সমুদ্রের ঢেউয়ে প্রেম

গুলশানের একটা ছোট ক্যাফেতে বসে আরিয়ান তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বয়স ২৮। একটা আইটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। চোখে চশমা, চুল এলোমেলো, আর মুখে সবসময় একটা ক্লান্ত হাসি। আজও তার মাথায় ছিল একটা ডেডলাইনের চাপ। কিন্তু হঠাৎ করে বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এল।

kxz

ক্যাফের জানালার কাছে বসে সে বৃষ্টি দেখছিল। ঠিক তখনই দরজা খুলে ঢুকল একটা মেয়ে। তার পরনে হালকা নীল সালোয়ার কামিজ, চুল ভিজে গেছে, আর চোখে একটা অসহায় দৃষ্টি। সে চারপাশে তাকিয়ে একটা খালি টেবিল খুঁজছিল। আরিয়ানের টেবিলের পাশেই একটা খালি চেয়ার ছিল। মেয়েটা দ্বিধা করে জিজ্ঞাসা করল, “এখানে বসতে পারি?”

আরিয়ান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মেয়েটা বসল। তার নাম ছিল মেহের। বয়স ২৫। চট্টগ্রামের মেয়ে। ঢাকায় একটা এনজিওতে কাজ করে। চোখ দুটো তার এত সুন্দর যে বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঝকঝক করছিল।

kx/춺'

“বৃষ্টিতে ভিজে গেলেন?” আরিয়ান হালকা হেসে জিজ্ঞাসা করল।

মেহের লজ্জা পেয়ে হাসল, “হ্যাঁ। অফিস থেকে বেরিয়ে বাস ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বৃষ্টি এসে সব ভাসিয়ে দিল।”

তাদের কথা শুরু হল। প্রথমে আবহাওয়া নিয়ে, তারপর শহরের ট্রাফিক, তারপর চট্টগ্রামের সমুদ্রের গল্প। মেহের বলল, “চট্টগ্রামের সমুদ্র দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা কত বড়। ঢাকায় এসে মনে হয় সবকিছু ছোট হয়ে গেছে।”

আরিয়ান বলল, “আমারও চট্টগ্রাম যেতে ইচ্ছে করে। কখনো যাইনি।”

সেই বিকেলটা তাদের জীবনের প্রথম অধ্যায় হয়ে উঠল। বৃষ্টি থামার পরও তারা অনেকক্ষণ বসে রইল। ফোন নম্বর বিনিময় হল।

পরের কয়েক সপ্তাহ তাদের মেসেজিং চলতে লাগল। আরিয়ান প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মেহেরের সাথে কথা বলত। মেহেরের গলায় একটা মিষ্টি সুর ছিল। সে গান গাইতে ভালোবাসত। একদিন রাতে ফোনে সে “তোমার চোখে আমি” গানটা গেয়ে শোনাল। আরিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল।

এক শুক্রবার তারা প্রথম ডেটে গেল। জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে হাঁটতে হাঁটতে। মেহের হাতে একটা আইসক্রিম নিয়ে হাসছিল। আরিয়ান তার হাতটা ধরতে চাইছিল কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না। শেষে সে বলল, “মেহের, তোমার সাথে সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে।”

মেহের লাল হয়ে গেল। “আমারও।”

তারপর থেকে তাদের সম্পর্ক গভীর হতে লাগল। আরিয়ান মেহেরকে তার অফিসের ছাদে নিয়ে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখাত। মেহের আরিয়ানকে নিয়ে পুরান ঢাকায় ঘুরতে যেত, ইফতার করত, ফুচকা খেত। তাদের মধ্যে একটা নরম টান তৈরি হচ্ছিল।

কিন্তু সমস্যা ছিল। মেহেরের পরিবার চট্টগ্রামে। তার বাবা একজন স্কুল শিক্ষক, খুব রক্ষণশীল। আর আরিয়ানের পরিবার ঢাকায়, তারা চায় ছেলে যেন একটা ভালো ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে। দুজনের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্যও ছিল না, কিন্তু সামাজিক বাধা ছিল।

একদিন মেহের কাঁদতে কাঁদতে ফোন করল। “আমার বাবা বলেছে, আমাকে চট্টগ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। একটা ছেলের সাথে বিয়ের কথা চলছে।”

আরিয়ানের বুকটা চুরমার হয়ে গেল। সে বলল, “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, মেহের। চলো আমরা একসাথে কথা বলি।”

তারা ঠিক করল চট্টগ্রাম যাবে। আরিয়ান ছুটি নিয়ে মেহেরের সাথে ট্রেনে চেপে বসল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সেই দীর্ঘ যাত্রা তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হয়ে উঠল।

ট্রেনের কামরায় জানালার পাশে বসে তারা হাত ধরে ছিল। বাইরে সবুজ মাঠ, নদী, গ্রাম চলে যাচ্ছিল। মেহের মাথা আরিয়ানের কাঁধে রেখে বলল, “যদি বাবা রাজি না হয়?”

আরিয়ান তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মেহের। সব বাধা পার হয়ে যাব।”

রাত নামল। ট্রেনের আলো ম্লান। অন্য যাত্রীরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মেহের আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে তার ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়ে এল। প্রথম চুমু। নরম, ভয়ে ভরা, কিন্তু গভীর ভালোবাসায় ভরা। আরিয়ান তার কোমর জড়িয়ে ধরল। তাদের শ্বাস এক হয়ে গেল। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে তাদের শরীর আরও কাছে এল। মেহেরের সালোয়ারের উপর দিয়ে আরিয়ান তার পিঠে হাত বুলাতে লাগল। মেয়েটা কেঁপে উঠল।

“আমি তোমার,” মেহের ফিসফিস করে বলল।

সেই রাতে ট্রেনের বাথরুমের কাছে একটা খালি জায়গায় তারা দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ছিল। চুমুতে চুমুতে তাদের শরীরের তাপ বাড়ছিল। আরিয়ান মেহেরের ঘাড়ে চুমু খেয়ে বলল, “তোমার গন্ধটা আমাকে পাগল করে দেয়।”

মেহের লজ্জায় মুখ লুকাল তার বুকে। কিন্তু তার হাত আরিয়ানের শার্টের বোতাম খুলছিল। তারা দুজনেই জানত, এখনো সময় হয়নি পুরোপুরি এক হওয়ার। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছিল।

চট্টগ্রাম পৌঁছে তারা হোটেলে উঠল। পরের দিন মেহের তার বাবার সাথে কথা বলতে গেল। আরিয়ান বাইরে অপেক্ষা করছিল। মেহেরের বাবা প্রথমে রেগে গেলেন। “ঢাকার ছেলে? কী করে? কোন পরিবার?”

কিন্তু মেহের কাঁদতে কাঁদতে সব খুলে বলল। সে বলল কীভাবে আরিয়ান তার জীবন বদলে দিয়েছে। কীভাবে সে এখন আর একা নয়।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ছেলেটাকে নিয়ে আয়। দেখি।”

আরিয়ান এসে সম্মানের সাথে কথা বলল। সে তার পরিবারের কথা বলল, তার চাকরির কথা, তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। মেহেরের মা চুপচাপ শুনছিলেন। শেষে বাবা বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু বিয়েটা চট্টগ্রামেই হবে। আর তোমাকে এখানে থাকতে হবে কিছুদিন।”

আরিয়ান রাজি হয়ে গেল।

তারপরের দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো। তারা সমুদ্র সৈকতে গেল। পতেঙ্গা বিচে বসে সূর্যাস্ত দেখল। ঢেউয়ের শব্দে তাদের হাসি মিশে যাচ্ছিল। মেহের তার শাড়ির আঁচল উড়িয়ে আরিয়ানের কাছে এসে দাঁড়াল। সমুদ্রের হাওয়ায় তাদের চুল উড়ছিল। আরিয়ান তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। এবার আর লুকোল না। দীর্ঘ, গভীর চুমু। মেহেরের ঠোঁট তার ঠোঁটে মিশে গেল। তাদের হাত একে অপরের শরীর অন্বেষণ করছিল।

সন্ধ্যায় হোটেলের রুমে তারা একসাথে ছিল। আলো নিভিয়ে, শুধু সমুদ্রের আওয়াজ। মেহের লজ্জায় কাঁপছিল। আরিয়ান আস্তে আস্তে তার শাড়ির আঁচল সরাল। তার সুন্দর শরীরটা চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছিল। সে মেহেরের কপালে, চোখে, ঠোঁটে, ঘাড়ে চুমু দিতে লাগল। মেহের তার পিঠ আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করল, “আমাকে তোমার করে নাও।”

তাদের শরীর এক হয়ে গেল। নরম, আবেগপূর্ণ, ভালোবাসায় ভরা। আরিয়ান তার প্রতিটা স্পর্শে মেহেরকে বলছিল সে কতটা ভালোবাসে। মেহেরের চোখ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একে অপরকে আবিষ্কার করল। শরীরের প্রতিটা কোণ, প্রতিটা অনুভূতি। বাইরে সমুদ্রের ঢেউ যেন তাদের ভালোবাসার তালে তাল মিলিয়ে যাচ্ছিল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মেহের আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে বলল, “এটাই আমার স্বর্গ।”

বিয়ের দিন ঠিক হল। চট্টগ্রামের একটা সুন্দর বাড়িতে। অনেক আত্মীয়স্বজন এল। মেহের লাল বেনারসি শাড়িতে অপূর্ব লাগছিল। আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে চোখ সরাতে পারছিল না। কাজী সাহেব যখন জিজ্ঞাসা করলেন, “মেহের, তুমি এই ছেলেকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছ?” মেহের চোখের জল ফেলে বলল, “হ্যাঁ।”

বিয়ের পর তারা ঢাকায় ফিরে এল। কিন্তু প্রতি মাসে চট্টগ্রাম যেত। তাদের জীবনটা ছোট ছোট সুখে ভরে উঠল। আরিয়ান অফিস থেকে ফিরে মেহেরকে জড়িয়ে ধরত। রাতে তারা একসাথে রান্না করত, গান শুনত, আর একে অপরের শরীরে হারিয়ে যেত।

এক বছর পর মেহেরের পেটে সন্তান এল। আরিয়ান তার পেটে হাত রেখে বলল, “আমাদের ভালোবাসার ফল।”

বৃষ্টির সেই প্রথম দিন থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত, তাদের গল্পটা ছিল একটা অসাধারণ রোমান্টিক যাত্রা। যেখানে বাধা ছিল, কিন্তু ভালোবাসা জিতেছিল।

মেহের আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলত, “বৃষ্টির পরে তোমার চোখটা আরও সুন্দর লাগে।”

আর আরিয়ান উত্তর দিত, “তোমার চোখেই আমার সারা পৃথিবী।”

....
👁 451