চট্টগ্রামের হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা সেই সন্ধ্যাটা কখনো ভুলতে পারবে না আরিফ। পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট একটা কটেজ। চারদিকে সবুজের সমারোহ। আর সেখানে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে — নীলা। তার চুল উড়ছে বাতাসে, চোখে সেই চিরকালীন দুষ্টুমি।
আরিফের বয়স তখন ২৮। ঢাকায় একটা আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। চট্টগ্রামে এসেছে অফিসের একটা প্রজেক্টের জন্য। তার চাচাতো বোনের বিয়েতে যোগ দিতে। আর নীলা? সে তার চাচাতো বোনের বান্ধবী। বয়স ২৪। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। স্বপ্ন দেখে লেখক হওয়ার।
প্রথম দেখাতেই কেমন যেন একটা ঝড় উঠল দুজনের মনে। বিয়ের আসরে নীলা হাসতে হাসতে বলল, “আপনি তো ঢাকার ছেলে, পাহাড় দেখলে ভয় পাবেন না তো?”
আরিফ হেসে উত্তর দিল, “ভয় পাবো কেন? পাহাড় তো দেখার জন্যই। আর যদি সঙ্গে এমন সুন্দর গাইড থাকে, তাহলে তো স্বর্গ।”
সেই থেকে শুরু। বিয়ের পরের দিন দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়ল চট্টগ্রামের বিখ্যাত স্পটগুলোতে। প্রথমে গেলেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। সূর্য ডুবছিল। লাল আকাশের নিচে নীলা তার চুল খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিফের হাতে একটা আইসক্রিম ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে বসে অনেক কবিতা লিখেছি আমি। আপনি কি কবিতা পড়েন?”
আরিফ লজ্জা পেয়ে বলল, “পড়ি। কিন্তু লিখতে পারি না। তুমি লেখো, আমি শুনব।”
সেই সন্ধ্যায় নীলা প্রথম তার লেখা একটা কবিতা শোনাল। কবিতাটা ছিল প্রেমের, হারিয়ে যাওয়া আর খুঁজে পাওয়ার। আরিফের বুকের ভিতর কেমন যেন নড়ে উঠল।
পরের দিন তারা গেলেন মিরসরাইয়ের পাহাড়ি এলাকায়। জিপে চড়ে ঘুরছিল। রাস্তা ঘুরে ঘুরে উঠছে। নীলা জানালা দিয়ে মাথা বের করে চিৎকার করে বলছিল, “আরিফ ভাইয়া, দেখো! কত সুন্দর!”
আরিফ হাসতে হাসতে তার হাতটা ধরে টেনে ভিতরে নিয়ে এল, “পড়ে যাবে যে!”
তাদের হাত লেগে রইল কয়েক সেকেন্ড। দুজনের চোখাচোখি হলো। সময় যেন থেমে গেল। নীলা লজ্জায় মুখ নিচু করে বলল, “আপনার হাতটা খুব গরম।”
আরিফ আস্তে করে বলল, “তোমার হাতটা তো ঠান্ডা। ভয় পাচ্ছ নাকি?”
নীলা মাথা নাড়ল, “না। কিন্তু... কেমন লাগছে।”
সেই রাতে তারা একটা ছোট্ট রিসোর্টে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। চাচাতো বোনের বাড়িতে ফিরবে না বলে। রিসোর্টের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল দুজন। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে পাহাড়ের কালো সিলুয়েট।
নীলা হঠাৎ বলল, “আরিফ, তুমি কখনো প্রেমে পড়েছ?”
আরিফ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “পড়েছিলাম। কিন্তু সে চলে গেছে। অনেকদিন আগে।”
নীলা তার কাঁধে মাথা রাখল আস্তে করে। “আমিও। কিন্তু সেই প্রেমটা ছিল শুধু কষ্টের। তোমার সাথে এই কয়েকদিন... কেমন যেন আলাদা লাগছে।”
আরিফ তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। “নীলা, আমি ঢাকায় ফিরে যাব দুইদিন পর। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না।”
সেই রাতে প্রথমবারের মতো তারা কাছাকাছি এল। নীলার ঠোঁটে আরিফের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল। নরম, উষ্ণ, ভয়ে ভয়ে। নীলা কাঁপছিল। আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। তার শরীরের গন্ধ, তার নিঃশ্বাস — সবকিছু মিলিয়ে একটা নেশা।
“আমি তোমাকে চাই, নীলা।” আরিফ ফিসফিস করে বলল।
নীলা তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমিও। কিন্তু আস্তে... এটা আমার প্রথম।”
সেই রাতটা তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর রাত হয়ে রইল। পাহাড়ের ঠান্ডা হাওয়া, কম্বলের উষ্ণতা, আর দুটো শরীরের মিলন। আরিফ খুব যত্ন করে নীলাকে আদর করছিল। তার ঘাড়ে চুমু খাচ্ছিল, তার স্তনের উপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। নীলা আনন্দে কেঁপে উঠছিল। যখন আরিফ তার ভিতরে প্রবেশ করল, নীলা তার নখ দিয়ে আরিফের পিঠ আঁচড়ে দিল। দুজন একসাথে পৌঁছে গেল সেই স্বর্গে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নীলা আরিফের বুকে মাথা রেখে বলল, “এটা স্বপ্ন না তো?”
আরিফ হেসে তার কপালে চুমু খেল, “না। এটা আমাদের গল্পের শুরু।”
কিন্তু জীবন তো সবসময় সোজা পথে চলে না। দুইদিন পর আরিফকে ঢাকায় ফিরতে হলো। নীলা চট্টগ্রামে রয়ে গেল। প্রতিদিন ফোনে কথা হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ভিডিও কল। নীলা তার লেখা নতুন কবিতা শোনাত। আরিফ তাকে তার অফিসের গল্প বলত।
একমাস পর নীলা বলল, “আমি ঢাকায় আসছি। তোমার সাথে দেখা করব।”
আরিফ খুশিতে উড়ছিল। সে নীলাকে নিয়ে গেল তার ফ্ল্যাটে। সেখানে দুজনে আবার মিলিত হলো। এবার আরও গভীরভাবে। নীলা এখন আর লজ্জা পেত না। সে নিজেই আরিফের জামা খুলে দিত। তার শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিত। আরিফ তাকে উপরে তুলে নিয়ে ভালোবাসত। তাদের শরীর ঘামে ভিজে যেত। নীলার আর্তনাদে ফ্ল্যাট ভরে যেত।
কিন্তু সমস্যা এল পরিবার থেকে। আরিফের বাবা-মা চাইছিলেন তাকে বিয়ে দিতে। একটা ভালো ঘরের মেয়ের সাথে। নীলার পরিবারও জানতে পারল তাদের সম্পর্কের কথা। নীলার বাবা রাগ করে বললেন, “ঢাকার ছেলে? কখনো না।”
দুজনে খুব কষ্ট পেল। নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, আরিফ।”
আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমরা লড়ব। চল, আমরা পালিয়ে যাই।”
একদিন রাতে তারা ঠিক করল। নীলা চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে করে ঢাকায় আসবে। তারপর দুজনে মিলে কোথাও চলে যাবে। হয়তো সিলেট কিংবা কক্সবাজার।
সেই ট্রেন যাত্রাটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে রোমান্টিক অধ্যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেন। এসি কেবিন। রাতের অন্ধকারে জানালার বাইরে আলো জ্বলছে। নীলা আরিফের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল।
“ভয় লাগছে, আরিফ।” নীলা ফিসফিস করে বলল।
আরিফ তার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, “আমি আছি। কিছু হবে না।”
ট্রেনের মৃদু দোলায় দুজনে আবার কাছাকাছি এল। কেবিনের দরজা লক করে নীলা আরিফের উপর উঠে বসল। তার শাড়ির আঁচল খসে পড়ল। আরিফ তার স্তন দুটো মুঠোয় ধরে চুমু খাচ্ছিল। নীলা তার কোমর দিয়ে নড়াচড়া করছিল। ট্রেনের শব্দের সাথে তাদের নিঃশ্বাস মিলে একাকার হয়ে গেল। তারা দুজনেই একসাথে চরমে পৌঁছাল। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে নীলা আরিফের বুকে শুয়ে পড়ল।
“আমি তোমার। চিরকাল।” নীলা বলল।
ঢাকায় পৌঁছে তারা একটা ছোট্ট হোটেলে উঠল। পরিবারের চাপ বাড়ছিল। কিন্তু দুজনের ভালোবাসা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। আরিফ তার চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করল। নীলা তার লেখা প্রকাশ করতে লাগল অনলাইনে। ধীরে ধীরে তাদের জীবন সুন্দর হয়ে উঠতে লাগল।
এক বছর পর। চট্টগ্রামের পাহাড়ে আবার ফিরে এসেছে দুজন। এবার তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। নীলার বাবা-মা শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন। আরিফের পরিবারও।
সেই একই কটেজে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলা। আরিফ পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“মনে আছে প্রথমবার?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।
নীলা হেসে ঘুরে তার ঠোঁটে চুমু খেল, “কীভাবে ভুলব? এই পাহাড়ই তো আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে।”
তারপর থেকে তাদের জীবনটা হয়ে উঠল একটা অসাধারণ রোমান্টিক গল্প। প্রতি সন্ধ্যায় তারা পাহাড়ের ঢালে হাঁটত। নীলা তার নতুন বইয়ের অংশ পড়ে শোনাত। আরিফ তাকে শুনে মুগ্ধ হয়ে যেত। রাতে তাদের শরীর এক হয়ে যেত ভালোবাসায়। কখনো আস্তে আস্তে, কখনো উন্মাদের মতো।
নীলা একদিন বলল, “আরিফ, আমরা একটা ছোট্ট পরিবার শুরু করি?”
আরিফ তার পেটে হাত রেখে বলল, “হ্যাঁ। আমাদের ভালোবাসার ফসল।”
আর সেই থেকে তাদের গল্প চলতে লাগল। পাহাড়ের আড়ালে, সমুদ্রের কাছে, ট্রেনের দোলায় — যেখানেই থাকুক, তাদের প্রেমটা ছিল অটুট।
....