পাহাড়ে হারানো হৃদয়

আরিফের বয়স ২৮। ঢাকায় একটা আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। গত তিন বছর ধরে সে একা। বিয়ে করেনি। মা-বাবা অনেকবার বলেছে, কিন্তু সে বলেছে, “যাকে ভালোবাসব, তাকেই বিয়ে করব।” কিন্তু সেই “যাকে” এখনো খুঁজে পায়নি।

kxz

ট্রেনটা থামল একটা ছোট স্টেশনে। যাত্রীরা উঠছে-নামছে। হঠাৎ একটা মেয়ে আরিফের সামনের সিটে এসে বসল। তার পরনে হালকা সবুজ সালোয়ার কামিজ, চুল খোলা, চোখে একটা হালকা ক্লান্তি। মেয়েটা ব্যাগটা রেখে জানালার দিকে তাকাল। আরিফের চোখটা তার দিকে চলে গেল। মেয়েটার মুখটা চাঁদের মতো গোল, গালে হালকা লালচে আভা।

“এক্সকিউজ মি, এটা কি চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস?” মেয়েটা জিজ্ঞাসা করল নরম গলায়।

kx/춺'

আরিফ হাসল। “হ্যাঁ। আপনি চট্টগ্রাম যাচ্ছেন?”

“হুম।” মেয়েটা ছোট করে উত্তর দিল। তারপর চুপ করে গেল।

ট্রেন চলতে শুরু করল। রাত বাড়ছিল। কামরায় আলোটা মৃদু। আরিফ আর মেয়েটা দুজনেই চুপচাপ। কিন্তু আরিফের মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। যেন এই মেয়েটাকে সে আগে কোথাও দেখেছে।

ঘণ্টা দুয়েক পর মেয়েটা হঠাৎ বলল, “আপনার নাম কী?”

“আরিফ। আর আপনি?”

“নাদিয়া।”

নামটা শুনে আরিফের বুকটা ধক করে উঠল। নাদিয়া। তার ছোটবেলার বন্ধু নাদিয়ার নাম। কিন্তু সে তো অনেক আগে চলে গিয়েছিল।

“কোথায় যাচ্ছেন চট্টগ্রামে?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।

“আমার দাদির বাড়ি। অনেকদিন পর যাচ্ছি।” নাদিয়া হাসল। তার হাসিতে একটা মায়া ছিল।

দুজনের কথা শুরু হলো। আরিফ বলল তার চাকরির কথা, ঢাকার ব্যস্ত জীবনের কথা। নাদিয়া বলল সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, ইংরেজি সাহিত্য। তারপর কথা গড়ালো বইয়ের দিকে, গানের দিকে, স্বপ্নের দিকে।

রাত বারোটার দিকে ট্রেনটা একটা স্টেশনে থামল। বিদ্যুৎ চলে গেছে। কামরায় অন্ধকার। শুধু চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে। নাদিয়া শীত করছে বলে আরিফ তার জ্যাকেটটা দিল। নাদিয়া জ্যাকেটটা নিয়ে হাসল। “থ্যাঙ্ক ইউ।”

সেই রাতে দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতো বাঁধা পড়ল। ট্রেন যখন চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাল, তখন সকাল। দুজনেই নামল। নাদিয়া বলল, “আবার দেখা হবে হয়তো।”

কিন্তু আরিফ ভাবল, এই দেখা যেন আর না হারায়।


চট্টগ্রামে নাদিয়ার দাদির বাড়ি ছিল পাহাড়ের কোলে, একটা ছোট গ্রামে। আরিফেরও চট্টগ্রামে একটা প্রজেক্টের কাজ ছিল। সে হোটেলে উঠল, কিন্তু মনটা নাদিয়ার কাছে পড়ে রইল।

দুদিন পর আরিফ ফোন করল নাদিয়াকে। নম্বরটা ট্রেনে নিয়েছিল। “হ্যালো, নাদিয়া? আমি আরিফ।”

নাদিয়া অবাক হয়ে বলল, “ওয়াও! আপনি ফোন করবেন ভাবিনি।”

“কেন? আমি তো বলেছিলাম আবার দেখা হবে।”

দুজনে দেখা করল কর্ণফুলী নদীর ধারে। সন্ধ্যা। নদীর পাড়ে বসে তারা কথা বলছিল। নাদিয়া বলল তার জীবনের কথা। তার বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সে দাদির কাছে বড় হয়েছে। আরিফ বলল তার একাকিত্বের কথা।

“আমি মনে করি, ভালোবাসা হলো সেই জিনিস যা তোমাকে পুরো করে।” নাদিয়া বলল চাঁদের দিকে তাকিয়ে।

আরিফ তার হাতটা ধরল। “তাহলে হয়তো আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি।”

নাদিয়া লজ্জায় মুখ নিচু করল। কিন্তু হাত সরাল না।


পরের কয়েক সপ্তাহ দুজনের সম্পর্ক গভীর হতে লাগল। আরিফ প্রজেক্ট শেষ করে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সে থেকে গেল। প্রতিদিন তারা দেখা করত। কখনো পাহাড়ে, কখনো সমুদ্রের ধারে, কখনো নাদিয়ার দাদির বাড়ির উঠোনে।

একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। দুজনে একটা ছোট চায়ের দোকানে বসে। নাদিয়া বলল, “আরিফ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমার মা-দাদি... তারা কি মেনে নেবে?”

আরিফ তার কপালে চুমু খেল। “আমি সবকিছু ঠিক করে নেব।”

সেই রাতে আরিফ নাদিয়াকে নিয়ে তার হোটেলে গেল। ঘরটা অন্ধকার। শুধু বাইরের বৃষ্টির শব্দ। নাদিয়া লজ্জায় কাঁপছিল। আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরল। “ভয় পেয়ো না। আমি তোমার।”

দুজনের শরীর এক হয়ে গেল। নাদিয়ার চোখে জল। আরিফ তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “এটা ভালোবাসা। এটা পবিত্র।”

সেই রাতটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রাত। চাঁদনী রাত না হলেও, তাদের হৃদয়ে চাঁদের আলো ছিল।


কয়েক মাস পর। আরিফ নাদিয়ার দাদির কাছে গিয়ে প্রস্তাব দিল। দাদি প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু আরিফের ভালোবাসা দেখে রাজি হয়ে গেলেন। নাদিয়ার মাও এসে দেখলেন। সবাই মেনে নিল।

বিয়ে হলো একটা সুন্দর শীতের দিনে। গ্রামের বাড়িতে। লাল-সবুজ শাড়ি পরে নাদিয়া। আরিফের চোখে অশ্রু।

বিয়ের পর দুজনে ঢাকায় চলে এল। তাদের ছোট ফ্ল্যাট। প্রতি সন্ধ্যায় আরিফ ফিরলে নাদিয়া দরজা খুলে জড়িয়ে ধরে। তারা রান্না করে, গান শোনে, বই পড়ে, আর রাতে একে অপরের কাছে হারিয়ে যায়।

এক বছর পর নাদিয়া মা হলো। একটা ছোট্ট মেয়ে। তার নাম রাখল “চাঁদনী”।

আরিফ প্রতি রাতে চাঁদনীকে কোলে নিয়ে বলে, “তোমার মা আর আমি যেমন চাঁদনী রাতের অপেক্ষায় ছিলাম, তুমিও আমাদের জীবনের চাঁদনী।”

নাদিয়া হাসে। আর তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হয়।

....
👁 75