বৃষ্টির পরে তোমার চোখ

ঢাকার গরমটা যেন কখনো কমে না। জুন মাসের এক বিকেলে, মিরপুর-১০ নম্বরের সেই ছোট বইয়ের দোকানটায় ঢুকলাম আমি, আরিফ। হাতে ছিল একটা ভেজা ছাতা। বাইরে হঠাৎ করে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দোকানের ভিতরটা ঠান্ডা, পুরনো বইয়ের গন্ধে ভরা।

kxz

“দাদা, ‘যে জীবনের গল্প’ আছে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

দোকানদার বলল, “ওই তাকে আছে, খুঁজে নিন।”

kx/춺'

তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বইটা খুঁজছিলাম, হঠাৎ পাশ থেকে একটা নরম গলা ভেসে এল, “ওটা আমি নিয়েছি। কিন্তু যদি আপনার খুব দরকার হয়, আমি পরে নেব।”

ঘুরে তাকালাম।

সে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা সালোয়ার কামিজ, চুলে হালকা ক্লিপ, চোখে চশমা। বৃষ্টির ফোঁটা তার কপালে লেগে আছে। তার চোখ দুটো যেন বৃষ্টির পরের আকাশের মতো—শান্ত কিন্তু গভীর।

“না, ঠিক আছে। আপনি নিন,” বলে আমি হাসলাম।

সে একটু ইতস্তত করে বলল, “আসলে আমি এটা কাল ফেরত দিয়ে দিব। যদি চান, কাল আসবেন।”

“আমি আরিফ।”

“আমি নুসরাত।”

সেই প্রথম দেখা।

নুসরাত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমি একটা ছোট সফটওয়্যার কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার। মিরপুরে থাকি ভাড়া বাসায়। সে থাকে মোহাম্মদপুরে মামার বাসায়।

পরের দিন বই ফেরত দিতে এসে আমরা আবার দেখা করলাম। বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছিল। দোকানের বাইরে ছোট ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছিলাম।

“আপনি কী পড়েন?” সে জিজ্ঞাসা করল।

“যা পাই। প্রেমের গল্প, দুঃখের গল্প, জীবনের গল্প। আপনি?”

সে হাসল, “আমিও। কিন্তু বাস্তবে প্রেম হয় বলে মনে হয় না। সবকিছু এত জটিল।”

“জটিলতা না থাকলে তো গল্প হয় না,” আমি বললাম।

সেই থেকে আমাদের কথা শুরু। প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে, তারপর ফোনে। সে খুব কম কথা বলত, কিন্তু যা বলত তা গভীর। আমি অনেক কথা বলতাম, সে শুনত।

দু’মাস পর আমরা প্রথম ডেটে গেলাম। জুরাইনের একটা ছোট ক্যাফেতে। বৃষ্টি পড়ছিল। সে এসেছিল নীল রঙের একটা টপ আর জিন্স পরে। তার চুল ভিজে গিয়েছিল।

“আরিফ, আমার বাবা-মা খুব কনজারভেটিভ। আমি যদি কাউকে পছন্দ করি, তাহলে অনেক ঝামেলা হবে,” সে বলল।

“আমিও জানি। আমার বাবা চায় আমি গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করি। কিন্তু নুসরাত, আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারি না।”

সে আমার হাত ধরল প্রথমবার। তার আঙুলগুলো ঠান্ডা ছিল বৃষ্টির জন্য।

“তাহলে আমরা লড়ব। একসাথে।”

সেই দিন থেকে আমাদের ভালোবাসা বড় হতে থাকল। আমরা মিরপুরের রাস্তায় হাঁটতাম, ধানমন্ডি লেকের পাশে বসে থাকতাম, বৃষ্টিতে ভিজতাম। সে আমাকে তার কবিতা শোনাত। আমি তাকে কোডিং শেখাতাম।

কিন্তু সমস্যা শুরু হলো ছয় মাস পর।

নুসরাতের বাবা জানতে পারলেন। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। খুব কড়া মানুষ। তিনি নুসরাতকে বললেন, “তোর পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছেলের সাথে কথা বলবি না। আর যদি সেই ছেলে মিরপুরের কোনো সাধারণ চাকরিজীবী হয়, তাহলে তো কথাই নেই।”

নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ফোন করল। “আরিফ, বাবা বলেছে আমাকে চট্টগ্রামে মামার কাছে পাঠিয়ে দিবে।”

আমার বুকটা ভেঙে গেল। কিন্তু আমি বললাম, “তুমি যেও না। আমরা অপেক্ষা করব। আমি চাকরিটা ভালো করব, প্রমোশন নেব। তারপর তোমার বাবার কাছে যাব।”

সে চট্টগ্রামে চলে গেল।

দূরত্ব আমাদের কষ্ট দিতে লাগল। প্রতিদিন রাতে আমরা ভিডিও কলে কথা বলতাম। সে বলত, “আজ সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম। তোমার কথা মনে পড়ছিল।”

আমি বলতাম, “একদিন আমরা একসাথে সমুদ্রে যাব। হাত ধরে হাঁটব।”

আমি রাত জেগে কাজ করতাম। প্রজেক্ট শেষ করে প্রমোশন নিলাম। স্যালারি বাড়ল। কিন্তু নুসরাতের বাবা এখনো রাজি না।

একদিন নুসরাত ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবা আমার জন্য একটা ছেলে দেখেছে। চট্টগ্রামের ডাক্তার। বিয়ে ঠিক করতে চায়।”

আমি চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, “তুমি কী চাও, নুসরাত?”

সে ফুঁপিয়ে উঠল, “আমি তোমাকে চাই। কিন্তু বাবা-মা… আমি কী করব?”

“আমি আসছি চট্টগ্রামে,” আমি বললাম।

পরের সপ্তাহে আমি চট্টগ্রাম গেলাম। নুসরাতের মামার বাসার কাছে একটা হোটেলে উঠলাম। গোপনে দেখা হলো। সে এসেছিল কালো ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে।

আমরা পাহাড়ের নিচে একটা নির্জন জায়গায় বসলাম। বৃষ্টি পড়ছিল আবার।

“আরিফ, আমি বাবাকে বলব। যদি না মানে, তাহলে আমি তোমার সাথে চলে যাব,” সে বলল।

“না নুসরাত। আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলব। সম্মানের সাথে।”

সেই রাতে আমি নুসরাতের বাবাকে ফোন করলাম। প্রথমে তিনি রাগ করলেন। কিন্তু আমি সব খুলে বললাম—আমার চাকরি, আমার স্বপ্ন, নুসরাতকে কতটা ভালোবাসি।

তিনি বললেন, “ছেলে, ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না। দায়িত্ব লাগে।”

আমি বললাম, “স্যার, আমি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। আপনি আমাকে একটা সুযোগ দিন।”

তিনি চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আগামী মাসে ঢাকায় আসবে। আমার সাথে দেখা করবে।”

আমি ফিরে এলাম ঢাকায়। নুসরাতের সাথে প্রতিদিন কথা হতো। সে বলত, “বাবা তোমার কথা ভাবছে।”

এক মাস পর আমি নুসরাতের বাবার সাথে দেখা করলাম। তিনি অনেক প্রশ্ন করলেন—আমার পরিবার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ধর্ম, সবকিছু। আমি সত্যি কথা বললাম।

শেষে তিনি বললেন, “দেখো আরিফ, আমি তোমাকে পছন্দ করেছি। কিন্তু নুসরাতের পড়াশোনা শেষ হোক। তারপর বিয়ে।”

আমি আনন্দে কেঁদে ফেললাম প্রায়।

নুসরাত গ্র্যাজুয়েশন শেষ করল। আমরা বিয়ে করলাম সেই বছরের ডিসেম্বরে। ছোট অনুষ্ঠান। মিরপুরের বাসায়। বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন।

বিয়ের পর আমরা প্রথম রাতে ছাদে বসেছিলাম। সে আমার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আরিফ, মনে হয় সব বৃষ্টি আমাদের জন্যই ছিল। যাতে আমরা একসাথে ভিজতে পারি।”

আমি তার চোখে চুমু খেলাম। “হ্যাঁ, বৃষ্টির পরে তোমার চোখ সবচেয়ে সুন্দর।”

তারপর থেকে আমাদের জীবন শুরু হলো। ছোট ছোট সুখ। সকালে একসাথে চা খাওয়া, রাতে একসাথে হাঁটা, সপ্তাহান্তে ধানমন্ডি লেকে যাওয়া। নুসরাত শিক্ষকতা শুরু করল। আমি প্রজেক্ট লিড হয়ে গেলাম।

দু’বছর পর আমাদের একটা ছোট্ট মেয়ে হলো। তার নাম রাখলাম বৃষ্টি।

এখনো যখন বৃষ্টি পড়ে, আমরা দুজন ছাদে বেরিয়ে যাই। নুসরাত আমার হাত ধরে বলে, “মনে আছে প্রথম দিনের কথা?”

আমি বলি, “সব মনে আছে। আর সবসময় মনে থাকবে।”

ভালোবাসা কখনো সহজ হয় না। কিন্তু যদি সত্যি হয়, তাহলে সব বাধা পেরিয়ে যায়।

আমাদের গল্প এখনো চলছে। প্রতিদিন নতুন করে লেখা

....
👁 247