বৃষ্টি আর তোমার চোখ

ঢাকা শহরের জুন মাস। বৃষ্টি যেন আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে অবিরাম। রাসেল রোডের একটা ছোট কফি শপে বসে ছিল আরিয়ান। তার হাতে এক কাপ আমেরিকানো, চোখে ল্যাপটপের স্ক্রিন। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আরিয়ান, ২৮ বছর বয়স। চাকরি করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। কিন্তু আজ তার মনটা অন্য কোথাও। মায়ের ফোন এসেছিল সকালে — “বিয়ে কর, আরিয়ান। বয়স তো হয়ে যাচ্ছে।”

kxz

সে হাসল একা একা। বিয়ে? ভালোবাসা ছাড়া বিয়ে করবে কী করে? সে তো এখনো সেই একটা মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে যে তার হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে।

হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকল একটা মেয়ে। ভিজে গেছে পুরো। সাদা শাড়ির আঁচল কাঁধে, চুল থেকে পানি ঝরছে। তার চোখ দুটো — কালো, গভীর, যেন বৃষ্টির মধ্যেও আলো জ্বলছে। মেয়েটা কাউন্টারে গিয়ে বলল, “একটা হট চকোলেট দিন প্লিজ।”

kx/춺'

আরিয়ানের চোখ আটকে গেল। সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন। মেয়েটা ঘুরে তাকাল একবার। তাদের চোখাচোখি হলো মাত্র দু’সেকেন্ড। কিন্তু সেই দু’সেকেন্ডে আরিয়ানের বুকের ভিতর কিছু একটা নড়ে উঠল।

মেয়েটা নাম নিল নিলুফা। পরে জানা গেল সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের লেকচারার। ২৫ বছর বয়স। থাকে মিরপুরে। বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন।

সেদিন আর কথা হয়নি। কিন্তু আরিয়ানের মনে সেই চোখ দুটো রয়ে গেল।

দু’দিন পর। গুলশানের একটা বইমেলায়। আরিয়ান বই খুঁজছিল। হঠাৎ দেখল সেই মেয়ে — নিলুফা। হাতে একটা কবিতার বই। “রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’।”

আরিয়ান সাহস করে এগিয়ে গেল। “আপনাকে সেদিন কফি শপে দেখেছিলাম। ভিজে একশা হয়ে গিয়েছিলেন।”

নিলুফা হেসে উঠল। তার হাসিতে যেন বৃষ্টি থেমে যায়। “হ্যাঁ, মনে আছে। আপনি তো একদম শুকনো ছিলেন।”

তারা কথা বলতে শুরু করল। সাহিত্য, সিনেমা, ঢাকার ট্রাফিক, বৃষ্টি। নিলুফা বলল, “বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়। বৃষ্টিতে সবকিছু নতুন লাগে।”

আরিয়ান বলল, “আমারও। কিন্তু একা একা বৃষ্টি দেখতে আর ভালো লাগে না।”

সেদিন তারা দুজন মিলে বইমেলা ঘুরল। নিলুফা একটা বই কিনে দিল আরিয়ানকে — জীবনানন্দ দাশের কবিতা। “পড়ে দেখবেন। এতে বৃষ্টির গন্ধ আছে।”

এরপর থেকে তাদের দেখা হতে লাগল নিয়মিত। কখনো কফি শপে, কখনো লেকের ধারে, কখনো পুরানো ঢাকার রাস্তায়। আরিয়ান জানল নিলুফার স্বপ্ন — একদিন একটা বই লিখবে। নিলুফা জানল আরিয়ানের স্বপ্ন — একটা ছোট বাড়ি কিনে শান্তিতে থাকা, যেখানে বৃষ্টির শব্দ শোনা যায়।

একদিন রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে নিলুফা বলল, “আরিয়ান, তুমি কখনো প্রেমে পড়েছ?”

আরিয়ান চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “এখনো পড়িনি। কিন্তু পড়তে চাই।”

নিলুফা হেসে বলল, “আমিও।”

তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতো বাঁধা পড়ছিল ধীরে ধীরে।

একটা শুক্রবার। আকাশ কালো হয়ে এসেছে। আরিয়ান নিলুফাকে নিয়ে গেল সাভারের একটা রিসোর্টে। “শুধু বৃষ্টি দেখতে,” বলেছিল সে।

রিসোর্টের বারান্দায় বসে তারা চা খাচ্ছিল। হঠাৎ ঝড় উঠল। বৃষ্টি নামল প্রবল বেগে। নিলুফা উঠে দাঁড়াল। “আয়, ভিজি।”

তারা দুজন বৃষ্টিতে নেমে পড়ল। হাসতে হাসতে, হাত ধরে। নিলুফার ভিজে যাওয়া চুল, তার চোখে জলের ফোঁটা, আরিয়ানের বুকের কাছে তার মাথা — সেই মুহূর্তে আরিয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

সে নিলুফার কপালে একটা চুমু খেল। নিলুফা চোখ বন্ধ করল। তারপর আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, আরিয়ান।”

আরিয়ানের চোখে জল চলে এল। “আমিও তোমাকে, নিলু। অনেকদিন থেকেই।”

সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ জেগে কথা বলল। ভবিষ্যতের কথা, বিয়ে, সংসার, সন্তান। নিলুফা বলল, “তোমার সাথে সবকিছু সম্ভব।”

কিন্তু সবকিছু এত সহজ নয়। নিলুফার বাবা ছিলেন খুব রক্ষণশীল। তিনি চাইতেন মেয়ের বিয়ে হোক তাদের পরিচিত একটা ডাক্তারের সাথে। আরিয়ানের পরিবারও মেয়ে দেখতে চাইছিল।

একদিন নিলুফার বাবা জানতে পারলেন তাদের সম্পর্কের কথা। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, “এই ছেলে কে? সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার? আমার মেয়েকে কোনো ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেব না।”

নিলুফা কাঁদতে কাঁদতে আরিয়ানকে ফোন করল। “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”

আরিয়ান বলল, “আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব।”

সে গেল নিলুফার বাড়িতে। প্রথমে অনেক ঝগড়া হলো। নিলুফার বাবা বললেন, “তুমি কী দিতে পারবে আমার মেয়েকে?”

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল, “সম্মান, ভালোবাসা, আর সারাজীবনের সঙ্গী হওয়ার প্রতিশ্রুতি। টাকা-পয়সা দিয়ে ভালোবাসা কেনা যায় না, স্যার।”

নিলুফার মা মাঝখানে এসে শান্ত করলেন। ধীরে ধীরে নিলুফার বাবা নরম হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন — “এক বছর সময় দাও। দেখি তোমরা কতটা সিরিয়াস।”

সেই এক বছর ছিল কঠিন। আরিয়ানকে প্রজেক্টের জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হলো ছয় মাসের জন্য। দূরত্ব তাদের পরীক্ষা করছিল। প্রতি রাতে ভিডিও কলে কথা হতো। নিলুফা বলত, “তোমার গলার আওয়াজ শুনলেই শান্তি লাগে।”

আরিয়ান ফিরে এল ছয় মাস পর। বিমানবন্দরে নিলুফা অপেক্ষা করছিল ফুল নিয়ে। তারা জড়িয়ে ধরল অনেকক্ষণ।

বাকি ছয় মাস তারা আরও কাছাকাছি হলো। নিলুফা তার প্রথম বইয়ের খসড়া দেখাল আরিয়ানকে। আরিয়ান তাকে নিয়ে গেল কক্সবাজারে। সমুদ্রের সামনে বসে তারা প্রতিজ্ঞা করল — “যাই হোক, আমরা একসাথে থাকব।”

এক বছর পূর্ণ হলো। নিলুফার বাবা রাজি হলেন। বিয়ে হলো সাদামাটা কিন্তু খুব সুন্দর করে। ঢাকার একটা ছোট হলে। বৃষ্টি পড়ছিল সেদিনও।

বিয়ের রাতে আরিয়ান নিলুফাকে কানে কানে বলল, “তোমার চোখে হারিয়ে গেছি আমি।”

নিলুফা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “আর আমি তোমার বুকে আশ্রয় পেয়েছি।”

তিন বছর পর। তাদের একটা ছোট ফ্ল্যাট মিরপুরে। আরিয়ানের প্রমোশন হয়েছে। নিলুফা তার বই প্রকাশ করেছে — “বৃষ্টির চোখ”। বইটা খুব জনপ্রিয় হয়েছে।

তাদের একটা ছোট মেয়ে হয়েছে — নাম রেখেছে “আঁচল”। বৃষ্টির দিনে তিনজনে বারান্দায় বসে থাকে। আরিয়ান মেয়েকে কোলে নিয়ে বলে, “দেখ, তোর মায়ের চোখের মতো বৃষ্টি।”

নিলুফা হেসে আরিয়ানের কাঁধে মাথা রাখে। “তুমি ছাড়া এই জীবন অসম্পূর্ণ ছিল।”

....
👁 92