চিরকালের ট্রেনের প্রেম

রাতের ঢাকা-চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনটা যখন কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে গেল, তখন আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদটা লুকোচুরি খেলছিল। সোহান জানালার পাশের সিটে বসে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার হাতে একটা পুরনো বই—রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’। কিন্তু মনটা কোথাও অন্য জায়গায় ঘুরছিল। ত্রিশ বছর বয়স, একটা আইটি কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার। জীবনটা চলছে ঠিকঠাক, কিন্তু ভিতরে একটা শূন্যতা। প্রেম? সেটা তার কাছে শুধুই স্মৃতি।

kxz

পাশের সিটে কেউ বসেনি এখনও। ট্রেনটা চলতে শুরু করল। হঠাৎ একটা মেয়েলি গলার স্বর শুনল সোহান।

“দাদা, এই সিটটা কি খালি?”

kx/춺'

সোহান চোখ খুলে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। লম্বা চুল, সাদা সালোয়ার কামিজ, চোখে একটা নরম আলো। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ আর একটা বই—হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’।

“হ্যাঁ, খালি। বসুন।”

মেয়েটা বসল। তার নাম আরিফা। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। কথা শুরু হলো সাধারণভাবে—ট্রেনের দেরি, আবহাওয়া, বইয়ের কথা। কিন্তু কথা যত এগোতে লাগল, সোহানের মনে হলো এই মেয়েটার সাথে কথা বলতে তার কখনো ক্লান্তি লাগছে না।

রাত বাড়ছিল। ট্রেনের আলো মৃদু। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে মাঠ-ঘাট পেরিয়ে যাচ্ছিল। আরিফা হাসতে হাসতে বলল, “আপনি জানেন, ট্রেনে বসে কারো সাথে প্রথম দেখাতেই এমন কথা হয়, এটা আমার জীবনে প্রথম।”

সোহান হাসল। “আমারও।”

তারা দুজনেই জানত না, এই রাতটা তাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত হতে চলেছে।

ট্রেন যখন ভৈরব স্টেশনে থামল, তখন রাত দুটো। আরিফা ঘুমিয়ে পড়েছিল সোহানের কাঁধে মাথা রেখে। সোহান নড়েনি। তার হৃদয়টা অদ্ভুত একটা ছন্দে বাজছিল। সে চুপচাপ আরিফার চুলের গন্ধ শুঁকছিল—হালকা জুঁই ফুলের মতো।

সকাল হলো। চট্টগ্রাম স্টেশনে নামার সময় আরিফা লজ্জা পেয়ে বলল, “সরি, রাতে আপনার কাঁধে...”

সোহান হাসল, “কোনো সমস্যা নেই। বরং ভালো লেগেছে।”

তারা নম্বর বিনিময় করল। কিন্তু সোহান জানত, এটা শুধু একটা রাতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না।

দুই মাস পর

সোহানের ফোন বাজল। আরিফা। “আবার ঢাকা যাচ্ছি। একই ট্রেনে। আপনি?”

সোহানের বুকটা ধক করে উঠল। “আমিও।”

দ্বিতীয়বারের দেখা। এবার তারা পাশাপাশি সিট বুক করে নিল। ট্রেন চলতে চলতে তারা গল্প করল নিজেদের জীবনের। আরিফা বলল তার ছোটবেলার কথা, গ্রামের বাড়ি, বাবার কষ্ট। সোহান বলল তার একাকিত্বের কথা, ক্যারিয়ারের চাপ।

রাত গভীর হলে আরিফা সোহানের হাত ধরল। “আপনার সাথে থাকলে সময়টা কেমন উড়ে যায়।”

সোহান তার আঙুলে চুমু খেল। “আমারও।”

সেই রাতে প্রথমবার তারা চুমু খেল। ট্রেনের জানালার পাশে, অন্ধকারে। চুমুটা ছিল নরম, দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু গভীর। আরিফার ঠোঁটে একটা মিষ্টি স্বাদ। সোহানের হাত তার কোমরে। ট্রেনের দুলুনিতে তাদের শরীর একে অপরের আরও কাছে চলে এল।

“এটা ঠিক হচ্ছে তো?” আরিফা ফিসফিস করে বলল।

“যা হচ্ছে, তা সবচেয়ে সুন্দর,” সোহান জবাব দিল।

তারা আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল। সোহানের হাত আরিফার সালোয়ারের উপর দিয়ে তার পিঠে বুলিয়ে গেল। আরিফা কেঁপে উঠল। কিন্তু সেই রাতে তারা আর এগোল না। শুধু আলিঙ্গন আর চুমু। ট্রেন তাদের সাক্ষী হয়ে রইল।

ছয় মাস পর

এখন তারা প্রেমে পড়েছে। প্রতি মাসে একবার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনে দেখা হয়। কখনো সোহান যায়, কখনো আরিফা। ট্রেনটা তাদের প্রেমের ঠিকানা হয়ে উঠেছে। তারা ট্রেনের বিভিন্ন কোচে বসে, কখনো এসি, কখনো শোভন। কিন্তু প্রতিবারই নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি হয়।

একবার বৃষ্টির রাতে ট্রেন আটকে গেল মাঝপথে। বিদ্যুৎ চলে গেল। অন্ধকার কামরায় শুধু তাদের নিঃশ্বাস। আরিফা সোহানের কোলে উঠে বসল। তার শরীর গরম। সোহান তার সালোয়ারের দড়ি খুলে দিল। আরিফার হাত সোহানের জামার ভিতরে।

“আমি তোমাকে চাই,” আরিফা বলল কাঁপা গলায়।

সোহান তাকে চুমু খেল গলায়, কানে, বুকে। তার হাত আরিফার নরম স্তনে। আরিফা নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। ট্রেনের দুলুনিতে তাদের শরীর এক হয়ে গেল। সেই রাতে তারা প্রথমবার শারীরিকভাবে মিলিত হলো। ট্রেনের সিটে, অন্ধকারে, বৃষ্টির শব্দে। এটা ছিল তাদের প্রথম ইন্টিমেট মুহূর্ত। নরম, আবেগপূর্ণ, প্যাশনেট।

সোহান আরিফার ভিতরে প্রবেশ করার সময় আরিফা তার পিঠ আঁকড়ে ধরল। “আমার সোহান... চিরকালের জন্য...”

তারা একসাথে চূড়ায় পৌঁছাল। ঘামে ভেজা শরীর, জড়াজড়ি করে শুয়ে রইল। ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

এক বছর পর

প্রেমটা আরও গভীর হয়েছে। সোহান আরিফাকে প্রপোজ করল একটা ট্রেনের কামরায়। ফুল, চকলেট, আর একটা ছোট রিং। আরিফা কেঁদে ফেলল। “হ্যাঁ... হাজারবার হ্যাঁ।”

কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না। আরিফার বাবা-মা অন্য ছেলের সাথে বিয়ের কথা বলল। সোহানের পরিবারও চাপ দিল। তারা লুকিয়ে দেখা করতে লাগল। ট্রেনই তাদের একমাত্র নিরাপদ জায়গা।

একদিন খুব ঝড়ের রাতে ট্রেন চলছিল। আরিফা কাঁদছিল। “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”

সোহান তাকে জড়িয়ে ধরল। “আমরা পালিয়ে যাব। ট্রেনেই।”

সেই রাতে তারা সিদ্ধান্ত নিল। পরের ট্রেনে তারা দুজনেই টিকিট কাটল, কিন্তু গন্তব্য অন্য। তারা চট্টগ্রাম থেকে আরও দূরে, কক্সবাজারের দিকে। ট্রেনে বসে তারা পরিকল্পনা করল।

কিন্তু ভাগ্য তাদের সাথে ছিল না। ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ল। ছোট একটা দুর্ঘটনা। কেউ মারা যায়নি, কিন্তু অনেকে আহত। সোহানের পা ভেঙে গেল। আরিফা তার মাথায় চোট পেল।

হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর আরিফা প্রথম সোহানের হাত ধরল। “তুমি ঠিক আছ তো?”

সোহান হাসল কষ্ট করে। “তুমি যতক্ষণ আছ, আমি ঠিক আছি।”

দুই বছর পর

তারা বিয়ে করেছে। পরিবার মেনে নিয়েছে। এখন তারা ঢাকায় থাকে। কিন্তু প্রতি মাসে একবার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনে চড়ে। সেই একই সিট, সেই একই জানালা।

এখন তাদের একটা ছোট মেয়ে আছে—নাম ট্রিনা। ট্রেনের নামে।

সোহান আর আরিফা বুড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতি বছর তাদের অ্যানিভার্সারিতে তারা ট্রেনে চড়ে। একই কামরায় বসে হাত ধরে। আরিফা সোহানের কাঁধে মাথা রাখে। সোহান তার চুলে চুমু খায়।

“চিরকালের ট্রেনের প্রেম,” সোহান ফিসফিস করে বলে।

আরিফা হাসে। “চিরকালের... তোমার সাথে।”

ট্রেন চলতে থাকে। জীবনের মতো। কখনো দুলে, কখনো সোজা। কিন্তু তাদের প্রেম কখনো থামে না।

....
👁 894