রাতের ঢাকা শহরটা যেন আলোর সমুদ্র। গুলশানের একটা ছোট ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল আয়েশা। তার হাতে এক কাপ কফি, চোখে দূরের আকাশ। বয়স ২৪। চাকরি করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। কিন্তু তার মনটা সবসময় খুঁজে বেড়ায় একটা শান্তি, একটা ভালোবাসা যা সিনেমার মতো নয়, বাস্তবের মতো গভীর।
“আয়েশা, কাল সকালে চট্টগ্রামের ট্রেন ধরবি?” মায়ের গলা ভেসে এল রান্নাঘর থেকে।
“হ্যাঁ মা। অফিসের কাজ। তিন দিনের ট্রিপ।” আয়েশা জবাব দিল। কিন্তু তার মনে অন্য চিন্তা। চট্টগ্রামে তার ছোটবেলার বন্ধু রিয়াজ থাকে। অনেকদিন দেখা হয়নি। ফেসবুকে মাঝে মাঝে কথা হয়, কিন্তু সামনাসামনি কখনো না।
পরদিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনে উঠল আয়েশা। স্টেশনটা ভিড়ে গমগম করছে। সে তার সিট খুঁজে বসল। উইন্ডো সিট। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ট্রেনটা ছাড়তেই তার ফোন বেজে উঠল।
“হ্যালো, আয়েশা? আমি রিয়াজ। শুনলাম তুই আজ চট্টগ্রাম যাচ্ছিস।”
আয়েশার হৃদয়টা একটু দ্রুত চলতে শুরু করল। “হ্যাঁ, কী করে জানলি?”
“তোর মা বলেছে। আমি স্টেশনে আসব তোকে রিসিভ করতে।”
ট্রেন চলছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে কাঁচে। আয়েশা চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল তার ছোটবেলার কথা। রিয়াজ তার পাশের বাড়ির ছেলে ছিল। একসাথে খেলত, পড়ত। তারপর রিয়াজ চলে গিয়েছিল চট্টগ্রামে বাবার চাকরির সুবাদে। আয়েশা কখনো ভাবেনি যে বড় হয়ে তার মনে এত জায়গা নেবে এই ছেলেটা।
ট্রেন মাঝপথে একটা স্টেশনে থামল। আয়েশা চোখ খুলে দেখল তার সামনের সিটে একজন লম্বা, সুদর্শন যুবক বসে আছে। চোখাচোখি হতেই ছেলেটা হাসল।
“আয়েশা? তুই?”
আয়েশা অবাক হয়ে গেল। “রিয়াজ? এখানে কী করছিস?”
রিয়াজ হেসে বলল, “তোকে সারপ্রাইজ দিতে ঢাকা থেকেই উঠেছি। তোর সিটের পাশে বুক করা ছিল।”
দুজনের মধ্যে প্রথমে একটা অস্বস্তি, তারপর হাসি। কথা শুরু হল। ট্রেন চলছে, বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে দুটো হৃদয়ের অনেক পুরোনো কথা।
রিয়াজ বলল, “জানিস, ছোটবেলায় তোকে দেখে আমার খুব ইচ্ছে করত তোর হাত ধরে দৌড়াতে। কিন্তু সাহস পাইনি।”
আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “আমিও তো তোকে দেখে ভাবতাম, এই ছেলেটা যদি সবসময় আমার পাশে থাকত।”
ট্রেনের ভেতর সময় যেন থেমে গিয়েছিল। তারা কথা বলতে বলতে ভুলে গিয়েছিল যে বাইরে পৃথিবী চলছে। রিয়াজ তার ল্যাপটপ খুলে আয়েশাকে তার চট্টগ্রামের জীবনের ছবি দেখাল। সমুদ্র, পাহাড়, তার ছোট অফিস। আয়েশা তার ঢাকার গল্প শোনাল।
রাত নামল। ট্রেনের লাইট কমে গেল। আয়েশা ঘুমিয়ে পড়েছিল রিয়াজের কাঁধে মাথা রেখে। রিয়াজ চুপ করে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। তার হৃদয় বলছিল, এই মেয়েটাই তার জীবনের অর্ধেক।
চট্টগ্রাম স্টেশনে নামার পর রিয়াজ আয়েশাকে তার গাড়িতে তুলল। “প্রথমে হোটেলে যাবি, না আমার বাসায়?”
আয়েশা বলল, “তোর বাসায়। মা বলেছে তোর মায়ের কাছে থাকব।”
রিয়াজের বাসা পাহাড়ের কাছে। সমুদ্রের হাওয়া আসছে। আয়েশা ঘরে ঢুকতেই রিয়াজের মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। “কতদিন পর দেখলাম তোকে, মা।”
সন্ধ্যায় তারা দুজন সমুদ্রের ধারে হাঁটতে গেল। বালির ওপর পা ফেলতে ফেলতে রিয়াজ হঠাৎ থেমে গেল।
“আয়েশা, আমি তোকে অনেকদিন ধরে ভালোবাসি। কিন্তু বলতে পারিনি। এখন বলছি। তুই কি আমার সাথে থাকবি?”
আয়েশা চোখে জল নিয়ে বলল, “আমিও তোকে ভালোবাসি, রিয়াজ। কিন্তু আমাদের পরিবার, দূরত্ব…”
রিয়াজ তার হাত ধরে বলল, “দূরত্ব কোনো বাধা নয়। আমি ঢাকায় চাকরি খুঁজব। অথবা তুই এখানে চলে আয়। আমরা একসাথে লড়ব।”
সেই রাতে তারা সমুদ্রের ধারে বসে অনেক স্বপ্ন দেখল। পরদিন আয়েশা তার অফিসের কাজ শেষ করে রিয়াজের সাথে ঘুরল। পাহাড়ে উঠল, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত দেখল। রিয়াজ তার জন্য ছোট ছোট উপহার নিয়ে এল — একটা চুড়ি, একটা ফুলের তোড়া, আর একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা ছিল:
“আয়েশা, তোমার চোখে আমি আমার পুরো পৃথিবী দেখি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অনেক দূর, কিন্তু তোমার হৃদয় আমার কাছে সবচেয়ে কাছে। চিরকাল তোমার সাথে থাকতে চাই। — তোমার রিয়াজ”
তিন দিন কেটে গেল খুব দ্রুত। আয়েশাকে ফিরতে হবে ঢাকায়। স্টেশনে দাঁড়িয়ে দুজনের চোখে জল।
রিয়াজ বলল, “আমি এক মাসের মধ্যে ঢাকায় চলে আসব। চাকরি ঠিক করে ফেলেছি।”
আয়েশা তার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদল। “আমি অপেক্ষা করব।”
ট্রেন ছাড়ল। আয়েশা জানালা দিয়ে হাত নাড়ল। রিয়াজ দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ ট্রেন চোখের আড়াল না হয়।
ঢাকায় ফিরে আয়েশা তার মাকে সব বলল। মা প্রথমে চুপ করে শুনলেন, তারপর হেসে বললেন, “রিয়াজ ছেলেটা ভালো। আমরা কথা বলব।”
এক মাস পর রিয়াজ ঢাকায় চলে এল। দুই পরিবারে কথা হল। বিয়ের তারিখ ঠিক হল ছয় মাস পর।
বিয়ের দিন আয়েশা লাল বেনারসি পরে বসেছিল। রিয়াজ তার সামনে এসে বলল, “আজ থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, আর চট্টগ্রাম থেকে সারা জীবন।”
তারা দুজন হাত ধরে নতুন জীবনে পা রাখল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তাদের ভালোবাসা কখনো থামবে না।
আয়েশা তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঢাকার আকাশে লাল-নীল আলো। তার মনে পড়ছিল ছোটবেলার সেই দিনগুলো। রিয়াজ তার পাশে দাঁড়িয়ে বলত, “আয়েশা, বড় হয়ে আমরা একসাথে থাকব।” সে তখন হেসে বলত, “পাগল!” কিন্তু আজ সেই কথাগুলো তার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
তার ফোন বেজে উঠল। রিয়াজের মেসেজ: “কাল ট্রেনে দেখা হবে। অপেক্ষায় আছি। ❤️”
আয়েশা হাসল। তার চোখ ভিজে গেল।
ট্রেনে উঠে আয়েশা সিটে বসল। বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ তার পাশে রিয়াজ বসল। দুজনের চোখে অবাক দৃষ্টি। তারপর হাসি।
“কেমন আছিস?” রিয়াজ জিজ্ঞাসা করল।
“ভালো। তুই?”
কথা শুরু হল। তারা তাদের জীবনের সব কথা বলল। রিয়াজ বলল তার চাকরির কথা, কীভাবে সে প্রতি রাতে আয়েশার পুরোনো ছবি দেখে। আয়েশা বলল সে কীভাবে প্রতি ঈদে রিয়াজের কথা ভাবে।
ট্রেন যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পার হচ্ছিল, রিয়াজ আয়েশার হাতটা চুপিচুপি ধরল। আয়েশা সরিয়ে নিল না। বরং আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরল।
রাতে খাবার খেতে খেতে তারা হাসতে হাসতে পুরোনো স্মৃতি মনে করল। “মনে আছে যখন তুই আমার খাতা চুরি করেছিলি?” আয়েশা বলল।
রিয়াজ হেসে বলল, “আর তুই আমাকে পিটিয়েছিলি
চট্টগ্রামে পৌঁছে তারা সমুদ্রের ধারে গেল। ঢেউ আছড়ে পড়ছে। রিয়াজ আয়েশাকে বলল, “এই সমুদ্রের মতো আমার ভালোবাসা। কখনো শেষ হয় না।”
তারা হাত ধরে হাঁটল। আয়েশা তার মাথা রিয়াজের কাঁধে রাখল। বাতাসে তাদের চুল উড়ছিল। রিয়াজ আয়েশার কপালে চুমু খেল।
“আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারব না।” রিয়াজ ফিসফিস করে বলল।
আয়েশা চোখ বন্ধ করে বলল, “আমিও না।”
আয়েশা ঢাকায় ফিরে এল। দিনগুলো কষ্টে কাটছিল। প্রতি রাতে ফোনে কথা হত। রিয়াজ বলত, “আমি আসছি।” কিন্তু চাকরির জন্য সময় লাগছিল।
একদিন আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। রিয়াজ রাতের ট্রেন ধরে ঢাকায় চলে এল। হাসপাতালে গিয়ে আয়েশার হাত ধরে বসে রইল সারারাত।
“তুই এলি কেন?” আয়েশা দুর্বল গলায় বলল।
“তোকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না।
ছয় মাস পর বিয়ে হল। দুই পরিবার খুশি। বিয়ের পর তারা চট্টগ্রামে নতুন ঘর সাজাল। প্রতি সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে হাঁটে। আয়েশা রিয়াজের বুকে মাথা রেখে বলে, “এই তো আমাদের জীবন।”
রিয়াজ বলে, “হ্যাঁ, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, আর চট্টগ্রাম থেকে চিরকাল।”
তাদের ভালোবাসা হয়ে উঠল অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা।
....