বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতি

প্রেগনেন্সির নয় মাসের উঁচু পেট নিয়ে প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই সতীনের মুখোমুখি হলাম আমি।
এখানে এসে লোকমুখে জানতে পারলাম, আমার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী আমি। আমার আগেও সে একটি বিয়ে করেছে। ইভেন এখনো তার প্রথম স্ত্রী রয়েছে। প্রথম সংসারে তার পাঁচ বছরের একটি মেয়েও আছে।
অথচ আমাদের বিয়ের আগে ঘুণাক্ষরেও সেসব টের পাইনি আমি। এসব কিচ্ছুটি স্বীকার করেনি সে। হয়তো এই সত্য কখনো জানাও হতো না, যদি আমি আজ নিজ থেকে তার খোঁজে না আসতাম। মানুষটা নিখুঁতভাবে ঠকিয়েছে আমাদের দু’জন নারীকে। আমার সতীনও জানে না, আমি তার স্বামীর আরেকটি স্ত্রী। অচেনা আমাকে দেখে সে আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

kxz

“কে আপনি?”

“আমি যদি বলি আমি আপনার স্বামীর আরেকটি স্ত্রী, আপনার সতীন আমি। কী, বিশ্বাস করবেন আপনি?”

kx/춺'

আমার কথায় সে প্রচণ্ড রকমের রেগে গেল। অচেনা এক মেয়ের মুখে স্বামীকে নিয়ে এমন কথা শুনলে রাগটাই স্বাভাবিক!
নারী তার স্বামীকে নিয়ে ভাগাভাগি কোনো কালেই সহ্য করতে পারেনি। আমিও পারছি না, আমার সতীনও পারবে না। সে আমার দিকে অ গ্নি চোখে তাকিয়ে বলল,

“এই মেয়ে! কী সব ফা/লতু কথা বলছিস তুই? এক্ষুনি বের হ তুই আমার বাসা থেকে।”

আমি কোনো ফা/লতু কথা বলছি না। তার সাথে রিলেশন করেই আমার বিয়ে হয়েছিল। আমি শহরের মেয়ে। আমাদের ফ্ল্যাটের পাশেই ছিল তার ফ্ল্যাট। সে ওখানেই চাকরি করত, ফ্ল্যাটে একাই থাকত। ওখানের সবাই জানত, সে অবিবাহিত। মা-বাবা গ্রামে থাকে—এ কথাও তার মুখের বলা।

আমাদের পাশাপাশি বাসা হওয়ার সুবাদে তার সাথে টুকটাক কথা হতো। দেখা হলেই প্রতিবার সে আগ্রহ নিয়ে আগে আগে কথা বলত। তার কথা বলার ভঙ্গি ছিল অসাধারণ! আমার ভালো লাগত। যে কেউ, যে কোনো মেয়েরই ভালো লাগবে তাকে। দেখতে শুনতে ভালো, শিক্ষিত যুবক।
এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই সে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিল আমায়। আমি তখন অমত করলাম। তবে, ধীরে ধীরে আমিও বুঝে গেলাম, আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।

এরপর আমাদের প্রেম হলো। আমি যেটাকে ভালোবাসা বা প্রেম ভাবতাম, আসলে ওটার নাম ছিল পর/কীয়া। ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি আমি তার চালাকি। সে বুঝতেও দেয়নি।
প্রেম হওয়ার ছয় মাসের মাথায়ই সে আমাকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গেল। আমার বাবা নেই। আমরা শুধু দুই বোন। আমার বিয়ের ব্যাপারে সে মায়ের সাথে সরাসরি কথা বলল। মা প্রথম প্রথম রাজি হননি। তবুও সে হাল ছাড়েনি।

এরপর বিভিন্ন কৌশলে আমার মাকেও রাজি করাল।
ছেলে ভালো চাকরি করে, দেখতে শুনতেও ভালো। তাই আমার পরিবার আর অমত করেনি। মা বললেন,

“তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইলে তোমার অভিভাবকদের নিয়ে আসতে হবে। তাদের মতামতেরও প্রয়োজন আছে।”

এরপর সে তার বাবা-মাকে গ্রাম থেকে আসতে বলল। তারাও আমাকে পছন্দ করলেন। এভাবেই বিয়েটা হলো আমাদের।
বিয়ের পরপরই তারা গ্রামে চলে গেল। আমরা দু’জন শহরে থাকতাম। মাঝেমধ্যে সে ছুটিতে গ্রামে যেত, কিন্তু আমাকে কখনো নিয়ে যেত না। আমি যেতে চাইলে বলত,

“তোমার অনার্স শেষ হলেই একেবারে ধুমধাম করে তুলে নিতে চাইছে, আব্বা-আম্মা।”

আমিও মেনে নিলাম। উনি যে কয়দিন ছুটিতে থাকত, সবসময় ব্যস্ত থাকত। তখন খুব একটা কথা হতো না আমাদের। হলেও দিনের বেলা টুকটাক হতো।

হবেই তো!আজ বুঝলাম সে কারণ!
সে গ্রামের কথা বলে চলে যেত তার প্রথম স্ত্রী আর সন্তানের কাছে। তারা-ও তো এসব জানে না। আর আমিও তো সরল ছিলাম। সে যা বুঝাতো, তাই বুঝতাম। কখনো সন্দেহ করতাম না। আর আমার এই সরলতা আর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সে আমাকে নিখুঁত ভাবে ঠকিয়েছে। তবুও আমি টের পাইনি।

বিয়ের ছয় মাস যেতেই আমি বাচ্চা কন্সিভ করি। এরপরও দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। আমার প্রেগনেন্সির আট মাস হতেই হঠাৎ সে গ্রামের কথা বলে বাসা থেকে বের হলো।

এরপর মানুষটা হঠাৎ একদিন গায়েব হয়ে গেল। আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ, মোবাইল বন্ধ। অসুস্থ শরীরে স্বামীর চিন্তায় আমি শেষ। কী হলো মানুষটার? কোথায় আছে?
এই প্রথমবার তার দেওয়া গ্রামের ঠিকানায় গেলাম, আমি আর মা। সেই ঠিকানা ছিল ভুয়া। আসলে সেখানে তাদের কেউ থাকে না। পরে শুনতে পাই, আমাদের বিয়েতে যারা তার বাবা-মা হয়ে এসেছিল, তারা আসলে তার কেউ না।

এতো এতো সত্যের মুখোমুখি হয়ে, আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি।

তবুও শেষটা দেখতে তার খোঁজ করলাম। আমার কাছে তার ভোটার আইডি কার্ডের একটা ফটোকপি ছিল। সেখান থেকে তার আসল ঠিকানা খুঁজে বের করি। খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলাম মানুষটাকে।

এখানে এসে শুনতে পেলাম আরেক সত্য। যা শুনে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। যে মানুষটাকে এতোটা বিশ্বাস করলাম, এতোটা ভালোবাসলাম, সেই মানুষটা আমাকে এভাবে ঠকালো?

কী হবে আমার? কী হবে আমার এই অনাগত সন্তানের?
আমি নিজেকে তবুও যথাসম্ভব সামলে নিলাম। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও লড়তে হবে আমাকে। আমি একটু শক্ত হয়ে তাকে বললাম,

“আমি সত্যি বলছি, আপা। এটা আমারও স্বামীর ঘর, এখানে আমারও অধিকার রয়েছে।”

আমার কথা শুনে সে (সতীন) হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আমাকে একটা থা/প্পড় দিয়ে অকথ্য গা/লি -গা লাজ করতে লাগল। আমাদের কথা শুনে সেখানে উপস্থিত হলো আমার স্বামী, মাহিম। তার কোলে তার মেয়ে। মেয়েটা দেখতে খুব মিষ্টি। আমার সতীনও সুন্দরী।
কতো সুন্দর সুখী পরিবার ছিল তার! সে পরিবার রেখেও আমার জীবনটা নষ্ট করল।

আমার নিজেকে আজ বড় অসহায় লাগছে। মানুষটা আমায় এভাবে ঠকালো? মস্তিষ্ক কেমন শূন্য শূন্য লাগছে আমার। কান্না পাচ্ছে খুব, কিন্তু কাঁদতে পারছি না আমি।
আমাকে নিজের বাড়িতে দেখে মাহিমের মাথায় যেন বা জ পড়ল। অবাক হয়ে বলল,

“তনয়া, তুমি এখানে?”

“হ্যাঁ, আমি। আমি না আসলে তো কখনো জানতেই পারতাম না এসব। তুমি আমায় এভাবে ঠকালে কেন, মাহিম? তুমি বিবাহিত, তোমার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে—এ কথা কেন আমায় বলোনি? বউ থাকতে এরপরও কেন বিয়ে করলে আমায়?”

"সত্যি যখন শুনেই ফেলছো, তাহলে আর মিথ্যে বলে লাভ কী? তুমি আমার মোহ ছিলে, তনয়া। ওসময় আমার স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য হয়েছিলো। তাই আমি রাগের বশে বিয়ে করে ফেলি তোমায়। মোহ কেটে গেছে এখন আর আমি তোমাকে চাই না। তুমি এখানে না আসলেও আমি তোমাকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিতাম। তুমি এখান থেকে চলে যাও, তনয়া। লোক জানাজানি হলে আমার সমস্যা হবে। মেয়ে আছে আমার, তার ভবিষ্যৎ আছে। তুমি পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও!"

গড়গড় করে খুব স্বাভাবিকভাবেই কথাগুলো বলল মাহিম। যা শুনে তার প্রতি অগাধ ভালোবাসাটা আর আমার রইল না। আমি অবাক হয়ে শুধু আওড়ালাম,

"ছি, মাহিম! তুমি এতোটা নিচ! এভাবে, এতো জঘন্যভাবে কেন ঠকালে আমায়? আরেহ্! তুমি তোমার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে, আমার অনাগত সন্তানের কথা ভাবলে না? আমার পেটে যে রয়েছে, সে-ও তো তোমার সন্তান।"

সকল সত্যের মুখোমুখি হয়ে গ র্জে উঠল আমার সতীন। বি শ্রী ভাষায় গা-লি-গা/লাজ করছে আমায়। তার স্বামীর কোনো দোষ নেই, সব দোষ মেয়ে আমার। আমি নাকি ভুলিয়ে-বালিয়ে নিজের শরীর দেখিয়ে বিয়ে করেছি তাকে।

হাহ্! আমার স্বামী নির্বাক। আমার সতীন তার সামনে থেকেই ঘাড় ধা ক্কা দিয়ে বের করে দিলো আমায়। আমি তবু নিজের সন্তানটার কথা ভেবে, ভিক্ষুকের মতো ওদের হাত-পায়ে ধরে একটু আশ্রয় চাইলাম। কিন্তু ওরা আমায় এতটুকু আশ্রয় দিলো না।

ওর বাবা ভাবল না, আমার সন্তানটার কথা। রাস্তায় বের করে দিলো আমায়। সাথে আমার স্বামী বলে দিলো,

"সন্তান যেহেতু আমার, তার দায়িত্ব না হয় আমিই নিলাম। তবে তোমার দায়িত্ব আমি নিতে পারলাম না। আমি আমার প্রথম স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যেহেতু ডিভোর্স কিংবা তালাক হয় না, তাই তোমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেব। সাথে কাবিনের টাকাটাও। আর কখনো তুমি এখানে আসবে না। এরপরও ঝামেলা করলে, কিছুই করতে পারবে না তুমি। এক্ষুনি চলে যাও তুমি, আমার বাড়ি থেকে।"

আহ্! কত সহজেই মানুষটা বলে দিলো এসব। আরেহ্, তুই যখন এতোটাই ভালোবাসিস তোর বউকে, তাহলে তাকে রেখেও আমায় কেন বিয়ে করলি? কেন এতো নাটক করলি আমার সাথে? তোর মোহকে প্রাধান্য দিতে, নষ্ট করলি আমার জীবনটা।

আহ্ পুরুষ! মেয়েদের জীবনটা পুতুলের থেকেও সহজলভ্য মনে করিস তোরা। এতো এতো অন্যায় করেও এই পুরুষগুলোর মধ্যে সামান্যতম অনুশোচনা নেই। তাদের জীবনে নারীর অভাব হয় না। তারা ঠিকই সুখে থাকে।

এদের খপ্পরে পড়ে শান্তি-সুখ পায় না বোকা নারীগুলো।

একটা মানুষকে বিশ্বাস করে, ভালোবেসে আমার জায়গা হলো শেষমেশ রাস্তায়। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।

এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমি, মানুষটা এতোটা বাজে ভাবে ঠকিয়েছে আমায়। আমার মনে হচ্ছে, এটা কোনো দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভেঙে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, আগের মতো। কিন্তু না, এটা বাস্তব। আর কিছুই ঠিক হবে না আমাদের।

হয়তো বাচ্চাটা জন্ম নেওয়ার সাথেই সাথেই আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। আহ্! মানুষটার কী নিখুঁত অভিনয় ছিল। তার অভিনয়কে ভালোবাসা ভেবে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিলাম তাকে। বিনিময়ে হাতছানি দিয়ে এতদিন দুঃখ ডাকছিলাম।

ঠকে গেলাম আজ বিশ্বাসের কাছে, ভালোবাসার কাছে।

আহা! এ কী নিদারুণ যন্ত্রণা!
এবার কী হবে আমার? কে দেখবে আমার বাচ্চাটাকে? আমি নিজেকে কীভাবে সামলাবো? বাস স্টেশনের ফুটপাতে নিস্তেজ হয়ে বসে ছিলাম আমি। কতক্ষণ ধরে এভাবে বসে আছি, খেয়াল নেই। আচমকা হুঁশ ফিরলো এক ভিখারিনীর ডাকে। ভেবেছিলাম, টাকা-পয়সা চাইতে এসেছে। আগ্রহ দেখালাম না, বরং বিরক্ত হলাম। এই শহরের সবকিছুতেই এখন আমার বিরক্তি, এমনকি নিজের প্রতিও।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে বৃদ্ধা বললেন,

“আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি, মা। এই পুরো স্টেশনটাই আমার বাড়ি। রাস্তার ওই পাশটাতেই থাকি আমি। কিন্তু তুমি কে? এই শহরে তো তোমাকে আগে দেখিনি। সেই দুপুর থেকে তোমাকে এখানে বসে থাকতে দেখছি। এখন তো সন্ধ্যা হয়ে এলো। অথচ তোমার মধ্যে কোনো যাওয়ার তাড়া নেই। তুমি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছো?”

হকচকিয়ে উঠলাম আমি। চারপাশে তাকালাম। গোধূলির লাল আভা শহরটাকে ইতোমধ্যে ঢেকে ফেলেছে। একটু পরেই সন্ধ্যার অন্ধকারে সব মিলিয়ে যাবে। হতবুদ্ধি হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।

মাহিমদের বাড়ি থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার পর এলোমেলো পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিলাম। আমার যেন কোনো হুঁশ ছিল না। শুধু রাস্তার পথ ধরে হেঁটেছি। স্বামীর প্রতারণা আমার আস্ত আমিটাকে ভিতর থেকে একদম দুম/ড়ে-মুচ/ড়ে দিয়েছে! আমি যেন আজ নির্বোধ হয়ে গিয়েছি।

এই অচেনা শহরে আমি নতুন। পথঘাট কিচ্ছু চিনি না। সন্ধ্যা নামছে। কোথায় যাবো আমি? কী করবো? কেন বসে আছি এখানে?

আমার ভাবনার মধ্যে বৃদ্ধা আবারও কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“তুমি কি অসুস্থ? কী হয়েছে তোমার? এমন বিষণ্ণ কেন লাগছে তোমাকে?”

আমি তাকালাম তার দিকে। আটপৌরে শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। বয়সের ভারে কুঁচকে গিয়েছে চামড়া। অভাবের কষ্টে ম্লান সৌন্দর্যের মাঝেও তার মুখে এক ধরনের অদ্ভুত মায়া। কেন যেন এই মুহূর্তে এই মানুষটিকেই নিজের আপন কেউ মনে হলো।

রাস্তার ভিখারিদের সাধারণত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে দেখা যায় না। কিন্তু এই বৃদ্ধা স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলছেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি অবশেষে জিজ্ঞেস করলাম,

“খালা, কয়টা বাজে?”

বৃদ্ধা পান খাওয়া মুখে মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন,

“আমার তো ঘড়ি নেই, মা। আমাদের সময় দেখার প্রয়োজনও হয় না। গাড়ির শব্দ আর পেটের ক্ষুধাই আমাদের সময়টা বুঝিয়ে দেয়।”

আমি আর কিছু বললাম না। খালা আমার বলার আশাও রাখলো না। সে আবারও বললো,

"ও মেয়ে, কোথায় যাবে তুমি? তোমায় দেখে তো মনে হচ্ছে, তুমি পো য়া তি। এই শরীরের এখানে বসে আর বেশী দেরী করো না। জায়গাটা খুব একটা ভালো না!"

"আমার যাওয়ার মতো আপাতত নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই, খালা।
এই শহরের এক পুরুষ আমাকে নির্ম/ম ভাবে ঠকিয়েছে।
তার সঙ্গে বেঁধে নেওয়া স্বপ্নগুলো আজ ভাঙা কাঁচের মতো ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
তাই কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো—তার কোনো উত্তর আমার কাছে নেই।”

খালা চলে গেলো কোনো কথাবার্তা ছাড়াই। হয়তো, এক দুঃখিনী আর এক দুঃখিনীর বোঝা নিজের ঘাড়ে সেধে চাপাতে চায় না। অথবা তার কোনো আপন দুঃখ মনে পড়ে গেলো। জানি না আমি! জানতেও চাই না।
খালা আমার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে বসলো। নিজের রঙচটা ব্যাগটা থেকে হাতড়ে হাতড়ে কিছু খাবার বের করছে। আমি কেন জানি, সেদিকে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছি।

ব্যস্ত শহরে মানুষ আসে-যায়। আমাদের দিকে একবার তাকায়, আবার নিজেদের জগতে মগ্ন হয়ে চলে যায়। চারপাশে এত কোলাহল, অথচ কারো চোখে কোনো খেয়াল নেই। এই যে আমি স্টেশনে এতক্ষণ বসে ছিলাম, কেউ আমাকে সেভাবে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। হয়তো কেউ না কেউ একবার ডেকে ছিলো, আমি খেয়াল করিনি।
এখানে সবাই শুধু নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। এই নিঃসঙ্গ ভিড়ে আমি যেন আরও একা হয়ে গেলাম। নিজেকে প্রচন্ড দুর্বল লাগছে এখন। ক্ষুধায় পেটটা জ্ব-লে যাচ্ছে। সারাটাদিন একটু পানিও আমার পেটে জুটেনি। বড্ড তৃষ্ণা লেগেছে। আমি নিজের কাঁধের ব্যাগটা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু, ব্যাগটা আর পাচ্ছি না। কোলের মধ্যে অবহেলায় মোবাইলটা পড়ে আছে। কিন্তু, ব্যাগটা কোথায় গেলো? এখানে আর নেই। মনে হচ্ছিল, আমার পাশেই সাইড ব্যাগটা রাখা ছিলো। সেখানে বেশ কিছু টাকাও ছিলো। এখন আর সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না। কত লোক আসা যাওয়া করে, কেউ হয়তো সুযোগ বুঝে নিয়ে গেছে। নিজের চলার জন্য রাখা টাকা-পয়সাটাও হারিয়ে আমি আরো একবার হতাশ হলাম। অচেনা শহরে কিভাবে কী করবো?

আমি আবারও সব ভুলে, ভিখারিনী খালার শুকনো রুটি আর পানির দিকে তাকিয়ে আছি। খালা কি বুঝলো কিছু? হঠাৎ করেই, নিজের ভাগের খাবারটুকু আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

"ও মেয়ে, তোমার ভিখারিনী খালার এই খাবার তুমি খাবে? খেতে পারবে এই খাবার? খেলে নেও।"

আমি তার প্রশ্নের কোনো জবাব দিলাম না। তার দেওয়া খাবার গুলো, এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে খেতে লাগলাম। খালা মৃদু হেসে, এবার এসে বসলো আমার পাশের বেঞ্চিটাতে। আমার সেদিকে হুঁশ নেই। খালা খেলো কি-না জিজ্ঞেসও করলাম না। বরং তার দেওয়া শুকনো রুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে সবটুকুই খেয়ে ফেললাম। ক্ষুধার মাঝে এই খাবারটাই এতো অমৃত মনে হলো আমার! এতো মজার খাবার বোধহয় আমি আর কখনো খাইনি।
এতটুকু পেটে পড়তেই নিজেকে একটু শান্ত অনুভব করলাম। আচমকাই খালার কথা মনে পড়লো। এই অসহায় মানুষটার সবটুকু খাবার আমি খেয়ে ফেললাম! উনি সারাদিনে খেলো কি-না জিজ্ঞেসও করলাম না। ছি! আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। নিজের হাতেও টাকা নেই, যে তাকে কিছু টাকা ধরিয়ে দিবো। আমি অনুতপ্ত চোখে, আশেপাশে তাকিয়ে খালাকে খুঁজলাম। বললাম,

"আপনি কি খেয়েছিলেন, খালা?"

"আমার ক্ষুধা নেই, মা। ক্ষুধার যাতনা সহ্য করবার ক্ষমতা আমার আছে।"

খালা আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই ওখান থেকে চলে গেলো ব্যস্ত ভঙ্গিতে। আমি কিয়ৎ ক্ষণ সেদিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলাম। বুকের ভেতরের ভারী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,

"একজন ভিখারিও আমার দুঃখ বুঝলো, বুকের তীব্র দহন অনুভব করলো।
অথচ তুমি! যাকে আমি এতটা আপন ভেবেছি, এতটা কাছে রেখেছি—সেই তুমি-ই আমাকে বুঝলে না। আমার ভাঙা মনের শব্দগুলোও তোমার কাছে নিস্তব্ধ রইল।"

আমি আর তাকে নিয়ে ভাবতে পারলাম না।
হাতে সময় নেই খুব একটা। তবে তার এই ঋণের ভাগীদার রয়েই গেলাম আমি।

°

এই শহর থেকে আমি আজ আর নিজের শহরে গেলাম না। যে মানুষটাকে আমার সাথে এতবড় প্রতারণা করলো, তার শেষ দেখেই ফিরবো আমি। না না, তার প্রতি আমার আর কোনো টান নেই, ভালোবাসাও নেই! রয়েছে ঘৃণা আর ঘৃণা!
আমি নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালাম। ত্রস্ত ফোনটা হাতে নিলাম। এতক্ষণ ফোন বন্ধ অবস্থাতেই পড়ে ছিলো। আমি ফোন অন করলাম। মা জানে না, আমি এখানে এসেছি। ওদের কাউকে কিছু না বলেই আমি এখানে এসেছিলাম তার খোঁজে। আমার মা-বোন নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমার চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন। এমনিতে অসুস্থ শরীর নিয়ে ওরা আমায় ছাড়তো না।
এসব ভাবনার মাঝেই কল দিলাম মা'কে। কিন্তু, ফোন ধরলো আমার ছোট বোন, তন্নি। আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই সে কেঁদে ফেললো। বললো ভাঙা কণ্ঠে,

"তুই কোথায় আছিস, আপু? তোর ফোন বন্ধ ছিলো কেন? কী হয়েছে তোর? আমাদের কাউকে কিছু না বলে তুই হঠাৎ কোথায় উধাও হলি? ভাইয়ার খোঁজ পেয়েছিস বুঝি?"

"পেয়েছি।"

"একি, আপু তোর কণ্ঠ এমন লাগছে কেন? ঠিক আছিস তুই? কী হয়েছে?"

আমি মৃদু হাসলাম। বোনটা আমাকে না দেখেই, ওর আপুর গলার স্বর শুনে ধরে ফেলেছে, আমি ঠিক নেই। আমি নিজেকে যথাযথ সামলিয়ে বললাম,

"আমি ঠিক আছিই। মা কোথায়? মায়ের কাছে ফোনটা দে।"

তন্নি চেঁচিয়ে উঠলো। মা'কে ডাকলো অনবরত। মা যেন আমার কলের অপেক্ষাতেই ছিলেন। টেনশনে এতক্ষণে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলছেন। তন্নির থেকে ফোন নিয়েই মা কথাবার্তা ছাড়াই কেঁদে উঠলেন। এরপর ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললেন,

"তনু, তুই কোথায় আছিস? তুই ঠিক আছিস?"

"মা, মাহিমকে খুঁজে পেয়েছি।"

"কি বলিস? জামাই কেমন আছে? কী হয়েছিল ওর? হঠাৎ, জামাই আমাদের সঙ্গে এরকম করলো কেন? ও ঠিক আছে?"

"কিছু ঠিক নেই, মা। কিছু ঠিক নেই।"

আমি আর নিজেকে মায়ের কাছে সামলাতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম অসহায় কণ্ঠে। মা অস্থির হলো। জানতে চাইলো,

"কি হয়েছে, কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন?"

আমি এবার মা'কে ভে/ঙেচু/রে সবটা বললাম। সবটা শুনে আমার মা ছিলেন বাক্যহারা। এরপর আচমকা বুক ভরা আক্ষেপ নিয়ে শুধালো,

“স্বামী ছাড়া এ পৃথিবীতে, বিধবা হয়ে বেঁচে থাকা আমাদের জন্য বড্ড কঠিন রে মা। আজ যদি তোদের বাবা বেঁচে থাকতো, মাথার উপর তোদের বড় একটা ভাইয়ের ছায়া থাকতো, আমাদের আর ঠকতে হতো না। ওরা ঠিকই, বিয়ের সময় ছেলের বাড়ি-ঘরের খোঁজ-খবর নিতো।
আমরা আবারও হেরে গেলাম বিশ্বাসের কাছে, মানুষের প্রতারণার কাছে। আমাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ওরা আমাদের ঠকালো, নষ্ট করলো আমার ফুলের মতো মেয়েটার জীবনটা। হায় আফসোস, আমি কেন একটিবার নিজে গিয়ে ছেলেটার খোঁজ-খবর নিলাম না! কেন ওর মধুর মধুর কথাতে গলে গেলাম! আহারে, তোর এই দুঃখ আমি কীভাবে ঘুচাবো মা!”

মা কাঁদছে, তন্নিও কাঁদছে। কিন্তু, আমার কান্না থেমে গেছে। কাঁদতে ইচ্ছে করে না আর। আমি যেন হৃদয়হীনা হয়ে উঠেছি! এ পৃথিবীতে আবারও আরো একবার মনে করিয়ে দিলো, "আমার বাবা নেই, আমার ভাই নেই!"
আমি আবারও বিরক্তিকর শ্বাস টানলাম। মা'কে বললাম,

"আমাকে বিকাশে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেও তো, মা। চলার মতো টাকা নেই। ব্যাগটাও হারিয়ে গেছে।"

মা আশ্বাস দিলো আমায়। পরবর্তীতে কী করবো, জানতে চাইলো। আমি জানালাম সবটা। মা-ও মেনে নিলো বিনাবাক্যে। শুধু বললো,

"আমিও আসতেছি। সাবধানে থাকিস, মা।"

আমি কিছু বললাম না। কল কেটে দিয়ে স্টেশন থেকে বাইরে বের হলাম। এ পৃথিবী আমার জন্য এখন বড্ড কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অচেনা শহরেও আমি হাল ছাড়লাম না। নিজেকে সামলে নিলাম। মনে জোর রাখলাম। ওখান থেকে মানুষজনের ভেতরে এগোলাম।

মা বিকাশে টাকা পাঠিয়েছে। আমি কিছু টাকা তুলে হাতে নিলাম। অচেনা আমাকে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে এখানে দেখেই যাচ্ছিল লোকজন। তারা কৌতূহল হয়ে এবার জানতে চাইলো,

"কে আপনি?"

আমি আর চুপ করে থাকলাম না। মানুষজনকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম,

"আমি মাহিমের, দ্বিতীয় স্ত্রী! ও আমাকে ঠকিয়েছে। আমি আজ সবকিছু যখন জানলাম, ওরা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।"

মুহূর্তেই পরিবেশ বদলে গেলো। লোকজনের কানাকানি শুরু হলো। আমাকে কিছু লোক ঘিরে ধরলো। ওদের আগ্রহ দেখে বুঝলাম, গ্রামের ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে ঘুরছে এই লোক। আমি আর নিজেকে ধমিয়ে রাখলাম না। সবার সামনে, টেনে-হিঁচড়ে খুলে দিবো ওর মুখোশ। মানুষ জানুক, এই শহরে একটা নিকৃষ্ট জীব রয়েছে, যে দুজন নারীকে নিখুঁতভাবে ঠকিয়েছে। না না, এরপর আমি আর তার সঙ্গে সংসার করতে চাচ্ছি না। শুধু আয়োজন করে আমি একটা পশুকে সমাজ থেকে চিহ্নিত করবো, আমি আমার প্রাপ্ত অধিকার বুঝে নেবো। এসবে আর তাকে এতটুকুও ছাড় দেওয়া হবে না। আমাকে দুঃখের মাঝে রেখে, তুমি শুধু সুখটাই বেছে নিবে? উঁহু, তা তো হচ্ছে না। একটু তো হেনস্তা তুমিও হও। এই সমাজের মেয়েরা আমাকে দেখুক, শিখুক নির্মম বাস্তবতাকে! আমায় নিয়ে আজ সন্ধ্যায় সালিশ বসেছে। এখানকার স্থানীয়রা এলাকার চেয়ারম্যানকে খবর দিয়েছে। আমি এখন বসে আছি চেয়ারম্যানের ক্লাবে। আমাকে ঘিরে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মাঝখানে আমি, অন্য এক পাশে মাহিম ও তার প্রথম স্ত্রী, কন্যা। ওরা দু'জনই আমার দিকে বিরাশ মুখে তাকিয়ে আছে। মাহিম একটু পরপর আমার দিকে র/ক্তিম চোখে তাকাচ্ছে। ওরা হয়তো ভাবতেই পারেনি, আমি এমন কিছু করব। আমি নীরবে হাসলাম। সবকিছু কি এতই সহজ? এক চুলও ছাড় দেব না আমি। তুমি শুধু নারীর ভালোবাসাটাই দেখেছ, মাহিম...তার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার তোপ দেখোনি। আমি তার সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেব তোমাকে।

এরমধ্যে চেয়ারম্যান সাহেব অচেনা আমাকে কিয়ৎক্ষণ আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে শুধালেন,

"এই মেয়ে, কে তুমি? কী চাও?"

"আমি মাহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী। আমি মাহিমের শাস্তি চাই।"

আচমকা, উপস্থিত সবাই কেমন কেমনে করে তাকাল আমার দিকে! স্ত্রী হয়ে স্বামীর শাস্তি চাওয়া হয়তো অদ্ভুত শোনাল তাদের কাছে। আমি আবারও হাসলাম। চেয়ারম্যান কিয়ৎক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। এরপর আবারও বললেন,

"তুমি যে নিজেকে মাহিমের স্ত্রী দাবি করছ, তার প্রমাণ কী? তোমাকে তো আমরা কেউই চিনি না, জানি না, কখনো দেখিনি। হুট করে তুমি কীভাবে মাহিমের স্ত্রী হয়ে গেলে? আমাদের জানাশোনা মতে, মাহিম এ কাজ করতেই পারে না। তুমি কে? সত্যি করে বলো। তুমি মাহিমকে ফাঁ/সাতে চাইছ? উদ্দেশ্য কী তোমার?"

আমি এবার শব্দ করেই হাসলাম। এ হাসিতে রয়েছে কেবল ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য। চেয়ারম্যান সাহেব কঠিন স্বরে ধমকে উঠলেন আমায়,

"এই মেয়ে, হাসছ কেন?"

"হাসছি এই ভেবে, একটা মানুষ কতটা নিখুঁত অভিনয় করতে পারে!"

আমি থামলাম। চেয়ারম্যানের পাশে বসা এক মুরব্বি বিরক্ত হলেন আমার আচরণে। তিনি বললেন,

"খোলাসা করে বলো সবটা।"

আমি হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলাম। নরম হয়ে বসলে ওরা আমাকে দুর্বল ভাববে। আমি নিজেকে যথাযথ শক্ত খোলসে আবদ্ধ করে মাহিমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললাম,

"ওই যে জানো/য়ারটাকে দেখছেন না, ও একটা প্রতারক, ভণ্ড। ও আমার স্বামী, এটা ভাবতেই আমার ঘৃণা হচ্ছে আজ। আমি ওর স্ত্রী, অথচ আপনারা এক এলাকার হয়েও আমাকে চিনেন না, কারণ আমাকে চিনতে দেওয়া হয়নি। তারপরও আপনাদের প্রমাণ চাই, তাই না?
শুনুন তবে, আমি মাহিমের স্ত্রী—এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমার পেটের অনাগত সন্তান। আপনাদের সন্দেহ থাকলে ডিএনএ টেস্ট করুন। আমাদের কাবিননামাও চেক করতে পারেন। আমি সবকিছুর জন্য প্রস্তুত!"

মুহূর্তেই টানটান উত্তেজনায় সবাই নড়েচড়ে উঠল। মাহিম এতগুলো মানুষের সামনে বেশ অপমানিত বোধ করল। সে খেঁকিয়ে ধমকে উঠল আমায়,

"তনয়া, মুখ সামলে কথা বলো।"

"মুখ সামলে কথা বলার মতো অতোটাও সম্মানিত কেউ তুই নস। তুই একটা নিরীহ মেয়ের সঙ্গে যা করেছিস, এরপর তোকে মানুষ বলতেও ঘৃণা হয় আমার। অ্যাকচুয়েলি, এটা কোনো মানুষের কাজ হতেই পারে না। তুই রাস্তার কুকুরটার থেকেও নিকৃ/ষ্ট। তোর মুখোশের আড়ালের চরিত্রটা আরও জঘ/ন্য!"

মাহিম ক্রোধে চোটপাট দেখিয়ে আমার দিকে তেড়ে এল। আমার সতীনও ঝংকার তুলল। ওদের সবাইকে থামিয়ে দিলেন চেয়ারম্যান সাহেব। বললেন,

"থামো তোমরা, চুপ করো সবাই। তোমরা নিজেরা নিজেরাই যদি সব বিচার-আচার করে নাও, তাহলে আমাদের ডাকা হলো কেন? এরপর তুমি বলো মাহিম, তনয়া মেয়েটা কি সত্যিই তোমার স্ত্রী? উনি যা বলছেন তা কি সত্যি? নয়তো আমরা অন্য প্রমাণগুলো দেখতে বাধ্য হব।"

মাহিম চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর যেন গলার স্বর বদলে, চাপা রাগে বলল,

"তার আর দরকার হবে না, চেয়ারম্যান সাহেব। তনয়া যা বলছে, সত্যি বলছে। তাকে আমি বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু তার সঙ্গে আমি আর সংসার করতে চাই না।"

"কেন চাও না?"

"কারণ, ওর সঙ্গে আমার ভণিভোনার মিল নেই। ও একটা বে শ্যা মহিলা। স্বভাব-চরিত্র মোটেও ভালো না। ও ছিল আমার জীবনে করা একটি ভুল। আমি সে ভুল এখন বুঝতে পেরেছি, তাই ওরে আমি এক্ষুনি ত্যাগ করতে চাই।
আমি আমার প্রথম স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। এরমাঝে দ্বিতীয় কোনো অধ্যায় আমি চাই না।"

নিজেকে নিয়ে মাহিমের বলা বি শ্রী ভাষা শুনে আমি ছিলাম কিয়ৎক্ষণ বাক্যহারা। পরে আবার নিজেকে বুঝিয়ে নিলাম—যে মানুষ এত জঘন্য কাজও করতে পারে, সে সবকিছুই বলতে পারে। বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট হচ্ছে তার চরিত্র। যখন এক পক্ষের কাছে আগ্রহ শেষ হয়ে সম্পর্ক বিচ্ছেদের দিকে এগোয়, তখন অন্য পক্ষের চরিত্রটাকেই ছাড়াছাড়ির মোক্ষম কারণ হিসেবে দেখায়। আমাদের ক্ষেত্রেও মাহিম তাই করল। আমি নীরব থাকলাম। এখানকার পরিস্থিতিও বেশ গরম হলো। সালিশ প্রধান কী বলে, আমি তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করলাম।
হঠাৎ, চেয়ারম্যান সাহেবকে আমার সতীন ডাকল। বলল,

"ভাইজান, একটু এদিকে আসুন। আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা রয়েছে। যেহেতু আমার হাসবেন্ড একটা ভুল করেই ফেলছে, এর একটা সমাধান করা দরকার।"

চেয়ারম্যান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। ওই মহিলার সঙ্গে কিছুটা দূরে গিয়ে কী যেন যুক্তি-পরামর্শ করলেন। তারা ফিরলেন বেশ কিছুক্ষণ পর। ওখান থেকে এসেই চেয়ারম্যানের কথার ধরণ পাল্টে গেল।

"দেখুন, মাহিম যেহেতু আপনাকে রাখতে চায় না, সেহেতু আমাদের কিছু করার নেই। আপনি বাড়ি ফিরে যান।"

আমিও সঙ্গে সঙ্গে কাঠকাঠ গলায় জবাব দিলাম,

"আমিও তার সঙ্গে সংসার করতে আগ্রহী নই, চেয়ারম্যান সাহেব। আমি শুধু আমার পাওনাটা চাই আর তার উপযুক্ত শাস্তি চাই। নয়তো ব্যাপারটা ভালো হবে না!"

চেয়ারম্যান সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চাপা স্বরে বললেন,

"কী ভালো হবে না? শুনি, বলুন? আপনি অন্য জায়গা থেকে এসে, সরাসরি আমাদের এলাকার ছেলেকে হু/মকি দিচ্ছেন। কিসের জোরে? খুব ক্ষমতা আপনার? আপনি কোনো কিছু পাবেন না। আপনার কি দোষ ছিল না? মাহিম দোষ করলে আপনিও তার সমান দোষী। একজন বিবাহিত পুরুষকে ভুলিয়ে-ফুঁসলিয়ে বিয়ে করে, নিজেকে এখন আপনি কী সতী প্রমাণ করতে চান? আপনার আগেও ওর স্ত্রী আছে, এক মেয়ে আছে—এটা আমরা সবাই জানি। তাদের প্রতি আপনি কী অবিচার করেননি?
এখন মাহিম আপনাকে রাখবে না, আপনিও তার সঙ্গে থাকবেন না। এর একটাই সমাধান—আপনি স্বসম্মানে এখান থেকে চলে যান। এর মধ্যে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এখন বেশি বাড়াবাড়ি করলে ব্যাপারটা ভালো হবে না।"

চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে যেন নীরবে হু/মকি দিলেন। আমি আশ্চর্য হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। মনেমনে সত্যিই কিছুটা ভয় হচ্ছিল আমার। যতো যাই হোক, অচেনা শহরে আমি একা দাঁড়িয়ে। আমার পরিচিত কিংবা আপনজন পাশে কেউ নেই যে আমি সেই জোরে কথা বলব। তবুও, মনের জোরে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম আমি। তখন ওখানকার একজন বৃদ্ধ লোক আমাকে চোখের ইশারায় থামতে বললেন। তিনি এখানকার মেম্বার। লোকটিকে বেশ সৎ মনে হলো। জগতে সবাই খারাপ হয় না! কত শত খারাপের ভিড়েও কিছু ভালো লোক সব জায়গায় থাকে। ওই লোকটাই আমাকে একফাঁকে সংকেত দিলেন,

"চেয়ারম্যান সাহেব মাহিমদের আত্মীয়। তুমি তার কাছে সঠিক বিচার পাইবা না, মা। এখান থেকে তুমি বুদ্ধি করে চলে যাও আর থানায় যেও।"

আমি সে ইশারা বুঝতে সক্ষম হয়ে চুপ রইলাম। ভয় পাওয়ার নাটকটাও করলাম। পরে সিদ্ধান্ত হলো, আমি এখন এখান থেকে সোজা বাসায় চলে যাব। আমিও মেনে নিলাম তাদের কথা।
মাহিম ও তার স্ত্রী অনেকক্ষণ পর বিজয়ীর হাসি হাসল। আমিও তা সরু চোখে দেখে নিলাম। ওদের উদ্দেশ্যে কেবল বললাম,

"আমায় ঠকিয়ে আপনারা আজ হাসছেন? বিশ্বাস করুন, আপনাদের এই হাসিটা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে রইবে না। কারণ, আপনাদের রব আমারও। আর রব তার কোনো বান্দাকেই ঠকায় না!
দেখবেন, আপনাদের এই সুখ অচিরেই দুঃখে পরিণত হবে।
আপনাদের দেওয়া যন্ত্রণাগুলো যে আমার রুহ অবধি পৌঁছে গেছে। আমার রুহের হায় আপনাদের ভালো থাকতে দেবে না, কখনোই না!"

আমি আর ওখানে দাঁড়ালাম না, ওদের প্রত্যুত্তর করার সুযোগও দিলাম না। ক্লাব থেকে বেরিয়ে এলাম। আমাকে এরপর ওখান থেকে চেয়ারম্যানের লোকজন বাসের টিকিট কেটে বাসেও উঠিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়ল, তবেই ওরা চলে গেল। আমি কিছুটা দূরে গিয়ে বাস থেকে নেমে গেলাম, আমার শহরে আর গেলাম না। একজন রিকশাওয়ালা মামার সাহায্যে আমি ওখানকার থানায় গেলাম। গোপনে মাহিমদের নামে কেস করলাম।

আজ রাতটাতে আমার আর কোথাও যাওয়া হলো না। সারারাত থানায় থাকতে হলো। অসুস্থ শরীরে বসে থাকা যায় আর কতক্ষণ! আমার অস্থিরতা দেখে ওখানকার ডিউটিরত একজন পুলিশ আমাকে একটা কম্বল বিছিয়ে, জেলখানার ভেতরে শোয়ার জায়গা করে দিলেন। সঙ্গে কিছু খাবার ও পানিও এনে দিলেন। আমি ওদের দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে রইলাম। এখানকার থানার ওসিটাও ভালো। তার নিদর্শনেই এসব দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের প্রতি তাদের যতটুকু দয়া হলো, এর কানাকড়িও আমার স্বামী আমাকে দেখায়নি। আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। ওর কথা আর ভাবলাম না। শুয়ে পড়লাম জেলখানার বিছানাটায়। সারাদিন পর একটু শোয়ার জায়গা পেয়ে আমার শরীরটাও একেবারে ছেড়ে দিলো, আর আমিও কখন জানি ঘুমিয়ে গেলাম। আমার সেই ঘুম ভাঙে সকালে, মায়ের ডাকে। মা এসেছে, তার সঙ্গে এসেছে রিধান ভাই। উনি আমার বড় খালার একমাত্র ছেলে। বিদেশ থেকে পড়ে কিছুদিন হলো দেশে ফিরেছে।

মা আমাকে দেখে কতক্ষণ কান্নাকাটি করলেও রিধান ভাই সারাটাক্ষণই ছিলো নিশ্চুপ। আমিও আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যাইনি। বেশ অনেক বছর পর তার সঙ্গে আমার দেখা, তবুও আমাদের এখন অবধি কথা হয়নি। আমারও কথা বলার মন-মানসিকতা হয়নি। আচমকা, রিধান ভাই আমাকে বললো,

"তনু, ভাত খাবি?"

পরিচিত সেই সুর। উনার মুখটাও বেশ হাসিহাসি। ফর্সা মুখটাতে সুখ সুখ!
আচমকা, তার এমন কথাতে রাগেরা আমার মাথায় তল্লিতল্লা চেপে বসলো। উনি কি সাত-সকালে এখানে এসেছে আমাকে ভাত খাওয়াতে? আমার কি এখন ভাত খাওয়ার মানসিকতা আছে? কথাবার্তা ছাড়াই এগুলো কেমন কথা? উনার খেতে ইচ্ছে হলে খাবে, আমাকে কেন বলবে? আমার যে কি হলো! আমি হঠাৎ এতক্ষণের সব রাগ উগলে দিলাম, রিধান ভাইকে। কঠিন স্বরে খেঁকিয়ে উঠলাম আচমকা। বললাম, রিধান ভাই, আপনি কি সাত-সকালে আমাকে ভাত খাওয়ানোর জন্য থানায় এসেছেন?"

"আমি তো তাও তোকে ভাত খেতে বলছি, তোর স্বামী তো তোকে সারাদিনটাতে এক গ্লাস পানিও দিলো না।"

উনার গা-ছাড়া কথাতে, আমার এতক্ষণের তেজওয়ালা মুখটা আমসি হয়ে গেল। রিধান ভাই সবটা জেনেও আমাকে মুখের উপর এসব বলছেন? আমার মনের অবস্থা জেনেও তার বলা এই কথাটা, এই মুহূর্তে আমাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিল। আমি কেবল তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,

"আপনি কি আমাকে খোঁচা দিচ্ছেন, রিধান ভাই?"

উনার আবারও সেই গা জ্বা/লানো উত্তর,

"মিথ্যে তো আর কিছু বলিনি। তোর কাছে এটা খোঁচা মনে হলো কেন, তনু?"

বিরক্তিতে আমার মুখ কুঁচকে এলো। গা-টাও জ্বলে গেল শিরশির করে! মা কেন এই হতচ্ছাড়াটাকে এখানে নিয়ে এলো? দুনিয়াতে কি আর কোনো মানুষ ছিল না? রিধান ভাইটাও কেমন কেমন করে আজকাল। উনি তো এমন ছিলেন না। বিদেশে গিয়ে কি উনি বদলে গেছেন?
আমার বিরক্তিকর মুখ দেখে মা আমাদের দু'জনের মধ্যে ফোঁড়ন কাটল। রিধান ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

"আহ, রিধান? এসব এখন থাক না, বাপ।"

মায়ের প্রত্যুত্তরে রিধান ভাই গড়গড় করে বলল,

"আমার খিদে পেয়েছে, খালা। আমার এখন ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। থানার ওপাশটাতে একটা হোটেল আছে, শুনেছি, ওরা দারুণ রাঁধে। আমি এখন সেখানে গিয়ে ভাত খাব। তুমি কী যাবে আমার সঙ্গে?"

সকাল সকাল রিধান ভাই ভাত খায়? অদ্ভুত তো! যে ছেলে শুধু একবেলা ভাত খায়, ডায়েটের জন্য তাও পরিমাণ মতো, সে এখন থানাতে এসেছে এই ভোর বেলা ভাত খেতে! জগতের সব অদ্ভুত ব্যাপার আমার সঙ্গেই ঘটতে চলছে বুঝি।
আমার ভাবনার মধ্যে মা-ও আমতা আমতা করল,

"খিদে তো আমারও পেয়েছে। কিন্তু...."

মায়ের এ বাক্যের পূর্ণতা মেলে না। রিধান ভাই তাকে থামিয়ে দিল। মায়ের হাত ধরে বলল,

"চল তো, খালা। আগে পেট ঠান্ডা হোক, তারপর দুনিয়া ঠান্ডা করব!"

চোখের সামনে থেকে ওরা দু'জন চলে গেল। মা'কে জোর করেই রিধান ভাই নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, থানার কোনো আসামিকে টেনে হিঁ/চড়ে পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ডিউটিরত কিছু পুলিশ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত, তারাও কিছু বলছে না। এদের ব্যবহার আমাকে পুরোপুরি হতাশ করল। কি আশ্চর্য!
ওরা তো গেল ভাত খেতে, আমি কী করব? এখন এখানে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। অগত্যা আমিও বিরক্তির শেষ পর্যায়ে গিয়ে ওদের পিছু নিলাম।

°
আমরা তিনজন এখন বসে আছি একটা হোটেলে। মা আর রিধান ভাই আমার সামনাসামনি চেয়ারে বসেছে, আর আমি তাদের বিপরীত চেয়ারে বসে আছি। আমাদের আশেপাশে বেশ কিছু মানুষ বসেছে। কেউ খাচ্ছে, কেউবা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে, কেউবা প্রিয়জনদের সঙ্গে আলাপ করছে! কিন্তু আমরা তিনজনই এখন চুপচাপ। রিধান ভাই ফোনে কী যেন করছে, মা আড়চোখে বারবার আমাকে দেখছে। আমি তাতে আগ্রহ দেখালাম না। এখানে আসার পর থেকেই আমার খিদে অনুভব হলো। হোটেল থেকে ভিন্ন ভিন্ন খাবারের চমৎকার ঘ্রাণ নাকে আসছে। এতে আমার পেটে গুড়গুড়িয়ে উঠছে। তখন আমি অনুভব করলাম, খিদে কাকে বলে!

এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, দুনিয়ার সব খাবার আমার পেটে ধরবে। ওরা কখন খাবার দেবে, কখন খাবো আমি? এতটুকুও তাড়না আমার সইছে না। এই মুহূর্তে জগতের কোনো চিন্তা আমার মাথাতেই নেই! এতে মনেমনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। এই ভেবে যে, আমি তো খেতে আসতে চাইনি, তখন উল্টো রিধান ভাইকে ধুয়ে দিচ্ছিলাম। এখন যদি সেধে এসে আগে আগে খাবার চাই, ইজ্জত থাকবে? রিধাইন্না যে লাগামহীন মানুষ, দেখা গেল এতোগুলা মানুষের মধ্যে উনি আমাকে কিছু একটা বলে দিলো। এরপর লজ্জায় আমার নাক-কান কা টা গেল! আমি সেরকম রিস্ক নিলাম না।

ভাগ্যিস, আমাদের নীরব অনুভূতি মানুষ অনুভব করতে পারে না। আমার ভাবনার মাঝেই হোটেল বয় এসে খাবার দিয়ে গেলো। রিধান ভাই অর্ডার করেছে সাদা ভাত, বেশ কয়েক পদের ঝাল ঝাল ভর্তা আর দেশি মুরগির ভুনা। সবগুলোই আমার খুব প্রিয়। খাবার সামনে আসার পরই আমি খাওয়া শুরু করেছি। বেশ কয়েক বেলা পর ভাত পেয়ে, বেশ তৃপ্তি নিয়ে আমি খাচ্ছি। আমার খাওয়ার মধ্যেই আচমকা রিধান ভাই মিহি স্বরে শুধালো,

"মামলা করেছিস?"

রিধান ভাইয়ের কণ্ঠে খানিকটা উদ্বেগ, কিন্তু আমার কণ্ঠে গাঢ় দৃঢ়তা। আমি দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলাম,

"হ্যাঁ।"

"কি কি বিষয়ে করলি?"

উনার ফের প্রশ্নে আমি ততক্ষণ জবাব দিলাম না। বরং লেকপিসটাতে একটা কামড় দিয়ে মজা করে খেলাম। এরপর একটু পানি খেয়ে পরিষ্কার গলায় বললাম,

"প্রথমেই দ্বৈত বিবাহ মামলা করেছি। তিনি আমাকে না জানিয়ে, আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এটা আমার এবং আমার সন্তানের অধিকার নিয়ে খেলা।"

(আইনি ধারা: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৯৪
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা।)

মা আমার কথাতে বেশ চমকালো। উনি খাওয়ার হাত থামিয়ে দিলেন এবং বেশ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো,

"বলিস কি? তাহলে আর কী কী করলি?"

আমি ঠোঁট এলিয়ে হাসলাম। বললাম,

"নারী নির্যা/তনের মামলা করেছি। গর্ভাবস্থায় আমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যা/তন করা হয়েছে।"

(আইনি ধারা: নারী ও শিশু নি/র্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৩, ৪, ৫
শাস্তি:
ধারা ৩: অঙ্গহানি বা বিকৃতি ঘটালে মৃ/ত্যু/দ/ণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
ধারা ৪: যৌ ন নি/র্যাতনের জন্য যাবজ্জীবন কারাদ/ণ্ড এবং জরিমানা।
ধারা ৫: অপহরণ বা পাচারের জন্য মৃ/ত্যুদ/ণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদ/ণ্ড এবং জরিমানা।)

মা সরু চোখে আমাকে দেখলো। আবারও বললো,

"আর কিছু?"

"হ্যাঁ, আরো আছে।"

"বল তো... শুনি?"

আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে মা আর রিধান ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম,

"হ্যাঁ, ভরণপোষণ মামলা করেছি। আমি এবং আমার সন্তানের জন্য অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।"

(আইনি ধারা: মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১-এর ধারা ৩, ৪
শাস্তি: স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্ত্রীর এবং সন্তানের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা স্বামীর বাধ্যবাধকতা।)

এ পর্যন্ত শুনে রিধান ভাই বললো বেশ গম্ভীর কণ্ঠে,

"এইটা তো তোর অধিকার। আর কিছু?"

আমি বললাম,

"উনার নামে আমি প্রতারণার মামলাও করেছি। আমাকে ধোঁ কা দিয়ে প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে আমাকে বিয়ে করেছেন।"

(আইনি ধারা: দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪২০
শাস্তি: সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদ/ণ্ড এবং জরিমানা।)

মা বিস্মিত হলেন আমার হাবভাব দেখে। স্বামীর ক্ষেত্রে আমি এতটা কঠোর হতে পারব, মা হয়তো ভাবতেই পারেননি! এই তো দু'দিন আগেও আমি তার জন্য অঝোর কেঁদেছিলাম। স্বামীর টেনশনে ম রে যাচ্ছিলাম! এসব ভাবলেই আজ হাসি পায়, তাচ্ছিল্যের হাসিতে দুনিয়া ভরে যায়! আমি মুচকি মুচকি হাসলাম। চুপ রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। যা দেখে মা অধৈর্য হয়ে আমাকে তাড়া দিলেন,

"শেষে আর কিছু বলবি? আরো আছে না-কি?"

"আরো একটা আছে।"

"কি? কোন বিষয়ে?"

"সম্পত্তি দাবির মামলাও আমি এর সঙ্গে করেছি। আমার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে চাই।"

(আইনি ধারা: সিভিল মামলা (সম্পত্তি দাবির ক্ষেত্রে)
শাস্তি: সন্তানের অধিকার অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের আদেশ।)

সবটা শুনে মা জিজ্ঞেস করলেন, "মামলা মোট হলো ক'টা?"

আমি পৈ!শাচিক হাসি দিয়ে বললাম, "পাঁচটা।"

আচমকা রিধান ভাই আমাকে বাহবা দিয়ে বললেন,

"বাহ বাহ! তোর সাহস তো দেখছি অনেক বড় হয়েছে, তনু!"

আমিও তাকে ভাব নিয়ে বললাম,

"জানি, আমি। এটা আমার লড়াই, আমার অধিকার!"

রিধান ভাই আর কিছু বললেন না, নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। মা-ও আর কথা বাড়ালেন না। তার চোখেমুখে লেপ্টে আছে উৎফুল্লতা! আমিও ওদের নিয়ে আর ভাবলাম না। আমি এখন ভাবছি আমার ভবিষ্যতের কথা, আমার অনাগত সন্তানের কথা, আমার অধিকারের কথা। আবার পৈ!শাচিক হেসে ভাবছি, ওরা যখন মামলার নোটিশগুলো পাবে, ওদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
আমাকে কি হু/মকি দেবে, না-কি আবারও মাহিম সব মিটমাট করতে আসবে? কিন্তু আমি তো তাকে মন থেকেই ক/বর দিয়েছি। এখানে মাহিমের কোনো স্থান নেই, কোনো জায়গা নেই। ও কেমল আমার কাছে একজন অপরাধী!
আমার দেহে প্রাণ থাকা অবধি আমি লড়ব। নারীকে যারা শুধু দুর্বল ভেবে বসে আছে, তাদের আমি আমার সাহসিকতা দেখিয়ে দেব। হাজার হাজার ঠকে যাওয়া নারীকে শেখাব, অধিকার রক্ষার লড়াই!
না না, এই লড়াই কেবল আমার নিজের জন্য নয়, বরং সমাজের অন্য অন্য অবহেলিত নারীদের জন্যও একটি উদাহরণ।

এসব ভাবনার মাঝে কখন যে নিজের প্লেট ভর্তি খাবারটা শেষ করেছি, খেয়াল করিনি। আমার ভাবনায় ভা!ঙন ঘটল মায়ের ডাকে,

"তনু? তনু?"

খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম আমি। তবুও নিজেকে সামলে জবাব দিলাম,

"হ্যাঁ, মা।"

"আর ক'টা ভাত দিব, মা? নিবি আরেকটু?"

আমি অনুভব করলাম, আমার পেটে এখনো খিদে রয়েছে। এতটুকু খাবারে পেট ভরেনি। আমি কোনো কিছু না ভেবেই বললাম,

"দাও।"

মা বেশ আয়েশ করে আমার প্লেটে ভাত তুলে দিলেন, ভর্তা তুলে দিলেন, নিজের বাটিতে রাখা মাংসও তুলে দিলেন। আমি খাচ্ছি। আজকের মাংসটা বেশ মজা হয়েছে। আমার আরেক বাটি খেতে ইচ্ছে করছে। রিধান ভাইয়ের মাংসের বাটিটা এখনো ভরা। উনি এখনো ছুঁয়েও দেখেননি। আমি সেদিকে লোভাতুর হয়ে তাকিয়ে আছি। যা লক্ষ্য করে রিধান ভাই আচমকা আমার দিকে নিজের মাংসের বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

"নে, খেয়ে নে।"

আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমি সত্যি সত্যিই তার দেওয়া মাংসের বাটিটার সবটুকু মাংসই নিজের প্লেটে তুলে নিলাম, যেন আমি এতক্ষণ ধরে এটারই অপেক্ষা করেছিলাম। আমার ছেলেমানুষী দেখে রিধান ভাই কেমন করে যেন একটু হাসলেন। কিন্তু ততক্ষণে কিছু বললেন না। বললেন আমার খাওয়ার পর। আচমকা রিধান ভাই মা’কে দেখিয়ে বললেন,

"দেখলে খালা, কে যেন বলছিল আমি ভাত খাব না। আমার কি সেই মানসিকতা আছে? এনিয়ে আমাকে কত হু/মকি-ধা!মকি! এখন দেখলে, নিজেরটা তো খেলোই, সঙ্গে আমার মাংসের বাটিটাও সাফ করে দিলো! রা ক্ষ স একটা!"

তার কথায় মা-ও মিটমিট করে হাসলেন।
আকস্মিক, রিধান ভাইয়ের এমন খোঁটা শুনে আমার লজ্জায় ম রে যেতে ইচ্ছে করল। বদলোক! এজন্যই তো বলি, এই লোক তখন এত সাধুগিরি কেন দেখালো! আমার ইচ্ছে করছে এখন পেট থেকে সবটুকু খাবার বের করে উনাকে ফেরত দিয়ে দিতে। তা তো আর সম্ভব না! আমি ছ্যাঁৎ করে উঠলাম আচমকা,

"আমি কি আপনার কাছে আপনার মাংসের বাটি চেয়েছিলাম, রিধান ভাই? নিজেই সেধে দিয়ে এখন আবার আমাকে খাবারের খোঁটা দিচ্ছেন?"

"আমি কি স্বেচ্ছায় দিয়েছি? যেমন করে তুই তাকিয়ে ছিলিস, ওই মাংস আমি খেলেই তো আজ আমাকে ছোট ঘরেই কেবল দৌড়াদৌড়ি করতে হতো!"

আমি লাস্ট আমার প্লেটে তাকিয়ে দেখি একটা হাড় অবশিষ্ট রয়েছে। আমি সেটাই ওনাকে দিয়ে মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে বললাম,

"নেন আপনার মাংস, খাবো না আর...!"

বলে আমি উঠে গেলাম, বেসিনে হাত ধুতে। রিধান ভাই পেছন থেকে ছ্যাঁৎ করে উঠলেন। আমি সেসব পাত্তা দিলাম না। এর মধ্যে, ওদের খাওয়াও শেষ। রিধান ভাই বিল দিলেন, আমরা তিনজন একসঙ্গে হোটেল থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর টঙ দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেলাম। সবটাতেই আজ বেশ তৃপ্তি পাচ্ছি আমি, আমার সঙ্গে মা-ও। এটা ভাবতেই অবাক লাগে, আজ এমন একটা মুহূর্তে কীভাবে আমি এত আরাম করে খাচ্ছি! মানুষ বড় অদ্ভুত! অদ্ভুত তার মন। মন কখন কী চায়, তা আমরা নিজেরাও বুঝি না। আমি এই মুহূর্তে এসব বুঝতেও চাই না। সেদিন থানার আরো বেশ কিছু কাজ রিধান ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গুছিয়ে ফেললাম আমরা। এখনো আদালতের ব্যাপার-স্যাপার বাকি পড়ে আছে! সেখানে আমাকে দরকার হবে।
তাই,আমরা আর বাড়ি গেলাম না। অসুস্থ শরীর নিয়ে বারবার এত দূর জার্নি আমি এখন নিতে পারব না। এই ভেবে মা ও রিধান ভাই এখানে একটা আবাসিক হোস্টেলে দুই রুম নিলেন। এক রুমে আমি আর মা, অন্য রুমে রিধান ভাই। আবাসিক হোটেলে আজ আমার দু'দিন চলছে। এ ক'দিন থানার ভিন্ন ভিন্ন প্রমাণ, কাগজপত্রে ঝামেলা গুছাতে গিয়ে ব্যাপক ছোটাছুটি করতে হয়েছে আমাকে। অসুস্থ শরীর নিয়ে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি আমি। ভরা পেট নিয়ে নড়াচড়া করতেও আজকাল কষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমার। তবুও আমি মনের জোরে লড়ছি। আজ দুপুরে খেয়ে একটু শুয়েছিলাম। হঠাৎ মাহিমের নাম্বার থেকে কল। ফোনকলের শব্দ পেয়ে, পাশ থেকে মা জিজ্ঞেস করলো,

"কে কল করেছে, তনু?"

আমি স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, "মাহিম।"

মা ওর নাম শুনতেই আত/ঙ্কে উঠলো। ভয়ার্ত গলায় আমায় বললো,

"কল ধরিস না, তনু, তুই ওর কল ধরিস না! কল কে/টে দে, কল কে/টে দে! তুই এক্ষুনি ওর নাম্বারটা ব্লক করে দে।"

কিন্তু, আমি মায়ের বারণ শুনলাম না। কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসলাম। মা ওর নাম শুনতে পেয়েই, উনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কিন্তু, আমি বেশ স্বাভাবিকই রয়েছি। যেন আমি জানতাম এমনটাই হওয়ার। এরপর কল রিসিভ করলে কি হতে পারে তাও আঁচ করে নিয়েছি। মা আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। আমার ভাবসাব দেখে তার চোখে বিস্ময়, মুখে কোথাও শব্দ নেই। আমি আবারও হাসলাম। এরপর নিজেকে যথাযথ সামলিয়ে ফোন রিসিভ করলাম। রিসিভ করার আগে অবশ্য কল রেকর্ডিং চালু করে নিয়েছি। আমি আর আগপাছ না ভেবে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালাম,

"হ্যালো।"

আচমকা ওপাশ থেকে মাহিমের বা/জখাঁই কণ্ঠে বি শ্রী গালিগালাজ ভেসে আসলো,

"কিরে মা গী, তুই না-কি লাং নিয়ে হোটেলে উঠেছিস? আবার আমার নামে মামলাও করেছিস? ন টী /র বাচ্চা, তোর এতো সাহস কীভাবে হলো?

"মুখ সামলে কথা বল, মাহিম। তুই আমার সাহসের এখনো কিছুই দেখিসনি।"

"তোর সাহস দেখার আগেই আমি তোকে দুনিয়া থেকে বিদায় করবো, তনয়া! ভালোয় ভালোয় কথা বলছিলাম আমি, তুই যখন শুনিসনি, এইবার তোর তেজ আমি ছুটাবো দেখিস, মা গী।বে /শ্যাগিরী শুরু করছিস হোটেলে বসে? বে/শ্যা/গিরী?
এই বে শ্যা, তুই তোর কোন বাপের পরামর্শে আমার নামে মামলা করেছিস? তোর বড়বড় বাপেরা মিলেও মাহিম চৌধুরীর একগোছা চুলও ছিঁড়তে পারবে না। তোর টাকার লোভ হয়েছে, আমার সম্পত্তির উপর লোভ হয়েছে, তাই না? তোকে আমি জাস্ট খু ন করে ফেলবো, খু ন করে দিবো!"

আমি নিঃশব্দে নিভৃতে ওর কল কেটে দিলাম। ওর বি শ্রী কথাবার্তা ও হু/মকি মূলক কথাবার্তার ভয়েস রেকর্ডটাও সেই সঙ্গে মোবাইলে সেভ করে ফেললাম। এই জিনিস আমার মামলাটাকে আরো একটু শক্তপোক্ত করতে সাহায্য করবে। আমি ততক্ষণাৎ মাহিমের নাম্বারটা চিরতরের জন্য ব্লক লিস্টে যুক্ত করলাম। ওর বি শ্রী গা/লিগা/লাজ গুলো এখনো আমার কানে বাজছে, সেই সঙ্গে শরীরটাও ঘিনঘিন করছে ঘৃণায়। ভাবতেই আজ নিজের প্রতি করুণা হয়, এরকম একটা অ/সভ্য, জানো/য়ারকে এককালে ভালোবাসছিলাম আমি। ছি!

আজ আমাকে ওর গা/লি/গা/লাজ গুলোও হজম করতে হলো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভেবে। এই যে, আমি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়েও দেখায়নি। পাছে, আমার প্রমাণটা যদি নড়বড়ে হয়ে যায়। আমি জানতাম, থানা থেকে নোটিশ পাঠালে কিংবা মাহিমের কানে মামলার খবর পৌঁছালে সে আমাকে কল করবে। হলোও তাই। আমার লক্ষ্য এবার সাকসেস! তবুও, আমি কিছুক্ষণ থমথমে অবস্থায় বসে ছিলাম। আমার নির্বিকার ভঙ্গির ভাঁটা পড়লো মায়ের ডাকে,

"তনু? ও তনু? কি বললোরে, মাহিম?"

আমি ততক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে মা'কে এড়িয়ে গেলাম। মা জানার জন্য এখনো উসখুস করছে, কিন্তু আমি কীভাবে বলবো মা'কে, আমার প্রেমিক পুরুষ আমাকে মা গী বলেছে। আমরা যে প্রেমিকা, প্রেমিকার অশোভন আচার-আচরণ সচারাচর প্রকাশ করতে পারি না কাউকে! প্রেমেরা হারিয়ে সম্পর্ক যখন বিষাদে ভরে উঠে, তখন চুপিচুপি কতো কথা আমরা গিলে ফে লি লোকের ভয়ে। আমিও তার বিপরীতে নই। মায়ের থেকে নিজেকে লুকলাম কৌশলে। আমি হাতড়াতে থাকলাম মূল জায়গাতে।

মাহিমের বলা কল রেকর্ড ও সেদিনের শালিসিতে বসা সকল কথোপকথন আমি বুদ্ধি করে নিজের ফোনে লুকিয়ে রেকর্ড করে ছিলাম। সেগুলো মিলিয়ে আজ আমি থানার দারোগাকে পাঠিয়ে দিলাম। সঙ্গে দিলাম সামান্য দশ হাজার টাকা!
থানার দারোগাটা খুব ভালো। ঘু/ষ খায় না সে। তবে, তবে উপহার হিসেবে টাকাপয়সা সে নেয়। বড় বাবুদের কাজের একটা সম্মানি আছে না! এটা সামান্য চা-নাস্তার টাকা!

থানার দারোগা বাবুদের হাতে বেশ প্রমাণ রয়েছে এখন। রিধান ভাইও মামলার পিছনে বেশ শ্রম দিচ্ছে। একে একে দুই মিলিয়ে দারোগা সাহেব কথা দিয়েছে, রাতে তার ফোর্স নিয়ে এরেস্ট করবে মাহিমকে। দরদ দেখিয়ে আমাকেও বলেছে,

"আপনি চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম। হারা/মজাদা/টাকে আমরা এইবার একটা উচিত শিক্ষাই দিবো! আর হ্যাঁ, আপনি সাবধানে থাকবেন।"

আমিও সাবধানেই থাকলাম। দারোগা সাহেবও তার কথা রেখেছে। মাহিমকে সেদিনই পুলিশের ফোর্স এরেস্ট করেছে।

°

জেলখানাতে মাহিমের বেশ কিছুদিন কেটেছে। থানার সকল ফর্মালিটি পূরণ করে আমাদের মামলা উঠেছে এবার আদালতে। জজ সাহেব বিচারকের আসনে বসে আছেন। আমাদের দুপক্ষের দু'জন উকিল তর্ক-বিতর্ক করছেন। মাহিমকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে আজ। তার পক্ষে বড়সড় লোকজন আছেন। এলাকার চেয়ারম্যান সাহেব এসেছে, আমার স/তীনও এসেছে, তার সঙ্গে আরো অনেকজন। তারা আমার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন।
এদিকে আমার পক্ষে কেবল একজন উকিল, আমি, আমার মা ও রিধান ভাই।
আমাদের উকিলটা বেশ কাজের। উনি রিধান ভাইয়ের বন্ধু, জায়ান আহমেদ। রিধান ভাইয়ের কথাতেই আমাদের হয়ে আইনি ভাবে লড়ছে সে। আদালতের এক পর্যায়ে সবদিক দিয়েই প্রমাণিত হতে যাচ্ছিলো, মাহিম অপরাধী। তাকে জজ সাহেব ও উকিল সাহেব অনেক প্রশ্ন করলো। প্রথম প্রথম মাহিম তালবাহানা করলেও পরবর্তী রায়ের দিন তার সাফ সাফ কথা,

"ইওর অনার, আমি তনয়ার সঙ্গে সংসার করতে ইচ্ছুক নই। আমি তার দেনাপাওনা পরিষদ করে তাকে ডিভোর্স দিতে চাই। এরপরও আদালত আমাকে যে শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত।"

"কেন সংসার করতে চান না? উনি আপনার অনাগত সন্তানের মা। আপনার সন্তানের ভবিষ্যত কি?"

"আমার সন্তানের ভবিষ্যত আমি। তার ভরণপোষণের দায়িত্বও আমার, কিন্তু তার মায়ের দেনাপাওনা পরিষদ করার পর তার কি হবে তার দায়ভার আমার নয়। তাছাড়া, এ বিয়েটা আমি আমার প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়েই করেছিলাম কিন্তু এখন আমাদের ভণিভণার মিল নেই, আমরা আলাদা হতে চাই।"

এরমধ্যে আমি বাঁধ সেধে বললাম, "মহামান্য আদালত, মাহিম মিথ্যে বলছে। উনি উনার প্রথম স্ত্রীর অগোচরে আমার সঙ্গে চিটিং করে আমাকে বিয়ে করেছে। উনি আমার আর আমার অনাগত সন্তানের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।"

আমার কথার পিঠে স/তীন বললো, "ইওর অনার, আমি মাহিমের প্রথম স্ত্রী, নুহা বলছি। আমার স্বামী আমার অনুমতি নিয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। উনার দ্বিতীয় বিয়েতে আমার কোনো আপত্তি ছিলো না।"

আমি হতবাক হয়ে রইলাম কিঞ্চিৎক্ষণ। একজন নারী হয়েও উনি অপরাধকে চাপা দিয়ে স্বামীর পক্ষ নিয়ে আদালতকে মিথ্যে বললো? এরমধ্যে, আমার পক্ষের উকিল ব্যঙ্গ করে উনাকে বললেন,

"আপনি এতোই উদার মনের মানুষ, মিস নুহা? আপনার স্বামী আপনার কাছে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য অনুমতি চাইলো, আর আপনি আপনার জন্য স/তীন আনতে অনুমতি দিয়ে দিলেন?"

বাদীপক্ষের উকিল জায়ান আহমেদকে বাঁধা দিয়ে বললো,

"অবজেকশন ইওর অনার, এটা মাহিম ও নুহার ব্যক্তিগত ব্যাপার। জায়ান আহমেদ তাদের ব্যক্তিগত বিষয় হস্তক্ষেপ করতে চেয়ে লোক সম্মুখে তাদের হেনস্থা করতে চাইছে।"

ওদের দুজনের মধ্যে তর্কবিতর্ক হতে যাচ্ছিলো, আচমকা জজ সাহেব তার হাতুড়িতে গোটা কয়েক শব্দ করে বললেন,

"সাইলেন্ট প্লিজ, সাইলেন্ট প্লিজ!"

আদালত ঠান্ডা হলো। আবারও অনুমতি নিয়ে জায়ান আহমেদ আদালতকে প্রমাণ দেখিয়ে আমার সতীনকে জিজ্ঞেস করলেন,

"মিস নুহা, সেদিন চেয়ারম্যানের শালিসির বৈঠকে আপনি তো বলছিলেন যে, আপনি আপনার স/তীন সম্পর্কে অবগত নন। আমার কাছে সেটার যথাযথ প্রমাণও রয়েছে।"

নুহা বেশ চমকালো। এরপর আবারও অপরাধীর মতো আরেক মিথ্যা শুরু করে দিলো খুব কৌশলে,

"প্রথমেই আমি আদালতের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, হ্যাঁ আমি সেদিন নিজেদের মানসম্মান বাঁচাতে আমি আমার স/তীনকে অস্বীকার করেছি। কিন্তু, আমি আর আদালতে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলতে চাই না।"

আমি অবাক হয়ে সেদিন কেবল অনুভব করেছি, একজন নারীই একজন নারীর বড় শত্রু। আজ যদি নুহা তার স্বামীর পক্ষ না নিয়ে, অন্যায়ের পক্ষ নিতো, সমাজের একজন অপরাধী কঠিন শাস্তি পেতো। আদালতের কাছে চিহ্নিত হতো একজন ঠকবাজ, প্রতারক! কিন্তু, হায় আফসোস! আজও আমাদের সমাজের নারী গুলো স্বামীতে অন্ধভক্ত। নিজের সংসার রক্ষার্থে আজও নারীরা, তার স্বামীর হাজারটা অপরাধ লুকোয়। একজন অপরাধীকে বুক ফুলিয়ে বাঁচিয়ে দেয়। এতে যদি অন্যের জানটাও চলে যায় সেদিকে ফিরেও তাকায় না, তাকাতেও চায় না। আমি নীরবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। পাশ থেকে মা আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে।

এরপর আরো মামলা পরিষ্কার হলো। মাহিম আমাকে রাখবে না, আমিও তার সঙ্গে থাকবো না, পরবর্তীতে আইনি ভাবে সিদ্ধান্ত হলো আমাদের বিচ্ছেদ। মাহিম আমার দেনমোহর ও দেনাপাওনা পরিষদ করে দিবেন। কিন্তু বাচ্চা, বাচ্চাটার প্রসঙ্গে এসে আদালত আবারও মাহিমকে প্রশ্ন করলো,

"মাহিম চৌধুরী, তনয়ার গর্ভে যে বাচ্চা রয়েছে সেটা তো আপনারই। বাবা হিসেবে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও আপনার। কিন্তু, এই বাচ্চাটা যে আপনার কাছে নিরাপদ থাকবে এর নিশ্চয়তা কি?"

মাহিম বেশ অনেকক্ষণ পর বললো, "দরকার হলে আইনি ভাবে তার নিশ্চয়তাও আমি দিবো।"

কিন্তু এতে আবারও বাঁধা দিলাম আমি। আদালতের কাছে দাবি তুলেছি,

"আমার বাচ্চা আমার কাছেই থাকবে। আমার বাচ্চা আমি সারাজীবন নিজের কাছে রাখবো। তাকে আমি কাউকে দিবো না। আমি যেখানে থাকবো আমার বাচ্চাও সেখানে থাকবে।"

কিন্তু, আইনিভাবে একজন বাচ্চার অধিকার প্রথম তার বাবার দিকে এগিয়ে। নিদিষ্ট একটা সময়ের পর, বাবা যদি নিজের সন্তান নিজের কাছে রাখার দাবি আদালতে তোলে, সে ক্ষেত্রে মায়েরা চাইলেও বাচ্চা নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। কিন্তু, আমাদের ক্ষেত্রে সেরকমটা হলো না। মাহিম এই বাচ্চা নিজের কাছে রাখার অনিহা দেখালো। আমার সতীনও অন্যের বোঝা নিজের সংসারে নিতে রাজি নন। অগত্যা আমার দাবিই আদালত লিখিতভাবে নিলেন। সবশেষে আমাদের ডিভোর্স লেটারও রেডি হলো, স্বাক্ষরও হলো। গল্পের আসল লেখিকা,সুমাইয়া আফরিন ঐশী। মাহিম আজ লাস্ট শুনানিতে আমার দেনমোহরসহ ৩ মাসের ভরণপোষণের খরচ জমা দিলো। এছাড়াও, বাচ্চা হওয়ার আগ অবধি আমার চিকিৎসা ও বরণ পোষণের যাবতীয় খরচও তার। এছাড়াও, বাচ্চা আমার কাছে থাকলেও সে তার পিতার সম্পত্তির উপর অধিকার রাখবেন। সবশেষে নানাবিধ অপরাধে মাহিমকে আদালত দিলো ছয় মাসের কারাদ/ণ্ড ও জরিমানা। যদিও ওর শাস্তি আরো বেশি হওয়া দরকার ছিল, কিন্তু ক্ষমতা আর টাকার ফাঁকফোকর থেকে আদালত তাকে অল্পতেই বাঁচিয়ে নিলো। জায়ান আহমেদ আর কিছু করতে চেয়েও পারলো না। আদালতে এরপর আর তার হাত নেই। আজ আমি এতটুকুই সন্তুষ্ট থাকলাম এই ভেবে,

"মানুষের আদালতে ফাঁকফোকর থাকে। কিন্তু আল্লাহর আদালতে কোনো ফাঁকফোকর নেই—সেখানে প্রতিটি কাজের সঠিক বিচার হয়। তুমি ঠিক ততটুকুই পাবে, যতটুকু তোমার প্রাপ্য; হোক তা সুখের পুরস্কার, কিংবা শাস্তির কঠিন বোঝা।"

সেই বিশ্বাস রেখেই আমি দু-হাত উঁচিয়ে একজন অপরাধীকে আল্লাহর নিকট সঁপে দিবো। আমার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস ওর দিকে অভিশা/প হয়ে ফিরবে! হ্যা হ্যা, ফিরবেই। আমি হাসলাম তৃপ্তিতে। ভাগ্যিস, আমাদের একজন রব আছেন!

অবশেষে, আমি আমার সংসারটা লিখিতভাবেই হারালাম। বাচ্চা ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের তালাক কার্যকর হবে। আমি সেই সময়টার সবুরও করলাম না, সেই কবেই মন থেকেই একজন প্রতা/রকে তুলে ফেলেছি! এমন ভাবেই তুললাম যে, আমার ঘৃণাতেও সেই পুরুষের নামটাও থাকবে না। আমি এ-ও জানি, আমি তাকে ছাড়াই বাঁচবো, ভালো থাকবো এবং একজন বিপ্ল/বী নারী হবো। যাকে দ্বিতীয় বার ভাঙাতে আসলে সেই পুরুষ একশত বার ভাববে! বেশ কিছুদিন পর নিজের শহরে ফিরছি আমরা। আমি আর মা বাসের এক সিটের পাশাপাশি, রিধান ভাই অন্য সিটে বসেছে। বাস চলছে। বাসের জানালার পাশের সিটটাতেই বসে আছি আমি। বাইরে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো আমাকে অবচেতনভাবে অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছে। আমার এক হাতে ব্যাগ, অন্য হাতটা অবহেলায় জানালার ধারে রেখে বাইরে তাকিয়ে আছি। শীতল হাওয়ার ঝাপটা মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমি টের পেলাম আমার চোখে এক বিষন্নের স্থিরতা। ভেতরটাতেও কেমন দুমড়েমুচড়ে, মূ/র্ছা যাচ্ছে!
তবুও আমার মনের ভেতরটায় একপ্রকার মুক্তির স্বাদ, আবার গভীর এক শূন্যতা। সম্পর্কের জটিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে আজ আমি একটু হালকা অনুভব করছি, কিন্তু সেই মুক্তি যেন আমার জীবনের অনেকটুকুই কেড়ে নিয়েছে। এটা কি সংসার হারানোর বিষাদ? জানি না আমি, কিচ্ছু জানি না!

বাসের ভিড়, কতো মানুষের কোলাহলও আমাকে ছুঁতে পারছে না। আমি ভাবছি—সব হারিয়েও কি কিছু পাওয়া যায়? হয়তো যায়। নিজেকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন আজ প্রথমবারের মতো আমার চোখে ভেসে উঠছে। জানালার কাচে আমার প্রতিচ্ছবি যেন আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে,

"তুই পারবি, তনয়া। তুই একাই যথেষ্ট।"

বাস ধীরে ধীরে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আমার হৃদয়ের ভাঙা অংশগুলো নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আচমকা, ফোনের ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠলাম আমি। তন্নি কল করেছে। আমি অনাগ্রহের সাথে কল ধরলাম। ওপাশ থেকে ভেসে আসছে বড় খালার কণ্ঠ,

"হ্যালো, তনু?"

বড় খালাদের বাসাতেই এতোদিন থেকেছে, তন্নি। মা একা-একা এক ফ্লাটে রাখেনি ওকে। বড় খালাই তন্নির ফোন থেকে কল করেছে আমায়। খালার কণ্ঠ শুনে আমি আস্তেধীরে বললাম,

"হ্যা, বলো খালা?"

"কী ব্যাপার, কল ধরছিলি না কেন? আমার ফোনে ব্যালেন্স ছিলো না, তাই তন্নির ফোন থেকে কতগুলো কল করেছি তোকে..."

"শুনতে পাইনি খালা।"

আমার বিষন্ন, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ শুনে খালা বিচলিত হলো আরো কয়েকগুণ।

"কি হয়েছে, তনু? তোকে এতো বিষন্ন লাগছে কেন?"

আমি ছলছল চোখে অল্পস্বল্প হাসলাম। বললাম,

"আমার বেনামি সংসারটা আজ ভেঙে গিয়েছে খালা। আজ আমি মুক্ত।"

আমার অদ্ভুত বাচনভঙ্গি শুনে খালা কথার খেল হারিয়ে ফেললো। তব্দা খেয়ে কিয়ৎক্ষণ স্থির রইলো। হয়তো উনি আমাকে বুঝার চেষ্টা করছে। এরমধ্যে, তন্নি ফোন নিলো। জিজ্ঞেস করলো,

"কতদূর এলি, আপু?"

"কাছাকাছি চলে এসেছি, একটু পরই পৌঁছে যাবো। ফোন রাখলাম, আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না এখন।"

"ঠিকাছে আপু, সাবধানে থাকিস। নিজের খেয়াল রাখিস।"

"আচ্ছা, রাখবো।"

তন্নি এরপরও কল কাটলো না। আমায় পুনরায় কণ্ঠে দরদ মিশিয়ে ডাকলো,

"আপু, শোনো?"

"কি?"

"বেইমানরা তোমার জীবনের গল্পের একটি অধ্যায়, পুরো গল্প নয়। তাদের জন্য তুমি থেমে যেও না, মন খারাপ করো না। তারা তোমাকে ভেঙেচুরে দিয়ে আবারও শক্তিশালী হতে শিখিয়েছে। তুমি নিজেকে শক্ত রেখো, সামনে এগিয়ে যাও। সত্যিকার অর্থে যে মানুষগুলো তোমার, তারা তোমার নতুন পথচলার অপেক্ষা করছে!"

ওর কথা শুনে আমি আনমনেই হাসলাম। আমার ছোট বোনটা কি খুব বড় হয়েছে? কেমন ভারি ভারি কথা বলছে! মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিলো, তন্নি। এখন ইন্টারমিডিয়েটের শেষ পর্যায় চলে গেছে, সামনে ওর পরিক্ষা। সময় কীভাবে যে ফুরোয়!
হ্যা, আমাদের সেই ছোট তন্নিটা সত্যিই বড় হয়েছে। আমাদের বাবা নেই, মাথার উপর বড় ভাইদের কোনো ছায়া নেই। আমিই যে বড়, আমার মাথার উপর কত দায়িত্ব বেড়েছে। ওদের জন্য হলেও আমাকে ভালো থাকতেই হবে। আমি আনমনে হাসলাম আবারও। বললাম,

"তোরাই আমার শক্তি, তোরাই আমার বল, তোরাই আমার নতুন পথচলা।"

তন্নি আমাকে আবারও দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দিয়ে বললো,

"আমরা সবাই তোমার সাথে আছি, আপু। তুমি পারবে, তুমি পারবে!"

আমি ভরসা পেলাম। কল কেটে দিয়েছি এরপর। আচমকা, ক্লান্তিতে ধরেছে শরীরে ও মন। আমি বিনা আমন্ত্রণে মায়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলাম। মা একটু মুচকি হাসলো, আমার ধরা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। মায়ের আদর অনুভব করে কখন জানি চোখ লেগেছিল। আমি ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম বোধহয়। আমার তন্দ্রা ভাব কাটে রিধান ভাইয়ের ডাকে,

"তনু, এই তনু?"

আমি আচমকা ডাকে হকচকিয়ে গেলাম। বললাম,

"কি হয়েছে, কি হয়েছে?"

"পোঁছে গেছি আমরা।"

রিধান ভাই এতটুকু বলে ঝড়ের বেগে আবার কোথাও অদৃশ্য হলো। আমি আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিলাম একবার। আমার মাথাটা এখনো মায়ের কাঁধে। মা নড়াচড়া না করেই সেভাবে বসে রয়েছে। পাছে, আমার যদি অসুবিধা হয়। মায়ের গভীর যত্নটুকু আমার মন ভালো হওয়ার কারণ। আমার বুকের ভারটা আচমকা সরে গিয়েছে। আমি মা'কে জড়িয়ে ধরেই সেভাবে কতক্ষণ বসে রইলাম। যাত্রীরা ধস্তাধস্তি করে নামছে। অনেক ভীরের মধ্যে আমি অসুস্থ শরীর নিয়ে গেলাম না। মা বারণ করেছে। আমরা মা-মেয়ে নামলাম সবার শেষে।

°

বাস স্টেশনে কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, আমি আর মা। রিধান ভাইটা আবার কোথায় গেলো? নীরবে আমরা ওনাকে খুঁজছি। আচমকা, আমার চোখ আঁটকে গেলো পরিচিত একটা পুরুষালী মুখের উপর। ওই তো কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ লোক। যে লোকটা আমার বিয়েতে এসেছিলো মাহিমের বাবা হয়ে। যাকে আমি একসময় বাবা বলেও ডেকেছি! আজ সেসব ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে। আমার ইচ্ছে করছে, প্রতারক লোকটার মুখ বরাবর থুথু ফেলতে। কী করে করতে পারলো উনি এমন কাজ? উনি আমার বাবা না হোক, পৃথিবীর কারো না কারোই তো বাবা। বাবারা কি করে প্রতারক হয়? কারণ কী? কারণটা জানতে হলেও, আমি একবার উনার খোঁজ করতাম। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ওই লোকটাকে আজই এখানে দেখবো ভাবিনি। আমি দেরি না করে উনার দিকে এগিয়ে গেলাম। ডাকলাম উঁচু কণ্ঠে,

"এই, এই শুনুন?"

বৃদ্ধ লোকটা আচমকা আমাকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লো। তার চোখে-মুখে গাঢ় বিস্ময়ের রেশ! উনি আনমনেই বলে উঠলেন,

"তনু, তুমি?"

আমি এরমধ্যে বড়বড় পা ফেলে, উনার কাছে পৌঁছে গিয়েছি। আমার পিছনে পিছনে মা-ও এলো। আমি একবার আলগোছে বৃদ্ধ লোকটার আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে নিলাম। আগের সেই পোশাক-আশাকের সঙ্গে এখন উনার মিল নেই। পড়নে সস্তায় কেনা একটা মলিন শার্ট ও লুঙ্গি, পায়ে একজোড়া চটিজুতো, হাতে আধখালি একটা ব্যাগ। সবটাই লক্ষ্য করে আমি তাচ্ছিল্যের সুরে বললাম,

"কী ব্যাপার, আজকাল টাকা-পয়সা পেতে সমস্যা হচ্ছে না-কি আপনার? আগের মতো ঠকবা/জি করার জায়গা পাচ্ছেন না বুঝি!"

লোকটা হঠাৎ মাথা নিচু করে নিলো। আগেপিছে কিছু না ভেবে, দ্রুত আমার থেকে উল্টো রাস্তা ধরে হাঁটা দিলো। আমি বুঝলাম, লোকটা আমার থেকে পালাতে চাইছে। আমি তাকে যেতে দিলাম না, আঁটকে দিলাম। বাঁধা দিয়ে বললাম,

"দাঁড়ান।"

লোকটার পা-জোড়া অমনি থেমে গেলো। তবে, উনি আমার দিকে তাকালো না। আমি সেসবে মাথাও ঘামালাম না। বরং মনের সবটুকু রাগ উগলে দিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,

"জানেন,আমার সংসারটা আজ ভেঙে গেছে!"

লোকটা একটুও চমকালো না এতে। বরং হেলদোলহীন ভাবে বললো,

"যাওয়ারই ছিলো।"

এতে কী যে রাগ লাগলো আমার! উনি এমন ভাব করলো, যেন এতে উনি অনেক খুশী হয়েছে। লোকটার মুখোমুখি হয়ে আমি আগের থেকেও দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বললাম,

"কীভাবে পারলেন? কীভাবে পারলেন, আপনি এই কাজ করতে? আপনার বিবেকে একটুও বাঁধলো না? সবটা যেনেও কেন একটা মেয়ে'কে অনিশ্চিত সংসার গড়তে সাহায্য করলেন? আপনি না বাবা, তবুও কেন একটা মেয়েকে সবাই মিলে ঠকালেন?"

"পেটের দায়ে। পেটে খুদার যন্ত্রণার থাকলে, মাথায় বিবেকের তাড়না থাকে না।"

"মানে? তাই বলে এমন একটা কাজ করবেন?"

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে আমার কথার জবাব দিলো না। আমি আগ্রহ নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি, আমার সঙ্গে মা-ও। কীরকম অদ্ভুত লাগছে লোকটাকে। দূরের ল্যাম্পপোস্টের ফিনফিনে আলোতে তার কুচকুচে যাওয়া চোখ জোড়া চিকচিক করছে। বোধহয় লোকটা কাঁদছে! কিসের এতো দুঃখ উনার? আমার ভাবনার মাঝেই লোকটা বললো,

"আমি আর আমার স্ত্রী টাকার জন্য তোমাদের সঙ্গে অভিনয় করেছি, মা। সেদিন আমাদের হাতে আর কোনো উপায় ছিলো না। আমরা এই কাজ না করলে, মাহিম আমাদের ওতোগুলো টাকা দিতো না, আর আমার অসুস্থ ছেলেটাকেও বাঁচানো হতো না।"

আমার কাছে আবারও সবকিছু পরিষ্কার হলো। লোকটা মিথ্যা বলছে না, তার চিকচিক করা অশ্রুসিক্ত চোখ জোড়া তার সাক্ষী। আমি কিছুক্ষণের জন্য ভাষাহীন, বিতৃষ্ণা চোখে তাকিয়ে আছি সামনের দিকটাতে। এরমধ্যে, মা বললো,

"যতোই হোক, তাই বলে মানুষ ঠকানো কোনো ভালো কাজ নয়। আপনি যেকোনো উপায়ে, আমাদের একবার জানাতে পারতেন সবটা। সেদিন যদি আপনি আমাদের কিছু একটা আঁচ দিতেন, আজ আমার মেয়েটার সংসারটা ভাঙতো না, আমার ফুলের গায়ে এতো আঁচড় লাগতো না। সেদিনই কাঁটা থেকে রেহাই পেতো আমার ফুলটা। আমার মেয়েটা আজ যা যা হারিয়েছে, যে যন্ত্রণা সহ্য করেছে, ওর এক একটা দীর্ঘশ্বাসের পিছনে আপনিও কোনো না কোনো ভাবে দায়ী! নিজের সন্তানের কথা ভেবে আপনি সেদিন আরেকজনের সন্তানকে ঠকিয়েছেন না! আপনি দেইখেন, আল্লাহ এর বিচার নিজেই করবেন। আজ না হয় কাল, ওর রুহের অভিশা/প আপনার সন্তানের উপরও পড়বে।"

লোকটা অদ্ভুত স্বরে হাসলো কিয়ৎক্ষণ। এরপর প্রাণহীন গলায় শুধালো,

"সে অভিশা/পের আর দরকার হবে না, আপা। প্রকৃতি ভোলে না কারো ঋণ! সেদিন আমি আমার সন্তানকে বাঁচালেও, তার পা দু'টো আমি আর বাঁচাতে পারিনি। হঠাৎ এক দুর্ঘ/টনায় আমার ছেলেটার পা দু'টো চিরতরে হারিয়ে গেলো। একমাত্র মেয়েটার সংসারটাও ভেঙে গেলো কারণ ছাড়া। ওই যে পাপ, পাপের পিছুটান!"

লোকটা আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। নির্জীব ভঙ্গিতে চলে গেলো। আমরা মা-মেয়ে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। মানুষটাকে আমাদের আর শাস্তি দেওয়ার দরকার হলো না। ওই যে, লোকটার ভেতরের অপরাধবোধটাই হলো তার আ/ত্মার শা স্তি! আ/ত্মায় যদি অসুখ থাকে, মানুষ কীভাবে ভালো থাকে?

তাকে নিয়ে আমাদের আর বেশিক্ষণ ভাবা হলো না। আমাদের কি আর এতো সময় আছে? আমরা যে নিজনিজ জগতে ব্যস্ত। তান্মধ্যে, রিধান ভাই এলে কোত্থেকে যেন রিকশা নিয়ে। সঙ্গে এনেছে দু'টো কা টা ডাব। আমার হাতে একটা দিলো, মায়ের হাতে একটা দিলো। আমার এতক্ষণ বড়োই জলতেষ্টা লেগেছিল। লোকটা বুঝি খেয়াল করছিল? এতো রাতে ডাব পেলো কই?
আমি এতোশত না ভেবেই, ডাবের পানিটা তৃপ্তি করে খেয়ে নিলাম। রিধান ভাইকে আর একটু আগের ব্যাপারে জানালাম না। গল্পের আসল লেখিকা, সুমাইয়া আফরিন ঐশী। লোকটা বড়ই ঘাড়ত্যাড়া! উনাকে চিনলে, ঝামেলা করবে। অতৃপ্ত মানুষটাকে আমি আর অশান্তি পোহাতে দিলাম না। তার প্রতি আমার আর কোনো রাগ-অনুরাগ নেই। আমার পাওনা যে আমার রব নিজেই আগে আগে পুষিয়ে দিয়েছে। নিশ্চয়ই, রব সর্বশেষ্ঠ বিচারক! রবের নিকট সকল কাজের ন্যায় বিচার পাওয়া যায়। আমিও পাবো! এই ভেবেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেছে আমার।
এরপর, আর সময় নষ্ট করলাম না আমরা। রিকশায় চড়ে বাসায় এলাম। আমাদের সঙ্গে ব্যাগ-পত্র নিয়ে রিধান ভাইও এসেছে। উনি থাকবে না যদিও, একটু পরই বোধহয় চলে যাবে নিজ বাসাতে।

বাসায় আমি ফুরফুরে মেজাজে এলেও, আমার মেজাজের রদবদল হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমাদের উপস্থিত টের পেয়েই মানুষজনের হা ম লা শুরু হলো। আশেপাশের ফ্ল্যাটের ভাবি এলো, চাচিরা এলো। ওরা আমায় কেউ কেউ দেখলো বাঁকা চোখে। কেউ বা আমার জন্য দুঃখ পেলো। আমি যদিও ওসব দেখছি না, ভাবছিও না। কিন্তু, পাশের বাসার ভাবি দরদ দেখিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে যেন। উনি এলো আমার রুমে। পাশে বসে বললো,

"ডিভোর্সটা তবে হয়েই গেলো তোর?"

আমি ঠান্ডা স্বরেই প্রত্যুত্তরে বলললাম, "শুনেছো যখন, আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?"

এতটুকুই যেন আমার দোষ হয়ে গেলো। ভাবি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। খ্যাঁক করে উঠলো,

"ও জিজ্ঞেস করাতেই বুঝি আমার দোষ হয়ে গেছে?"

আমি তার কথাতে পাত্তা দিলাম না। না শোনার মতো ফোন হাতে নিয়ে বসে রইলাম। এতে ভাবির কথাতে সুবিধা হলো না। অধৈর্য হয়ে ডিভোর্সের প্রথম দিনই ভাবি আমায় খোঁটা দিলো,

"ডিভোর্সি মা-গীর তেজ কতো! এই তেজের কারণেই স্বামীর ঘর ছাড়া হতে হয়েছে।"

কথাটা ভাবী বিড়বিড় করে বললেও আমি শুনে নিয়েছি। আমি তাকে তারপরও কিছু বললাম না। কিছু-কিছু সময় চুপচাপ থাকাই ভালো। ভাঙা মানুষের দুর্বল পয়েন্ট ধরে অনেকেই পুনরায় ভাঙতে আসে, আসবে। আর তখন যদি তারা অপর মানুষটার কাছে সুবিধা পেয়ে বসে, তাহলে আর তার রক্ষা নেই। এক জীবন অতিষ্ঠ করে, মানুষ আর তাকে বাঁচতে দিবে না। কিন্তু, আমি তো বাঁচতে চাই। বাঁচাতে চাই, আমার পেটে বেড়ে ওঠা সন্তানকে। তাই চুপ রইলাম। যার-তার কথা কানে তুলতে নেই । এতে ওরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভেবে বসবে। কিন্তু, আমি তো ওদের গুরুত্ব দিচ্ছি না।

দীর্ঘ জার্নিতে শরীর ক্লান্ত লাগছে আমার। আমি কোনো কথাবার্তা ছাড়াই, রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। ভাবী অমনি সুড়সুড় করে চলে গেলো, যুতসই জায়গা না পেয়ে। আমি হাসলাম, তার অপমানিত হওয়া ভোঁতা মুখটা দেখে। রাজ্যের ক্লান্তীতে চোখ বন্ধ করে আমি ভাবতে লাগলাম, এই জায়গাটা আমার ছেড়ে দেওয়া উচিত। মানুষের মগজ বুঝে চলা ভালো। চলার পথে কিছু বি/কৃত মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোও উচিত। এতে মানসিক শান্তি অক্ষ/ত থাকে!
এই সমাজের কাছে আমি এখন ডিভোর্সি। ওদের কাছে আমি বড়ই ঠুনকো, আমার দাম নেই কানাকড়িও। ওরা সুযোগ পেলেই আমাকে বারবার ভাঙতে আসবে। আমিও বারবার মনোবলের খেই হারিয়ে ফেলবো। আমাকে আমার অতীত পিছুডাক দিবে। নিজের সম্মান, নিজের দাম রক্ষার্থে হলেও এই শহরের জায়গাটা আমার পাল্টে ফেলা উচিত। আমাকে আর বেশিক্ষণ ভাবতে হলো না। বসার ঘর থেকে শুনতে পেলাম রিধান ভাই মা'কে বলছে,

"এই বাসাটা পাল্টে ফেলিও, খালা। আমি তোমাদের জন্য নতুন ফ্ল্যাট দেখবো।"

মা-ও তার সঙ্গে সহমত হলো, অমত করলো না। রিধান ভাই বিচক্ষণ মানুষ, এক প্রহরেই বুঝে গিয়েছে, এই বাসাটা এখন আর আমার জন্য শান্তির জায়গা নয়। নতুন জীবন, নতুন বাসায় কাটছে বিন্দাস। সবার আয়ু থেকে আমাদের ছয়টা মাস চলে গেছে। আমার নতুন ঘরে নতুন মেহমানের জন্ম হয়েছে। আমার দুঃখের ঘরে সুখের ছোঁয়া, আমার রাজকুমারী! হ্যাঁ, আমার গর্ভ থেকে একজন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছে। সে পৃথিবীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার বাবা আমার জন্য নিষিদ্ধ পুরুষের খাতায় উপযুক্ত হয়েছে।

আমার কন্যার বাবা নেই। জন্ম থেকেই সে আর পাঁচটা শিশুর মতো বাবার ছোঁয়া পায়নি। তাকে কখনো তার বাবা ছুঁতেও পারবে না, আমি ছুঁতেও দেবো না। আমাদের মা-মেয়ের জীবনে মাহিম নামক মানুষটি কোথাও থাকবে না। সে আছে আমার ঘৃণাতে, আমার অভিশা/পে!

আমি মনে করি, তার বাবা-মা সবটাই এখন আমি। তাকে নিয়ে দিব্যি আনন্দে এখন যাচ্ছে আমার দিন। আমার কন্যাটা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই পৃথিবীটাও যেন নতুন রূপে আমাকে চুম্বন করতে শুরু করেছে। তার ছোট্ট হাত দুটি যখন আমার আঙুলে ছোঁয়, তখন মনে হয় যেন পৃথিবী সবকিছু ভুলে আমার এই মুহূর্তটাকেই বিশেষ করে তুলেছে।

ছোট্ট একটি প্রাণ, যে আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন। তার হাসি, কান্না—সব কিছু আমার এক নতুন পৃথিবীর সূচনা। মাতৃত্বের প্রতিটি দিন কষ্টের হলেও, তার প্রতি মুহূর্তে ভালোবাসা আর দায়িত্বের গোপন শক্তি আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই সন্তান আমার অজানা শক্তি, আমার অমৃত। তার মাঝে আমি এতো এতো সুখের সন্ধান খুঁজে পাওয়াতে, আমি তার নাম রেখেছি সুখ।

ও আমার শুধু সুখ নয়, সুখ পাখি! আমি তাকে নিজের মতো পুষে বড় করবো। পৃথিবীর সকল কিছুর সঙ্গে আমি তাকে পরিচিত করবো। আমি আমার কন্যাকে দুঃখ চেনাবো, সুখ চেনাবো, ক্ষুধা চেনাবো, বাস্তবতা চেনাবো, যাতে আমার মতো একই ভুল আমার কন্যা না করে। তাকে ঘিরে আমার হাজারটা কল্পনা-জল্পনা।

অদ্ভুত এই আনন্দের মাঝে আমার কাঁধে দায়িত্বটাও বেড়েছে। সে ছাড়া-ও আমার পাশে আমার মা রয়েছে, ছোট বোন রয়েছে। বড় হওয়ার সুবাদে তাদের দায়িত্বও আমার। ছোট বোনটা বড় হচ্ছে, সামনে তার পরীক্ষা। এরপর বিয়েসাদীরও একটা ব্যাপার আছে। এতোগুলা মানুষ নিয়ে বসে আর কতকাল খাওয়া যায়? আমার মাথার উপর যে বাবার ছায়া নেই। আমার বটবৃক্ষটা হারিয়ে গেছে সেই কবেই। রেখে গিয়েছে পেনশনের সামান্য কিছু টাকা। আমার বাবা স্কুল মাষ্টার ছিলো কি-না! মা ওটা দিয়েই রয়েসয়ে চলছে। আমি ভাবছি কি করা যায়। আমি এরমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছি। কিন্তু ভালো ফলাফল আসেনি এখনো। যা এসেছিলো, সেই স্বল্প বেতনে আমার পোষবে না। এনিয়ে আমি একটু চিন্তিতও বটে! ভালো চাকরি পাওয়ার সুযোগ নেই আমার। অনার্স কমপ্লিট হতে এখনো আমার দেড়-দু'বছর বাকি। আমার পড়ালেখা শেষ হয়নি এখনো। মাত্র ইন্টারমিডিয়েট সার্টিফিকেট দিয়ে ভালো চাকরি পাওয়াটাও বিলাসিতা! আমি কি যে করি! যতোই হোক, লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে হবে। এরমাঝে যেকোনো একটা কাজ করাও সময়ের দাবি হিসেবে দাঁড়িয়েছে আমার জন্য। কোনো দিকে উপায়ান্তর না পেয়ে বসন্তের এক বিকেলে মা'কে বললাম,

"ভালো চাকরি তো পাচ্ছি না, মা! কি করবো বলতো?"

মা অনেকক্ষণ ভেবে বললো, "তোর জন্য এখন চাকরি পাওয়াটা মুশকিল হয়ে যাবে। চাকরি খোঁজা বাদ দিয়ে কোচিং সেন্টার খুলতে পারিস, শহরে এটা ভালোই চলবে।"

আমি ভেবে দেখলাম, মায়ের আইডিয়াটা খারাপ না। আমি সেই মোতাবেক এগুলাম। বাসার কাছাকাছি একটা ঘর ভাড়া নিলাম, সেখানে খুলে ফেললাম কোচিং সেন্টার। অনলাইন থেকে শুরু করে, শহরের আনাচে-কানাচে ছাপিয়ে দিলাম আমার "সুখ কোচিং সেন্টার" এর বার্তা।
শিশু থেকে শুরু করে, ইন্টার পড়ুয়া স্টুডেন্টকে আমি পড়াতে পারবো। শুরুতে আমি হাতে গোনা ক'জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করলাম আমার এই যাত্রা। বাচ্চা মায়ের কাছে রেখে, আমি আমার সবটুকু শ্রম আর মেধা এখানে ঢেলে দিলাম। আমি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে স্টুডেন্টদের পড়াতাম। যার ফলে ওরা ভালো রেজাল্ট করতো। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চারপাশে আমার শুনাম বাড়তে লাগলো। ধীরেধীরে মানুষজন আমার কোচিং সেন্টার চিনতে লাগলো, ভীড় বাড়লো। এরপর আর কখনো আমাকে স্টুডেন্ট নিয়ে ভাবতে হয়নি।

"সৎ পথে সাফল্য রয়েছে। পরিশ্রমই সেই সাফল্যের চাবিকাঠি, যা একদিন সুন্দর ফল দেয়।"

আমি এই মন্ত্রে বিশ্বাসী। আমি নিজের লক্ষ্য অটুট রেখে পরিশ্রম করতে লাগলাম। খুব শীঘ্রই সে ফল পেতে লাগলাম আমি। কয়েক ব্যাচে ভাগাভাগি করে এখন স্টুডেন্ট পড়াতে হয় আমাকে। আমাকে এতে হেল্প করছে তন্নিও। এরমধ্যে, ওর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন তন্নিও আমার সেন্টারে ছোট বাচ্চাদের পড়ায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের দু'বোনের একটা গতি হয়েছে। এখন আর "কাল কি খাবো, বাসা ভাড়া কীভাবে যোগাড় করবো, বাচ্চার খরচ কীভাবে চালাবো?" এ নিয়ে ভাবতে হয় না আমাদের। আমাদের এই সাফল্যে সবচেয়ে খুশী আমার মা। মা তার সবটুকু দিয়ে আমাদের পাশে থাকছে, সব কাজে সাপোর্ট করছে। আমি টের পেলাম, বাচ্চা, মা-বোন নিয়ে মানসিক শান্তির কমতি নেই আমার। আমার দুনিয়া ঝলমল করছে ওদের ছোঁয়ায়। এরপর আর আমাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সেবার এক বিকেলের কথা। যথারীতি বিকেলে কোচিং সেন্টারে বসে আমি বাচ্চাদের পড়াচ্ছিলাম। আচমকা, কোত্থেকে যেন এলো, রিধান ভাই। সে মাঝেমধ্যে প্রায়ই সময় পেলে আমাদের এখানে আসে, বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে, ঘুরে যায়। এবার এসেছে বেশ কিছুদিন পর। তা-ও আমি তাকে দেখে আগ্রহ দেখালাম না। আমি যথারীতি তাকে এড়িয়ে যাই, এড়িয়ে চলি। আজও গেলাম। এতে অবশ্য রিধান ভাইয়ের কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না। তার আচরণ স্বাভাবিক! রিধান ভাই বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে আমাকে এক প্রকার হুমকি করলো,

"আমায় একটা রং চা খাওয়া তো, তনু?"

আমি একবার বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বললাম, "চা আপনি নিচে গিয়ে খেয়ে আসুন, রিধান ভাই। এটা আমার পড়াবার জায়গা, বাসা নয়। এখানে আমি চা-নাস্তা নিয়ে বসে থাকি না।"

রিধান ভাই কিয়ৎক্ষণ আমার দিকে ভ্রু উঁচিয়ে চেয়ে রইলো আর কিছু বললো না। আমি সেসবে আগ্রহও দেখালাম না। রিধান ভাই বসে রইলো আমার কোচিং এর একটা চেয়ারে। আমার বাচ্চাদের পড়ানোর টাইম শেষ, আমি তাদের ছুটি দিলাম। ওরা চলে গেলো। রিধান ভাই তাও বসে আছে। বিরক্ত হলাম আমি। মানুষটা কি এখানে আজীবন থাকার কথা ভাবছে? আমি এক পর্যায় বললাম,

"যাচ্ছেন না কেনো?"

"আমি এখানে থাকলে অসুবিধা কি তোর?"

রিধান ভাইয়ের পাল্টা প্রশ্নে আমি আবারও বললাম,

"অবশ্যই আমার অসুবিধা আছে। আপনি চলে যান রিধান ভাই, আর কখনো এখানে আসবেন না।"

রিধান ভাই সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললো না। অনেকক্ষণ পর বললো,

"এক্ষুনি চলে যাবো? আরেকটু বসি।"

"বসে কি করবেন? আমার আরেক ব্যাচ পড়ানো বাকি, ওরা চলে আসবে। আপনি চলে যান।"

"বারবার আমাকে চলে যেতে বলছিস কেন, তনু? তোর কি মনে হয়, আমি এখানে বসে, ঘুমতে এসেছি। অনেক কাজ ফেলে এখানে এসেছি।"

"আসছেন কেন, আমি কি আসতে বলেছি আপনাকে?"

রিধান ভাই আমার কথা পাত্তা দিলো না। বললো,

"তোর একটু সময় হবে? বের হবি একটু আমার সঙ্গে?"

আমি তার দিকে আর তাকালাম না। উল্টো দিকে ফিরে বললাম,

"না।"

যদিও আমার হাতে এখন অনেকখানি সময়। পরবর্তী ব্যাচের স্টুডেন্টরা আসতে এখনো ৩০/৪০ মিনিট বাকি। যতোই হোক, সমাজের কাছে আমি একজন ডিভোর্সি নারী। ডিভোর্সি নারীদের কতশত দোষ। এরা কাজের জন্যও যদি কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলে, সমাজের মানুষ সেটাও বাঁকা চোখে দেখে। সেখানে রিধান ভাই বড়ই বেপরোয়া। আজকাল কেমন কেমন করে তাকায় সে আমার দিকে! তার গভীর চোখে চোখ রাখার মতো দুঃসাহস আমার হয় না। গল্পের আসল লেখিকা, সুমাইয়া আফরিন ঐশী। আমি কোনো বদনামের ভাগীদার হতে চাই না! আমার কল্পনা ভিন্ন, বাস্তবতাও ভিন্ন! যতোই আমি প্রতিবাদি আর সাহসী নারী হই, এই সমাজেই আমি করছি বাস। এখানকার সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমাকে থাকতে হয়। আমার সম্মান আমাকেই ধরে রাখতে হবে যে!
আমার থেকে কাঙ্ক্ষিত উত্তর না পেয়ে রিধান ভাই উঠে দাঁড়ালো। পকেট থেকে কিছু চকলেট বের করে টেবিলে রাখলো, গম্ভীর কণ্ঠে একবার আমায় শুধালো,

"সুখের জন্য এনেছিলাম।"

এরপর আর একমুহূর্তও দেরী করলো না, রিধান ভাই। বাইরে বের হলো। এই জিনিস সে প্রায়ই করে। সুখকে খুব স্নেহ করে, রিধান ভাই। কিন্তু, চকলেট আদৌও সুখের জন্য? আমার বাচ্চা মেয়ে। সে কি করে চকলেট খাবে? তাকে আমি এসব কখনোই দেই না। তবুও, ওর বয়স ছ'মাস থেকেই রিধান ভাই আসলে ওর নামে চকলেট নিয়ে আসে। কারণ কি?

এ কারণ ভাবতে চাই না আমি। আমার ভাবনার মাঝেই, রিধান ভাই অনেকদূর চলে গেলো। আমি তাকে পিছন থেকে ডাক দিলাম,

"রিধান ভাই?"

রিধান ভাইয়ের পা থেমেছে কিন্তু লোকটা আর পিছনে ফেরেনি। আমি চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,

"আপনি আর কখনো এখানে আসবেন না, রিধান ভাই। এমনকি আমাদের বাসাতেও না।"

রিধান ভাই প্রত্যুত্তরে কিছু বললো না, এমনকি আমার দিকে তাকালোও না। এলোমেলো পায়ে আমার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হলো। মানুষটা কি কষ্ট পেলো আমার ব্যবহারে? আমি এসব একটিবারও ভাবলাম না। কেবল চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিলাম, এরপর আবারও ব্যস্ত হলাম নিজের কাজে।

°
আজ শুক্রবার। আমার ছুটির দিন। এই দিনটাতে সুখের সঙ্গেই আমি কাটাই। মেয়েটা সপ্তাহে একদিন মা'কে কাছে পেয়ে ছাড়তেই চায় না, বারবার কোলে উঠে জাপ্টে ধরে মা'কে। বুকের সঙ্গে মিশে থাকে। তখন কি যে সুখ সুখ লাগে আমার! আজও সুখকে নিয়ে বসার ঘরে বসে ছিলাম আমি। তন্নি, মা আজ বাসায় নেই। ওরা দু'জন এক আত্মিয়ের বিয়েতে গিয়েছে। আমি যাইনি। বাসায় আজ আমি আর আমার সুখ। হঠাৎ, পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি এলো আমাদের বাসায়। এই ভাবিটা খুব ভালো। কিন্তু, কথা একটু বেশিই বলে। আজও শুরু হলো তার কথার ঝুলি।

"তনু, কি হয়েছে জানো?"

"কি হয়েছে?"

"মাহিমে....."

মাহিম, মাহিম নামটা শুনতে পেয়েই র ক্ত গরম হয়ে গেলো আমার। আমি তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে বললাম,

"আমার সামনে এই নামটা কখনো উচ্চারণ করবেন না, ভাবী। কতবার নিষেধ করেছি আপনাকে?"

জগতের একটাই নাম, যা আমি ভীষণ ঘৃণা করি। এই নামটা আমার বক্ষঃস্থল থেকে আমি মুছে দিয়েছি। এই নাম আমি আর শুনতে চাই না, জানতে চাই না। কিন্তু, এই ভাবিটা বারবার এই নামটাই বলে। কারণ, উনি মাহিমদের এলাকার লোক। কীভাবে কীভাবে যেন সে আমাকে চিনে ফেলছে। তবুও, আমি তাকে শুরু থেকেই এসব বলতে বারণ করেছি। আজ অনেকদিন পর আবারও শুরু হলো উনার পুরোনো কথা। এতে এবার চরম রাগই লাগছিল আমার। উনি এমন কেন? এরমধ্যে, ভাবী আবারও বললো আমায়,

"তুমি মাহিমকে খুব ঘৃণা করো তাই-না, তনু?"

আমি এবার সুখকে আঁকড়ে ধরে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। উনার থেকে উল্টো দিকে ঘুরে বললাম,

"ওরা আমার ঘৃণাতেও নেই, ভাবী। ওরা রয়েছে আমার অভিশা/পে, আমার গোপন দীর্ঘশ্বাসে।"

"তোমার অভিশা/প ওদের জীবনে লেগেছে, তনু। খুব করে লেগেছে! তুমি জিতে গেছো তনু, তুমি জিতে গেছো।
জেল থেকে বের হওয়ার পর মাহিমদের খুব ভালোই চলছিলো। কিন্তু, তোমার অভিশা/প ওদের পিছু ছাড়েনি, পিছু ছাড়েনি।
জানো, মাসখানেক আগে মাহিমদের সহোপরিবার এক্সি/ডেন্ট করেছে। ওদের মেয়েটা সেই জায়গাতেই মা রা গেছে। মাহিম ও তার স্ত্রী ম/রতে ম/রতে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু, এ বাঁচার থেকে ম রে যাওয়াটাও মন্দ নয়। মাহিমের তো দু'টো পা'ই তো কা টা গেছে। এখন চলতে-ফিরতেও পারছে না একা-একা। ওর বউয়েরও মাথাতে আঘাত লেগেছে, মস্তিষ্কে র-ক্তক্ষরণ হয়েছে। এর চিকিৎসা চালাতে চালাতে মাহিম তো পথে বসেছে।"

আমার কি যে হলো! আচমকা, বুকের ভেতর থেকে একটা ভার চলে গেলো। মানুষের এইরকম একটা মর্মা/ন্তিক ঘটনা শুনে কেউ হাসতে পারে? কি অদ্ভুত! আমার মুখে চাপা হাসি লেগেছে। ভাবী আমাকে, আমার অদ্ভুত আচরণকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় শুধালো,

"তুমি খুশী হয়েছো, তনু?"

"জানি না। তবে, আমার মনে হয়, এর থেকে আনন্দদায়ক খবর আমি আর কখনো শুনিনি।"

ভাবী হাসলো। বললো খুব জোরালো গলায়,

"পাপ কাউকে ছাড় দেয় না, কাউকে ছাড়ে না। এটা তো ওদের পাওনা ছিলো।"

আমিও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চনমনে গলায় বললাম, "রব কাউকে ছাড় দেয় না, তাই না ভাবী?"

ভাবী হাসলো। আমার দিকে এগিয়ে ফিসফিস করে বললো,

"জানো, ডক্টর বলেছে, ওরা আর কখনো বাবা-মা হতে পারবে না।"

ঠিক সেই সময়ই আমি উপলব্ধি করলাম, রবের বিচার এই জগতে বসেই হয়। রব যা করে, বান্দার মঙ্গলের জন্যই করে। আমরা অনেক সময় সেটা দেরিতে উপলব্ধি করি। আজ মনে হচ্ছে, আমার রাজ্য সুখেই ভরা। আমি আমার সুখকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে, সুখী সুখী গলায় আওড়ালাম,

"অতঃপর সেদিন মানুষ চিনেছি,
ঠকেছি, তবুও আমি ভালো থেকেছি।
শিখেছি প্রতারণার মাঝে সত্যের খোঁজ,
হারিয়ে গিয়ে ফিরে পাওয়ার মজাটা বুঝেছি।

যে ঠকিয়েছে, সে শিখিয়েছে আমায়—
বিশ্বাস ভাঙলে কেমন করে গড়া যায়।
তাই তো আজ বলি নিশ্চিন্ত মনে,
ঠকেছি বলে, তবু সুখে আছি প্রাণভরে।"

(সমাপ্ত)

....
👁 459