আদরে মিশে যাওয়া দুই প্রাণ

রাত এগারোটা বেজে গেছে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে রিয়ান। তার হাতে একটা ছোট ট্রলি ব্যাগ, অন্য হাতে মোবাইল। স্ক্রিনে একটা মেসেজ: “ট্রেন লেট আছে নাকি? আমি অপেক্ষায় আছি। আয়েশা।”

kxz

আয়েশা। নামটা শুনলেই তার বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। এক বছর আগেও সে ভাবতে পারেনি যে একটা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ তার জীবন এভাবে বদলে দেবে।

রিয়ান চাকরি করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে, মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে। বয়স ২৯। চট্টগ্রামের ছেলে, কিন্তু ঢাকায় থাকে। আর আয়েশা ঢাকার মেয়ে। বাবা-মা’র পছন্দে বিয়ে হয়েছে ছয় মাস আগে। প্রথম প্রথম দুজনেই অস্বস্তিতে ছিল। কথা বলতে গেলে কেমন জড়তা লাগত। কিন্তু তারপর... তারপর একদিন বৃষ্টির রাতে সব বদলে গেল।

kx/춺'

ট্রেন এসে গেল। সুবর্ণ এক্সপ্রেস। রিয়ান উঠে পড়ল। তার বার্থ নম্বর ১৭, লোয়ার। পাশের বার্থে এক ভদ্রলোক। সে ব্যাগ রেখে জানালার ধারে বসল। মোবাইলে আয়েশাকে কল করল।

“হ্যালো... উঠছি এখন। তুমি খেয়ে নিয়েছ?”

আয়েশার গলা ভেসে এল, একটু ঘুমঘুম, একটু আদুরে: “হুম, খেয়েছি। তুমি না এলে ভালো লাগে না রে... তাড়াতাড়ি এসো।”

“আসছি তো। সকালে চট্টগ্রামে নেমেই বাসে উঠব। রাতের মধ্যে পৌঁছে যাব।”

“ঠিক আছে। সাবধানে যেয়ো।”

কলটা কেটে গেল। রিয়ান জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঢাকার আলো ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে হালকা। সে চোখ বন্ধ করল। এক বছর আগের সেই দিনটা মনে পড়ে গেল...

বিয়ের আগে প্রথম দেখা। আয়েশার বাসায়। সে লাল শাড়ি পরে বসেছিল। চোখ নামিয়ে। রিয়ানের মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা বড্ড শান্ত। কিন্তু যখন চা দিতে এসেছিল, তার হাত কেঁপে গিয়েছিল। চামচ পড়ে গিয়েছিল। রিয়ান হেসে ফেলেছিল। সেই হাসিতে আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রথম।

বিয়ে হয়ে গেল। প্রথম রাত। আয়েশা ভয়ে কাঁপছিল। রিয়ান তার হাত ধরে বলেছিল, “ভয় পেয়ো না। আমরা দুজনেই নতুন। ধীরে ধীরে শিখব।”

সেই রাতে তারা শুধু কথা বলেছিল। অনেক রাত পর্যন্ত। আয়েশা বলেছিল তার কলেজের গল্প, তার বাবার কড়া শাসনের কথা। রিয়ান বলেছিল তার চট্টগ্রামের সমুদ্র, তার মায়ের রান্নার গল্প। কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি সেদিন। শুধু দুটো আত্মা কাছাকাছি এসেছিল।

তারপর ধীরে ধীরে...

একদিন অফিস থেকে ফিরে রিয়ান দেখল আয়েশা রান্না করছে। তার চুল এলোমেলো, কপালে ঘাম। রিয়ান পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। আয়েশা প্রথমে চমকে উঠেছিল, তারপর হেসে বলেছিল, “এত তাড়াতাড়ি?”

সেই প্রথম চুমু। গভীর, আবেগময়। তারপর সব বদলে গিয়েছিল। রাতগুলো আর শুধু ঘুমের হয়ে থাকেনি। আয়েশার শরীরে রিয়ানের হাত যখন প্রথমবার স্পর্শ করেছিল, সে কেঁপে উঠেছিল। “আস্তে...” বলেছিল সে লজ্জায়। কিন্তু তার চোখে ছিল অন্য এক আলো।

রিয়ান এখন ট্রেনে বসে সেই সব স্মৃতি মনে করছে। তার শরীরে শিহরণ জাগছে।

ট্রেন চলছে। মাঝরাত। পাশের ভদ্রলোক ঘুমিয়ে পড়েছেন। রিয়ানও চোখ বন্ধ করল।

সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে নামল সে। বাস ধরে বাড়ির দিকে। বাড়িতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। আয়েশা দরজা খুলতেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।

“অনেক দিন পর এলে...”

“মাত্র চার দিন তো গেছে রে পাগলি।”

“চার দিনও অনেক।”

রিয়ান তার কপালে চুমু খেল। আয়েশার মা-বাবা ঘরে ছিলেন না। তারা দুজন একা। রিয়ান তাকে কোলে তুলে নিয়ে শোবার ঘরে নিয়ে গেল।

“এখনই?” আয়েশা লজ্জায় হাসল।

“হ্যাঁ, এখনই। অনেক দিন ধরে তোমাকে মিস করছি।”

তাদের শরীর মিলিত হলো। আয়েশার নরম ঠোঁট, তার গলার কাছে লালচে দাগ, তার কোমরের বাঁক, তার উরুর উষ্ণতা—সবকিছু রিয়ানকে পাগল করে দিল। তারা দুজনে একে অপরকে আবিষ্কার করতে লাগল যেন প্রথমবার। আয়েশা তার নাম ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলছিল, “আরও... আরও কাছে এসো...”

সন্ধ্যা নামল। তারা দুজনে ঘামে ভিজে শুয়ে আছে। আয়েশা রিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল, “তুমি না থাকলে আমি বাঁচব না রে।”

রিয়ান তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “আমিও না।”

পরের কয়েকদিন তারা খুব কাছাকাছি সময় কাটাল। সকালে সমুদ্রের ধারে হাঁটা, বিকেলে পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, রাতে একসাথে রান্না করা। আয়েশা রিয়ানের জন্য তার প্রিয় ইলিশ মাছের পাতুরি বানাল। রিয়ান তাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেল।

কিন্তু একদিন ঝগড়া হলো।

রিয়ান বলল, “আমি ঢাকায় ফিরে গেলে তুমি এখানে একা থাকবে কীভাবে? চলো, ঢাকায় চলে যাই।”

আয়েশা রেগে গেল, “আমার বাবা-মা বুড়ো হয়ে গেছে। তাদের ছেড়ে যাব কীভাবে? তুমি তো শুধু তোমার চাকরির কথা ভাবো!”

রিয়ানও চড়া গলায় বলল, “তাহলে আমি একা ঢাকায় থাকব? সারাদিন অফিস, রাতে খালি ঘর?”

ঝগড়া বেড়ে গেল। আয়েশা কেঁদে ফেলল। রিয়ান বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

রাতে সে ফিরে এসে দেখল আয়েশা বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে আছে। তার চোখ ফোলা। রিয়ান তার পাশে শুয়ে পড়ল। আস্তে করে জড়িয়ে ধরল।

“সরি...”

আয়েশা কিছু বলল না। কিন্তু তার শরীরটা রিয়ানের দিকে সরে এল।

সেই রাতে তাদের মিলন ছিল আরও গভীর। ঝগড়ার পরের আদর সবসময়ই তীব্র হয়। আয়েশা তার নখ দিয়ে রিয়ানের পিঠ আঁচড়াচ্ছিল। রিয়ান তার ঘাড় কামড়ে ধরছিল। তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল। আয়েশা চিৎকার করে উঠল যখন চরম মুহূর্ত এল। “আমার... তুমি আমার...”

পরদিন সকালে তারা দুজনে বসে কথা বলল। ঠিক হলো, আয়েশা মাঝে মাঝে ঢাকায় যাবে, আর রিয়ানও চট্টগ্রামে বেশি করে আসবে। কম্প্রোমাইজ।

দিনগুলো কেটে যেতে লাগল।

তিন মাস পর।

ঢাকায় ফিরে এসেছে তারা। আয়েশা এখন ঢাকায়ই থাকে। একটা অনলাইন জব করছে। রিয়ানের অফিসের কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে তারা।

এক বৃষ্টির রাতে।

বিদ্যুৎ চলে গেছে। ঘর অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে বৃষ্টির শব্দ আসছে। আয়েশা রিয়ানের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।

“জানো, প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম, আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব গম্ভীর। কিন্তু তুমি হাসলে... সেই হাসিটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।”

রিয়ান তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আর আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব লাজুক। কিন্তু রাতে যখন তুমি আমার নাম ধরে ডাকো... তখন বুঝি তুমি কতটা আমার।”

আয়েশা লজ্জায় তার বুকে মুখ লুকাল। তারপর আস্তে করে তার হাত নামিয়ে দিল রিয়ানের শরীরের নিচের দিকে।

“আজকে... আমি তোমাকে আরও অনেক কিছু দিতে চাই।”

বৃষ্টির শব্দের সাথে তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে গেল। আয়েশা উপরে উঠে এল। তার চুল ভিজে গেছে ঘামে। তার স্তন রিয়ানের বুকে চেপে আছে। সে ধীরে ধীরে নড়াচড়া করছে। রিয়ান তার কোমর চেপে ধরে আছে। তাদের চোখে চোখ। কোনো কথা নেই। শুধু ভালোবাসা আর কামনার মিশ্রণ।

যখন তারা দুজনেই চরমে পৌঁছাল, আয়েশা রিয়ানের কানে কানে বলল, “আমি তোমার... সারাজীবন।”

সেই রাতের পর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।

ছয় মাস পর আয়েশা প্রেগন্যান্ট হলো। রিয়ান আনন্দে পাগল। তারা দুজনে মিলে বাচ্চার নাম ঠিক করল—“আলো”। যদি মেয়ে হয়। আর ছেলে হলে “আকাশ”।

কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না।

আয়েশার প্রেগন্যান্সির পঞ্চম মাসে তার শরীর খারাপ হয়ে গেল। ডাক্তার বললেন হাই রিস্ক। বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। রিয়ান অফিস থেকে ছুটি নিল। সারাদিন তার পাশে থাকত। খাবার খাওয়াত, গল্প শোনাত, পেটে হাত বুলিয়ে গান গাইত।

একদিন আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছি...”

রিয়ান তার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, “তুমি আমার সব। কষ্ট তো আমাদের দুজনের।”

সেই সময়টায় তাদের শারীরিক সম্পর্ক কমে গিয়েছিল। কিন্তু ভালোবাসা বেড়েছিল হাজার গুণ। রিয়ান আয়েশাকে চুমু খেত তার কপালে, গালে, ঠোঁটে। আলতো করে তার শরীর স্পর্শ করত। আয়েশা তার হাত ধরে বলত, “এই যে তুমি আছো, এটাই আমার সবচেয়ে বড় সুখ।”

আট মাস পর সুস্থভাবে একটা মেয়ে হলো। নাম রাখা হলো “আলো”।

আলো যখন তিন মাসের, তখন এক রাতে আয়েশা রিয়ানকে বলল, “আজকে আমি তোমাকে চাই... পুরোপুরি।”

রিয়ান সাবধানে, আদর করে তাকে ভালোবাসল। আয়েশার শরীর আবারও তার হয়ে উঠল। কিন্তু এবার ভালোবাসাটা ছিল আরও পরিণত, আরও গভীর।

বছর কেটে গেল।

আজ আবার সেই ট্রেন জার্নি। রিয়ান চট্টগ্রাম যাচ্ছে। আয়েশা আর আলো ঢাকায় আছে। কিন্তু এবার ফোনের ওপাশে আয়েশা বলল, “আমরা তোমার জন্য অপেক্ষায় আছি। তাড়াতাড়ি এসো। আমি তোমাকে অনেক আদর করব।”

রিয়ান হাসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বৃষ্টি পড়ছে।

জীবনটা ঠিক এমনই। ঢাকার বৃষ্টি আর চট্টগ্রামের আলো। দুটো জায়গা, একটা ভালোবাসা।

আর সেই ভালোবাসার নাম—আয়েশা।

....
👁 36