রাত দশটা বেজে গেছে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। চট্টগ্রামে মায়ের কাছে যাচ্ছে সে। অফিসের ছুটি নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মনটা ভারী। বয়স ২৮, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। প্রেম করেছে একবার, ভেঙে গেছে। তারপর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।
ট্রেনটা এসে দাঁড়াল। সিলেট এক্সপ্রেস। আরিফ তার এসি কেবিনের সিট খুঁজে বসল। ২২ নম্বর সিট। জানালার পাশে। ঠিক পাশের সিটে একটা মেয়ে বসে আছে। লম্বা চুল, ফর্সা গায়ের রং, চোখে চশমা। তার পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ। মেয়েটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আরিফ লক্ষ্য করল, তার চোখে একটু চিন্তার ছাপ।
“আসসালামু আলাইকুম,” আরিফ নরম গলায় বলল।
মেয়েটা ঘুরে তাকাল। “ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“আমি আরিফ। চট্টগ্রাম যাচ্ছি।”
“আমি নুসরাত। একই।”
ট্রেন ছাড়ল। বাইরে ঢাকার আলো কমে আসছে। কথা শুরু হলো ধীরে ধীরে। নুসরাত বলল সে চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। বয়স ২৬। বাবা-মা আলাদা থাকেন। সে একা। আরিফ তার জীবনের গল্প বলল। অফিস, প্রোজেক্ট, একাকীত্ব।
রাত বাড়তে লাগল। ট্রেনের লাইট কম। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালায় ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে। নুসরাত একটা বই পড়ছিল। আরিফ তার ল্যাপটপ খুলে কাজ করার চেষ্টা করছিল কিন্তু মন বসছিল না।
“বৃষ্টি দেখলে তোমার কী মনে হয়?” নুসরাত হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
“শান্তি। আর একটু দুঃখ।”
নুসরাত হাসল। “আমারও। বৃষ্টিতে মনে হয় সবকিছু ধুয়ে যায়। নতুন করে শুরু করা যায়।”
তারা দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলল। নুসরাতের গলার স্বরটা খুব মিষ্টি। আরিফের মনে হলো এই মেয়েটার সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে। অনেকদিন পর।
মাঝরাতে ট্রেনটা একটা স্টেশনে থামল। লাইট নিভে গেল কয়েক মিনিটের জন্য। অন্ধকারে নুসরাতের হাতটা আরিফের হাতে ঠেকল। দুজনেই চমকে উঠল কিন্তু হাত সরাল না। বৃষ্টির শব্দ আর ট্রেনের দুলুনিতে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
“ভয় লাগছে?” আরিফ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
“না। তোমার পাশে থাকলে না।”
সেই রাতে তারা ঘুমাল না। গল্প করল। নুসরাত বলল তার একটা ব্রেকআপ হয়েছে দুবছর আগে। ছেলেটা তাকে ঠকিয়েছে। আরিফ বলল তারও একই গল্প। দুজনেই হাসল। কষ্টটা শেয়ার করলে হালকা লাগে।
সকাল হলো। চট্টগ্রাম স্টেশন। তারা নামল। নুসরাতের বাসা স্টেশন থেকে কাছে। আরিফের মায়ের বাসা লালমনিরহাট রোডে।
“আবার দেখা হবে?” আরিফ জিজ্ঞেস করল।
নুসরাত হাসল। “নম্বর দাও।”
তারা নম্বর বিনিময় করল। আরিফ মায়ের বাসায় গিয়ে সবকিছু ভুলে গেল না। নুসরাতের মুখটা বারবার মনে পড়ছিল। সেই চোখ, সেই হাসি, বৃষ্টির রাতের স্পর্শ।
দুদিন পর নুসরাতের মেসেজ এলো: “আজ বিকেলে পাহাড়ের নিচে কফি খাবে?”
আরিফ রাজি। তারা মিলিত হলো। চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কথা বলল। নুসরাতের হাত ধরল আরিফ। নুসরাত সরাল না। সূর্য ডুবছিল। লাল আকাশ। দুজনের হৃদয়ে একটা নতুন অনুভূতি জাগছিল।
তারপর থেকে প্রতিদিন দেখা। আরিফ চট্টগ্রামে আরও কয়েকদিন থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তারা সাগরের ধারে গেল, পার্কে বসল, রাতে ফোন করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলল। নুসরাত আরিফকে তার কলেজ দেখাল। আরিফ নুসরাতকে তার মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
একদিন বৃষ্টি নামল খুব। তারা দুজনে একটা ছোট ক্যাফেতে আশ্রয় নিল। ভেজা চুল, ভেজা কাপড়। নুসরাত কাঁপছিল। আরিফ তার কাঁধে হাত রাখল। “ঠান্ডা লাগছে?”
নুসরাত মাথা নেড়ে আরিফের বুকে মাথা রাখল। “তোমার কাছে থাকলে না।”
সেই মুহূর্তে আরিফ বুঝল সে এই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। সে নুসরাতের চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, নুসরাত।”
নুসরাতের চোখে জল এসে গেল। “আমিও তোমাকে। অনেকদিন ধরে।”
তারা চুমু খেল। প্রথম চুমু। নরম, গভীর, ভালোবাসায় ভরা। ক্যাফের বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছিল। যেন আকাশও তাদের সাথে আনন্দ করছে।
দিনগুলো কাটতে লাগল। আরিফ ঢাকায় ফিরে গেল কিন্তু প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম আসত। তারা ফোনে গল্প করত, ভিডিও কল করত। নুসরাত একদিন বলল, “আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। সারাজীবন।”
আরিফ প্রপোজ করল। সাগরের সামনে হাঁটু গেড়ে। নুসরাত কেঁদে রাজি হয়ে গেল।
বিয়ের আগের রাত। চট্টগ্রামের একটা রিসোর্টে। তারা দুজনে একসাথে। নুসরাত লজ্জায় লাল। আরিফ তার কপালে চুমু খেল। “আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দিব না।”
তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। কাপড় খসে পড়ল ধীরে ধীরে। নুসরাতের নরম শরীর আরিফের বুকে লেগে আছে। আরিফ তার ঠোঁটে চুমু খেল, গলায়, বুকে। নুসরাত ফিসফিস করে বলল, “আরও কাছে এসো।”
তাদের শরীর এক হয়ে গেল। ধীরে, আবেগে, ভালোবাসায়। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল আবার। ঘরের ভিতরে দুটো হৃদয় এক হয়ে যাচ্ছিল। নুসরাতের নিঃশ্বাস ভারী, আরিফের হাত তার পিঠে। প্রতিটা স্পর্শে ভালোবাসা, প্রতিটা চুমুতে প্রতিশ্রুতি। তারা একে অপরকে পুরোপুরি অনুভব করল। রাতটা তাদের হয়ে গেল।
বিয়ের পর তারা ঢাকায় থিতু হলো। নুসরাত চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে এলো। আরিফের সাথে একটা ছোট ফ্ল্যাটে। সকালে একসাথে চা খাওয়া, রাতে একসাথে রান্না, ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো। তাদের ভালোবাসা দিন দিন গভীর হচ্ছিল।
এক বছর পর নুসরাত প্রেগন্যান্ট। আরিফ তার পেটে হাত রেখে বলল, “আমাদের ছোট্ট পরিবার।”
নুসরাত হাসল। “তোমার জন্যই এত সুন্দর জীবন।”
তারা দুজনে জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। সেই প্রথম ট্রেনের বৃষ্টি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত। ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।
....