বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছিল ঢাকা শহর। জুন মাসের এক সন্ধ্যায় রাস্তায় জল জমে ছোট ছোট নদী তৈরি হয়েছে। আরিয়ান তার কালো অফিসের গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে হাঁটছিল মিরপুরের একটা ছোট ক্যাফের দিকে। তার হাতে একটা ল্যাপটপের ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের জীবন এমনই—দিনরাত কোড, মিটিং, ডেডলাইন।ক্যাফেতে ঢুকতেই একটা মিষ্টি গন্ধ এল। কফির সাথে ভ্যানিলা আর দারচিনির মিশেল। ভিতরে খুব কম আলো, দেওয়ালে পুরোনো বইয়ের তাক, আর এক কোণে একটা পিয়ানো। আরিয়ান তার নিয়মিত টেবিলে বসল। কিন্তু আজ তার টেবিলে কেউ বসে আছে।
“এক্সকিউজ মি, এটা আমার...” কথা শেষ করতে পারল না আরিয়ান সামনে বসে থাকা মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল। তার চোখ দুটো গাঢ় বাদামি, চুল কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠে ছড়ানো, পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ। তার হাতে একটা খাতা, আর কলম দিয়ে কী যেন লিখছিল।
“ওহ সরি! আমি জানতাম না এটা রিজার্ভড,” মেয়েটি হাসল। হাসিটা এতটাই স্বচ্ছ যে আরিয়ানের মনে হল কেউ যেন তার বুকের ভিতর আলো জ্বালিয়ে দিল।
“না না, ঠিক আছে। আমি অন্য টেবিলে বসছি,” আরিয়ান বলল। কিন্তু তার পা আর নড়ছিল না।
মেয়েটি হেসে বলল, “বসুন না। টেবিলটা তো বড়। আমি একা। আর বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়াও তো যাবে না।”
আরিয়ান বসল। নাম জিজ্ঞাসা করল।
“আমি নাফিসা। নাফিসা রহমান। লিখি।”
“লেখক?”
“ছোট ছোট গল্প। আর কবিতা। আর আপনি?”
“আরিয়ান হক। কোড লিখি। কম্পিউটারের ভাষায়।”
সেই সন্ধ্যায় তাদের কথা থামল না। নাফিসা বলল তার গ্রামের বাড়ির কথা, সিলেটের চা বাগানের কথা। আরিয়ান বলল তার একাকী শহরের রাতের কথা। বৃষ্টি থামার পরও তারা বসে রইল। যখন ক্যাফে বন্ধ করার সময় হল, তখনও তাদের কথা শেষ হয়নি।
পরের দিন আবার দেখা হল। তারপর পরের দিন। এক সপ্তাহের মধ্যে আরিয়ান বুঝতে পারল—এটা শুধু কফি আর গল্প নয়। এটা কিছু অন্যরকম।নাফিসা একটা ছোট ফ্ল্যাটে একা থাকত। তার বাবা-মা সিলেটে। সে ঢাকায় এসেছে লেখালেখির জন্য। তার প্রথম বই প্রকাশের অপেক্ষায়। আরিয়ান তার জীবনে প্রথম এমন কাউকে দেখল যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে, যেন তার সব কথা শুনতে চায়।
একদিন সন্ধ্যায় তারা লেকের ধারে হাঁটছিল। আকাশে লাল-কমলা রং। নাফিসা হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল,
“আরিয়ান, তুমি কখনো ভেবেছ কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে?”
আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখন থেকে ভাবব।”
তার হাতটা নিজের হাতে নিল। নাফিসা সরিয়ে নিল না।
সেই রাতে আরিয়ান বাসায় ফিরে প্রথমবার তার ডায়েরিতে লিখল:
“আজ আমি একটা মেয়েকে খুঁজে পেয়েছি যে আমার সমস্ত অসম্পূর্ণতা দেখেও হাসে।”
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না।নাফিসার পরিবারের একটা পুরোনো প্রতিশ্রুতি ছিল। তার চাচাতো ভাই রিয়াজের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে বলে পরিবার বিশ্বাস করত। রিয়াজ লন্ডনে থাকে, ব্যবসায়ী। নাফিসা কখনো রাজি হয়নি, কিন্তু পরিবারের চাপ বাড়ছিল।
আরিয়ানের বাবা-মা ঐতিহ্যবাহী। তারা চান তাদের ছেলে একটা “ভালো ঘরের” মেয়েকে বিয়ে করুক, যে ঘর সামলাতে পারবে। লেখক মেয়ে তাদের কাছে “অস্থির” মনে হয়।
দুজনের মধ্যে প্রেম গভীর হচ্ছিল, কিন্তু বাধা আসছিল ধীরে ধীরে।
দুই মাস কেটে গেল। আরিয়ান আর নাফিসা প্রায় প্রতিদিন দেখা করত। কখনো লেকে, কখনো পুরোনো ঢাকার গলিতে, কখনো বইয়ের দোকানে। নাফিসা তার নতুন গল্পের খসড়া পড়ে শোনাত আরিয়ানকে। আরিয়ান তার কোডের জটিলতা বোঝাতে চেষ্টা করত।
একদিন নাফিসা বলল, “তুমি আমার গল্পের নায়ক হয়ে যাচ্ছ।”
আরিয়ান হেসে বলল, “তাহলে তুমি আমার জীবনের নায়িকা।”
কিন্তু সমস্যা শুরু হল যখন নাফিসার মা ঢাকায় এলেন। তিনি জানতে পারলেন মেয়ে একটা ছেলের সাথে ঘুরছে। প্রথমে শান্তভাবে বুঝিয়েছিলেন, পরে চাপ বাড়ল।
“রিয়াজ তোমার জন্য ভালো। সে তোমাকে সুখী রাখতে পারবে। এই ছেলেটা কী করে? সফটওয়্যার? এসব তো আজকাল সবাই করে।”
নাফিসা কাঁদতে কাঁদতে আরিয়ানকে ফোন করল।
“আমি পারছি না আরিয়ান। পরিবার...”
আরিয়ান চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল, “আমি তোমাকে ছাড়ব না। কিন্তু তোমাকেও তোমার পরিবারকে হারাতে দেব না।”
তারা সিদ্ধান্ত নিল একটা সময় চাইবে। নাফিসা তার মাকে বলবে সে আরিয়ানকে ভালোবাসে। আরিয়ান তার বাবা-মাকে বোঝাবে।
কিন্তু ভাগ্য নিষ্ঠুর।
আরিয়ানের কোম্পানি তাকে ছয় মাসের জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠাল প্রজেক্টের জন্য। যাওয়ার আগের রাতে তারা শেষবার দেখা করল। লেকের একই জায়গায়।
নাফিসা কাঁদছিল। “তুমি চলে গেলে আমি কী করব?”
আরিয়ান তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “প্রতিদিন ফোন করব। প্রতি সপ্তাহে ভিডিও কল। আর ছয় মাস পর ফিরে এসে তোমাকে বিয়ে করব। কথা দিলাম।”
বিমানবন্দরে বিদায়ের সময় নাফিসা আরিয়ানের হাত শক্ত করে ধরেছিল। “ফিরে এসো। আমি অপেক্ষা করব।”
সিঙ্গাপুরে আরিয়ানের দিনগুলো কষ্টের হয়ে গেল। কাজের চাপ প্রচণ্ড। কিন্তু প্রতি রাতে নাফিসার সাথে কথা বলত। নাফিসা তার নতুন বইয়ের অগ্রগতি বলত। কিন্তু তার গলায় একটা দুঃখ লুকিয়ে থাকত।
তিন মাস পর একদিন নাফিসা ফোন ধরল না। দুইদিন, তিনদিন। আরিয়ান উদ্বিগ্ন হয়ে তার ফ্ল্যাটের ল্যান্ডলেডিকে ফোন করল।
“নাফিসা আপা তো গ্রামে চলে গেছে। তার মা খুব অসুস্থ।”
আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল। সে জানত এটা সত্যি নয়। নাফিসার মা সুস্থই ছিলেন। এটা চাপ। পরিবার তাকে জোর করে নিয়ে গেছে।
সে রাতে আরিয়ান প্রথমবার কাঁদল। তারপর সিদ্ধান্ত নিল—ছয় মাস অপেক্ষা করবে না। সে প্রজেক্ট শেষ করার আগেই ছুটি নিয়ে ঢাকায় ফিরবে।
কিন্তু ঢাকায় ফিরে শুনল নাফিসাকে তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। রিয়াজ ঢাকায় এসেছে।
আরিয়ান পাগলের মতো খুঁজতে লাগল নাফিসাকে। তার পুরোনো বন্ধুদের কাছে, ক্যাফেতে, সেই লেকে। কোথাও নেই।
অবশেষে একটা ছোট চিঠি পেল নাফিসার কাছ থেকে। এক বন্ধুর মাধ্যমে।
“আরিয়ান, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু পরিবারের জন্য আমাকে এই বিয়ে করতে হবে। তুমি আমাকে ভুলে যাও। তুমি অনেক ভালো ছেলে। তুমি সুখী হবে। — তোমার নাফিসা”
চিঠিটা পড়ে আরিয়ানের সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সে ঠিক করল—একবার শেষ দেখা করবে।
বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। নাফিসা সিলেটের বাড়িতে। আরিয়ান একাই গেল সেখানে। তার হাতে নাফিসার জন্য লেখা একটা চিঠি আর একটা ছোট হীরের আংটি।
বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল বিয়ের আয়োজন চলছে। নাফিসা ঘরের ভিতর বসে আছে, চোখ ফোলা। আরিয়ান কোনোভাবে তার কাছে পৌঁছাল।
“নাফিসা।”
নাফিসা চমকে উঠে তাকাল। “তুমি এখানে কেন? চলে যাও!”
“আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আর তুমিও পারবে না। বলো, তুমি সত্যিই এই বিয়ে চাও?”
নাফিসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “না। কিন্তু আমার মা...”
ঠিক তখন নাফিসার মা ঘরে ঢুকলেন। আরিয়ান তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“আমি আপনার মেয়েকে সারাজীবন ভালোবাসব। আমি তাকে কষ্ট দিব না। আমি আপনাদের ছেলের মতো হয়ে থাকব। শুধু একটা সুযোগ দিন।”
নাফিসার মা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তোমার সততা দেখে আমার মন গলে গেছে। কিন্তু সমাজ...”
সেই মুহূর্তে নাফিসার বাবাও এসে পড়লেন। দীর্ঘ আলোচনা হল। আরিয়ান তার সব স্বপ্ন, তার ভালোবাসার কথা খুলে বলল।
অবশেষে নাফিসার বাবা বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু বিয়ে হবে আমাদের মতে।”
রিয়াজ নিজেই পিছিয়ে গেল। সে বলল, “আমি জোর করে কাউকে বিয়ে করতে চাই না।”
তারপরের ছয় মাস ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। বিয়ে হল ছোট করে, কিন্তু ভালোবাসায় ভরপুর।
এক বছর পর নাফিসার প্রথম বই প্রকাশিত হল। নাম “অপেক্ষার রং”। বইয়ের উৎসর্গে লেখা ছিল:
“যে ছেলেটা বৃষ্টির দিনে আমার জীবনে এসেছিল।”
আরিয়ান আর নাফিসা এখন একসাথে থাকে। ছোট একটা বাড়ি। সন্ধ্যায় তারা লেকের ধারে হাঁটে। নাফিসা গল্প বলে, আরিয়ান শোনে।
প্রেম মানে শুধু আবেগ নয়। প্রেম মানে অপেক্ষা, লড়াই, বিশ্বাস আর ফিরে আসা।
তাদের গল্প এখনো চলছে। প্রতিদিন নতুন করে।
....