রাত আটটা বেজে গেছে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে রাহাত। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। চট্টগ্রামে তার ছোট ভাইয়ের বিয়ের জন্য যাচ্ছে সে। অফিসের কাজ শেষ করে শেষ মুহূর্তে টিকিট কেটেছে। সুবর্ণ এক্সপ্রেসের এসি কেবিন।
রাহাত বয়স তেত্রিশ। লম্বা, ফর্সা, চশমা পরা। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় একা থাকে। বিয়ে-থা করেনি। মা-বাবা চট্টগ্রামে। ভাইয়ের বিয়েতে যাচ্ছে বলে মনটা একটু হালকা, কিন্তু ক্লান্তি তো আছেই।
কেবিনে উঠে দেখল তার পাশের সিট খালি। জানালার ধারে বসে বাইরের আলো দেখছে। ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা বাজল। ঠিক তখনই দৌড়ে এল একটা মেয়ে। লম্বা চুল, সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা বড় ব্যাগ। হাঁপাচ্ছে।
“দাদা, এটা কি সিট নাম্বার ২৭?” জিজ্ঞাসা করল সে।
রাহাত মাথা নাড়ল। মেয়েটা বসল। তার নাম আয়েশা। বয়স ছাব্বিশ। চট্টগ্রামের একটা কলেজে ইংরেজি পড়ায়। ঢাকায় মামার বাড়িতে এসেছিল বোনের পরীক্ষার জন্য। এখন ফিরছে।
প্রথমে দুজনেই চুপচাপ। ট্রেন চলতে শুরু করল। বাইরে ঢাকার আলো কমে আসছে। রাহাত একটা বই বের করল। আয়েশা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে।
“আপনি চট্টগ্রামেই থাকেন?” হঠাৎ প্রশ্ন করল আয়েশা।
“হ্যাঁ। বাবা-মা আছেন। ভাইয়ের বিয়ে। আপনি?”
“আমিও চট্টগ্রাম। কলেজে চাকরি করি।”
কথা শুরু হলো। প্রথমে ট্রেনের খাবার নিয়ে, তারপর ঢাকা-চট্টগ্রামের ট্রাফিক, তারপর কাজের কথা। রাহাত দেখল আয়েশার হাসিতে একটা আলাদা আলো আছে। চোখ দুটো গভীর। কথা বলার সময় হাত নাড়ায় একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
রাত বাড়ল। খাবার এল। দুজনে একসাথে খেল। আয়েশা বলল, “আমার মনে হয় আপনি খুব বেশি চিন্তা করেন। চোখে দেখা যায়।”
রাহাত হাসল। “জীবন তো চিন্তারই। অফিস, পরিবার, ভবিষ্যৎ। আপনি কেমন আছেন?”
আয়েশা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমারও অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর মা আর ছোট বোনকে দেখতে হয়। তাই চাকরি। কিন্তু পড়ানোটা ভালো লাগে। ছাত্রীরা যখন কবিতা বুঝতে পারে, তখন মনে হয় জীবন সার্থক।”
রাহাতের মনে হলো এই মেয়েটা অন্যরকম। সাধারণ কথার মাঝেও গভীরতা।
ট্রেন মাঝরাতে একটা স্টেশনে থামল। বাইরে ঠান্ডা হাওয়া। আয়েশা একটা শাল জড়িয়ে নিল। রাহাত তার ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল, “ঘুমান। আমি জেগে আছি।”
কিন্তু ঘুম এল না। দুজনেই গল্প করতে লাগল। রাহাত তার ছোটবেলার কথা বলল—চট্টগ্রামের পাহাড়, সমুদ্র, বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তা। আয়েশা বলল তার কবিতার বইয়ের কথা, যেগুলো সে লুকিয়ে লেখে।
“একটা কবিতা শোনাবেন?” রাহাত জিজ্ঞাসা করল।
আয়েশা লজ্জা পেল। তারপর আস্তে আস্তে বলল:
“রাতের ট্রেনে এক অচেনা যাত্রী, চোখে তার আলোর ফুলকি, হৃদয়ে বয়ে যায় নীরব স্রোত, জানি না কেন মনে হয় চিরকালের সাথী...”
রাহাতের বুক কেঁপে উঠল। এই কবিতা যেন তার জন্যই লেখা।
সকাল হলো। ট্রেন চট্টগ্রামের কাছাকাছি। আয়েশা বলল, “নামার সময় হয়ে গেছে। ভালো থাকবেন।”
রাহাত কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বলতে পারল না। শুধু ফোন নাম্বার চাইল। আয়েশা একটু ইতস্তত করে নাম্বার দিল।
“যোগাযোগ রাখবেন,” বলে আয়েশা নেমে গেল।
রাহাতের ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন শুরু হলো। বাড়িতে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু রাহাতের মন পড়ে আছে আয়েশার কথায়। সে মেসেজ করল: “পৌঁছে গেছেন?”
আয়েশা রিপ্লাই দিল: “হ্যাঁ। আপনার কথা মনে পড়ছে।”
এভাবে শুরু হলো তাদের কথোপকথন। প্রতিদিন মেসেজ, কল। রাহাত অফিস থেকে ফিরে আয়েশার গল্প শোনে। আয়েশা কলেজ থেকে ফিরে রাহাতের অফিসের টেনশনের কথা শোনে।
একদিন আয়েশা বলল, “আমার মা খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে। টাকার খুব অসুবিধা।”
রাহাত সঙ্গে সঙ্গে বলল, “চিন্তা করবেন না। আমি সাহায্য করব।”
আয়েশা প্রথমে রাজি হতে চায়নি। কিন্তু রাহাত জোর করে টাকা পাঠাল। অপারেশন সফল হলো। মা সুস্থ হলেন।
এরপর থেকে আয়েশার চোখে রাহাত আর শুধু একজন অচেনা যাত্রী রইল না। সে একজন সঙ্গী হয়ে উঠল।
দুই মাস পর। চট্টগ্রামের পাহাড়ি রাস্তায় দুজনে হাঁটছে। রাহাত আয়েশাকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে। সমুদ্রের ধারে বসে আয়েশা বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি রাহাত। কিন্তু আমার দায়িত্ব অনেক। মা, বোন...”
রাহাত তার হাত ধরল। “আমিও তোমাকে ভালোবাসি। তোমার দায়িত্ব আমারও। আমরা একসাথে সব সামলাব।”
তারা চুমু খেল প্রথমবার। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে তাদের হৃদয় মিলে গেল।
কিন্তু জীবন সবসময় সহজ নয়। রাহাতের পরিবার প্রথমে রাজি হলো না। আয়েশার পরিবারও চাইছিল না যে মেয়ে বাইরের ছেলেকে বিয়ে করে। কিন্তু তাদের ভালোবাসা ছিল অটুট। রাহাত তার মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলল আয়েশার কথা। তার সৎ স্বভাব, দায়িত্ববোধ, স্বপ্নের কথা।
অবশেষে একদিন দুই পরিবার দেখা করল। আয়েশার মা রাহাতকে দেখে বললেন, “তোমার চোখে আমার মেয়ের জন্য ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি।”
বিয়ে হয়ে গেল। সাদামাটা কিন্তু আনন্দময়।
বিয়ের পর তারা একসাথে চট্টগ্রামে থাকতে শুরু করল। রাহাত চাকরি করছে, আয়েশা পড়াচ্ছে। সন্ধ্যায় দুজনে ছাদে বসে গল্প করে। আয়েশা তার কবিতা পড়ে শোনায়। রাহাত তার স্বপ্নের কথা বলে।
এক বছর পর। আয়েশা গর্ভবতী। তারা ছোট্ট একটা ঘরে সুখে আছে। রাহাত আয়েশার পেটে হাত রেখে বলে, “আমাদের ভালোবাসা ট্রেনের সেই রাত থেকে শুরু হয়েছে। আর কখনো শেষ হবে না।”
আয়েশা হেসে বলে, “হ্যাঁ। তুমি আমার অমর প্রেম।”
তারা দুজনে জড়িয়ে ধরে থাকে। বাইরে চট্টগ্রামের আকাশে তারা জ্বলছে। যেন তাদের গল্পের সাক্ষী।
....