ঢাকার বর্ষা সবসময়ই একটু বেশি রোমান্টিক। আকাশটা যেন কালো মেঘের ওড়না পরে কাঁদতে থাকে, আর রাস্তার পানিতে আলোর প্রতিফলন যেন হাজারো তারার ঝিলিমিলি। সেই বর্ষার এক সন্ধ্যায় হাসান প্রথম আয়েশাকে দেখেছিল।
হাসান, বয়স ২৮। ঢাকার একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে মার্কেটিং ম্যানেজার। লম্বা, ফর্সা, চোখে চশমা, আর হাসিতে একটা মায়া। তার জীবনটা ছিল নিয়মিত — অফিস, জিম, বাসা, আর মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে কফি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে একটা গভীর একাকিত্ব অনুভব করত। তার বাবা-মা গ্রামে থাকেন, চট্টগ্রামের কাছে একটা ছোট গ্রামে। হাসান ঢাকায় একা।
আয়েশা, বয়স ২৪। সে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যের লেকচারার। ছোটখাটো শরীর, লম্বা কালো চুল, চোখ দুটো যেন গভীর কুয়ো। তার হাসিতে একটা লজ্জা মেশানো আনন্দ। আয়েশার বাবা ঢাকায় চাকরি করতেন, কিন্তু মা গ্রামের বাড়িতে। সে নিজেও একটা ছোট ফ্ল্যাটে একা থাকে মিরপুরে।
সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে আয়েশা বাস স্টপে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই — “প্রেমের কবিতা”। বাস আসছিল না। হাসান তার গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির জন্য গতি কমিয়ে দেখল একটা মেয়ে একা দাঁড়িয়ে। সে গাড়ি থামাল।
“আপু, কোথায় যাবেন? বৃষ্টিতে ভিজছেন, উঠুন।”
আয়েশা প্রথমে ইতস্তত করল। কিন্তু বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। সে উঠে পড়ল।
“মিরপুর ১০। ধন্যবাদ।”
গাড়ির ভেতরটা গরম ছিল। হাসানের গা থেকে হালকা পারফিউমের গন্ধ আসছিল। আয়েশা চুপ করে বসে ছিল। হাসান কথা বলার চেষ্টা করল।
“বইটা কীসের? প্রেমের কবিতা?”
আয়েশা হাসল। “হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথের। আপনি পড়েন?”
“পড়ি। কিন্তু সময় কম। আপনি কী করেন?”
এভাবেই কথা শুরু। মিরপুরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুজনের মধ্যে ফোন নম্বর বিনিময় হয়ে গেল।
পরের দিন হাসান আয়েশাকে মেসেজ করল। “কফি খাবেন? বৃষ্টি থেমেছে।”
আয়েশা রাজি হল। ধানমন্ডির একটা ক্যাফেতে দেখা। সেখানে দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলল। আয়েশা বলল তার গ্রামের কথা, তার ছোটবেলার স্বপ্ন — লেখক হওয়ার। হাসান বলল তার একাকিত্বের কথা, কাজের চাপের কথা।
দিন যায়। দুজনের দেখা বাড়তে থাকে। কখনো বইমেলায়, কখনো লেকের পাড়ে, কখনো রাতের ঢাকায় হাঁটতে হাঁটতে। হাসান আয়েশার জন্য ফুল নিয়ে আসে, আয়েশা তার জন্য হাতে লেখা কবিতা।
একদিন বৃষ্টির রাতে হাসান আয়েশাকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। আয়েশা ভিজে গিয়েছিল। হাসান তাকে টাওয়েল দিল।
“ঠান্ডা লাগবে না তো?”
আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “না।”
দুজনে সোফায় বসে। হাসান আয়েশার হাত ধরল। আয়েশার হাত কাঁপছিল। হাসান আস্তে আস্তে তার কপালে চুমু খেল। আয়েশা চোখ বন্ধ করল। তারপর দুজনের ঠোঁট মিলিত হল। প্রথম চুমু — নরম, ভয়ে ভয়ে, তারপর গভীর। হাসান আয়েশাকে কোলে তুলে নিল বেডরুমে।
সেই রাতে দুজনে এক হয়ে গেল। আয়েশার শরীরটা ছিল নরম, উষ্ণ। হাসান তার প্রতিটা ইঞ্চি চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। আয়েশা হাসানের বুকে মাথা রেখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সেই রাতের পর থেকে দুজনের সম্পর্ক আরও গভীর হল। কিন্তু সমস্যাও এল। হাসানের মা ফোন করে বললেন, “বিয়ে কর। গ্রাম থেকে মেয়ে দেখেছি।” আয়েশার বাবা বললেন, “ছেলে দেখ, সময় হয়েছে।”
দুজনে ঝগড়া করল। আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি কি শুধু শরীর চাও? না ভালোবাসা?”
হাসান আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি তোমাকে বিয়ে করব। কিন্তু পরিবারকে ম্যানেজ করতে সময় লাগবে।”
একদিন আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। হাসান অফিস ফেলে তার কাছে ছুটে গেল। রাত জেগে তার মাথায় পানি দিল, খাবার খাওয়াল। আয়েশা সুস্থ হয়ে হাসানের বুকে কাঁদল। “তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।”
তারপর একটা ট্রিপ। দুজনে কক্সবাজার গেল। সমুদ্রের ধারে বসে হাসান আয়েশার আঙুলে আংটি পরিয়ে দিল। “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে রাজি হল।
কিন্তু বাস্তব কঠিন। হাসানের পরিবার আয়েশাকে পছন্দ করল না প্রথমে — “শহুরে মেয়ে, লেকচারার, বেশি পড়াশোনা করেছে।” আয়েশার বাবাও বললেন, “ছেলেটা কী করে?”
দুজনে অনেক কাঁদল, অনেক ঝগড়া করল। একদিন আয়েশা বলল, “আমি চলে যাব।” হাসান তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “যাবে না। আমি সব ঠিক করব।”
অবশেষে হাসান গ্রামে গিয়ে তার মা-বাবাকে বুঝাল। আয়েশাও তার বাবাকে। দুই পরিবারের দেখা হল ঢাকায়। প্রথমে অস্বস্তি, তারপর আয়েশার বিনয় আর হাসানের দৃঢ়তায় সব ঠিক হয়ে গেল।
....