ফুলসজ্জিত রুমে একহাত ঘোমটা দিয়ে বসে আছে নূরা। এর আগে ও তার বিয়ে হয়েছিলো বিয়েটা টিকেনি কারন নূরা বোবা কথা বলতে পারে না। তবে শুনতে পায়। এইবার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তাকে সে দেখেনি তবে শুনেছিলো সে খুব রাগী আর অহংকারী মানুষ। তাই তো নূরা ভয়ে ভয়ে আছে। যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার বউ না কি চলে গেছে পরকীয়া করে। নূরা বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলো। ভয়ে মেয়েটা অনবরত ঘামছে। নূরার বয়স ষোলো বছর। মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখা-পড়া করেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সুযোগ সে পায়নি। কারন ঘরে তার সৎ মা ছিলো। দিনে রাতে উঠতে-বসতে তাকে মারধর করত। ওনার ভাষায় বোবাদের এতো পড়া লেখা করে লাভ কী? তারা তো আর জর্জ-ব্যারেস্টার হবে না। নূরা দেখতে সুন্দর না হলেও অতোটাও খারাপ নয়। শ্যমলা তার গায়ের রং। এক ডাল মাথা ভর্তি চুল। হরিনের মতো টানা টানা চোখ। কপালের এক সাইডে সুন্দর একটা তিল আছে। নূরার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার নাম আহান মির্জা। পেশায় একজন সিআইডি। নূরা ছোটো থেকে এইসব পেশার মানুষদের ভয় পায় আর আজ তার ভাগ্যেই এই পেশার একজন জুটেছে। আহান মির্জার বাবা শাকিল মির্জা একজন ডাক্তার। নূরা যতটুকু শুনেছে শাকিল মির্জারা দুই ভাই এক বোন। শাকিল মির্জা বড় আর ওনার ভাই সজীব মির্জা ছোটো। আহান মির্জারা দুই ভাই এক বোন। আহান বড়ো আর ছোটো ভাই সাকিব মির্জা ইন্টারে পড়ে বেশ মিশুক। নূরার সাথে বেশ সুন্দর করে কথা বলেছে মিশেছে। নূরা যেহেতু কথা বলতে পারে না তাই মাথা নাড়িয়েছে। আর ছোট বোন আলো মির্জা এইবার মধ্যমিকে পড়ে।
নূরার এইসব ভাবনার মাঝে দরজার খুলার শব্দ হলো। নূরা নড়েচড়ে বসল। আহান মির্জা প্রবেশ করল। স-শব্দে ডোরটা লক করল। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ রেগে আছে। নূরা ঘোমটা আড়ালে একবার আড়চোখে তার পুরুষটিকে। বেশ লম্বা চওড়া সুঠাম দেহ। বুঝাই যাচ্ছে নিয়মিত জিম করে। নূরার যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঢোক গিলল সে। আহান নূরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— হেই ইউ? নূরা ফাতেহা রাইট।
নূরা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালো। আহান তার মাথার পাগড়ীটা খুলতে খুলতে বলল,
— এই বিয়েটা মেনে নিতে আমার সময় লাগবে। কিন্তু তার মানে এই না যে তোমায় অস্মান করবো। যথেষ্ট সম্মান করবো তোমায়। পড়ালেখা করতে চাও?
নূরা ফেরে মাথা নাড়ালো।
— গুড! কালই তোমায় ভর্তির ব্যবস্থা করে দিবো। সাকিব এর সাথে রোজ কলেজে যাবে। কোনো ছেলেদের সাথে ভুলেও মিশবে না। আর শোনো, বোরকা পড়ে কলেজে যাবে গট ইট।
নূরা মাথা নাড়ালো। কি আর বা করবে মাথা নাড়ানো ছাড়া তো আর কোনো কাজ নেই। কথা তো আর বলতে পারে না। আহান ফোর্স করে নিঃশ্বাস নিলো। তারপর নূরাকে বলল,
— কাছে আসো।
নূরা বাধ্য মেয়ের মতো বিছানা থেকে নেমে কাছে এলো। আহান নূরার ঘোমটা তুলল। অতঃপর বলল,
— মাশা-আল্লাহ। খুব সুন্দর তুমি। হাতটা দেও।
নূরা হাতটা দিলো। আহান পকেটে থেকে একটা জুয়েলারি বক্স বের করে নূরাকে আংটি পড়িয়ে দিলো। অতঃপর বলল,
— যাও দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নেও। তোমার এই সাজ পোশাক দেখে আমারই গরম লাগছে। তোমার না জানি কত কষ্ট হচ্ছে। দেরি করো না কুইক ফ্রেশ হয়ে নেও।
নূরা তার লাগেজ থেকে জামা বের করতে নিলে আহান বলল,
— আলমারির ড্রয়ারে তোমার জন্য রাখা একটা প্যাকেট আছে ওটা নেও।
নূরা তাই করল। আলমারি খুলে প্যাকেট টা বের নিয়ে তার ভিতরে হাত দিয়ে ভিতরে থাকা ড্রেস বের করল। ভাঁজ করা নতুন ড্রেসটা খুলে চোখের সামনে ধরতেই চোখ জোড়া তার বড় বড় হয়ে গেলো। এতে নাইট ড্রেস। নূরা তো বাপের জন্মে ও ড্রেস পড়েনি। নূরা মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। যার অর্থ সে পড়বে না এইটা। আহান ভ্রু যুগল কুঁচকে বলল,
— এইটাই পড়তে হবে গো। তুমি না পড়লে আমি পড়িয়ে দিবো। বিলিভ মি আমার একটুও না কষ্ট হবে না লজ্জা লাগবে। নাউ ইউ ডিসাইড।
নূরা বেকায়দায় পড়ল। আহানের চোখ মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে সে, মোটেও ফাজলামো করচ্ছে না কথাটা সে সিরিয়াসলি বলেছে। কাঁদো কাঁদো ভাব নূরার।
— কি হলো আমি আসবো?
নূরা আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না সে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। এই লোকটাকে তার মোটেও ভালো লাগেনি। কেমন খাপছাড়ানো গম্ভীর গলা। আরেকটু হলে নূরা ফিট খেতো। আল্লাহ্ দয়ার সরীর তাই বাঁচিয়ে দিলো তাকে এই যাত্রায়।
নূরা চলে যেতে আহান বারান্দায় চলে গেলো। পাঞ্জাবির পকেটে হতে একটা সিগারেট নিলো। নূরার সাথে তার বিয়েটা ঘটকালির মাধ্যমে হয়েছে। হাজার মেয়ের পিকের মধ্যে তাকে সে সিলেক্ট করেছে। ওর কথা বলার না পাড়াতে তার কোনো সমস্যা নেই মানুষটা খাঁটি হতে হবে। আগের জনের মনের মতো বেইমান না হলেই সেই খুশি।
বেশ কিছুক্ষন পর দরজা খুলার তীক্ষ্ণ শব্দ হলো। বুঝলো নূরা বের হয়েছে। হাতের সিগারেট টা ফেলে দিয়ে লম্বা কদম ফেলে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল সে। দেখলো নূরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাইটি পড়ের।
নাইটিটা বেশ মানিয়েছে নূরার গায়ে। ইচ্ছাকৃত ভাবে নূরাকে ভয় দেখানোর জন্য আহান গম্ভীর কন্ঠে বলল,
— স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়াও এইভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো?
কেঁপে উঠল নূরা। কী সাংঘাতিক লোকরে বাবা! রাগ আর গাম্ভীর্য যেন এই লোকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নতুন জামাটার অস্বস্তি আর আহানের এই মেঘমন্দ্র কণ্ঠ সব মিলিয়ে নূরার মনে হলো মেঝেটা যদি দুভাগ হয়ে যেত, তবে সে তার ভেতরে লুকিয়ে বাঁচত। ভয়ে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
আহান নূরার এই জড়সড় রূপ দেখে মনে মনে একটু হাসল। নিজের পেশাগত গম্ভীর স্বভাবটা চট করে ঝেড়ে ফেলা তার পক্ষে কঠিন, তবে মেয়েটাকে আর বেশি ঘাঁটাল না। সে নূরার আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে আলতো করে পিঠের পেছনে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,
— আমি মানুষটা একটু শক্ত স্বভাবের নূরা, কিন্তু জল্লাদ নই। এই পোশাকটায় তোমাকে সত্যিই খুব মানিয়েছে। এখন ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে না থেকে খাটে গিয়ে ঘুমাও। আজ সারাটা দিন তোমার ওপর দিয়ে ধকল গেছে।
নূরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে দ্রুত পায়ে খাটের এক কোণায় গিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল এবং গায়ের ওপর চাদরটা এমনভাবে টেনে নিল যেন নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করা যায়।
আহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে নিজের টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর যখন সে ফ্রেশ হয়ে বের হলো, দেখল নূরা খাটের একদম শেষ প্রান্তে, প্রায় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
আহান খাটে এসে শুতেই পুরো তোশকটা একটু দেবে গেল। নূরার হৃৎপিণ্ড আবার যেন ড্রাম বাজাতে শুরু করল। সে দেয়ালের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে রইল। হঠাৎ একটা শক্ত ও উষ্ণ হাত নূরার কোমরে জড়িয়ে ধরল এবং আলতো টানে তাকে খাটের মাঝবরাবর নিয়ে এলো। নূরা আতঙ্কে শিউরে উঠে চোখ বড় বড় করতেই অন্ধকারের মাঝে আহানের ফিসফিসানি শুনতে পেল,
— ওভাবে একদম কিনারে শুলে রাতে নিচে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে। তখন আবার কাল কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে যেতে পারব না। চুপচাপ ঘুমাও, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।
আহানের গায়ের হালকা পারফিউম আর সিগারেটের মিশ্র গন্ধটা নূরার নাকে এসে লাগল। এই প্রথম কোনো পুরুষের এতো কাছাকাছি হওয়া। প্রথমে ভয় লাগলেও, আহানের বুকের ওম আর শক্ত বাঁধনে কেমন যেন একটা অদ্ভুত নিরাপত্তা ছিল। সৎ মায়ের ঘরে যে মেয়েটা শুধু অবহেলা আর লাঞ্ছনা পেয়েছে, তার কাছে এই শাসনটুকুও কেমন যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো শোনাল। আস্তে আস্তে নূরার ক্লান্ত চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
---
পরদিন সকালে পাখির কিচিরমিচিরে নূরার ঘুম ভাঙল। চোখ মেলতেই সে দেখল ঘর ফাঁকা, আহান রুমে নেই। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। নতুন বাড়ি, প্রথম সকাল, অথচ তার উঠতে দেরি হয়ে গেল! সৎ মা হলে এতক্ষণে চুলে মুঠি ধরে টেনে তুলত।
নূরা তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে নিজের সুতি থ্রি-পিস পরে রুম থেকে বের হতেই ডাইনিং স্পেসে সাকিবের মুখোমুখি হলো। সাকিব তাকে দেখেই এক গাল হেসে বলল,
— আরে ভাবিজান! গুড মর্নিং। তুমি এত সকালে উঠে পড়লে কেন? ভাইয়া তো বলল তোমাকে ডাক না দিতে।
নূরা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। তখনই রান্নাঘর থেকে আলো বের হয়ে এলো, তার হাতে চায়ের কাপ। আলোকে দেখে নূরার খুব আপন মনে হলো। আলো বলল,
— ভাবি, বাবা আর ভাইয়া অলরেডি টেবিলে বসা। চলো, নাস্তা করবে।
ডাইনিং টেবিলে যেতেই নূরার বুকটা আবার ধক করে উঠল।
টেবিলের প্রধান আসনে বসে আছেন শ্বশুর শাকিল মির্জা। তাঁর ঠিক পাশেই বসা ওনার ছোট ভাই সজীব মির্জা এবং চাচী শায়লা বেগম। সজীব মির্জার দুই ছেলে-মেয়ে রাইয়ান আর রিদিয়া ওরাও টেবিলে বসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে।
নূরাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চাচী শায়লা বেগমই প্রথম ডেকে উঠলেন,
— আরে নতুন বউমা যে! এসো এসো, ভেতরে এসো। আমরা সবাই তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
নূরা মাথা নিচু করে ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। আলো নূরাকে টেনে নিয়ে আহানের পাশের খালি চেয়ারটায় বসিয়ে দিল। নূরা আড়চোখে একবার আহানের দিকে তাকাল। লোকটা এখনো সেই একই রকম গম্ভীর, যেন ডাইনিং টেবিলে নয়, কোনো ক্রাইম সিনের তদন্তে বসে আছে।
সজীব মির্জা হেসে বললেন,
— বড় ভাই, আমাদের বাড়ির বউমা কিন্তু মাশা-আল্লাহ খুব লক্ষ্মী। চেহারা জুড়ে কী শান্ত একটা ভাব!
শাকিল মির্জা পরম স্নেহে নূরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ঠিক বলেছিস সজীব। নূরা মা, এই বাড়িতে কোনো সংকোচ করবে না। আজ থেকে এটা তোমারও ঘর। যা লাগবে আলোকে বা শায়লাকে ইশারায় বুঝিয়ে দেবে, কেমন? এখন পেট ভরে নাস্তা করে নাও।
চাচাতো বোন রিদিয়া নূরার প্লেটে একটা পরোটা আর ডিম পোচ তুলে দিয়ে বলল,
— ভাবি, আমাদের এই বাড়িতে কিন্তু অনেক নিয়ম। তবে সবচেয়ে বড় নিয়ম হলো, সকালের নাস্তাটা সবাইকে একসাথেই করতে হয়। তুমি একদম ভয় পেও না, আমরা সবাই খুব ফ্রেন্ডলি।
নূরা কৃতজ্ঞতায় সবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটু হাসল। সৎ মায়ের সংসারে যে মেয়েটা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু লাঞ্ছনা আর গালমন্দ পেত, এই ভরা পরিবারের ভালোবাসা তার বুকে এসে তীরের মতো বিঁধল। তার চোখ দুটো সিক্ত হয়ে উঠল।
তখনই আহান কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
— নূরা, তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করো। সাকিবের কলেজের প্রিন্সিপালকে ফোন দিয়েছিলাম, ওনারা আজই ফর্ম ফিলাপ করতে ডেকেছেন। নাস্তা শেষ করেই আমরা বের হব।
আহানের এই হুট করে দেওয়া আদেশে নূরা পরোটার টুকরো মুখে তুলতে গিয়েও থেমে গেল। সে মাথা নাড়িয়ে দ্রুত খাওয়া শুরু করল।
....