের কণ্ঠ শোনা গেল।
“দরজা ভাঙো।”
পরের মুহূর্তেই বিকট শব্দে দরজায় আঘাত পড়ল।
আমি চমকে উঠলাম।
আরেকটা আঘাত।
পুরোনো কাঠের দরজাটা কেঁপে উঠল।
রফিক আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পেছনের জানালা দিয়া পালান। এখনই।”
“আর আপনি?”
সে মৃদু হাসল।
“কেউ তো ওদের আটকাইতে হবে।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।
“না, আমি আপনাকে ফেলে—”
“সময় নাই!”
বাইরে আবার প্রচণ্ড আঘাত পড়ল। দরজার একপাশ ফেটে গেল।
ফাঁক দিয়ে কারও চোখ দেখা গেল।
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে গেলাম।
রফিক বন্দুক তুলে ধরল।
তারপর হঠাৎ গুলির শব্দে পুরো রাত কেঁপে উঠল। গুলির শব্দটা পুরো টিনের বাড়িটাকে কাঁপিয়ে দিল। মুহূর্তের জন্য আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। বাইরে কে গুলি করেছে, রফিক নাকি ইয়াসিনের লোকেরা, সেটা বুঝে ওঠার আগেই রফিক আমার দিকে ঘুরে চিৎকার করে বলল, “পিছনের দিক দিয়া যান! এখনই!”
দরজায় আবার প্রচণ্ড আঘাত পড়ল। পুরোনো কাঠের ফাঁক আরও বড় হয়ে গেল। বাইরে থেকে কারও ছায়া দেখা যাচ্ছিল। আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শরীর যেন কথা শুনছিল না। মনে হচ্ছিল, এই অন্ধকার ঘরের ভেতর দাঁড়িয়েই সব শেষ হয়ে যাবে।
রফিক আবার চিৎকার করল, “তানিশা!”
তার গলার তাড়াহুড়োই আমাকে নড়িয়ে দিল। আমি পিছনের ছোট জানালাটার দিকে দৌড় দিলাম। জানালাটা অর্ধেক ভাঙা ছিল। বাইরে ঝোপঝাড় আর কাদা। আমি কোনোমতে নিজেকে গলিয়ে বাইরে নামতেই কাঁটার ডালে হাত কেটে গেল। ব্যথায় দাঁত চেপে ধরলাম। কিন্তু থামিনি।
ঠিক তখনই পেছনে আরেকটা গুলির শব্দ হলো।
তারপর কারও গোঙানির আওয়াজ।
আমি ঘুরে তাকাতে গিয়েও তাকালাম না। কারণ হালিমা খাতুনের কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল— “পেছনে ফিরবা না।”
আমি ঝোপের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগলাম। জামাকাপড় কাদায় ভিজে ভারী হয়ে গেছে। চুল এলোমেলো। হাত-পা কেটে জ্বলছিল। দূরে লোকজনের চিৎকার ভেসে আসছিল। তারা বুঝে গেছে আমি পালিয়েছি।
হঠাৎ ডানদিকে একটা সরু পথ চোখে পড়ল। সম্ভবত পুরোনো ড্রেনের রাস্তা। চারপাশে এত আগাছা যে বাইরে থেকে সহজে বোঝা যাবে না। আমি দ্রুত সেদিকে ঢুকে পড়লাম।
কিছুদূর যাওয়ার পর থামলাম। হাঁটু মুড়ে বসে হাঁপাতে লাগলাম। বুকের ভেতরটা এখনও ধড়ফড় করছে। দূর থেকে ভাঙা টিনের শব্দ, মানুষের চিৎকার, আর কুকুরের ডাক ভেসে আসছিল। কিন্তু আমি এখন অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে আছি।
আমার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল।
রফিক কি বেঁচে আছে?
কিন্তু আমি জানতাম, এখন ফিরে যাওয়া মানে আত্মহত্যা।
আমি ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা চিনতাম না। চারপাশে শুধু ফাঁকা জমি আর গাছপালা। আকাশে মেঘ জমেছে। মনে হচ্ছিল আবার বৃষ্টি নামবে।
কয়েক মিনিট হাঁটার পর দূরে একটা আলো দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে বুঝলাম, ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। দোকান বন্ধ, কিন্তু পাশের ঘরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে। আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সাহায্য চাইব? নাকি লুকিয়ে থাকব?
ঠিক তখনই দূরে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো।
আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। দ্রুত দোকানের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম।
দুইটা কালো গাড়ি রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল। গাড়ির কাঁচ কালো ছিল। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট দেখলাম।
সামনের গাড়িতে মিস্টার ইয়াসিন বসে আছে।
তার মুখে কোনো রাগ নেই। বরং অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব। যেন সে জানে আমি বেশি দূর যেতে পারব না।
গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পরও আমি কিছুক্ষণ নড়লাম না। তারপর ধীরে ধীরে বের হলাম। চারপাশ আবার নীরব হয়ে গেছে।
ঠিক তখন দোকানের পেছনের দরজাটা কড়াৎ করে খুলল।
আমি চমকে উঠলাম।
একজন বৃদ্ধ লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা দাড়ি। গায়ে পুরোনো চাদর।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “তুমি কি ওই বাড়ি থেইকা পালাইছো?”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ভয় পাইও না। তোমার আগে আরও দুইজন এই রাস্তা দিয়া পালাইতে চাইছিল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কি বললেন?”
লোকটা দরজা একটু খুলে বললেন, “ভেতরে আইসো। বাইরে দাঁড়াইলে নিরাপদ না।”
আমি কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু আশেপাশে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ঘরটা ছোট। কিন্তু পরিষ্কার। একটা কাঠের টেবিল, দুইটা চেয়ার, আর দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ঘড়ি। চুলার ওপরে পানি গরম হচ্ছিল।
লোকটা আমাকে বসতে বলল। তারপর এক কাপ গরম চা এগিয়ে দিল।
আমি কাপটা হাতে নিয়েও খাইনি। এখন আর কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারছি না।
বৃদ্ধ সেটা বুঝতে পারলেন।
হালকা হেসে বললেন, “চায়ে কিছু মেশানো নাই মা।”
তার কথায় আমার বুকটা কেমন করে উঠল। কারণ কয়েক ঘণ্টা আগেও আমি একটা বিষমেশানো দুধ খেতে যাচ্ছিলাম।
লোকটা ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারে বসলেন।
“আমার নাম কাদের মিয়া। এই এলাকায় অনেক বছর ধইরা আছি।”
আমি নিচু গলায় বললাম, “আপনি ওই বাড়ির কথা জানেন?”
লোকটার চোখের ভেতর ছায়া নেমে এলো।
“অনেক কিছুই জানি। কিন্তু মানুষ সব জানলেও মুখ খোলে না।”
“কেন?”
“কারণ যারা মুখ খোলে… তারা বাঁচে না।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম।
কাদের মিয়া কিছুক্ষণ আমাকে দেখলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার স্বামীর বাবা কেমন মানুষ আছিল, জানো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“ইয়াসিনের বাবা হাজী মতিউর রহমান এই এলাকার সবচেয়ে ধনী মানুষ আছিল। কিন্তু মানুষের সামনে যত ধার্মিক সাজত, ভেতরে তত নিষ্ঠুর আছিল।”
আমি মন দিয়ে শুনছিলাম।
“বহু বছর আগে এই বাড়িতে এক মেয়ে কাজ করত। নাম ছিল রহিমা। খুব সুন্দরী মেয়ে। গরিব পরিবার। হঠাৎ একদিন মেয়েটা হারায় যায়। সবাইরে বলা হয় সে পালাইছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ অন্য কথা বলত।”
আমার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে অস্বস্তি বাড়ছিল।
“কী কথা?”
কাদের মিয়া চুপচাপ আমার দিকে তাকালেন।
“মানুষ বলত, ওই বাড়ির পুরুষরা যেই মেয়েরে পছন্দ করত, তার জীবন আর নিজের থাকত না।”
আমার হাতের কাপ কেঁপে উঠল।
“আপনি বলতে চাচ্ছেন… এসব অনেক পুরোনো?”
“হুম।”
তিনি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“এই বাড়ির পাপ নতুন না মা। অনেক পুরোনো।”
বাইরে হঠাৎ বজ্রপাত হলো। পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “কিন্তু তারা এসব করছে কেন?”
কাদের মিয়া এবার সরাসরি উত্তর দিলেন না।
বরং উঠে গিয়ে পুরোনো একটা কাঠের বাক্স খুললেন। ভেতর থেকে হলদেটে হয়ে যাওয়া একটা ছবি বের করলেন।
তিনি ছবিটা আমার হাতে দিলেন।
ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন তরুণ শাহানা বেগম। তার পাশে একজন মধ্যবয়সী লোক— সম্ভবত ইয়াসিনের বাবা। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট ছেলে।
মিস্টার ইয়াসিন।
কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল অন্য জায়গায়।
ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন মেয়ে।
মুখ আধাআধি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি তাকে চিনে ফেললাম।
আমার বুক ধক করে উঠল।
মেয়েটা হালিমা খাতুন।
“এই ছবি আপনার কাছে কেন?”
কাদের মিয়া ধীরে ধীরে বললেন, “কারণ হালিমা একসময় এই বাড়ির কাজের লোক ছিল না।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে তার দিকে তাকালাম।
“তাহলে?”
কাদের মিয়া খুব নিচু গলায় বললেন,
“সে এই পরিবারেরই মানুষ ছিল।”
আমার শরীরের রক্ত যেন জমে গেল।
“মানে?”
“হালিমা ছিল মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী।”
ঘরের ভেতর যেন সব শব্দ থেমে গেল।
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
সেই কুঁজো হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা মহিলা… যাকে সবাই কাজের লোক ভাবত…
তিনি একসময় এই বাড়ির গৃহকর্ত্রী ছিলেন?
কাদের মিয়া ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, “বিয়ের কয়েক বছর পর মতিউর রহমান আরেকটা বিয়ে করে। তারপর শুরু হয় অত্যাচার। হালিমারে ধীরে ধীরে বাড়ির লোকজনের সামনে কাজের বেটির মতো ব্যবহার করা শুরু হয়। বাইরে কেউ যেন সত্যিটা না জানে।”
আমার বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠছিল।
“আর ইয়াসিন?”
“ছোটবেলা থেইকাই নিজের বাবার মতো হইছে।”
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
হঠাৎ বাইরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
কাদের মিয়া সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেলেন।
তিনি লণ্ঠনের আলো কমিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকালেন।
তার মুখের রং বদলে গেল।
“ওরা এখানে আইছে।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কী?”
দূরে কালো গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছিল।
কাদের মিয়া দ্রুত আমার দিকে ফিরে বললেন, “তোমারে এখুনি লুকাইতে হবে।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
“কোথায়?”
তিনি মেঝের একটা পুরোনো কার্পেট সরালেন।
নিচে কাঠের দরজা।
গোপন ঘর।
তিনি দরজাটা খুলতেই নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে এলো।
“তাড়াতাড়ি নামো।”
আমি নিচে নামতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলাম।
কারণ বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এসেছে।
তারপর খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তানিশা… আমি জানি তুমি এখানে আছো।মিস্টার ইয়াসিনের কণ্ঠটা বাইরে রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে অস্বাভাবিক পরিষ্কার শোনাচ্ছিল। শান্ত, ধীর, নিয়ন্ত্রিত। যেন তিনি কাউকে হুমকি দিচ্ছেন না, বরং অনেক পরিচিত কাউকে বাড়ি ফিরতে ডাকছেন। কিন্তু সেই স্বরের ভেতর এমন কিছু ছিল, যা আমার বুকের ভেতর ঠান্ডা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল।
কাদের মিয়া দ্রুত ফিসফিস করে বললেন, “নিচে নামো। এখনই।”
আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। কাঠের দরজাটা ধরে নিচে নামতে লাগলাম। সরু সিঁড়ি। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাদের মিয়া আমার হাতে একটা ছোট টর্চ ধরিয়ে দিলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “যতক্ষণ না আমি দরজা খুলি, কোনো শব্দ করবা না।”
পরের মুহূর্তেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। ওপরে কার্পেট টেনে দেওয়ার শব্দ পেলাম। তারপর সব অন্ধকার।
আমি কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম। নিঃশ্বাসের শব্দও যেন বেশি জোরে শোনা যাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে টর্চ জ্বালালাম।
ঘরটা খুব বড় না। কিন্তু পুরোনো জিনিসে ভরা। কাঠের বাক্স, মরিচা ধরা ট্রাঙ্ক, ছেঁড়া কাপড়, পুরোনো বই। দেয়ালের প্লাস্টার উঠে গেছে। মনে হচ্ছিল বহু বছর কেউ এখানে আসেনি।
ওপরে দরজায় টোকা পড়ল।
একবার।
দুইবার।
তারপর মিস্টার ইয়াসিনের গলা।
“কাদের চাচা, দরজা খুলেন।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কয়েক সেকেন্ড পর কাদের মিয়ার স্বর শোনা গেল। স্বাভাবিক শোনানোর চেষ্টা করছেন।
“এত রাতে?”
ইয়াসিন খুব শান্তভাবে বলল, “আমার স্ত্রী হারাইছে। এইদিকে আইতে দেখছে কেউ।”
কাদের মিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, “আমি কিছু দেখি নাই।”
বাইরে আরেকজনের পায়ের শব্দ শোনা গেল। সম্ভবত শাহানা বেগম।
তিনি বিরক্ত গলায় বললেন, “মিথ্যা কইয়েন না কাদের ভাই। মেয়েটা এই রাস্তা দিয়াই আসছে।”
আমার বুক ধড়ফড় করছিল। মনে হচ্ছিল ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আমার নিঃশ্বাসও শুনতে পাচ্ছে।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো।
তারা ভেতরে ঢুকেছে।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ওপরে ধীর পায়ে হাঁটার শব্দ। কাঠের মেঝে কড়মড় করছে। কেউ যেন ঘরের চারপাশ দেখছে।
ইয়াসিনের গলা আবার শোনা গেল।
“আপনি জানেন, আমি কাউরে কষ্ট দিতে চাই না।”
তার গলায় অদ্ভুত কোমলতা। কিন্তু এখন আমি জানি, এই কোমলতার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে।
কাদের মিয়া এবার একটু শক্ত গলায় বললেন, “আমি বুড়া মানুষ। ঝামেলায় যাইতে চাই না।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে ইয়াসিন বলল, “তানিশা যদি এখানে থাকে, তাকে আমার কাছে ফিরাই দেন। সে অসুস্থ। ভয় পাইছে।”
আমার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। এত সহজভাবে সে মিথ্যা বলতে পারে!
হঠাৎ শাহানা বেগমের কণ্ঠ শোনা গেল, “ঘরটা ভালো করে দেখো।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
ওপরে কারও হাঁটার শব্দ আরও কাছে এলো। মনে হচ্ছিল ঠিক আমার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমি টর্চ নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকারে দেয়ালের সঙ্গে গা চেপে দাঁড়ালাম।
তারপর একটা শব্দ।
কার্পেট সরানোর শব্দ।
আমার বুকের রক্ত যেন থেমে গেল।
কেউ নিচের দরজার ঠিক ওপরে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললাম।
কয়েক সেকেন্ড পুরো নীরবতা।
তারপর ইয়াসিনের গলা।
“এটা কী?”
কাদের মিয়া উত্তর দিলেন, “পুরোনো স্টোররুম। বহু বছর খুলি নাই।”
আমার হাত কাঁপছিল। যদি এখন দরজাটা খুলে যায়?
শাহানা বেগম ঠান্ডা গলায় বললেন, “খুলে দেখেন।”
আমার মনে হলো সব শেষ।
ঠিক তখনই বাইরে হঠাৎ কুকুরের বিকট চিৎকার শোনা গেল। তারপর দূরে কোথাও মানুষের হৈচৈ।
ওপরে দাঁড়ানো লোকগুলোর মধ্যে মুহূর্তের জন্য অস্থিরতা তৈরি হলো।
একজন বলল, “সাহেব, রাস্তার দিকে কেউ দৌড়াইতেছে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ইয়াসিন বলল, “চলো।”
তার গলায় বিরক্তি।
পায়ের শব্দ দূরে সরে যেতে লাগল। তারপর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। গাড়ির দরজা। ইঞ্জিন স্টার্ট।
আমি তখনও নড়তে পারছিলাম না।
অনেকক্ষণ পর ওপরে কাঠের দরজা খুলল।
কাদের মিয়া নিচু গলায় বললেন, “ওরা গেছে।”
আমি ধীরে ধীরে ওপরে উঠলাম। হাঁটু কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে গেছে।
কাদের মিয়া দরজা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কপালে ঘাম জমেছে।
“অল্পের জন্য বাঁচলা।”
আমি শুকনো গলায় বললাম, “ওরা কি সত্যি চলে গেছে?”
তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন না।
জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইয়াসিন এত সহজে ছাড়ার মানুষ না।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
আমি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লাম। মাথা তখনও ঘুরছে। গত কয়েক ঘণ্টায় এত কিছু ঘটেছে যে মনে হচ্ছিল সব দুঃস্বপ্ন।
হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথায় এলো।
“আপনি বলেছিলেন হালিমা খাতুন এই পরিবারের মানুষ ছিল।”
কাদের মিয়া ধীরে মাথা নাড়লেন।
“হুম।”
“তাহলে উনি এত বছর চুপ ছিলেন কেন?”
কাদের মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “কারণ উনার আর যাওয়ার জায়গা আছিল না।”
তিনি ধীরে ধীরে আবার সেই পুরোনো বাক্সটা খুললেন। এবার ভেতর থেকে একটা ডায়েরি বের করলেন। চামড়ার মলাট। অনেক পুরোনো।
“এইটা হালিমার।”
আমি ডায়েরিটা হাতে নিলাম। পাতাগুলো হলদেটে হয়ে গেছে।
প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা সাধারণ কথা। সংসার, রান্না, গ্রামের আত্মীয়স্বজন। তারপর ধীরে ধীরে লেখাগুলো বদলাতে শুরু করেছে।
এক জায়গায় লেখা—
“আজ আবার ও আমাকে মারল। কারণ আমি জিজ্ঞেস করছিলাম, কেন ওই মেয়েটারে বাড়িতে আনা হইছে।”
আরেক জায়গায়—
“ইয়াসিন আজ প্রথমবার আমার দিকে ওইভাবে তাকাইছে। ওর চোখে ঠিক ওর বাবার ছায়া।”
আমার শরীর শিউরে উঠল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা নাম চোখে পড়ল।
মেহরিন।
আমি থেমে গেলাম।
সেই তৃতীয় স্ত্রী।
নিচে লেখা—
“মেয়েটা অনেক কিছু বুঝতে শুরু করছে। আমি ওরে বাঁচাইতে চাই। কিন্তু দেরি হয়ে যাইতেছে।”
আমার বুক ধকধক করতে লাগল।
পরের পাতায় কালি ছড়িয়ে গেছে। তবু কিছু শব্দ বোঝা যাচ্ছিল।
“নিচতলার ঘর…”
“মাটি খোঁড়া…”
“রাতের চিৎকার…”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“ওই বাড়ির নিচে সত্যিই কবর আছে…”
কাদের মিয়া চুপচাপ বসে ছিলেন।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কখনও কাউকে বলেননি?”
তিনি তিক্ত হাসলেন।
“কে বিশ্বাস করত?”
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
ঠিক তখনই বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের চালে টুপটাপ শব্দ পড়তে লাগল।
কাদের মিয়া হঠাৎ নিচু গলায় বললেন, “একটা জিনিস এখনও তুমি জানো না।”
আমি তাকালাম।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
“তোমারে শুধু মারার জন্য বিয়ে করা হয় নাই।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“মানে?”
তিনি উত্তর দেওয়ার আগে দ্বিধা করলেন।
“ইয়াসিন যাদের বিয়ে করে… তাদের সবার একটা মিল আছে।”
আমি বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
“কী মিল?”
কাদের মিয়া ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমাদের চেহারা প্রায় একই রকম।”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল।
আমার মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো ছবিগুলো। একই সোনার কাঁটা। একই লাল শাড়ি। একই ধরনের মুখ।
হঠাৎ গা শিউরে উঠল।
“কিন্তু কেন?”
কাদের মিয়া এবার উঠে দাঁড়ালেন। জানালার পাশে গিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
অনেকক্ষণ পর খুব নিচু গলায় বললেন,
“কারণ ইয়াসিন অন্য কাউরে খুঁজতেছে।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“কাকে?”
তিনি ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
তার চোখে এমন এক অদ্ভুত ভয় ছিল, যা আমি আগে দেখিনি।
“তার মৃত বোনরে।”
আমার শরীর জমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড আমি কোনো শব্দ করতে পারলাম না।
কাদের মিয়া ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, “ইয়াসিনের একটা ছোট বোন ছিল। নাম ইরা। ছোটবেলায় মারা যায়। কিন্তু ইয়াসিন কখনও মানতে পারে নাই।”
আমার হাত কাঁপছিল।
“তাই সে…?”
“যেই মেয়েদের চেহারা ইরার মতো লাগে, তাদের খুঁজে বের করে।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“তারপর বিয়ে করে…”
কাদের মিয়া ধীরে মাথা নাড়লেন।
“শুরুতে সে স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে মানসিক অবস্থা বদলাইতে থাকে। সে চায় মেয়েটা পুরোপুরি ইরার মতো আচরণ করুক। একই কাপড়, একই চুল, একই কথা।”
আমার মনে পড়ে গেল বিয়ের আগে শাহানা বেগমের অদ্ভুত আচরণ। আমার পোশাক বেছে দেওয়া। চুল ঠিক করে দেওয়া। এমনকি হাসার ধরন নিয়েও মন্তব্য।
আমার বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
“আর যখন তারা সেটা পারে না…”
কাদের মিয়া বাকিটা বললেন না।
কারণ উত্তরটা আমি নিজেই বুঝে গেছি।
হঠাৎ বাইরে বজ্রপাত হলো। ঘর কেঁপে উঠল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় আবার টোকা পড়ল।
একবার।
ধীরে।
তারপর একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এলো।
“দরজা খোলেন… আমি তানিশার সাথে কথা বলতে চাই। দরজার ওপাশের নারীকণ্ঠটা শুনে আমার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা চাপ অনুভব হলো। গলাটা খুব শান্ত। বয়স্কও না, আবার খুব কমবয়সীও না। কিন্তু কণ্ঠে এমন এক ধরনের ক্লান্তি ছিল, যেন বহু বছর ধরে ভয় আর দুশ্চিন্তার মধ্যে বেঁচে আছে।
আমি আর কাদের মিয়া দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়েছে। টিনের চালের ওপর পানি পড়ে একটানা ঝমঝম আওয়াজ তৈরি হচ্ছে।
আবার দরজায় টোকা পড়ল।
এইবার একটু জোরে।
“আমি একা আইছি,” নারীকণ্ঠটা বলল। “দয়া করে দরজা খোলেন।”
কাদের মিয়া ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকালেন। চোখে সতর্কতা। তিনি নিচু গলায় বললেন, “তুমি পেছনে থাকো।”
তারপর খুব সাবধানে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে দরজার হুক খুললেন না, শুধু জিজ্ঞেস করলেন, “কে আপনি?”
বাইরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এলো।
“আমার নাম সাদিয়া।”
নামটা শুনে আমি কিছুই বুঝলাম না। কিন্তু কাদের মিয়ার মুখ হঠাৎ কেমন শক্ত হয়ে গেল।
তিনি ধীরে বললেন, “এতদিন পর?”
বাইরে দাঁড়ানো মহিলা ক্লান্ত স্বরে বললেন, “আমি জানি, আপনি আমারে দেখতে চান না। কিন্তু মেয়েটারে এখনই এখান থেইকা সরান দরকার।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
কাদের মিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অবশেষে দরজা খুললেন।
বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটাকে দেখে প্রথমেই আমার চোখ আটকে গেল তার মুখে। সাদা সালোয়ার-কামিজ ভিজে গায়ের সঙ্গে লেগে আছে। কাঁধ পর্যন্ত চুল। মুখ ফ্যাকাসে। চোখের নিচে কালি। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
আমি যেন তাকে কোথাও দেখেছি।
মহিলাটাও আমাকে দেখেই থেমে গেল।
তার চোখে মুহূর্তের জন্য এমন এক বিস্ময় ফুটে উঠল, যেন সে কোনো মৃত মানুষকে সামনে দেখছে।
তার ঠোঁট নড়ল।
“ঠিক… ইরার মতো।”
আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
কাদের মিয়া বিরক্ত গলায় বললেন, “তুমি এখানে কেন আইছো?”
মহিলাটা ধীরে ভেতরে ঢুকল। তারপর দরজাটা বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল কীভাবে শুরু করবে বুঝতে পারছে না।
অবশেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমারে সময় খুব কম।”
আমি গলা শুকিয়ে আসা স্বরে বললাম, “আপনি কে?”
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
চোখ নামিয়ে বলল, “আমি এই পরিবারের মানুষ আছিলাম।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কী সম্পর্ক?”
মহিলাটা ধীরে মাথা তুলল।
“আমি ইয়াসিনের প্রথম স্ত্রী।”
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলাম না কী শুনলাম। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে গেল রফিকের কথা। সে বলেছিল প্রথম স্ত্রী সামিয়া মারা গেছে।
কিন্তু এই মহিলা তো জীবিত।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “আপনি… সামিয়া?”
সে ধীরে মাথা নাড়ল।
আমার শরীর শিউরে উঠল।
“কিন্তু সবাই তো বলে আপনি মারা গেছেন।”
সামিয়া তিক্ত হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না।
“ওরা চায় সবাই তাই বিশ্বাস করুক।”
আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এতক্ষণ ধরে যাকে মৃত ভাবছিলাম, সে এখন আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
কাদের মিয়া চুপচাপ একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন। সামিয়া বসে পড়ল। তার হাত কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল বহুদিন ঠিকমতো ঘুমায়নি।
আমি ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে বসলাম।
“সত্যিটা কী?”
সামিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “আমি মরিনি। কিন্তু যেদিন ওই বাড়ি থেইকা পালাইছি, সেদিনের পর থেইকা আগের মানুষও নাই।”
বাইরে আবার বজ্রপাত হলো।
সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“আমার বিয়ের পর প্রথম কয়দিন সব স্বাভাবিক আছিল। ইয়াসিন খুব শান্ত, ভদ্র। শাহানা বেগমও অনেক আদর করত। কিন্তু এক সপ্তাহ যাওয়ার পর সব বদলাইতে শুরু করে।”
আমি নিঃশব্দে শুনছিলাম।
“ওরা আমার চুল কাটতে দিত না। একটা নির্দিষ্ট স্টাইলে রাখতে বলত। একদিন শাহানা বেগম আমারে একটা পুরোনো লাল শাড়ি দিল। বলল, ‘ইয়াসিন এই রঙ পছন্দ করে।’ তারপর আমার ঘরে একটা পুরোনো ছবি রাখল।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“ইরার ছবি?”
সামিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
“প্রথমে ভাবছিলাম, মৃত বোনরে ভালোবাসে, এই জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, ব্যাপারটা অন্যরকম।”
সে থামল। গলা শুকিয়ে গেছে। কাদের মিয়া তাকে পানি দিলেন।
কিছুক্ষণ পর আবার বলতে শুরু করল।
“ইয়াসিন মাঝে মাঝে আমারে ইরা বলে ডাকত। প্রথমে ভুল মনে করতাম। পরে বুঝলাম, সে ইচ্ছা করেই করে।”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
“একদিন রাতে আমি ঘুমাইতেছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, ইয়াসিন আমার বিছানার পাশে বসে আছে। অন্ধকারে আমার মুখের দিকে তাকায়া আছে।”
সামিয়ার চোখের ভেতর আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠল, যেন দৃশ্যটা এখনও তার সামনে ভাসছে।
“আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে। সে হাসল। তারপর বলল, ‘তুমি যদি পুরোপুরি ইরার মতো হইতা… তাইলে কেউ তোমারে আমার কাছ থেইকা নিতে পারত না।’”
আমার গা শিউরে উঠল।
সামিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই রাতের পর আমি বুঝছিলাম, এই মানুষটা স্বাভাবিক না।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল।
“তারপর?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তারপর শুরু হয় ওষুধ।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“প্রতিদিন রাতে দুধ বা শরবতের মধ্যে কিছু মিশাইত। খাওয়ার পর মাথা ঝিমঝিম করত। ঘুম পাইত। সকালে কিছু মনে থাকত না।”
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, আমার সাথেও ঠিক একই জিনিস হতে যাচ্ছিল।
সামিয়া আবার বলল, “একদিন ভুল করে আমি গ্লাসটা খাই নাই। রাতে জেগা ছিলাম। তখন শুনলাম, শাহানা বেগম ইয়াসিনরে কইতেছে, ‘মেয়েটা আগেরগুলার মতো না। সাবধানে থাকো।’”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“আগেরগুলা মানে?”
সামিয়া আমার দিকে তাকাল।
“আমার আগেও একজন আছিল।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি অবিশ্বাস নিয়ে বললাম, “কিন্তু আপনি তো প্রথম স্ত্রী!”
সামিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
“না। আমার আগেও একটা বিয়ে হইছিল।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তার নাম কেউ জানে না। কারণ ওই মেয়েটা বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই হারায় যায়।”
আমি অনুভব করলাম, এই পরিবারের ইতিহাস আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক অন্ধকার।
কাদের মিয়া নিচু গলায় বললেন, “ওই মেয়েটার কোনো ছবি পর্যন্ত রাখে নাই ওরা।”
সামিয়া আবার বলতে লাগল, “আমি পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ধরা পড়ে যাই। ওই রাতেই প্রথম নিচতলার ঘরটা দেখি।”
আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“কবর?”
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
“মাটির গন্ধ এখনও আমার নাকে লাগে।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ ভারী নীরবতা নেমে এলো।
বাইরে বৃষ্টি থামতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আমি ধীরে বললাম, “আপনি কীভাবে পালালেন?”
সামিয়ার চোখে অদ্ভুত একটা ছায়া নেমে এলো।
“হালিমা আমারে বাঁচাইছিল।”
আমার বুক মোচড় দিয়ে উঠল।
“যেদিন সবাই ভাবছে আমি মারা গেছি, সেদিন আসলে হাসপাতালের আগেই আমাকে গাড়ি থেইকা নামায়া ফেলা হয়। কারণ আমি তখনও বাঁচা আছিলাম। হালিমা গোপনে রফিকরে সাহায্য করতে বলে।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
“তারপর থেইকা আমি লুকায়া আছি।”
কথাগুলো বলার সময় তার চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট ছিল। যেন প্রতিটা দিন সে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “এখন হঠাৎ ফিরলেন কেন?”
সামিয়া সরাসরি উত্তর দিল।
“কারণ এবার ব্যাপার আলাদা।”
“কীভাবে?”
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“ইয়াসিন এবার তোমারে মারতে চায় না।”
আমার বুক কেঁপে উঠল।
“মানে?”
সামিয়া খুব নিচু গলায় বলল,
“সে বিশ্বাস করে তুমি ইরার মতো দেখতে না… তুমি ইরাই।”
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
আমি কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারলাম না।
“এটা পাগলামি।”
“হ্যাঁ,” সামিয়া ফিসফিস করল। “কিন্তু ও এখন পুরোপুরি বাস্তবতা হারায় ফেলছে।”
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
সামিয়া এবার আরও নিচু গলায় বলল, “সবচেয়ে ভয়ের কথা জানো?”
আমি তাকালাম।
সে ধীরে বলল,
“ইরা যেভাবে মারা গেছিল… সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।”
আমার বুকের ভেতর ধপ করে উঠল।
“কী বলতে চাইছেন?”
সামিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে হঠাৎ গাড়ির ব্রেকের শব্দ শোনা গেল।
তারপর একসাথে কয়েকজন মানুষের পায়ের শব্দ।
কাদের মিয়ার মুখ মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল।
তিনি জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“ওরা আবার আইছে… এইবার অনেক লোক নিয়া।” কাদের মিয়ার কণ্ঠে এমন একটা চাপা আতঙ্ক ছিল, যেটা শুনেই বুঝে গেলাম পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। তিনি জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। মুখের রং বদলে গেছে। আমি আর সামিয়া দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম।
বাইরে একটার পর একটা গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে আসছিল। ভারী বুটের আওয়াজ। কয়েকজন মানুষ বাড়িটার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
আমার বুকের ভেতরটা আবার দ্রুত কাঁপতে শুরু করল।
সামিয়া নিচু গলায় বলল, “ওরা এইবার খালি খুঁজতে আসে নাই।”
কাদের মিয়া জানালা থেকে সরে এসে দ্রুত ঘরের বাতি নিভিয়ে দিলেন। চারপাশ আবার আধো অন্ধকারে ডুবে গেল। শুধু বাইরে গাড়ির হেডলাইটের আলো মাঝে মাঝে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে দেয়ালে কাঁপা ছায়া ফেলছিল।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “এখন কী করব?”
কাদের মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “পালানোর রাস্তা একটা আছে। কিন্তু ঝুঁকি আছে।”
“কোথায়?”
তিনি ঘরের পেছনের দেয়ালের দিকে ইশারা করলেন। সেখানে পুরোনো একটা কাঠের আলমারি দাঁড়িয়ে আছে।
“ওইটার পিছনে সরু রাস্তা আছে। আগে এই এলাকায় চোরাকারবারিরা ব্যবহার করত। সোজা পুরোনো মিলের দিকে যায়।”
সামিয়া দ্রুত বলল, “ওরা যদি রাস্তা চিনে ফেলে?”
কাদের মিয়া মাথা নাড়লেন।
“চিনে না। অনেক বছর ধইরা বন্ধ।”
বাইরে ঠিক তখনই কারও গলা ভেসে এলো।
“চারপাশ দেখো!”
আমি সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠটা চিনতে পারলাম।
শাহানা বেগম।
তার স্বরে আগের মতো ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং বিরক্তি আর রাগ মিশে আছে।
তারপর মিস্টার ইয়াসিনের গলা শোনা গেল।
“তানিশা এখানে আছে। আমি জানি।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সামিয়া খুব নিচু গলায় বলল, “ও যখন এইভাবে কথা বলে, তার মানে সে নিয়ন্ত্রণ হারানো শুরু করছে।”
আমি তাকালাম।
“মানে?”
সামিয়া ফিসফিস করে বলল, “ইয়াসিন যত শান্ত দেখায়, ভেতরে তত অস্থির হয়। আর সে যখন বিশ্বাস করে কেউ তার কাছ থেইকা কিছু কাইড়া নিচ্ছে… তখন সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে যায়।”
কাদের মিয়া আর সময় নষ্ট করলেন না। দ্রুত আলমারিটা সরাতে লাগলেন। আলমারির পেছনে সরু কাঠের দরজা দেখা গেল। নিচে অন্ধকার সুড়ঙ্গ।
ঠিক তখনই সামনের দরজায় জোরে আঘাত পড়ল।
পুরো ঘর কেঁপে উঠল।
“দরজা খোলেন!” বাইরে একজন চিৎকার করল।
কাদের মিয়া নিচু গলায় বললেন, “তোমরা নামো।”
আমি আর সামিয়া একে অপরের দিকে তাকালাম। তারপর দ্রুত নিচে নামতে শুরু করলাম। সরু সিঁড়ি। ভেজা গন্ধ। দেয়ালের মাটি হাত ছুঁলেই ঝরে পড়ছে।
নামার আগে আমি শেষবারের মতো পেছনে তাকালাম।
কাদের মিয়া দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন।
আমি কাঁপা গলায় বললাম, “আপনি?”
তিনি হালকা হাসলেন।
“কেউ না থাকলে ওরা সন্দেহ করবে।”
আমার বুক কেমন করে উঠল।
“কিন্তু—”
“যাও।”
তারপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আমরা অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর দাঁড়িয়ে রইলাম। ওপরে দরজা ভাঙার শব্দ ভেসে আসছিল। কারও চিৎকার। ভারী পায়ের শব্দ।
সামিয়া আমার হাত ধরে বলল, “চলো।”
আমরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম। সুড়ঙ্গটা খুব সরু। দুজন পাশাপাশি হাঁটা যায় না। মাথার ওপর মাকড়সার জাল। কোথাও কোথাও পানি পড়ছে। বাতাসে পুরোনো মাটির গন্ধ।
আমি হাঁটতে হাঁটতে ফিসফিস করে বললাম, “আপনি একটু আগে বলছিলেন ইরার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।”
সামিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইল। মনে হচ্ছিল কথা বলতে চাইছে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বলল, “ইরা মারা যায় যখন তার বয়স বারো।”
আমরা সামনে এগোচ্ছিলাম। অন্ধকারে শুধু আমাদের টর্চের আলো কাঁপছিল।
“সবাইরে বলা হয়, ছাদ থেইকা পড়ে গেছে। কিন্তু হালিমা অন্য কিছু দেখছিল।”
আমার বুক ধড়ফড় করছিল।
“কি?”
সামিয়া খুব নিচু গলায় বলল, “ইরা পড়ে যাওয়ার আগে বাড়িতে চিৎকার শোনা গেছিল।”
আমি থেমে গেলাম।
“আপনি বলতে চাচ্ছেন…”
সামিয়া ধীরে বলল, “হালিমার বিশ্বাস, ইরা নিজে পড়ে নাই।”
আমার শরীর শিউরে উঠল।
“তাহলে কে—”
সে উত্তর দিল না।
শুধু বলল, “ওই ঘটনার পর থেইকাই ইয়াসিন বদলাইতে শুরু করে। আগে সে অদ্ভুত ছিল, কিন্তু পুরোপুরি বিপজ্জনক না। ইরার মৃত্যুর পর সে বাস্তবতা থেইকা আলাদা হয়ে যায়।”
আমরা হাঁটতেই থাকলাম। সুড়ঙ্গটা যেন শেষই হচ্ছে না।
ওপরে মাঝে মাঝে মৃদু শব্দ ভেসে আসছিল। সম্ভবত বাড়ির ওপর দিয়েই রাস্তা গেছে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “শাহানা বেগম সব জানেন?”
সামিয়া তিক্ত স্বরে বলল, “জানেন? উনিই সব লুকাইছে।”
তার গলায় স্পষ্ট ঘৃণা।
“ইয়াসিন ছোটবেলা থেইকা অসুস্থ। কিন্তু শাহানা বেগম কখনও চিকিৎসা করায় নাই। বরং সবসময় ওরে আড়াল করছে।”
আমি ধীরে বললাম, “কেন?”
সামিয়া অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কারণ এই পরিবারে ইজ্জত সত্যির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠল।
অনেকক্ষণ হাঁটার পর সামনে ক্ষীণ আলো দেখা গেল।
সুড়ঙ্গ শেষ।
আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম।
ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগতেই বুঝলাম কতক্ষণ ধরে বন্ধ জায়গায় ছিলাম। চারপাশে বিশাল ফাঁকা জায়গা। দূরে ভাঙা চিমনি দাঁড়িয়ে আছে।
পুরোনো মিল।
জায়গাটা পরিত্যক্ত। মরিচা ধরা লোহার কাঠামো। ভাঙা জানালা। চারপাশে আগাছা।
আকাশে মেঘ সরে গেছে। চাঁদের আলোয় জায়গাটা আরও নির্জন লাগছিল।
সামিয়া চারপাশ দেখে নিচু গলায় বলল, “কিছুক্ষণের জন্য নিরাপদ।”
আমি ক্লান্ত হয়ে ভাঙা দেয়ালের পাশে বসে পড়লাম। মাথা ঝিমঝিম করছে। গত দুইদিনে যেন পুরো জীবন বদলে গেছে।
সামিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ বলল, “তোমারে একটা জিনিস দেখানো দরকার।”
আমি তাকালাম।
সে ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পুরোনো একটা ছবি বের করল।
ছবিটা হাতে নিয়ে আমার বুক ধক করে উঠল।
একটা ছোট মেয়ে।
বয়স বারো-তেরো।
চুল বাঁধা। মুখে হালকা হাসি।
আর সেই মুখ—
আমার মতো।
আমি অবিশ্বাস নিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এতটা মিল সম্ভব?
মনে হচ্ছিল কেউ আমার ছোটবেলার ছবি এনে সামনে ধরেছে।
সামিয়া নিচু গলায় বলল, “এইটা ইরা।”
আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“না… এটা সম্ভব না…”
“এই কারণেই ইয়াসিন তোমারে ছাড়বে না।”
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাথার ভেতর সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ আমার মনে পড়ল—
বিয়ের আগে প্রথমদিন ইয়াসিন আমাকে দেখার সময় যেভাবে স্থির হয়ে গিয়েছিল…
শাহানা বেগমের অদ্ভুত আচরণ…
আমার জন্য বিশেষভাবে বেছে আনা পোশাক…
সবকিছু যেন ধীরে ধীরে জায়গামতো বসতে শুরু করল।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“কিন্তু আমি তো ইরা না।”
সামিয়া ধীরে বলল, “ওর কাছে সত্যি গুরুত্বপূর্ণ না। ও যা বিশ্বাস করতে চায়, সেটাই সত্যি।”
বাইরে হঠাৎ ধাতব কিছুর শব্দ হলো।
আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম।
সামিয়া দ্রুত আলো নিভিয়ে দিল।
কয়েক সেকেন্ড পুরো নীরবতা।
তারপর দূরে কারও পায়ের শব্দ।
মিলের ভেতরে কেউ হাঁটছে।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সামিয়া খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “ওরা এত তাড়াতাড়ি রাস্তা পাইছে?”
আমরা অন্ধকারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।
পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছিল।
একটা ছায়া ভাঙা দরজার সামনে থামল।
তারপর খুব পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তানিশা?”
আমি জমে গেলাম।
রফিক।
সামিয়া দ্রুত টর্চ জ্বালাল।
রফিককে দেখে আমার বুকের ভেতর চাপা স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুঝলাম কিছু একটা ভুল।
তার শার্টে রক্ত।
বাম কাঁধ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ ফ্যাকাসে।
আমি দৌড়ে এগিয়ে গেলাম।
“আপনি ঠিক আছেন?”
রফিক কষ্ট করে মাথা নাড়ল।
“গুলি ছুইয়া গেছে। সময় কম।”
সামিয়া দ্রুত তাকে বসতে সাহায্য করল।
আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম, “কাদের মিয়া?”
রফিক কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
“ওনারে ধইরা নিয়ে গেছে।”

....
👁 2131