ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর নিওন আলোর ঝলকানির মাঝে আয়েশা একটা ছোট কফি শপের জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। জুনের বৃষ্টি। তার চোখ দুটো জানালার কাচে ভেজা ফোঁটাগুলোর দিকে স্থির। হাতে এক কাপ ল্যাটে, কিন্তু ঠান্ডা হয়ে গেছে।
"ম্যাডাম, আরেকটা নেবেন?" ওয়েটার জিজ্ঞাসা করল।
"না, থ্যাংক ইউ।" আয়েশা হাসল। তার হাসিতে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি। তেইশ বছর বয়স, কিন্তু চোখে যেন ত্রিশের ছাপ। সফটওয়্যার কোম্পানিতে প্রজেক্ট ম্যানেজার। দিনরাত কোড, মিটিং, ডেডলাইন। প্রেম? সেটা তার কাছে শুধুই পুরনো স্মৃতি।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার।
"হ্যালো?"
"আয়েশা? আমি রাহাত। মনে আছে? স্কুলের রাহাত। চট্টগ্রামের সেই ছেলেটা।"
আয়েশার হৃদয়টা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। রাহাত। তার প্রথম প্রেম। দশ বছর আগের। গ্রামের সেই নদীর ধারে, বৃষ্টির দিনে হাত ধরে হাঁটা। তারপর রাহাত চলে গিয়েছিল কানাডায় পড়তে। যোগাযোগ কমে গিয়েছিল।
"রাহাত… তুমি কোথায়?"
"ঢাকায়। আজই এসেছি। তোমার সাথে দেখা করতে চাই। প্লিজ।"
সেই রাতে তারা দেখা করল ধানমন্ডি লেকের পাশে। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। রাহাতকে দেখে আয়েশার চোখে পানি চলে এল। লম্বা, সুঠাম, চোখে সেই একই নরম দৃষ্টি।
"তুমি একদম বদলাওনি," রাহাত বলল।
"তুমি বদলে গেছ। আরও সুন্দর হয়েছ।" আয়েশা হাসল।
তারা হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা বলল। পুরনো দিনের কথা, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা। রাহাত এখন একটা আন্তর্জাতিক এনজিওতে কাজ করে। কয়েক মাসের জন্য ঢাকায়।
রাত বাড়ছিল। তারা একটা ছোট রেস্টুরেন্টে ঢুকল। মোমবাতির আলোয় ডিনার। রাহাত তার হাতটা ধরল।
"আয়েশা, এই দশ বছর আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি। প্রতি রাতে তোমার কথা মনে পড়ত।"
আয়েশার গাল লাল হয়ে গেল। "আমিও… কিন্তু জীবন তো চলতে থাকে।"
সেই রাতে রাহাত তাকে বাসায় ছেড়ে দিতে গেল। গাড়ির ভিতরে নীরবতা। তারপর রাহাত বলল, "আজ রাতটা আমার সাথে কাটাবে? শুধু কথা বলব। কোনো চাপ নেই।"
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
রাহাতের ফ্ল্যাটটা গুলশানে। ছোট, সুন্দর, বইয়ে ভরা। তারা বারান্দায় বসল। আকাশে তারা। রাহাত তার কাঁধে হাত রাখল। আস্তে আস্তে আয়েশা তার বুকে মাথা রাখল।
"আমি তোমাকে ভালোবাসি, আয়েশা। এখনও।"
সেই রাতে প্রথম চুমু। নরম, দীর্ঘ, আবেগে ভরা। আয়েশার শরীর কেঁপে উঠল। রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরল। তারা বিছানায় গেল। কাপড় খুলতে খুলতে রাহাত প্রতিটা ইঞ্চি চুমু খাচ্ছিল। আয়েশার গলা, কানের লতি, ঘাড়। তার হাত আয়েশার পিঠ বেয়ে নামছিল।
"তুমি এত সুন্দর," রাহাত ফিসফিস করে বলল।
তারা এক হয়ে গেল। রাতের নীরবতায় শুধু তাদের নিঃশ্বাস আর হৃদয়ের শব্দ। রাহাত ধীরে ধীরে ভালোবাসল তাকে। প্রতিটা স্পর্শে দশ বছরের অপেক্ষা মিশে ছিল। আয়েশা তার নাম ধরে কেঁদে উঠল আনন্দে।
সকাল হলো। কিন্তু তাদের রাতের প্রেম শেষ হয়নি।
পরের কয়েক সপ্তাহ তারা একসাথে সময় কাটাল। রাহাত তাকে নিয়ে সুন্দরবনে গেল, কক্সবাজারে গেল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ছিল ঢাকার রাতগুলো। ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে চা খাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা, গান শোনা।
এক রাতে আয়েশা বলল, "রাহাত, আমি তোমাকে ছাড়া আর কিছু চাই না।"
রাহাত তার চোখে চোখ রেখে বলল, "তাহলে চলো, আমরা বিয়ে করি।"
কিন্তু জীবন সহজ নয়। আয়েশার পরিবার রাজি নয়। রাহাতের চাকরি আবার কানাডায় ফিরে যাওয়ার।
এক রাতে ঝড় উঠল। আয়েশা রাহাতের ফ্ল্যাটে চলে এল। ভিজে গেছে পুরো। রাহাত তাকে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিল। তারপর গরম দুধের কাপ।
"আমি তোমার সাথে যাব, রাহাত। যেখানে তুমি যাও।"
রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরল। সেই রাতে তাদের প্রেম আরও গভীর হলো। তারা সারা রাত জেগে রইল। কথা বলল, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখল, আবার ভালোবাসল। আয়েশার শরীর রাহাতের স্পর্শে ফুলের মতো ফুটে উঠছিল। রাহাত তার প্রতিটা ইচ্ছা পূরণ করছিল। চুমু, আদর, নরম কথা।
রাত গভীর হলে তারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। রাহাত পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে। তার ঠোঁট আয়েশার ঘাড়ে।
"এই রাতগুলোই আমাদের জীবন," সে বলল।
কয়েক মাস পর তারা বিয়ে করল। ছোট অনুষ্ঠান। তারপর কানাডা চলে গেল। কিন্তু প্রতি রাতে তারা একে অপরের কাছে ফিরে আসে। রাতের প্রেম তাদের সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে রইল।
....