অতিথির ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া নারী

আমার স্বামী মিস্টার ইয়াসিন আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে তার প্রেমিকা সুহাসিনীকে নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে গেল। যাওয়ার আগে ইয়াসিন শুধু একটা মেসেজ পাঠালো, “এই ছুটিটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য। তুমি বাসায় থাকো, ঘর পরিষ্কার করো ওটাই তোমার কাজ।” 
আমি কোনো উত্তর দিইনি। 
আমি শুধু আমাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিক্রি করে দেশ ছেড়ে চলে গেলাম। তারা যখন রোদে পুড়ে হাসিমুখে ফিরে এল, তখন সেই বাড়িটা আর তাদের ছিল না। 
ভোরের আলো ঢাকার গুলশানের আমাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছিল। 
সময় সকাল ৬টা ১০। শহরটা তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল, এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল। 
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, যেন ভিতরের সব অনুভূতি একসাথে জমে পাথর হয়ে গেছে। 
আলমারির দরজা খুলে একটা সিল্কের জামা বের করলাম, ধীরে ধীরে ভাঁজ করে রাখলাম ইয়াসিনের দামী স্যুটগুলোর পাশে। আজ আমাদের বিয়ের ছয় বছর পূর্ণ হলো। 
এই ছয় বছরে আমি কতবার নিজেকে বদলেছি, কতবার নিজের ইচ্ছে মেরে ফেলেছি তার হিসাব নেই। 
সকাল ৮টার ফ্লাইটে কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল, ইয়াসিনেরই পরিকল্পনা তার মতে, এই ট্রিপ নাকি আমাদের সম্পর্কের দূরত্ব কমাবে। 
কিন্তু আমি জানতাম, এই সম্পর্ক অনেক আগেই ভেঙে গেছে, শুধু নামটা বেঁচে আছে। ছয় বছর ধরে আমি তার জীবনের নীরব ভরসা হয়ে ছিলাম। তার রাত করে বাসায় ফেরা, অস্পষ্ট অজুহাত, ফোন লুকিয়ে কথা বলা, আর তার জামায় লেগে থাকা অচেনা পারফিউমের গন্ধ সব আমি দেখেও না দেখার ভান করেছি। 
আমি সবকিছু ঠিকঠাক রেখেছি, যেন সে নির্বিঘ্নে নিজের কাজ, নিজের ব্যবসা, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে। তার কাছে আমি কোনো সঙ্গী ছিলাম না, আমি ছিলাম শুধু একটা নিশ্চিন্ত জায়গা যেখানে সে ফিরে আসতে পারে, যখন তার প্রয়োজন। 
হঠাৎ আমার ফোনটা কেঁপে উঠল। সময় সকাল ৬টা ১৪। ইয়াসিনের মেসেজ। সে একটু আগেই বাসা থেকে বের হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ কিছু বলবে ফ্লাইটের কথা, বা দেরি হচ্ছে এই ধরনের কিছু। 
কিন্তু মেসেজটা খুলতেই সবকিছু বদলে গেল। “রুহানি, এয়ারপোর্টে আসার দরকার নেই। 
আমি সুহাসিনীকে নিয়ে যাচ্ছি। এই বিয়েটা আমার কাছে এখন ক্লান্তিকর। একটু দূরে থাকতে চাই। ও এই ট্রিপটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য। তুমি বাসায় থাকো, ঘর পরিষ্কার করো, আর কোনো নাটক করো না। 
আমি ফিরে এসে সব ঠিক করে ফেলব।” কয়েক সেকেন্ড আমি স্থির হয়ে বসে থাকলাম। কোনো অনুভূতি কাজ করছিল না না কষ্ট, না রাগ, না অপমান শুধু একধরনের শূন্যতা। সে আমাকে সবকিছু করতে দেখেছে তার জন্য রান্না করা, তার জন্য অপেক্ষা করা, তার জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করা—আর তারপর একটা মেসেজ দিয়ে আমাকে মুছে ফেলল। 
আমি আবার সেই লাইনটা পড়লাম“ এই ট্রিপটা তোমার চেয়ে বেশি প্রাপ্য।” হঠাৎ করে আমার ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল। প্রথমে ছোট, তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। আমি হেসে উঠলাম কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল শুধু ঠাণ্ডা হিসেব। 
কারণ ইয়াসিন একটা বড় ভুল করেছে। 
সে ভেবেছে এই বাসা তার, এই জীবন তার, এই আরাম তার। কিন্তু সে জানে না এই পেন্টহাউসটা কখনোই তার ছিল না। তিন বছর আগে আমার খালা খালেদা বেগম এই বাসাটা কিনে আমার নামে করে দিয়েছিলেন। 
তিনি আমাকে বলেছিলেন, “নিজের জন্য কিছু রেখে দিস, রুহানি।” তখন আমি গুরুত্ব দিইনি, কারণ আমি ভাবতাম আমার স্বামীই আমার সবকিছু। 
কিন্তু আজ বুঝলাম, তিনি কতটা ঠিক ছিলেন। সব কাগজপত্র এমনভাবে করা ছিল, যেখানে আমার ছাড়া আর কারো কোনো অধিকার নেই। 
আইন অনুযায়ী, ইয়াসিন এই বাসার মালিক না সে শুধু একজন অতিথি। আমি ফোনটা হাতে নিলাম এবং তানভীর রহমানকে কল দিলাম। 
সে আমার খালার পরিচিত, বিশ্বাসযোগ্য একজন মানুষ। “হ্যালো আপা?” সে বলল। আমি শান্ত গলায় বললাম, “বাসাটা বিক্রি করতে হবে।” 
সে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত হঠাৎ?” আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললাম, “হ্যাঁ। মার্কেটের চেয়ে কম দামে দিলেও সমস্যা নেই। দ্রুত ডিল শেষ করতে হবে। বৃহস্পতিবারের আগেই।” ফোনটা কেটে দেওয়ার পর আমি ধীরে ধীরে পুরো বাসাটা ঘুরে দেখলাম। 
এই সোফায় আমরা একসাথে বসে সিনেমা দেখতাম, এই ডাইনিং টেবিলে বসে আমি অনেক রাত একা একা খেয়েছি, এই বেডরুমে আমি অসংখ্য রাত অপেক্ষা করেছি—আর আজ সবকিছু শেষ। পরের কয়েকটা দিন খুব দ্রুত কেটে গেল। তানভীর কথা রেখেছিল। 
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একজন ক্রেতা পাওয়া গেল—সে নগদ টাকা দিতে রাজি ছিল। দাম একটু কম হলেও আমার তাতে কিছু যায় আসে না। বৃহস্পতিবারের আগেই সব কাগজপত্র সম্পন্ন হয়ে গেল। 
আমি শেষবারের মতো বাসাটার দিকে তাকালাম। কোনো আফসোস ছিল না, কোনো কষ্ট ছিল না শুধু এক ধরনের মুক্তি। 
আমি চাবিটা নতুন মালিকের হাতে তুলে দিলাম, আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর আমি সরাসরি এয়ারপোর্টে গেলাম। 
আমার হাতে ছিল শুধু একটা ছোট ব্যাগ কিন্তু মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা বিশাল বোঝা নামিয়ে ফেলেছি। 
কয়েক ঘণ্টা পর, যখন ইয়াসিন আর সুহাসিনী কক্সবাজার থেকে ফিরে এল রোদে পুড়ে, হাসতে হাসতে তারা এসে দেখল, দরজায় নতুন তালা। তাদের পুরোনো চাবি আর কাজ করছে না। তারা বারবার চেষ্টা করল, কল করল—কিন্তু আমি আর তখন এই দেশে নেই। 
আমি প্লেনে বসে ছিলাম, জানালার বাইরে মেঘের দিকে তাকিয়ে। আমার ফোনে তখন একের পর এক কল আসছে ইয়াসিন, অচেনা নম্বর, মেসেজ। 
আমি একবারও ফোনটা ধরলাম না। শুধু একটা ছোট মেসেজ পাঠালাম “এই বাসাটা কখনো তোমার ছিল না। 
তুমি শুধু একজন অতিথি ছিলে। এবার নিজের জায়গা খুঁজে নাও।” তারপর আমি ফোনটা বন্ধ করে দিলাম। 
প্লেনটা ধীরে ধীরে আকাশে উঠে গেল, আর আমি অনুভব করলাম ছয় বছরের সব অপমান, সব অপেক্ষা, সব কষ্ট… নিচে পড়ে রয়ে গেল। 
আমি প্রথমবারের মতো সত্যিকারের মুক্ত হলাম। ঢাকা শহরের আকাশ তখন ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে আসছিল। প্লেন থেকে নেমে আমি যখন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে বের হলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি আর আগের মানুষটা নেই। যে রুহানি ছয় বছর ধরে কারও ছায়া হয়ে বেঁচে ছিল, সে যেন সত্যিই কোথাও পিছনে পড়ে গেছে। 
হাতে ছোট ব্যাগটা ছাড়া আর কিছুই নেই, কিন্তু মাথার ভিতরে অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করছিল। না, এটা সুখ না, এটা ছিল দীর্ঘদিন পরে পাওয়া নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি।
বাইরে অপেক্ষা করছিল তানভীর রহমান। 
গাঢ় নীল শার্ট, হাতে ফাইল, মুখে ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় একটা ভাব। আমাকে দেখেই সে এগিয়ে এল।
“আপা, আপনি সত্যি চলে এসেছেন?” আমি হালকা মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
সে একটু থেমে বলল, “ইয়াসিন সাহেবের কল আমার কাছে বারবার আসছে। উনি খুব রাগান্বিত। বলছেন আপনি নাকি বাসা বিক্রি করে দিয়েছেন, এটা কীভাবে সম্ভব?”
আমি কোনো তাড়াহুড়ো করলাম না। শান্ত গলায় বললাম, “সব কাগজপত্র তার নামে না। তাই সম্ভব হয়েছে।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বলল, “আপনাকে একটা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না।”
গাড়িতে বসার পর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। ঢাকা শহর আগের মতোই ব্যস্ত, আগের মতোই নিষ্ঠুর। কিন্তু আজ এই শহরকে আমার অপরিচিত মনে হলো না। মনে হলো, আমি প্রথমবারের মতো এই শহরে ফিরে এসেছি নিজের জন্য, কারও স্ত্রী হিসেবে না।
গাড়ি চলতে শুরু করল। তানভীর বলল, “আপা, আপনি চাইলে কিছুদিন আমার ফ্ল্যাটে থাকতে পারেন। তারপর নতুন কিছু ভাববেন।”
আমি বললাম, “না। আমি কোথাও আটকে থাকতে চাই না। আমি শুধু কিছুদিন নিজের মতো করে থাকতে চাই।”
তানভীর আর কিছু বলল না। শুধু গাড়ি চালিয়ে গেল।
অন্যদিকে কক্সবাজার থেকে ফিরে ইয়াসিন যখন গুলশানের সেই পেন্টহাউসের সামনে দাঁড়াল, তখন প্রথমে সে কিছুই বুঝতে পারেনি। মনে হয়েছিল হয়তো তালা বদলানো হয়েছে ভুলবশত বা কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা। সে ফোন বের করে বারবার কল করছিল। 
সুহাসিনী পাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে ছিল।
“ইয়াসিন, কী হচ্ছে এসব? তুমি বলেছিলে সব ঠিক থাকবে।”
ইয়াসিন রেগে গিয়ে বলল, “চুপ করো। এটা আমার বাসা। কেউ না কেউ ভুল করছে।”
কিন্তু মিনিট দশেক পর যখন নতুন মালিকের একজন লোক এসে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে দিল না, তখন তার মুখের ভেতরের আত্মবিশ্বাসটা ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে শুরু করল।
“এই ফ্ল্যাট এখন অন্য কারও নামে। আপনাদের এখানে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিন যেন কয়েক সেকেন্ড থমকে গেল। তারপর হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসি ছিল অবিশ্বাসের।
“অন্য কারও নামে মানে কী? আমি এখানে থাকি। এই বাসা আমার।”
লোকটা শান্তভাবে বলল, “দুঃখিত, কাগজে আপনার নাম নেই।”
সুহাসিনী একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে এবার অস্বস্তি স্পষ্ট। সে নিচু গলায় বলল, “ইয়াসিন, তুমি বলেছিলে এটা তোমার নিজের ফ্ল্যাট।”
ইয়াসিন তার দিকে তাকাল না। সে শুধু ফোনটা কানে লাগাল। একের পর এক কল, কিন্তু কেউ ধরছে না। 
রুহানির নামটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু প্রতিবারই কল কেটে যাচ্ছে।
তখনই প্রথমবার তার ভিতরে অজানা এক ভয় ঢুকতে শুরু করল।
রাতে হোটেলে বসে ইয়াসিন একা ছিল। 
সুহাসিনী রাগ করে আগেই বেরিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর অন্ধকার, শুধু টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। 
সে বারবার কাগজপত্র খুঁজছে, কিছু প্রমাণ, কিছু ভুল, যেটা দেখিয়ে সে বলতে পারবে এটা অসম্ভব।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল, সবকিছু ঠিক আছে। সবকিছু আইন অনুযায়ী হয়েছে। 
আর সবচেয়ে বড় সত্যটা হলো, রুহানি কখনোই শুধু সাধারণ স্ত্রী ছিল না। সে ছিল নীরবভাবে পুরো খেলাটার কেন্দ্রবিন্দু।
তার মাথায় বারবার ঘুরছিল সেই লাইনটা, “এই বাসাটা কখনো তোমার ছিল না।”
রাগে সে টেবিলের ওপর হাত মারল। গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল। কিন্তু তার ভেতরের ভাঙনটা আরও গভীর ছিল।
পরদিন সকালে ইয়াসিন সরাসরি ঢাকায় ফিরে এল। অফিসে না গিয়ে সে প্রথমে গেল তানভীরের অফিসে। মুখে ছিল কঠিন রাগ। “রুহানি কোথায়?”
তানভীর শান্তভাবে তাকাল। “আমি জানি না।”
“তুমি মিথ্যা বলছো।”
“না, আমি শুধু আপনার মতো তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করি না।”
এই কথাটা ইয়াসিনকে আরও রাগিয়ে দিল। সে টেবিলে হাত দিয়ে ঝুঁকে বলল, “ও আমার স্ত্রী।”
তানভীর হালকা হেসে বলল, “ছিল।”
এই একটা শব্দেই ঘরের বাতাস বদলে গেল।
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “সে এটা করতে পারে না। ও এতটা সাহসী না।”
তানভীর এবার ফাইল খুলে বলল, “মানুষকে ভুলভাবে বিচার করাই সবচেয়ে বড় ভুল।”
সে কয়েকটা কাগজ সামনে রাখল। সম্পত্তির দলিল, বিক্রির কাগজ, ব্যাংক ট্রান্সফার সব কিছু।
ইয়াসিনের চোখ কাগজের ওপর স্থির হয়ে গেল। তার মনে হলো, তার পুরো জীবনটা যেন কারও হাতে লেখা স্ক্রিপ্ট ছিল, আর সে শুধু অভিনয় করে গেছে।
সেদিন বিকেলে রুহানি একটি ছোট শহরের হোটেলে বসে ছিল। জানালার বাইরে রোদ, মানুষের হাঁটাচলা, জীবনের স্বাভাবিক গতি। তার হাতে চা, আর চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
প্রথমবার সে নিজের নামটা কাগজে লিখল নিজের জন্য। শুধু নাম। কোনো সম্পর্ক না, কোনো পরিচয় না।
তার ফোনটা এখনো বন্ধ।
কিন্তু সে জানত, এই নীরবতা বেশিদিন থাকবে না।
কারণ কিছু সম্পর্ক ভাঙার পরও শব্দ করে ফিরে আসে।
ঢাকায় ফিরে ইয়াসিন আবার চেষ্টা করল। 
এবার সে শুধু রুহানিকে খুঁজছিল না, সে খুঁজছিল নিজের হারানো নিয়ন্ত্রণ।
কিন্তু যতই সে সামনে এগোচ্ছিল, ততই বুঝতে পারছিল, রুহানি আর সেই আগের মানুষ নেই যে চুপচাপ সব সহ্য করত।
সে এখন এমন এক মানুষ, যে চলে যেতে জানে, আর পিছনে কিছু রেখে যেতে জানে না।
আর ঠিক সেই জায়গাতেই গল্পটা আরও জটিল হতে শুরু করল।
কারণ ইয়াসিন বুঝতে পারছিল না, এটা শুধু বাসার বিষয় না।
এটা ছিল প্রতিশোধের শুরু।ইয়াসিন তানভীরের অফিস থেকে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসে ছিল। ইঞ্জিন চালু ছিল, কিন্তু সে কোথাও যাচ্ছিল না। 
স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে সে একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে ছিল, যেন রাস্তার ভিড়, হর্ন, মানুষের চলাচল সবকিছু তার চারপাশে ঘটছে অথচ সে সেই জগতের অংশ না। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই বাক্য ঘুরছিল—“ছিল।”
এই শব্দটা তাকে ভেতর থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছিল। ছয় বছরের সম্পর্ক, অভ্যাস, অধিকারবোধ, সবকিছুকে এক শব্দে মুছে ফেলা যায়—এটা সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার কাছে রুহানি কখনোই এমন কেউ ছিল না যে নিজে থেকে সবকিছু শেষ করে চলে যেতে পারে। 
সে সবসময়ই ভেবেছে, রুহানি থাকবে, সহ্য করবে, আর সে যত দূরেই যাক না কেন, ফিরে এসে একই জায়গায় তাকে পাবে। কিন্তু আজ সেই জায়গাটা শূন্য।
গাড়িটা হঠাৎ স্টার্ট দিয়ে সে গুলশানের পুরনো পেন্টহাউসের দিকে রওনা দিল। তার ভেতরের অহংকার এখন ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। 
সে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে, যেভাবেই হোক এই পরিস্থিতি সে ঠিক করবে। দরকার হলে কাগজপত্র আবার ঘুরিয়ে দেখা হবে, দরকার হলে কোর্টে যাবে, দরকার হলে রুহানিকে ফিরিয়ে আনবে। তার কাছে এটা শুধু একটা ভুল বোঝাবুঝি, যার শেষ সে নিজে দাঁড়িয়ে ঠিক করবে।
কিন্তু পেন্টহাউসের সামনে পৌঁছে যখন সে নতুন তালা আর অচেনা লোকদের দেখল, তখন তার ভিতরের আত্মবিশ্বাস আবার এক ধাক্কায় নড়ে উঠল। 
এবার আর সে চিৎকার করল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। সুহাসিনী আগেই চলে গেছে। তার জায়গায় এখন শুধু অপমান আর বাস্তবতা। অন্যদিকে রুহানি তখন ঢাকার বাইরের ছোট শহরটিতে দিন কাটাচ্ছিল। 
হোটেলের সেই সাধারণ রুমে জানালার পাশে বসে সে প্রতিদিন সকালে চা খেত। তার জীবন এখন খুবই ছোট পরিসরে চলে এসেছে, কিন্তু সেই ছোট পরিসরের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছিল। 
সে আর কারও জন্য অপেক্ষা করত না, কারও ফোনের শব্দে চমকে উঠত না, কারও মুড অনুযায়ী নিজের দিন বদলাত না। 
এই নীরবতা প্রথমে তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখন সেটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠেছে।
তানভীর মাঝে মাঝে ফোন করত। শুধু খোঁজ নেওয়ার জন্য। রুহানি খুব সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিত। 
সে কারও ওপর নির্ভর করতে চায় না, এমনকি সাহায্যও না। সে জানত, যদি সে আবার কারও ওপর ভর করে দাঁড়ায়, তাহলে আবার একই জায়গায় ফিরে যেতে হবে। তাই সে নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিল, যেন ভাঙা কাঁচ থেকে আবার নতুন কিছু তৈরি হয়।
ঢাকায় ইয়াসিনের জীবন তখন অন্যরকম হয়ে গেছে। অফিসে গিয়ে সে আগের মতো কাজ করতে পারছে না।
পার্টনাররা তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। ফোনে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় সে মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। তার সব সিদ্ধান্তের ভেতর এখন এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। 
যে মানুষটা একসময় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত, সে এখন নিজের জীবনটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
এক সন্ধ্যায় তার অফিসে একজন আইনজীবী এল। হাতে কিছু কাগজপত্র।
“মিস্টার ইয়াসিন, আপনার নামে কিছু নোটিশ এসেছে।”
ইয়াসিন কাগজটা হাতে নিয়ে খুলল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু ধীরে ধীরে পড়তে পড়তে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। এটি শুধু বাসার মালিকানা নয়, কিছু পুরনো আর্থিক লেনদেন, কিছু পারিবারিক ট্রাস্টের পুনর্গঠন, সবকিছু মিলিয়ে এমন এক আইনি কাঠামো, যা তাকে পুরোপুরি বাইরের মানুষ বানিয়ে দিয়েছে।
সে ধীরে ধীরে বলল, “এটা কে করেছে?” আইনজীবী একটু থেমে বলল, “আপনার স্ত্রীর পক্ষ থেকে সব কিছু রেজিস্টার হয়েছে।”
এই শব্দটা আবার তাকে আঘাত করল। “স্ত্রী।” এখনো বলা হচ্ছে, অথচ বাস্তবে সে জানে, সেই সম্পর্কের অস্তিত্ব আর নেই।
ইয়াসিন সেই রাতে আর বাসায় ফেরেনি। 
সে শহরের রাস্তায় গাড়ি চালিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার ভেতরের রাগ ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে, যেটা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। 
সেটা শুধু ক্ষোভ না, সেটা ছিল অনিশ্চয়তা। কারণ সে বুঝতে পারছিল, রুহানি শুধু চলে যায়নি, সে পুরো খেলার নিয়মটাই পাল্টে দিয়েছে।
পরদিন সকালে সে আবার তানভীরকে ফোন করল। এবার তার গলায় রাগ কম, কিন্তু দৃঢ়তা বেশি।
“আমি রুহানির সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
তানভীর শান্ত গলায় বলল, “সে এখন কথা বলতে চায় না।”
“সে আমাকে এভাবে এড়িয়ে যেতে পারে না।”
“সে তো আপনাকে এড়িয়ে যাচ্ছে না, সে শুধু নিজের জীবন বাঁচাচ্ছে।”
এই কথাটা ইয়াসিনের ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিল। 
কিন্তু এবার সে চিৎকার করল না। ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল। দিনগুলো এগোতে লাগল। 
রুহানি এখন অন্য শহর থেকে আরও দূরে চলে গেছে। নতুন জায়গা, নতুন পরিচয়, নতুন রুটিন। 
সে একটি ছোট এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেখানে নারীদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ হয়। 
প্রথম দিন যখন সে সেখানে যায়, কেউ তাকে বিশেষভাবে কিছু জিজ্ঞেস করে না। শুধু কাজ শেখায়। 
আর সেটাই সে চায়। সে ধীরে ধীরে মানুষের গল্প শুনতে শুরু করে। কারও হারিয়ে যাওয়া, কারও বাঁচার লড়াই, কারও আবার নতুন করে শুরু করার চেষ্টা। 
এসব গল্পের মধ্যে সে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়, কিন্তু এবার সেই প্রতিচ্ছবি তাকে দুর্বল করে না, বরং শক্ত করে।
একদিন সন্ধ্যায় এনজিও অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল রুহানি। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে আর্দ্রতা। তার পাশে একজন সহকর্মী দাঁড়িয়ে ছিল।
“আপনি কি কখনো পিছনে ফিরে যান?”
রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “যেখানে আমি ছিলাম, সেখানে আমি আর থাকতে চাই না। তাই পিছনে তাকানো মানে নিজেকে আবার হারানো।”
এই কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো কাঁপুনি ছিল না।
অন্যদিকে ইয়াসিন এখন প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায়। তার ব্যবসায়িক পার্টনাররা তার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। 
সে যেভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতে ক্ষতি বাড়ছে। একসময় যে মানুষটা নিজের নিয়ন্ত্রণে সবকিছু রাখত, এখন সে নিজের ওপরই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
এক রাতে সে একা বাসায় বসে ছিল। 
সেই পুরনো পেন্টহাউস এখন প্রায় খালি। নতুন মালিক কিছু আসবাব রেখে দিয়েছে, কিন্তু সবকিছুর ভেতর শূন্যতা। 
সে সোফায় বসে ছিল, আর তার সামনে টেবিলে রাখা ছিল রুহানির পুরনো একটা ছবি। ছবিটা সে জানে না কখন রেখে গেছে।
সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল।
তার মনে প্রথমবারের মতো একটা প্রশ্ন উঠল, সে কি সত্যিই শুধু হারিয়েছে, নাকি সে নিজেই হারিয়ে ফেলেছে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না।
ঠিক সেই সময় তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সে ধরল না। কিন্তু আবার বেজে উঠল। শেষ পর্যন্ত সে ধরল।
“ইয়াসিন?”
এই কণ্ঠটা অনেকদিন পর শোনা। রুহানি।
সে কিছু বলতে পারল না।
অন্য পাশ থেকে শান্ত গলায় রুহানি বলল, “আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব না। শুধু একটা কথা বলতে ফোন করেছি। 
তুমি যেটা হারিয়েছ, সেটা কোনো জায়গা না। সেটা ছিল বিশ্বাস।” কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে বলল, “আর বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সেটা ফিরিয়ে আনা যায় না।”
ফোনটা কেটে গেল।
ইয়াসিন ফোনটা হাতে ধরে বসে রইল। এবার তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের শূন্যতা। 
যে শূন্যতা মানুষকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়। বাইরে শহর তখনো চলছিল। গাড়ি, আলো, মানুষের জীবন সবকিছু স্বাভাবিক। 
কিন্তু তার ভেতরের জগৎটা তখন থেমে গেছে।
আর দূরে কোথাও রুহানি প্রথমবারের মতো নিজের নামের সঙ্গে কোনো পুরনো ছায়া ছাড়াই দাঁড়িয়ে ছিল। ইয়াসিন ফোনটা হাতে ধরে দীর্ঘ সময় বসে রইল। কলটা কেটে গেছে অনেক আগেই, কিন্তু তার কানে যেন এখনো সেই শেষ বাক্যটা বাজছে “বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সেটা ফিরিয়ে আনা যায় না।” 
এই বাক্যটা তার ভেতরের সব যুক্তি, সব অহংকার, সব রাগকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। 
সে জানত না ঠিক কখন থেকে তার জীবন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তার নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই।
রাত গভীর হচ্ছিল। গুলশানের সেই বড় পেন্টহাউসের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। 
আগের মতো চাকচিক্য এখন আর নেই, আলোও যেন নিস্তেজ। ইয়াসিন সোফা থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল। নিচে শহর তখনও জেগে আছে, গাড়ির লাইট, মানুষের ছোট ছোট ছায়া, সবকিছু চলছে নিজের নিয়মে। 
শুধু তার ভেতরের জগৎটা থেমে গেছে। তার মনে বারবার একই প্রশ্ন ঘুরছিল রুহানি কি সত্যিই এতটা বদলে গেছে, নাকি সে আসলে কখনো তাকে চিনতেই পারেনি?
এই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছিল না। কারণ ছয় বছর ধরে সে যে রুহানিকে দেখেছে, সেটা ছিল নীরব, সহনশীল, আর নিজের কষ্ট গিলে ফেলা এক মানুষ। 
যে কখনো অভিযোগ করেনি, কখনো চিৎকার করেনি, কখনো সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেনি। 
কিন্তু আজ যে কণ্ঠটা ফোনে শুনেছে, সেটা ছিল অন্য এক রুহানি—ঠান্ডা, স্থির, সিদ্ধান্তে অটল।
এই পরিবর্তন তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।
অন্যদিকে রুহানি তখন এনজিওর একটি ছোট রুমে বসে কিছু ফাইল গোছাচ্ছিল। রাত প্রায় শেষের দিকে। 
অফিসের সবাই চলে গেছে। শুধু সে আর এক নারী কর্মী ছিল, যে পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। ঘরের ভেতর হালকা ফ্যানের শব্দ, আর বাইরে দূরের শহরের শব্দ ভেসে আসছিল।
রুহানি তার কাজ থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। 
ফোনটা হাতে নিল। ইয়াসিনের নাম স্ক্রিনে একবার ভেসে উঠল। কিন্তু সে ফোনটা ধরল না। 
শুধু স্ক্রিনটা বন্ধ করে আবার টেবিলে রেখে দিল। তার ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই এখন। কোনো কাঁপুনি নেই। 
সে জানে, সে যেখান থেকে এসেছে, সেখানে ফিরে যাওয়া মানে আবার নিজেকে হারানো। আর সে আর সেই মানুষটা হতে চায় না।
পরদিন সকালে ইয়াসিন অফিসে গেল। 
কিন্তু এবার সে আগের মতো সরাসরি ভেতরে ঢুকল না। গাড়িতে বসে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। তার পার্টনাররা আগেই জানে তার অবস্থা ভালো না। 
কোম্পানির ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে। কিছু বড় ক্লায়েন্ট ডিল আটকে গেছে। আর এসবের কেন্দ্রে এখন সে নিজেই।
অফিসে ঢোকার পর একজন সিনিয়র ম্যানেজার তাকে ফাইল দিল। “স্যার, এই কনট্রাক্টটা যদি আজ সাইন না হয়, আমরা বড় লসের মধ্যে পড়ব।”
ইয়াসিন ফাইলটা হাতে নিল। কিন্তু তার চোখ কাগজে স্থির হলো না। তার মন তখন কোথাও নেই। 
সে ধীরে ধীরে বলল, “পরে দেখব।” ম্যানেজার একটু থমকে গেল। কারণ ইয়াসিন কখনো এমন কথা বলে না।
সেই দিন অফিসে তার উপস্থিতি ছিল, কিন্তু মন ছিল না। সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল না।
বিকেলের দিকে সে আবার ফোন করল তানভীরকে। এবার তার গলায় ক্লান্তি ছিল।
“আমি রুহানির সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। শুধু পাঁচ মিনিট।”
তানভীর একটু চুপ থেকে বলল, “সে চায় না।”
“সে আমাকে এভাবে শেষ করে দিতে পারে না।”
তানভীর এবার শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “সে আপনাকে শেষ করেনি, আপনি নিজেই নিজেকে শেষ করেছেন।”
এই কথাটা ইয়াসিনের ভেতরে কিছু নাড়িয়ে দিল। কিন্তু এবার সে রাগ করল না। 
শুধু ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারছিল, তার কাছে এখন আর কোনো জোর নেই। না সম্পর্কের ওপর, না মানুষের ওপর, না নিজের জীবনের ওপর।
অন্যদিকে রুহানি ধীরে ধীরে নতুন জীবনে স্থিতিশীল হচ্ছিল। এনজিওতে তার কাজ এখন বাড়ছে। 
সে শুধু অফিসে বসে ফাইল দেখে না, বাইরে ফিল্ডে যায়, নারীদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের গল্প শোনে। 
প্রতিটি গল্পে সে নিজের অতীতের কিছু অংশ খুঁজে পায়, কিন্তু এবার সেই অতীত তাকে টেনে ধরে না।
একদিন সে একটি গ্রামের এলাকায় গিয়েছিল। 
সেখানে একটি নারী ছিল, যে স্বামীর নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসেছে। তার চোখে ভয়, কিন্তু একই সাথে বাঁচার ইচ্ছা। 
সেই নারীর পাশে বসে রুহানি দীর্ঘ সময় কথা বলেছিল। সে কোনো উপদেশ দেয়নি, শুধু শুনেছিল।
সেদিন রাতে হোটেলে ফিরে এসে সে অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের মুখ দেখছিল। 
সেই মুখ এখন আর আগের মতো নেই। সেখানে ক্লান্তি আছে, কিন্তু ভাঙন নেই। 
সেখানে ব্যথা আছে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নেই। সে হালকা গলায় নিজেকেই বলল, “আমি ফিরে যাইনি, আমি তৈরি হয়েছি।” ঢাকায় ইয়াসিনের পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছিল। 
কোম্পানির ভেতরে তার সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। বোর্ড মেম্বাররা মিটিং ডাকল। 
সেখানে সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কি এখনো এই দায়িত্ব চালাতে সক্ষম?”
এই প্রশ্নটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। কারণ পুরো জীবন সে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত। আর আজ তাকে বলা হচ্ছে সে অক্ষম।
সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু চুপ করে রইল।
মিটিং শেষে সে বাইরে এসে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিল। 
তার চারপাশে সবাই যাচ্ছে, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। যে মানুষটা একসময় অফিসে ঢুকলেই সবাই দাঁড়িয়ে যেত, আজ সে একা দাঁড়িয়ে আছে।
সেই রাতে সে বাসায় ফিরে আর কিছু খায়নি। 
শুধু সোফায় বসে ছিল। তার সামনে টেবিলে রাখা ছিল পুরনো কিছু কাগজ, পুরনো কিছু স্মৃতি। 
কিন্তু এখন সেগুলো আর অর্থবহ নয়। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। এবার আবার অচেনা নম্বর না। এবার পরিচিত।
রুহানি।
সে কিছুক্ষণ ফোনটা ধরল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরল।
অন্য পাশে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। রুহানি শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমাকে শত্রু ভাবি না, ইয়াসিন। কিন্তু আমি তোমার জীবনে আর জায়গা দিতে পারব না।”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলল, “আমি যদি ভুল করে থাকি, আমি ঠিক করতে চাই।” একটু নীরবতা।
তারপর রুহানি বলল, “সব ভুল ঠিক করা যায় না। 
কিছু ভুল শুধু শেখায়, আর তারপর শেষ করে দেয়।”
এই কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো কাঁপুনি ছিল না।
সে আরও বলল, “তুমি আমাকে যেটা দিয়েছিলে, সেটা ছিল অবহেলা। আর আমি সেটা আর ফিরিয়ে দিতে চাই না।”
ফোনটা আবার কেটে গেল। এইবার ইয়াসিন আর ফোনটা হাতে ধরে রাখল না। সে ধীরে ধীরে সেটাকে পাশে রেখে দিল। তার চোখে এবার রাগও নেই, প্রতিরোধও নেই।
শুধু এক ধরনের উপলব্ধি। সে বুঝতে পারছিল, সে শুধু একজন মানুষকে হারায়নি। সে হারিয়েছে সেই মানুষটার ভেতরের জায়গাটা, যেখানে সে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সেখানে আর সে নেই। কয়েকদিন পর রুহানি একটি বড় ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশ নিতে ঢাকার বাইরে যায়। 
সেখানে বিভিন্ন জেলার নারীরা এসেছে। সবাই নিজের জীবনের গল্প বলছে। কেউ স্বামী হারিয়েছে, কেউ নির্যাতন থেকে পালিয়েছে, কেউ আবার নতুন করে শুরু করছে।
রুহানি তাদের মাঝে বসে ছিল। সে নিজের গল্প বলেনি। শুধু শুনছিল।
কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও তার মধ্যে একটা পরিবর্তন হচ্ছিল। সে আর শুধু নিজের জন্য বাঁচছে না, সে এখন অন্যদের বাঁচার শক্তি হয়ে উঠছে।
সেদিন সন্ধ্যায় প্রোগ্রামের শেষে আকাশে সূর্য ডুবছিল। সবাই ছবি তুলছিল, হাসছিল। 
রুহানি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার ফোনটা বেজে উঠল।
এবার তানভীর।
“আপা, একটা খবর আছে। ইয়াসিন সাহেবের কোম্পানিতে বড় সমস্যা হয়েছে। বোর্ড মেম্বাররা পরিবর্তনের কথা ভাবছে।”
রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এটা তার জীবন। আমি আর তার অংশ না।”
ফোন কেটে দিল। তার চোখে কোনো পরিবর্তন হলো না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
যেন সে বুঝতে পারছিল, জীবন কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না। আর ঠিক সেই সময় অন্যদিকে ইয়াসিন একা তার অফিসের কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। শহর তার সামনে, কিন্তু সে শহরের অংশ না।
তার ভেতরে প্রথমবারের মতো একটাই সত্য পরিষ্কার হয়ে উঠছিল সে শুধু একজন মানুষকে হারায়নি, সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। ইয়াসিন অফিসের কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ ধরে। শহরের আলো ঝলমল করছিল, গাড়ির লাইন নড়ছিল, মানুষ ছুটছিল নিজের গন্তব্যে, কিন্তু তার ভেতরের জগৎটা যেন সম্পূর্ণ থেমে গেছে। 
কাচের ওপারে যে প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল, সেটা তার নিজেরই, কিন্তু সে যেন সেই মানুষটাকে চিনতে পারছিল না। 
ছয় বছর আগের ইয়াসিন আর আজকের ইয়াসিনের মধ্যে কোনো মিল আছে কি না, সে নিজেই বুঝতে পারছিল না।
তার ফোনটা বারবার ভাইব্রেট করছিল। বোর্ড মেম্বার, ম্যানেজার, ক্লায়েন্ট সবাই কল করছে। 
কিন্তু সে ধরছে না। আজকের দিনটা তার জন্য শুধু ব্যবসার না, নিজের অস্তিত্বেরও সংকট। কোম্পানির ভেতরে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে জানে, কিছু একটা বড় পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, কিন্তু সে প্রস্তুত না।
এই মুহূর্তে তার মাথায় বারবার শুধু রুহানির মুখ ভেসে উঠছে। সেই রুহানি, যে কোনোদিন উচ্চস্বরে কিছু বলেনি, যে সবকিছু সহ্য করেছে, যে নিজের কষ্টকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল। 
সেই রুহানি আজ এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সে আর ফিরে তাকায় না।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে পড়ল। 
তার হাতে থাকা ফাইলগুলো খোলা, কিন্তু চোখ সেগুলোর ওপর নেই। সে প্রথমবার বুঝতে পারছে, ক্ষমতা সবসময় মানুষকে শক্তিশালী করে না, কখনো কখনো অন্ধ করে দেয়।
অন্যদিকে রুহানি তখন একটি ট্রেনিং সেন্টারে ছিল। 
সেদিনের সেশন শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সে হল থেকে বের হয়নি। অনেক নারী চারপাশে বসে নিজেদের গল্প বলছে, কেউ কান্না করছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছে। রুহানি তাদের মাঝে বসে শুধু শুনছিল।
একজন তরুণী মেয়ের গল্প তাকে বিশেষভাবে নাড়িয়ে দিল।
মেয়েটি বলছিল, “আমি ভাবতাম আমি ছাড়া সে থাকতে পারবে না। কিন্তু সে আমাকে ছাড়া ঠিকই বেঁচে আছে, শুধু আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।”
এই কথাটা শুনে রুহানির বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার নেমে এলো। সে বুঝতে পারছিল, এই গল্প শুধু ওই মেয়ের না, এটা তার নিজের অতীতেরও প্রতিচ্ছবি।
রাতের দিকে সে যখন রুমে ফিরে এল, তখন জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। 
সে চুপচাপ বিছানার পাশে বসে ছিল। ফোনটা হাতে নিল, স্ক্রিনে অনেক নাম, অনেক মিসড কল, কিন্তু সে কাউকে কলব্যাক করল না।
সে শুধু নিজের ভেতরে থাকা নীরবতাটাকে শুনছিল।
ঢাকায় ইয়াসিনের অফিসে সেই রাতটা আরও ভারী হয়ে উঠল। বোর্ড মিটিং শেষ হয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। তাকে জানানো হয়েছে, কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা থেকে তাকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 
এই সিদ্ধান্ত তাকে সরাসরি অপমান করলেও, সে কিছুই বলতে পারেনি। কারণ সেই মুহূর্তে তার কাছে কোনো যুক্তি ছিল না, কোনো শক্তি ছিল না।
মিটিং শেষে সবাই যখন বেরিয়ে গেল, সে একা রুমে বসে রইল। তার সামনে টেবিলে রাখা ছিল সেই কোম্পানির ফাইল, যেটা একসময় তার স্বপ্ন ছিল। এখন সেটা শুধু কাগজের স্তূপ।
সে হালকা করে হাসল। কিন্তু সেই হাসি ছিল না আনন্দের, ছিল আত্মপরিচয়ের ভাঙনের।
সেই রাতে বাসায় ফিরে সে ঘুমাতে পারল না। বারবার ফোন হাতে নিচ্ছিল, আবার রেখে দিচ্ছিল। 
একসময় সে তানভীরকে কল করল।ন“রুহানি এখন কোথায়?” তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “সে এখন নিজের জীবন গড়ে নিচ্ছে। 
আপনার জায়গা সেখানে নেই।” ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলল, “আমি শুধু একবার তার সামনে দাঁড়াতে চাই।”
তানভীর এবার কঠিন গলায় বলল, “কিছু মানুষকে দেখা মানে তাদের শান্তি নষ্ট করা।”
এই কথাটা শুনে ইয়াসিন চুপ হয়ে গেল। কয়েকদিন পর রুহানি ঢাকায় ফিরে এল। কিন্তু এবার আগের মতো না। 
এবার সে শহরের ভিড়ে হারিয়ে যায়নি, বরং নিজের জায়গা নিয়ে ফিরেছে। এনজিওর পক্ষ থেকে তাকে একটি নতুন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে নারীদের স্বনির্ভরতা নিয়ে কাজ হবে।
সে অফিসে বসে পরিকল্পনা তৈরি করছিল। তার চারপাশে মানুষ কথা বলছে, কাজ চলছে, কিন্তু তার মন শান্ত। 
সে আর আগের মতো অস্থির না। তার সিদ্ধান্তগুলো এখন নিজের জন্য, অন্য কারও জন্য না।
সেদিন দুপুরে হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। একটা অচেনা নাম্বার। সে ধরল না। কিন্তু আবার কল এল। শেষ পর্যন্ত সে ধরল। অন্য পাশে নীরবতা। তারপর ইয়াসিনের কণ্ঠ।
“আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “কেন?”
ইয়াসিন একটু থেমে বলল, “আমি ভুল করেছি। আমি সব ঠিক করতে চাই।”
রুহানি হালকা নিশ্বাস ফেলল। তার গলায় কোনো রাগ ছিল না, কোনো আবেগ ছিল না।
“ইয়াসিন, তুমি যেটা ঠিক করতে চাও, সেটা আর ভাঙা কিছু না। সেটা একটা শেষ হয়ে যাওয়া গল্প।”
ইয়াসিন দ্রুত বলল, “শেষ হতে পারে না। ছয় বছর…”
রুহানি তাকে থামিয়ে দিল।
“ছয় বছর আমি বেঁচে ছিলাম তোমার জন্য। এখন আমি নিজের জন্য বাঁচছি।
এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো কাঁপুনি ছিল না।
“তুমি আমাকে যেভাবে দেখেছ, আমি আর সেই মানুষটা না।” ফোনটা কেটে গেল।
ইয়াসিন ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশে শব্দ ছিল, মানুষ ছিল, কিন্তু তার কাছে সবকিছু দূরের মনে হচ্ছিল।
এইবার তার ভেতরে রাগ নেই, অনিশ্চয়তা নেই, শুধু এক ধরনের ভয়। কারণ সে বুঝতে পারছিল, সে শুধু একজন মানুষকে হারায়নি, সে হারিয়েছে সেই জায়গাটা যেখানে সে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দিনগুলো এগোতে লাগল। 
রুহানি এখন পুরোপুরি নিজের কাজে ডুবে গেছে। তার প্রকল্প সফল হচ্ছে। নতুন নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে। নারীরা তাকে বিশ্বাস করছে। সে তাদের জন্য শুধু একজন কোঅর্ডিনেটর না, একজন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে।
একদিন সে একটি সেমিনারে বক্তৃতা দিতে দাঁড়াল। মঞ্চে উঠে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পুরো হল ভর্তি মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি একসময় ভাবতাম ভালোবাসা মানে সহ্য করা। 
কিন্তু এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে নিজেকে হারানো না।” হলটা চুপ হয়ে গেল।
সে আরও বলল, “যে সম্পর্ক আপনাকে ছোট করে, সে সম্পর্ক আপনাকে ভালোবাসে না।”
এই কথাগুলো বলার সময় তার চোখে কোনো পানি ছিল না। অন্যদিকে ইয়াসিন তখন তার পুরনো পেন্টহাউসে একা বসে ছিল। সবকিছু প্রায় খালি। দেয়ালে এখন আর কোনো হাসির শব্দ নেই, কোনো স্মৃতি নেই। শুধু শূন্যতা।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার ফোনটা পাশে পড়ে আছে, কিন্তু সে ধরছে না। কারণ এখন আর কোনো কল তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
তার ভেতরে একটাই উপলব্ধি পরিষ্কার হয়ে গেছে—সে দেরি করে ফেলেছে। আর রুহানি অনেক আগেই এগিয়ে গেছে। ইয়াসিন পুরনো পেন্টহাউসের সেই নীরব ঘরে অনেকক্ষণ বসে রইল। চারপাশে কোনো শব্দ নেই, শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ সময়কে আরও ভারী করে তুলছে। 
জানালার বাইরে ঢাকার রাত আগের মতোই জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু এই আলো আর তার ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে কোনো মিল নেই। 
সে বুঝতে পারছিল, বাইরের পৃথিবী ঠিকই চলছে, কিন্তু তার নিজের পৃথিবীটা অনেক আগেই থেমে গেছে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো সোফার দিকে তাকাল। 
সেই সোফায় কত রাত রুহানি চুপচাপ বসে থেকেছে, অপেক্ষা করেছে, কথা না বলে শুধু তাকিয়ে থেকেছে।
সবকিছু এখন যেন অন্য কারও জীবনের গল্প মনে হচ্ছে। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছে, যেটা রাগ না, দুঃখ না, শুধু এক ধরনের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনুভূতি।
ফোনটা পাশে রাখা ছিল। স্ক্রিনে একাধিক মিসড কল। বোর্ড মেম্বার, অফিস স্টাফ, কিছু অচেনা নম্বর। 
কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে নামটা বারবার এসেছে, সেটা সে আর দেখতে চায় না। 
কারণ সেই নামটা এখন তার জন্য শান্তি না, অস্থিরতা।
সে জানে, রুহানি এখন আর আগের জায়গায় নেই। 
সে জানে, সে আর সেই জীবনেও ফিরতে পারবে না। কিন্তু তারপরও একটা অংশ বারবার তাকে টেনে নিয়ে যেতে চায় অতীতের দিকে। অন্যদিকে রুহানি তখন একটি নতুন প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল। 
ঢাকার বাইরে একটি জেলার নারীদের স্বনির্ভর করার জন্য একটি ট্রেনিং সেন্টার চালু হয়েছে। 
সেখানেই সে কয়েকদিন ধরে কাজ করছে। প্রতিদিন ভোরে উঠে সে ফিল্ডে যায়, নারীদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের জীবন শুনে, তাদের পাশে দাঁড়ায়।
এই কাজের ভেতর সে নিজের একটা নতুন পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। আগে সে ছিল কারও স্ত্রী, কারও নীরব ছায়া।
 এখন সে নিজের নামে পরিচিত। মানুষ তাকে চিনছে, সম্মান করছে, বিশ্বাস করছে। 
কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, সে আর কারও অনুমতির ওপর নিজের জীবন নির্ভর করছে না।
একদিন সকালে ট্রেনিং সেন্টারে একজন মধ্যবয়সী নারী এসে তার সামনে বসে কান্না শুরু করল। বলছিল, “আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি, কিন্তু এখনো মনে হয় আমি কিছু হারিয়ে ফেলেছি।”
রুহানি তার পাশে বসে ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কিছু হারাওনি। তুমি শুধু নিজেকে খুঁজতে শুরু করেছ।”
এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল অভিজ্ঞতা।
ঢাকায় ইয়াসিনের অবস্থার আরও অবনতি হতে শুরু করেছে। কোম্পানির ভেতরে এখন নতুন নেতৃত্ব আসার কথা চলছে। বোর্ড মেম্বাররা তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তার অতীতের সিদ্ধান্তগুলো এখন প্রশ্নবিদ্ধ। 
যে মানুষটা একসময় পুরো কোম্পানির মুখ ছিল, এখন সে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে।
এক সকালে তাকে অফিসে ডাকা হলো। বড় মিটিং রুম। চারপাশে সবাই বসে আছে। তার সামনে রাখা হলো কিছু ডকুমেন্ট। একজন বোর্ড মেম্বার বলল, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরানো হবে।”
এই বাক্যটা শুনে ইয়াসিনের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া এলো না। সে যেন আগে থেকেই এটা জানত। 
শুধু চোখ নামিয়ে রইল। তার ভেতরে কোনো প্রতিরোধ নেই। কারণ যেখান থেকে সে শক্তি পেত, সেটা এখন আর নেই।
সে ধীরে ধীরে বলল, “ঠিক আছে।” এই একটা শব্দেই যেন তার জীবনের একটা অধ্যায় বন্ধ হয়ে গেল।
মিটিং শেষে সবাই উঠে চলে গেল। রুমে সে একা রয়ে গেল। কাঁচের দেয়ালের বাইরে শহর আবারও ব্যস্ত, কিন্তু ভেতরে সে একা। সে চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে গেল। নিচে গাড়ির লাইন, মানুষের ভিড়, সবকিছু চলমান। 
কিন্তু তার নিজের জীবন থেমে গেছে। ঠিক সেই সময় তার ফোন বেজে উঠল।
রুহানি। এই নামটা দেখেই তার বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল। সে কিছুক্ষণ ফোন ধরল না। তারপর ধরল।
অন্য পাশে শান্ত নীরবতা। তারপর রুহানির কণ্ঠ।
“আমি জানি তুমি এখন কঠিন সময়ের মধ্যে আছো।”
ইয়াসিন কিছু বলল না। রুহানি আবার বলল, “আমি তোমার বিরুদ্ধে নেই, ইয়াসিন। 
আমি শুধু নিজের জীবনের পক্ষে।” এই কথাটা তার ভেতরে একটা গভীর আঘাত করল।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলল, “আমি যদি সব ঠিক করতে চাই?”
একটু নীরবতা। তারপর রুহানি বলল, “সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করা মানে সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা না।”
ইয়াসিন বলল, “আমি শুধু তোমাকে হারাতে চাই না।”
রুহানি শান্ত গলায় বলল, “তুমি আমাকে হারাওনি, ইয়াসিন। 
আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।” ফোনটা কেটে গেল।
এইবার ইয়াসিন ফোনটা হাতে ধরে আর নড়ল না। 
সে শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এবার কোনো আশা নেই, কোনো রাগ নেই, শুধু উপলব্ধি।
অন্যদিকে রুহানি সেই দিন সন্ধ্যায় ট্রেনিং সেন্টারের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। 
আকাশে হালকা লাল আভা, বাতাসে শীতলতা। তার হাতে একটা ফাইল, চোখে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
তার সহকর্মীরা নিচে কাজ শেষ করছে। সে একা ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।
তানভীর ফোন করল। “আপা, একটা খবর আছে। ইয়াসিন সাহেব এখন আর কোম্পানির দায়িত্বে নেই।”
রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “এটা তার জীবন। আমার না।”
তানভীর বলল, “আপনি কি একবারও ভাবেন না তাকে নিয়ে?”
রুহানি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি এখন নিজের জীবন নিয়ে ভাবি।”
ফোনটা কেটে গেল।নসে আবার আকাশের দিকে তাকাল।
তার ভেতরে কোনো অস্থিরতা নেই, কোনো টান নেই।
কারণ সে জানে, কিছু মানুষকে ছেড়ে না দিলে নিজেকে পাওয়া যায় না।
ঢাকায় ইয়াসিন তখন একা তার ফ্ল্যাটে বসে ছিল। সবকিছু এখন শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি তার জন্য সুখ না। 
এটা ছিল পতনের পরের নীরবতা। সে টেবিলের ওপর রাখা পুরনো একটা ছবি হাতে নিল। রুহানির ছবি।
সে ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ সময় বসে রইল। তার মনে একটা প্রশ্ন উঠল যদি সে তখন একটু বদলাত, যদি সে একটু শুনত, যদি সে একটু বুঝত।
কিন্তু এই “যদি” এখন কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ সময় একবার চলে গেলে, সেটা আর ফিরে আসে না।
ঠিক সেই সময় বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। শহর ধুয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরের অপরাধবোধ ধোয়া যাচ্ছে না।
রাত গভীর হতে লাগল। রুহানি তখন নিজের ঘরে বসে নতুন প্রজেক্টের রিপোর্ট লিখছিল। তার পাশে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু সে খেয়াল করেনি। তার জীবন এখন আর কারও গল্প না। এটা তার নিজের লেখা গল্প।
সে একবার থেমে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে আকাশে হালকা বজ্রপাত। তার মনে হলো, কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও কিছু মানুষ নতুনভাবে শুরু করতে শেখে। আর সে সেই দ্বিতীয় মানুষদের একজন। রাতটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে আসছিল। রুহানি জানালার পাশে বসে রিপোর্ট লিখছিল, কিন্তু তার মন পুরোপুরি কাজে নেই। সামনে কাগজ, হাতে কলম, চোখে আলো—সবই আছে, তবুও কোথাও একটা অদ্ভুত নীরবতা তার ভেতর কাজ করছে। 
এই নীরবতা এখন আর তাকে ভয় পাইয়ে দেয় না, বরং তার চিন্তাকে আরও পরিষ্কার করে। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঢাকার আকাশে হালকা বজ্রের শব্দ ভেসে আসছে। 
প্রতিটি বজ্রপাত যেন দূরের কোনো পুরনো স্মৃতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেই স্মৃতি আর তাকে টেনে আনতে পারছে না। 
রুহানি এক মুহূর্তের জন্য কলম থামিয়ে জানালার দিকে তাকাল। কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, যেন কারও না বলা কথা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। তার ফোনটা পাশে রাখা ছিল। কোনো শব্দ নেই, কোনো কল নেই। 
ইয়াসিনের নাম এখন আর বারবার স্ক্রিনে আসে না। প্রথম দিকে যেটা ছিল প্রতিদিনের অস্থিরতা, সেটা এখন ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে। 
সে এখন নিজের জীবনে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অতীত শুধু স্মৃতি, বর্তমানই বাস্তব।
অন্যদিকে ইয়াসিন তখন শহরের এক প্রান্তে তার ফ্ল্যাটে বসে ছিল। সেই ফ্ল্যাট এখন আর আগের মতো নয়। দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবি অনেক আগেই নামানো হয়েছে। টেবিলগুলো প্রায় খালি। 
যে জায়গাটা একসময় ব্যস্ততা আর ক্ষমতার প্রতীক ছিল, সেটা এখন নিঃশব্দ শূন্যতায় ভরা।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। বৃষ্টির ফোঁটা কাচে আছড়ে পড়ছে। তার ভেতরে কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো দৌড় নেই, শুধু থেমে থাকা। 
কয়েকদিন আগে যে মানুষটা কোম্পানির সিদ্ধান্ত দিত, আজ সে নিজের দিনটাও ঠিকভাবে গুছিয়ে নিতে পারছে না। তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সে ধরল।
অন্য পাশে একজন বলল, “স্যার, বোর্ড মেম্বাররা নতুন এমডি নিয়োগ দিয়েছে।”
এই খবরটা তার জন্য নতুন কিছু না, কিন্তু এবার সে কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। শুধু বলল, “ঠিক আছে।”
ফোন কেটে দিল।
তার ভেতরে এখন আর প্রতিযোগিতা নেই, রাগ নেই, প্রতিশোধ নেই। শুধু একটা অনুভূতি আছে, যেটা সে আগে কখনো বুঝত না—খালি হয়ে যাওয়া।
কয়েকদিন আগে যে ভেতরের আগুন তাকে চালিয়ে রাখত, সেটা এখন নিভে গেছে। এখন সে শুধু একজন মানুষ, যার কাছে অতীত ছাড়া আর কিছু নেই।
অন্যদিকে রুহানি ধীরে ধীরে তার কাজের ভেতর আরও গভীরভাবে ঢুকে যাচ্ছে। নতুন প্রজেক্ট শুরু হয়েছে। 
গ্রামাঞ্চলের নারীদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। সে নিজে মাঠে গিয়ে কাজ করছে, তাদের সাথে বসছে, তাদের গল্প শুনছে।
একদিন একটি গ্রামে সে একটি ছোট ঘরে ঢুকল। 
সেখানে এক নারী বসে ছিল, বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, চোখে ক্লান্তি, মুখে ভয় আর লজ্জার মিশ্রণ।
নারীটি বলল, “আমি এখানে আসতে চাইনি। কিন্তু আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।”
রুহানি তার পাশে বসে ধীরে ধীরে বলল, “যেখানে তুমি এখন আছো, সেটাই তোমার শুরু।”
এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো নাটক ছিল না। এটা ছিল নিজের অভিজ্ঞতার থেকে জন্ম নেওয়া সত্য।
সেদিন সন্ধ্যায় রুহানি হোটেলে ফিরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সূর্য ডুবছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। 
সে নিজের হাতে একটা নতুন পরিকল্পনার খসড়া লিখছিল।
তার সহকর্মী এসে বলল, “আপা, আপনি এত চাপ নেন কেন?”
রুহানি হালকা হেসে বলল, “আমি চাপ নিই না। আমি এখন নিজের জন্য বাঁচি।”
এই কথাটা বলার সময় তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না।
ঢাকায় ইয়াসিন তখন একা রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিল। 
কোনো গন্তব্য নেই। শুধু শহরের ভেতর দিয়ে ঘোরা। রাস্তার আলো, মানুষের ভিড়, দোকানের শব্দ—সবকিছু এখন তার কাছে দূরের মনে হচ্ছে।
সে হঠাৎ গাড়ি থামাল। একটা চায়ের দোকানের সামনে। 
অনেক বছর পর সে সাধারণ মানুষের মতো সেখানে বসে চা খেল। কেউ তাকে চিনছে না, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না।
এই অচেনা হয়ে যাওয়া তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করছিল।
সে মনে মনে ভাবল, “আমি কি সত্যিই এত বড় ছিলাম, নাকি শুধু ভেবেছিলাম?”
এই প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে পায় না।
রাতে সে বাসায় ফিরে আবার ফোন হাতে নিল। স্ক্রিনে রুহানির নাম নেই, কিন্তু সে নিজের ভেতরে সেই নামটাই অনুভব করছে।
হঠাৎ তানভীরের কল এল।
“আপা এখন ঢাকায় আসছে না কিছুদিন। তার নতুন প্রজেক্ট ফাইনাল হয়েছে।” ইয়াসিন কিছু বলল না।
তানভীর একটু থেমে বলল, “আপনি কি জানেন, সে এখন অনেক বদলে গেছে?”
ইয়াসিন ধীরে বলল, “না, সে বদলায়নি। সে নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছে।”
এই কথাটা বলার সময় তার গলায় কোনো অভিযোগ ছিল না। রাত গভীর হলো।
রুহানি তখন গ্রামের একটি ছোট গেস্টহাউসে বসে ছিল। বাইরে বাতাস, দূরে কুকুরের ডাক। সে ডায়েরি খুলে কিছু লিখছিল। লেখা খুব ছোট, কিন্তু অর্থ অনেক বড়।
“আমি এখন আর কারও গল্প না। আমি নিজের গল্প।”
সে কলম নামিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকারেও তার ভেতরে আলো আছে। অন্যদিকে ইয়াসিন সেই রাতেও ঘুমাতে পারল না। 
সে বারবার উঠে বসছে, আবার শুয়ে পড়ছে। তার মাথায় শুধু একটাই ছবি—রুহানি চলে যাচ্ছে, আর সে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে, সবচেয়ে বড় শাস্তি কখনোই চিৎকার না, সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো নীরবতা।
কয়েকদিন পর একটা বড় ব্যবসায়িক ইভেন্টে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। 
সে অনেকদিন পর স্যুট পরে বাইরে গেল। সেখানে পুরনো পরিচিত অনেক মানুষ ছিল। 
কেউ তাকে দেখে হালকা মাথা নাড়ল, কেউ দূরে সরে গেল।
তার পাশে একসময় যারা দাঁড়িয়ে থাকত, তারা এখন দূরে।
এই বিচ্ছিন্নতা তাকে আর আঘাত করছে না, শুধু বাস্তবতা হিসেবে মনে হচ্ছে। ইভেন্ট শেষে বাইরে এসে সে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
রুহানি।
এই নামটা দেখে তার বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগল।
সে ফোন ধরল। অন্য পাশে শান্ত কণ্ঠ।
“আমি আগামী সপ্তাহে বিদেশে যাচ্ছি।” ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আর ফিরবে না?”
রুহানি বলল, “ফেরা মানে সবসময় একই জায়গায় ফিরে যাওয়া না।” একটু নীরবতা। তারপর সে বলল, “নিজেকে হারিয়ে ফেলার পর আর ফিরে যাওয়ার জায়গা থাকে না।”
ফোন কেটে গেল। ইয়াসিন ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে এবার কোনো জল নেই, কোনো রাগ নেই।
শুধু একটাই উপলব্ধি—এই গল্প আর তার হাতে নেই।
রুহানি চলে যাচ্ছে, আর সে থেকে যাচ্ছে।
কিন্তু এই থাকা এখন আর জীবন না। এটা শুধু অপেক্ষা, যার কোনো শেষ নেই। ইয়াসিন ফোনটা হাতে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। স্ক্রিনটা এখন অন্ধকার হয়ে গেছে, কিন্তু তার ভেতরের শব্দটা এখনো থামছে না। 
“আমি আগামী সপ্তাহে বিদেশে যাচ্ছি।” এই একটা বাক্য তার পুরো শরীরের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে আবার ফিরে আসছে। মনে হচ্ছে, কেউ খুব ধীরে ধীরে তার জীবনের শেষ সম্পর্কটার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, আর সে ভেতর থেকে সেটা দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না।
রাতটা তখন প্রায় শেষের দিকে। শহরের শব্দ কমে এসেছে, কিন্তু ইয়াসিনের ভেতরে অস্থিরতা আরও বেড়ে গেছে। 
সে বারবার ফোনটা টেবিলে রাখছে, আবার হাতে নিচ্ছে। কোনো মেসেজ নেই, কোনো কল নেই, শুধু নীরবতা। যে নীরবতা আগে তার জন্য স্বস্তির ছিল, এখন সেটাই তার সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে জানে না কখন থেকে তার জীবন এভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। একসময় যেটা ছিল ক্ষমতা, অহংকার, নিয়ন্ত্রণ—সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। 
এখন তার হাতে আছে শুধু অতীত, আর সেই অতীত তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে রুহানি তখন বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল না, বরং সে নিজের ভেতরের একটা অধ্যায়কে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 
এনজিওর প্রজেক্টটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। সব রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। নারীদের একটা বড় গ্রুপ এখন স্বনির্ভরতার পথে। সে জানে, এই কাজ শেষ হলেই তার সামনে নতুন একটা জীবন শুরু হবে।
রুহানি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। 
ঢাকার আকাশে হালকা মেঘ, দূরে যানবাহনের শব্দ। সে কোনো তাড়াহুড়ো করছে না, কিন্তু তার ভেতরে কোনো দ্বিধাও নেই। সে এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, আর সেটা সে ইচ্ছা করেও খুঁজছে না। তার ফোন বেজে উঠল। তানভীর।
সে ধরল।
তানভীর বলল, “আপা, ইয়াসিন সাহেব আপনার বিদেশ যাওয়ার খবরটা শুনেছে।”
রুহানি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “শুনলে সমস্যা নেই।” তানভীর একটু থেমে বলল, “সে খুব খারাপ অবস্থায় আছে।” রুহানি ধীরে ধীরে বলল, “মানুষ যখন নিজের তৈরি করা জীবনে আটকে যায়, তখন সেটা আমার দায়িত্ব না।” ফোন কেটে গেল। তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, কোনো আবেগও না। শুধু বাস্তবতা।
ঢাকায় ইয়াসিন পরদিন সকালে অফিসে গেল। কিন্তু এবার সে আর অফিসে বসে থাকতে পারল না। সবকিছু এলোমেলো লাগছিল। 
বোর্ডরুম, ফাইল, মানুষ, সিদ্ধান্ত—সবকিছু তার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছিল। একসময় যে জায়গাটা ছিল তার শক্তি, এখন সেটা তার ক্লান্তির কারণ।
সে অফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠল। কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্য নেই, শুধু চলা। শহরের রাস্তায় গাড়ি ছুটছে, কিন্তু তার ভেতরের গন্তব্য অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।
হঠাৎ সে গাড়ি থামাল।
একটা ছোট বইয়ের দোকানের সামনে। সে অনেক বছর পর সাধারণ মানুষের মতো দোকানে ঢুকল। পুরনো বইয়ের গন্ধ, নীরব পরিবেশ, অচেনা মানুষ। 
সে একটা বই হাতে নিল, কিন্তু পড়ল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, এতদিন সে শুধু বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে ছোট সিদ্ধান্তটা—নিজেকে ঠিক রাখা—সে কখনো নেয়নি।
সেদিন বিকেলে সে আবার তানভীরকে কল করল।
“আমি রুহানির সঙ্গে একবার শেষবারের মতো দেখা করতে চাই।”
তানভীর এবার চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি জানেন, সে দেখা করতে চাইবে না।”
ইয়াসিন বলল, “আমি জোর করব না। শুধু একবার সামনে দাঁড়াতে চাই।”
তানভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমি চেষ্টা করব।”
অন্যদিকে রুহানি তখন তার বিদেশ যাওয়ার টিকিট হাতে পেয়েছে। তার ফ্লাইট আর কয়েকদিন পর। সে ব্যাগ গুছাচ্ছিল না, কারণ তার কাছে খুব বেশি কিছু নেই। 
এই জীবনে সে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে, সেগুলো সে অনেক আগেই নিজের ভেতরে গুছিয়ে ফেলেছে।
তার সহকর্মীরা তাকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়ার কথা বলছিল, কিন্তু সে না করে দিয়েছে। সে কোনো বড় বিদায় চায় না। সে শুধু চায় একটি শান্ত শুরু।
এক সন্ধ্যায় তানভীর তাকে ফোন করল। “আপা, ইয়াসিন সাহেব আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়। শেষবারের মতো।” রুহানি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ঠিক আছে। 
কিন্তু কোনো জায়গা না। শুধু পাঁচ মিনিট।” তানভীর বলল, “ঠিক আছে।” পরের দিন বিকেলে একটি শান্ত ক্যাফে। খুব বেশি ভিড় নেই। সাধারণ পরিবেশ। 
রুহানি আগে এসে বসে ছিল। তার সামনে একটা পানির গ্লাস। সে কোনো দিকে তাকাচ্ছিল না, শুধু নিজের ভেতরে শান্ত ছিল। কিছুক্ষণ পর ইয়াসিন ঢুকল।
তার চেহারা আগের মতো নেই। ক্লান্ত, ভাঙা, কিন্তু এখনও ভেতরে এক ধরনের চেষ্টা আছে নিজেকে ধরে রাখার। সে ধীরে ধীরে এসে বসে। দুইজনের মধ্যে প্রথমে কোনো কথা নেই। রুহানি প্রথমে বলল, “সময় খুব কম।”
ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল, “আমি জানি।”
একটা নীরবতা।
তারপর ইয়াসিন বলল, “আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি।”
রুহানি শান্ত গলায় বলল, “না, তুমি আমাকে হারাওনি। 
তুমি আমাকে তখনই হারিয়েছিলে, যখন তুমি আমাকে মানুষ হিসেবে দেখনি।” ইয়াসিন চোখ নামিয়ে নিল।
সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি ভুল করেছি। আমি সবকিছু আবার ঠিক করতে চাই।” রুহানি এবার তার দিকে তাকাল।
তার চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো দয়া নেই।
“ইয়াসিন, তুমি যেটা ঠিক করতে চাইছ, সেটা আর ভাঙা জিনিস না। সেটা একটা শেষ।” ইয়াসিন বলল, “আমি বদলাতে পারি।” রুহানি হালকা নিশ্বাস ফেলে বলল, “মানুষ তখনই বদলায়, যখন তাকে হারানোর কিছু থাকে। 
তুমি তখন বদলাওনি, যখন আমার থাকা দরকার ছিল।”
এই কথাটা ইয়াসিনের ভেতর ভেঙে পড়ার মতো লাগল।
সে কিছু বলতে গেল, কিন্তু পারল না। রুহানি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“আমি তোমাকে ঘৃণা করি না, ইয়াসিন। কিন্তু আমি তোমার কাছে আর ফিরব না।”
ইয়াসিন বসে রইল।
তার ভেতরে এবার কোনো যুদ্ধ নেই। শুধু হার মানা।
রুহানি চলে যেতে শুরু করল।
দরজার দিকে যেতে যেতে সে একবারও পেছনে তাকাল না।
কারণ এখন তার সামনে কোনো অতীত নেই, শুধু ভবিষ্যৎ।
ক্যাফের ভেতর ইয়াসিন একা বসে রইল।
তার চারপাশে মানুষ আছে, শব্দ আছে, জীবন আছে, কিন্তু তার জন্য কিছু নেই। সে বুঝতে পারল, সবচেয়ে বড় হারানো কখনো চিৎকার করে আসে না। এটা আসে নীরবে।
ঢাকার আকাশ তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।
রুহানি বাইরে এসে দাঁড়াল। তার হাতে ব্যাগ, চোখে স্থিরতা।
সে জানে, পরদিন সে দেশ ছাড়বে। তার জীবনের শেষ বাঁধনটা আজ ভেঙে গেছে।
অন্যদিকে ইয়াসিন ক্যাফের ভেতর বসে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরছে
যদি সে তখন মানুষটাকে হারাতে না দিত, তাহলে কি সবকিছু অন্যরকম হতো?
কিন্তু উত্তর এখন আর কোনো অর্থ বহন করে না।
কারণ রুহানি চলে যাচ্ছে।
আর এইবার সত্যিই ফিরে আসছে না। ইয়াসিন ক্যাফের ভেতর অনেকক্ষণ বসে রইল। চারপাশে মানুষের কথা, কাপের শব্দ, দরজার ঘণ্টা বাজা সবকিছু স্বাভাবিক, কিন্তু তার ভেতরের জগৎটা পুরোপুরি থেমে গেছে। সে এখন আর কিছুই ভাবতে পারছে না, শুধু একটা শূন্যতা অনুভব করছে, যেটা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না। 
এটা কষ্ট না, এটা রাগ না, এটা কোনো প্রতিশোধের আগুনও না। এটা হলো সেই অবস্থা, যখন মানুষ বুঝে যায় তার জীবনের কোনো অধ্যায় আর তার হাতে নেই।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বিল দিল। বাইরে বের হয়ে এল। ঢাকার রাস্তা তখন সন্ধ্যার আলোয় ভেজা, গাড়ির হেডলাইটগুলো লম্বা লম্বা ছায়া ফেলছে। 
সে হাঁটছে, কিন্তু গন্তব্য নেই। তার পা চলছে, কিন্তু মন কোথাও যাচ্ছে না। 
অনেক বছর পর সে প্রথমবার নিজের শহরে একা হাঁটছে, কিন্তু এই একাকিত্ব এখন আর তার কাছে নতুন না, এটা তার পরিচিত হয়ে গেছে।
তার ফোনটা হাতে ছিল। স্ক্রিনে কোনো নতুন মেসেজ নেই। রুহানির নাম নেই। 
সেই নামটা এখন তার জীবন থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, যেমন নদীর ধারে রাখা পাথরকে ধীরে ধীরে ঢেউ সরিয়ে নেয়, কিন্তু শব্দ করে না, শুধু নিয়ে যায়।
অন্যদিকে রুহানি তখন তার হোটেল রুমে বসে ছিল। বিদেশ যাওয়ার আগের রাত। ঘরের আলো মৃদু, জানালার বাইরে শহরের শেষ ব্যস্ততা। তার ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে। 
খুব বেশি জিনিস নেই, কারণ সে এখন জানে, মানুষ যত কম বহন করে, তত হালকা হয়।
সে বিছানার পাশে বসে ডায়েরি খুলল। কিছু লিখল না প্রথমে। শুধু খালি পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কলম নামাল।
“আমি যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখানে আমি আর নেই।”
এই একটা লাইন লিখে সে থামল। আর কিছু লিখল না। কারণ তার মনে হলো, তার আর অতীতের ব্যাখ্যা দরকার নেই। সেদিন রাতটা দুইজনের জন্যই আলাদা ছিল।
ইয়াসিন তার ফ্ল্যাটে ফিরে এল। দরজা খুলতেই ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে গিলে ফেলল। আলো জ্বালাল না। 
সোফায় বসে রইল। টেবিলে রাখা ছিল পুরনো একটা ফাইল, যেটা সে অনেকদিন আগে বন্ধ করে রেখেছিল। 
সে সেটা ছুঁল না। শুধু বসে রইল। তার ভেতরে এখন আর পরিকল্পনা নেই, প্রতিরোধ নেই, বদলানোর ইচ্ছাও নেই। 
শুধু এক ধরনের স্থির উপলব্ধি—সে যেখানে ছিল, সেখানেই শেষ হয়ে গেছে। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
তানভীর।
সে ধরল।
তানভীর বলল, “আপা কাল সকালে ফ্লাইট।”
ইয়াসিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি জানি।” তানভীর বলল, “আপনি কি কিছু বলবেন?”
ইয়াসিন ধীরে ধীরে বলল, “না।” এই একটা শব্দ বলার পর সে ফোনটা কেটে দিল।
রুহানি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। 
শহরের শেষ আলোগুলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। তার ভেতরে কোনো অস্থিরতা নেই। 
বরং একটা অদ্ভুত শান্তি কাজ করছে। সে মনে মনে ভাবল, “বিদায় মানে শেষ না। বিদায় মানে শুরু।” পরদিন ভোর।
এয়ারপোর্টে ভিড়, ব্যস্ততা, ঘোষণা, হুইলচেয়ারের শব্দ, ব্যাগ টানার শব্দ—সবকিছু একসাথে চলছে। 
রুহানি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে পাসপোর্ট, চোখে কোনো দোটানা নেই।
তার সহকর্মীরা এসেছে তাকে বিদায় দিতে। 
কেউ কাঁদছে না, কিন্তু সবার চোখে একটা নীরব অনুভূতি আছে। তানভীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
সে কাছে এসে বলল, “আপা, আপনি কি একবারও পেছনে তাকাবেন না?” রুহানি হালকা হাসল।
“আমি পেছনে তাকালে সামনে যাওয়া আটকে যাবে।”
সে এগিয়ে গেল।
বোর্ডিং গেটের দিকে। অন্যদিকে শহরের আরেক প্রান্তে ইয়াসিন তখন গাড়িতে বসে ছিল। 
সে এয়ারপোর্টে আসেনি সে জানে, যদি সে আসে, তাহলে হয়তো নিজেকে আর সামলাতে পারবে না। 
কিন্তু তারপরও তার পা গাড়িতে থেমে নেই। গাড়ি চলছে এয়ারপোর্টের দিকে। 
তার ভেতরে একটা লড়াই চলছে যাওয়া না যাওয়া। সে জানে না কেন যাচ্ছে। 
হয়তো শেষবার দেখার জন্য, হয়তো কিছু না বলার জন্য, হয়তো শুধু নিজের ভেতরের একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য।
কিন্তু যখন সে এয়ারপোর্টে পৌঁছাল, তখন স্ক্রিনে ফ্লাইট ইতিমধ্যেই বোর্ডেড দেখাচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে রইল।
চারপাশে মানুষ, শব্দ, দৌড়াদৌড়ি। কিন্তু তার সামনে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। সে আর কিছু করতে পারল না।
শুধু দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরে কোনো নাটকীয় ভাঙন নেই, কোনো চিৎকার নেই। শুধু একটা নিঃশব্দ উপলব্ধি।
সে দেরি করে ফেলেছে। এইবার সত্যি সত্যি। রুহানি তখন প্লেনে বসে ছিল। জানালার পাশে সিট। 
বাইরের পৃথিবী ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। সে নিচে তাকিয়ে আছে। শহর, নদী, বাড়িঘর সব ছোট হয়ে যাচ্ছে।
তার পাশে একজন সহযাত্রী বসেছে, কিন্তু সে কথা বলছে না। প্লেন রানওয়েতে এগোতে শুরু করল।
ইঞ্জিনের শব্দ বাড়ছে। রুহানি জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে কোনো ভয় নেই।
শুধু এক ধরনের মুক্তি। প্লেন ধীরে ধীরে আকাশে উঠল।
নিচের পৃথিবী দূরে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইয়াসিন এয়ারপোর্টের কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখছিল আকাশে একটা প্লেন উঠছে। সে জানে না সেটা কোনটা।
কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। যেন কেউ সত্যিই চলে যাচ্ছে, আর এইবার আর ফিরে আসছে না।
সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। তার পাশে মানুষ যাচ্ছে, ফোন বাজছে, জীবন চলছে। 
কিন্তু তার জন্য সবকিছু থেমে গেছে। সে বুঝতে পারল, কিছু হারানো কখনো শব্দ করে না।
এটা শুধু ধীরে ধীরে মানুষকে খালি করে দেয়। আকাশে প্লেনটা আরও দূরে চলে গেল। 
রুহানি সেখানে বসে ছিল, জানালার পাশে, নিজের ভেতরে স্থির। তার জীবনের সব পুরনো দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। 
আর সামনে শুধু অজানা পথ।
ঢাকায় ইয়াসিন একা এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টি শুরু হলো হালকা করে। সে ভিজছে, কিন্তু নড়ছে না।
কারণ এখন তার কাছে আর কিছু হারানোর নেই। শুধু নিজেকে ছাড়া। এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ইয়াসিন অনেকক্ষণ নড়ল না। হালকা বৃষ্টি তার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সে সেটা টের পাচ্ছিল না। চারপাশে গাড়ি যাচ্ছে, মানুষ ছুটছে, ফোনে কথা বলছে, জীবন আগের মতোই চলছে। 
শুধু তার ভেতরে সবকিছু থেমে গেছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারছিল না ঠিক কোন মুহূর্তে তার জীবন এমন হয়ে গেল। 
একটা সময় ছিল যখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে আত্মবিশ্বাস ছিল, প্রতিটি কথায় নিয়ন্ত্রণ ছিল। 
আর এখন সে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক জায়গায়, যেখানে তার কোনো সিদ্ধান্তই আর কাজ করে না।
তার চোখে ভেসে উঠল রুহানির মুখ। সেই রুহানি, যে একসময় তার অপেক্ষায় থাকত, তার কথায় নীরব থাকত, তার রাগ, তার অবহেলা সবকিছু গিলে ফেলত। 
আর সেই রুহানি এখন আকাশে কোথাও চলে গেছে—যেখানে সে পৌঁছাতে পারবে না, ডাকলেও ফিরবে না।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে ফিরল না। সে হাঁটতে শুরু করল শহরের দিকে। গন্তব্য নেই, উদ্দেশ্য নেই, শুধু চলা। 
তার ভেতরে কোনো প্রতিশোধ নেই, কোনো রাগ নেই, শুধু এক ধরনের পরিষ্কার উপলব্ধি সে হারিয়েছে, এবং এই হারানো আর ফেরানো যাবে না।
অন্যদিকে হাজার হাজার ফুট উপরে আকাশে রুহানি জানালার পাশে বসে ছিল। নিচে মেঘের সাদা সমুদ্র, তার ওপরে সূর্যের আলো। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল 
সে প্রথমবারের মতো এত দূর থেকে নিজের দেশকে দেখছিল। ঢাকা এখন ছোট, দূরের একটা বিন্দু।
তার পাশে বসা মানুষ ঘুমিয়ে আছে, কেবিনে হালকা শব্দ, এয়ার হোস্টেসের চলাচল সবকিছুই স্বাভাবিক। 
কিন্তু রুহানির ভেতরটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
তার মনে একবারও ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আসছে না। 
কারণ সে জানে, ফিরে যাওয়া মানে আবার সেই একই গল্পে আটকে যাওয়া, যেখান থেকে সে কোনোদিন বের হতে পারত না যদি সে একদিন নিজে সিদ্ধান্ত না নিত।
সে চোখ বন্ধ করল। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল 
তার মনে একটিই অনুভূতি—মুক্তি।
ঢাকায় ইয়াসিন সেই রাতে আর বাসায় ফিরল না। 
সে শহরের রাস্তায় হাঁটতে লাগল। পুরনো এলাকা, পুরনো দোকান, পুরনো মানুষ—সবকিছু তার পরিচিত, কিন্তু আজ সবকিছুই অচেনা মনে হচ্ছে। 
সে একসময় যেসব জায়গায় ঘুরে বেড়াত, এখন সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে সে এখানে কখনো ছিল না।
একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসল। কাপ হাতে নিল। গরম চা। ধোঁয়া উঠছে। 
সে চায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে ফেলল। এই হাসিতে আনন্দ নেই, বিদ্রূপও নেই। শুধু উপলব্ধি। 
সে মনে মনে বলল, “আমি সবকিছু পেয়েও কিছু রাখতে পারিনি।” তার চোখে এবার একটু পানি এলো, কিন্তু সেটা মুছল না। কারণ এখন আর লুকানোর কিছু নেই।
এয়ারপোর্ট থেকে কয়েকদিন পর একটি খবর এল। 
রুহানি বিদেশে পৌঁছে গেছে। নতুন কাজ শুরু করেছে, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। তার ছবি এনজিওর পেজে এসেছেনহাসছে, মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।
ইয়াসিন সেই ছবি দেখল। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।
কারণ সে বুঝে গেছে, কিছু জীবন আর তার সঙ্গে যুক্ত না।
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। ইয়াসিন আবার অফিসে ফিরল না। কোম্পানির কাগজপত্র অন্যদের হাতে চলে গেছে। সে আর সেই আগের মানুষ নেই।
সে একটা ছোট ফ্ল্যাটে চলে এল। খুব সাধারণ জীবন। 
কোনো বড় আসবাব নেই, কোনো দামী জিনিস নেই। শুধু একটা বিছানা, একটা চেয়ার, আর জানালা।
সে এখন প্রতিদিন সকালে উঠে জানালার পাশে বসে থাকে।
শহর দেখে। আর নিজের ভেতরটা দেখে।
রুহানি তখন বিদেশে তার নতুন জীবনে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে গেছে। কাজ, মানুষ, দায়িত্ব সবকিছু তাকে ব্যস্ত রাখে। 
কিন্তু এই ব্যস্ততা তাকে ক্লান্ত করে না, বরং জীবিত রাখে।
একদিন সন্ধ্যায় সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বিদেশের শহর, অচেনা আকাশ। তার ফোনে একবার তানভীরের মেসেজ এল। “ইয়াসিন সাহেব আর আগের মতো নেই।”
রুহানি কিছুক্ষণ মেসেজটা দেখল। তারপর শুধু রিপ্লাই করল, “সবাই বদলায়। কেউ ভেঙে, কেউ গড়ে।”
ফোনটা রেখে দিল। তার চোখে কোনো অতীত নেই। ঢাকায় ইয়াসিন সেই রাতে আবার এয়ারপোর্টের সামনে গেল।
সে জানে না কেন এসেছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে তাকিয়ে আছে। যেখানে একদিন একটা প্লেন উঠেছিল।
সে হালকা করে বলল, “তুমি ভালো থেকো, রুহানি।” এই প্রথমবার সে কিছু চাইলো না। না ফেরত, না ক্ষমা, না দেখা।
শুধু বিদায়। বৃষ্টি আবার শুরু হলো। কিন্তু এবার সে ভিজে যাচ্ছে না। কারণ এখন তার ভেতরেও আর কিছু বাকি নেই যা ভিজতে পারে। লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল 
সমাপ্ত 

....
👁 376