ট্রেনের প্রথম দেখা

 

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনটা যখন কুমিল্লার কাছে পৌঁছাল, তখন রাত প্রায় দশটা। জানালার বাইরে অন্ধকার মাঠ আর মাঝে মাঝে দূরের গ্রামের আলো ঝিকমিক করছিল। সায়মা জানালার পাশে বসে চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই ছিল, কিন্তু পড়া হয়নি। মনটা অন্য কোথাও।

kxz

সে চট্টগ্রামে তার মামার বাসায় যাচ্ছিল। চাকরির ছুটি নিয়ে। অফিসের চাপ, ঢাকার ভিড়, একা একা ফ্ল্যাট—সবকিছু থেকে কয়েকদিনের ব্রেক দরকার ছিল। বয়স ত্রিশ। সুন্দর, শান্ত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অস্থিরতা। বিয়ে হয়নি। অনেক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু কেউই মনের মতো হয়নি।

পাশের সিটে একটা ছেলে বসেছিল। লম্বা, ফর্সা, চশমা পরা। তার নাম আরিফ। সে কুমিল্লায় নেমে যাবে। হাতে ল্যাপটপ, চোখে ক্লান্তি কিন্তু মুখে একটা শান্ত হাসি। দুজনের মধ্যে প্রথমে কোনো কথা হয়নি। শুধু একবার যখন ট্রেনটা হঠাৎ ব্রেক কষল, সায়মার ব্যাগটা পড়ে যাচ্ছিল, আরিফ ধরে ফেলল।

kx/춺'

"ধন্যবাদ," সায়মা মৃদু হেসে বলল।

"কিছু না। সাবধানে রাখুন," আরিফও হাসল।

এরপর আর কথা হয়নি। কিন্তু সায়মার মনে হলো, ছেলেটার চোখে কেমন একটা পরিচিত ভাব। যেন আগে কোথাও দেখেছে।

ট্রেন কুমিল্লা স্টেশনে থামলে আরিফ নেমে গেল। যাওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে তাকাল। সায়মাও তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই দুজনেই চোখ সরিয়ে নিল।

চট্টগ্রামে পৌঁছে সায়মা মামার বাসায় উঠল। মামা-মামি খুব আদর করলেন। কিন্তু সায়মার মনটা কেমন যেন অস্থির। সেই ট্রেনের ছেলেটার মুখটা বারবার মনে পড়ছিল।

তিনদিন পর।

মামার বাড়ির কাছে একটা ছোট নদী আছে। সায়মা সন্ধ্যায় সেখানে হাঁটতে গিয়েছিল। হঠাৎ দেখল, একটা ছেলে নদীর ধারে বসে ছবি তুলছে। ক্যামেরা হাতে। আরিফ!

"আপনি!" সায়মা অবাক হয়ে বলল।

আরিফও চমকে উঠল। "আপনি এখানে?"

দুজনেই হাসল। তারপর কথা শুরু হলো। আরিফ কুমিল্লায় থাকে, কিন্তু তার মামার বাড়ি এই গ্রামে। ছুটিতে এসেছে। সে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার আর ওয়েব ডেভেলপার।

সেইদিন থেকে দুজনের দেখা হতে লাগল। প্রথমে কাকতালীয়, পরে ইচ্ছাকৃত। সকালে নদীর ধারে হাঁটা, বিকেলে চা খাওয়া, রাতে ছাদে বসে গল্প।

সায়মা বলত, "আমি কখনো ভাবিনি ট্রেনে দেখা একজনের সাথে এভাবে কথা বলব।"

আরিফ হাসত, "আমিও না। কিন্তু মনে হয় কোনো একটা কারণ ছিল।"

তারা অনেক কথা বলত। সায়মা তার ঢাকার একাকিত্বের কথা বলত। আরিফ বলত তার ছোটবেলার কথা, বাবা-মা চলে যাওয়ার পর কীভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে। দুজনের মধ্যে একটা গভীর বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছিল।

একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। দুজনে একটা পুরনো মন্দিরের ছাদের নিচে আশ্রয় নিয়েছিল। বৃষ্টির শব্দ, ঠান্ডা হাওয়া। আরিফ তার জ্যাকেটটা সায়মাকে দিয়ে বলল, "ঠান্ডা লাগবে না?"

সায়মার হৃদয়টা দ্রুত চলছিল। সে আরিফের দিকে তাকাল। আরিফের চোখে একটা নরম আলো।

"আপনাকে দেখলে মনে হয়, আমি অনেকদিন ধরে চিনি," সায়মা ফিসফিস করে বলল।

আরিফ তার হাতটা ধরল। "আমিও। যেন কোনো পুরনো গল্পের শেষ অংশটা এখন শুরু হচ্ছে।"

তারা হাত ধরে বসে রইল। কোনো চুমু নয়, কোনো তাড়াহুড়ো নয়। শুধু একটা অনুভূতি—যে এই মানুষটার সাথে সারা জীবন কাটানো যায়।

কিন্তু সমস্যা ছিল। সায়মাকে ঢাকায় ফিরতে হবে। আরিফের কাজ কুমিল্লায়। দূরত্ব।

ফেরার দিন সায়মা খুব মন খারাপ করে ট্রেনে উঠল। আরিফ স্টেশনে এসেছিল। শুধু বলল, "যোগাযোগ রাখবেন। আমি অপেক্ষা করব।"

মাস কয়েক কেটে গেল।

দুজনে প্রতিদিন কথা বলত। ফোন, ভিডিও কল, মেসেজ। আরিফ সায়মার জন্য ছবি পাঠাত—নদীর ধার, চাঁদনী রাত, ফুলের বাগান। সায়মা পাঠাত তার ঢাকার ছাদের ছবি, অফিসের কফি।

একদিন আরিফ বলল, "আমি ঢাকায় আসছি। একটা প্রজেক্টের জন্য।"

সায়মার হৃদয় লাফিয়ে উঠল।

আরিফ এল। দুজনে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরল। পুরান ঢাকা, হাতিরঝিল, বইমেলা। একদিন বৃষ্টিতে ভিজে তারা হাতিরঝিলের ব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিফ হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাতে একটা ছোট বাক্স।

"সায়মা, আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসি। প্রথম যেদিন ট্রেনে তোমাকে দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই। আমার সাথে বাকি জীবনটা কাটাবে?"

সায়মার চোখে জল। সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

তারপর শুরু হলো তাদের নতুন জীবন। আরিফ ঢাকায় চলে এল। দুজনে একসাথে একটা ছোট ফ্ল্যাট নিল। সকালে একসাথে চা খাওয়া, রাতে ছাদে বসে চাঁদ দেখা, ছোট ছোট ঝগড়া আর তারপর মিটমাট।

এক বছর পর।

তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট একটা অনুষ্ঠান। সায়মার মামা-মামি, আরিফের আত্মীয়রা। বিয়ের রাতে চাঁদনী রাত ছিল। তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরিফ সায়মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "মনে আছে প্রথম ট্রেনের সেই রাত?"

সায়মা হেসে বলল, "মনে আছে। সেদিন আমি জানতাম না, আমার সারা জীবনের অপেক্ষা শেষ হয়ে যাবে।"

আরিফ তার কপালে চুমু খেল। "আর কোনো অপেক্ষা নয়। এখন শুধু আমরা দুজন। চিরকাল।"

তারা দুজনে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে রইল। নিচে শহরের আলো জ্বলছিল। কিন্তু তাদের জগতে শুধু দুজন।

 

....
👁 49