তোমাতে মিশে যাই

রাত এগারোটা বেজে গেছে। ঢাকার মিরপুরের ছোট ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। আয়েশা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার পরনে একটা হালকা সালোয়ার কামিজ, চুল ভিজে গেছে বৃষ্টির ছাঁটে। পেছন থেকে রাহাত এসে দুই হাত দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরল।

kxz

“আবার রাগ করলি?” রাহাতের গলায় সেই চিরকালের নরম সুর।

আয়েশা কোনো উত্তর দিল না। শুধু একটু শক্ত হয়ে গেল তার শরীর। রাহাত তার গলায় নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিল। “তোর গন্ধটা এখনো সেই গ্রামের মাটির মতো। মনে হয় যেন এখনো সেই চন্দনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি।”

kx/춺'

আয়েশা একটু হাসল। কিন্তু রাগটা পুরোপুরি যায়নি। আজ সকালে রাহাত অফিসে যাওয়ার সময় বলেছিল, “আজকে লেট হবে। ডিনার কোরো না।” কিন্তু রাত দশটায় এসে দেখল আয়েশা টেবিল সাজিয়ে বসে আছে। দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে, তার প্রিয় ইলিশ মাছের ঝোল আর ভাত। রাহাত ক্লান্ত ছিল, খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। আয়েশার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

রাহাত তাকে ঘুরিয়ে নিল। আয়েশার চোখে চোখ রেখে বলল, “সরি। আজকে প্রজেক্টের ডেডলাইন ছিল। কিন্তু তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি।”

“কী সারপ্রাইজ?” আয়েশা ভুরু কুঁচকে তাকাল।

রাহাত পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। ভেতরে একটা সরু সোনার চেইন, তাতে ছোট্ট একটা হার্ট লকেট। আয়েশার চোখ চকচক করে উঠল।

“এটা কবে কিনলি?”

“গত মাসে তোর জন্মদিনের জন্য। কিন্তু দিতে পারিনি। আজ দিলাম।”

আয়েশা চুপ করে লকেটটা গলায় পরে নিল। তারপর রাহাতের বুকে মাথা রাখল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে হলো।

তাদের বিয়ে হয়েছে ছয় বছর। গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসেছিল রাহাত চাকরির খোঁজে। আয়েশা তখন কলেজে। প্রথম দেখাতেই দুজনের চোখে চোখ পড়েছিল। রাহাতের মা-বাবা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকার জীবন সহজ ছিল না। ছোট ফ্ল্যাট, দুজনের চাকরি, সংসারের খরচ। অনেক রাত জেগে কথা বলত তারা। আয়েশা বলত, “তোমার সাথে থাকলে সবকিছু সুন্দর লাগে।”

রাহাত তার কপালে চুমু খেল। “চল, আজকে তোকে একটা গল্প শোনাই। আমাদের প্রথম দিনের গল্প।”

দুজনে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বৃষ্টির শব্দ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো। রাহাত শুরু করল:

“সেই ২০১৮ সাল। আমি তখন ঢাকায় নতুন এসেছি। একটা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম মিরপুরে। বাস থেকে নেমে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ছাতা ছিল না। ভিজতে ভিজতে দৌড়াচ্ছি, হঠাৎ দেখি একটা মেয়ে ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুই। তোর পরনে লাল সালোয়ার, চোখে ভয় আর সাহস মিশে আছে। আমাকে দেখে বললি, ‘ভাই, ছাতার নিচে আসেন।’”

আয়েশা হেসে উঠল। “তুই তো তখন ভিজে একসা। আমার কাছে লজ্জা লাগছিল। কিন্তু তোর চোখ দুটো দেখে মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা ভালো।”

রাহাত তার গালে হাত বুলাল। “সেইদিন থেকে তোর চোখ আমার মনে গেঁথে গেছে।”

তারা কথা বলতে বলতে কাছে সরে এল। রাহাতের হাত আয়েশার পিঠে। আয়েশা তার বুকে হাত রাখল। ধীরে ধীরে তাদের শরীর এক হয়ে গেল। বৃষ্টির শব্দের সাথে তাদের নিঃশ্বাস মিশে গেল। রাহাত আয়েশার ঠোঁটে চুমু খেল, প্রথমে নরম, তারপর গভীর। আয়েশা তার চুলে হাত চালাল। অনেকদিন পর তারা এতটা আবেগে একে অপরকে অনুভব করল।

রাত গভীর হলো। তারা ঘুমিয়ে পড়ল জড়াজড়ি করে।

পরদিন সকালে আয়েশা উঠে রান্না করতে গেল। রাহাত পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আজকে অফিসে ছুটি নিয়েছি। তোকে নিয়ে ঘুরতে যাব।”

আয়েশা অবাক। “সত্যি?”

“হ্যাঁ। চল, বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভাড়া করে ঘুরব।”

দুজনে তৈরি হয়ে বের হলো। ঢাকার রাস্তা ভিজে আছে। তারা হাত ধরে হাঁটছে। রাহাত আয়েশার কানে কানে বলছে ছোট ছোট রোমান্টিক কথা। “তোর হাসিটা দেখলে আমার সারাদিনের ক্লান্তি চলে যায়।”

বুড়িগঙ্গায় নৌকায় উঠে তারা পাশাপাশি বসল। নদীর হাওয়া তাদের চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। আয়েশা রাহাতের কাঁধে মাথা রাখল। “মনে আছে, বিয়ের পর প্রথমবার আমরা এখানে এসেছিলাম? তুই তখন বলেছিলি, ‘এই নদী যেমন চলছে, আমাদের ভালোবাসাও তেমনি চলবে। কখনো থামবে না।’”

রাহাত তার হাত চেপে ধরল। “আর থামেওনি। অনেক ঝড় এসেছে, কিন্তু আমরা এখনো একসাথে।”

সন্ধ্যায় ফিরে তারা ফ্ল্যাটে এল। আয়েশা বলল, “আজকে আমি তোকে সারপ্রাইজ দিব।”

সে রান্নাঘরে গিয়ে বিশেষ রান্না করল। রাহাতের প্রিয় সব আইটেম। খাওয়ার পর তারা আবার বিছানায়। আয়েশা এবার উদ্যোগ নিল। তার হাত রাহাতের শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চুমু, আদর, আর গভীর সংযোগ। রাহাত ফিসফিস করে বলল, “তুই আমার সবকিছু।”

দিনগুলো এভাবে কাটতে লাগল। কিন্তু একদিন সমস্যা এল। রাহাতের অফিসে প্রমোশনের জন্য একটা বড় প্রজেক্ট। তাকে সপ্তাহখানেক চট্টগ্রাম যেতে হবে। আয়েশার মন খারাপ। “তুই চলে গেলে আমি একা কী করব?”

রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “প্রতিদিন ভিডিও কল করব। আর ফিরে এসে তোকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাব।”

চট্টগ্রামে গিয়ে রাহাত প্রতিদিন রাতে কল করে। আয়েশা একা ফ্ল্যাটে ঘুরে বেড়ায়। একদিন সে তার ডায়েরি খুলে লিখল:

“রাহাত, তোমার ছাড়া এই ঢাকা শহরটা ফাঁকা লাগে। তোমার হাতের স্পর্শ, তোমার চুমু, তোমার গলার স্বর—সব মিস করি। ফিরে এসো তাড়াতাড়ি।”

রাহাত ফিরে এল এক সপ্তাহ পর। সাথে একটা বড় বক্স। ভেতরে আয়েশার প্রিয় শাড়ি আর একটা ছোট নোট: “তোমার জন্য সবকিছু।”

সেই রাতটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে রোমান্টিক রাত। বৃষ্টি আবার পড়ছে। তারা দুজনে ছাদে উঠল। ভিজতে ভিজতে নাচল, হাসল, চুমু খেল। তারপর নিচে নেমে শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি অনুভব করল। আয়েশা রাহাতের কানে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেক অনেক।”

রাহাত বলল, “আমিও। তুই ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।”

....
👁 439