অঝোর বৃষ্টির ভালোবাসা

রাহাত ঢাকার একটা ছোট অফিসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করত। বয়স ২৮। চশমা পরা, শান্ত স্বভাবের ছেলে। তার জীবন ছিল রুটিনমাফিক — সকালে অফিস, রাতে কোডিং, আর মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে চা খাওয়া। কিন্তু তার মনে একটা অসম্পূর্ণতা ছিল। ভালোবাসার অভাব।

kxz

একদিন অফিসের প্রজেক্টের জন্য তাকে চট্টগ্রাম যেতে হলো। ক্লায়েন্ট মিটিং। ট্রেনের টিকিট কেটে সে স্টেশনে এসে দাঁড়াল। বর্ষাকাল। আকাশ কালো করে বৃষ্টি পড়ছে। প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মধ্যে তার চোখ পড়ল একটা মেয়ের উপর।

মেয়েটার নাম ছিল সামিয়া। বয়স ২৫। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। লম্বা চুল, গাঢ় নীল শাড়ি, চোখে একটা নরম দৃষ্টি। সে তার ছোট বোনকে ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিল। বোনটা অসুস্থ।

kx/춺'

ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে বৃষ্টিতে দুজনের ছাতা একসাথে ভিজে গেল। রাহাত হাসতে হাসতে বলল, “আপনার ছাতাটা একটু শেয়ার করবেন? আমারটা উড়ে গেছে।”

সামিয়া প্রথমে একটু সন্দেহের চোখে তাকাল, তারপর হেসে বলল, “আসুন। বৃষ্টিতে ভিজে তো কোনো লাভ নেই।”

ট্রেনের কামরায় তারা পাশাপাশি বসল। সারা রাত কথা হলো। রাহাত বলল তার ঢাকার একাকী জীবনের কথা। সামিয়া বলল তার চট্টগ্রামের সমুদ্রপাড়ের বাড়ির কথা, কীভাবে সে ছাত্রীদের পড়ায় আর বোনের অসুস্থতার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারে না।

“আপনি কখনো সমুদ্র দেখেছেন রাতে?” সামিয়া জিজ্ঞাসা করল। “না। শুধু ছবিতে।” “তাহলে একদিন আসবেন। সমুদ্র রাতে অনেক কথা বলে।”

ট্রেন চট্টগ্রাম পৌঁছাল সকালে। তারা নম্বর বিনিময় করল। রাহাত ভাবল, এটা শুধু একটা সাধারণ যাত্রা। কিন্তু সামিয়ার হাসিটা তার মাথায় লেগে রইল।

পরের কয়েক সপ্তাহ তারা মেসেজ করতে লাগল। প্রথমে শুধু “কেমন আছেন”, তারপর দীর্ঘ কথা। রাহাত রাতে কাজ শেষ করে সামিয়াকে ফোন করত। সামিয়া ক্লাসের পর তার গল্প শোনাত। ধীরে ধীরে তাদের কথায় একটা নরম আবেগ এসে পড়ল।

একদিন রাহাত বলল, “সামিয়া, আমি আবার চট্টগ্রাম যাব। তোমার সাথে দেখা করতে চাই।”

সামিয়া চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আসো। কিন্তু আমার পরিবার খুব রক্ষণশীল। খুব সাবধানে।”

রাহাত চট্টগ্রাম গেল। তারা কর্ণফুলী নদীর পাড়ে দেখা করল। বৃষ্টি পড়ছিল। সামিয়া একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরে এসেছিল। তারা হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা বলল। রাহাত তার হাত ধরল প্রথমবার। সামিয়ার হাত কাঁপছিল।

“আমি তোমাকে পছন্দ করি, সামিয়া। অনেক।” “আমিও… কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক দূরত্ব। ঢাকা আর চট্টগ্রাম। পরিবার…”

তারা সমুদ্র সৈকতে গেল। পতেঙ্গা বিচ। ঢেউয়ের শব্দের মাঝে রাহাত সামিয়াকে জড়িয়ে ধরল। প্রথম চুমু। বৃষ্টির ফোঁটার সাথে তাদের ঠোঁট মিশে গেল। সামিয়ার চোখে জল আর ভালোবাসা।

“আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না,” রাহাত ফিসফিস করে বলল।

তারপর থেকে তাদের সম্পর্ক গভীর হতে লাগল। রাহাত প্রতি মাসে চট্টগ্রাম যেত। কখনো অফিসের কাজের অজুহাতে, কখনো ছুটিতে। তারা সমুদ্রের ধারে বসে অনেক স্বপ্ন দেখত। সামিয়া বলত, “একদিন আমরা একসাথে থাকব। একটা ছোট বাড়ি, সমুদ্রের কাছে।”

কিন্তু সমস্যা শুরু হলো। সামিয়ার পরিবার জানতে পারল। তার বড় ভাই রাহাতকে হুমকি দিল, “তুমি আমার বোনের জীবন নষ্ট করো না। আমাদের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।”

সামিয়া কাঁদতে কাঁদতে রাহাতকে ফোন করল, “আমি পারছি না। পরিবার আমাকে চাপ দিচ্ছে।”

রাহাত ভেঙে পড়ল। ঢাকায় ফিরে সে রাতে ঘুমাতে পারত না। তার কোডিংয়ের স্ক্রিনে শুধু সামিয়ার ছবি। একদিন সে ঠিক করল — সে চট্টগ্রামে চলে যাবে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে।

সে সামিয়াকে বলল, “আমি তোমার জন্য সব ছেড়ে দিতে পারি। শুধু তুমি আমার সাথে থাকো।”

সামিয়া প্রথমে রাজি হলো না। কিন্তু এক রাতে, যখন তার বাড়িতে বিয়ে নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল, সে পালিয়ে রাহাতের কাছে চলে এল। তারা একটা ছোট হোটেলে উঠল।

সেই রাতটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রাত। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। ঘরের ভিতর শুধু তাদের দুজন। রাহাত সামিয়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সামিয়া তার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসি, রাহাত। অনেক অনেক।” “আমিও তোমাকে। চিরকাল।”

তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। শরীরের উষ্ণতায় মিশে গেল তাদের আবেগ। রাহাত সামিয়ার ঠোঁটে চুমু খেল, গলায়, কাঁধে। সামিয়া তার পিঠে নখ বসিয়ে দিল আবেগে। তারা ধীরে ধীরে এক হয়ে গেল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তাদের ভালোবাসা উথাল-পাথাল করছিল। ঘাম, নিঃশ্বাস আর ভালোবাসার শব্দে ভরে উঠল ঘর। সামিয়া ফিসফিস করে বলল, “আর কখনো ছেড়ে যেও না।”

সকালে তারা সিদ্ধান্ত নিল — তারা বিয়ে করবে। রাহাত চট্টগ্রামে নতুন চাকরি খুঁজল। সামিয়ার পরিবার প্রথমে রাগ করল, কিন্তু পরে তাদের ভালোবাসা দেখে রাজি হয়ে গেল।

এক বছর পর।

তারা বিয়ে করেছে। চট্টগ্রামের সমুদ্রের কাছে একটা ছোট বাড়ি নিয়েছে। রাহাত এখন ফ্রিল্যান্স করে। সামিয়া এখনো কলেজে পড়ায়। সন্ধ্যায় তারা সমুদ্রের ধারে হাঁটে। হাতে হাত রেখে।

একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। রাহাত সামিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মনে আছে প্রথম দিনের ট্রেন যাত্রা?”

সামিয়া হেসে বলল, “মনে আছে। সেই বৃষ্টিই আমাদের এক করেছে।”

তারা চুমু খেল। সমুদ্রের ঢেউ তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে গর্জন করছিল।

তাদের জীবন এখন পূর্ণ। ঢাকার বৃষ্টি আর চট্টগ্রামের সমুদ্র — দুটোই তাদের গল্পের অংশ হয়ে গেছে।

....
👁 35