প্রেমের অমৃত যাত্রা

 একটা ছোট কফি শপে প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের। নাম তার রাহাত। বয়স আটাশ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু মনটা সবসময় কবিতার খাতায় ঘুরে বেড়ায়। আর মেয়েটির নাম আয়েশা। চারবছরের ছোট। একটা প্রাইভেট কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়ায়। চোখ দুটো তার যেন কোনো পুরনো কবিতার লাইন—গভীর, রহস্যময় আর একটু দুঃখী।

kxz

রাহাত সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে ঢুকেছিল শপে। কফির অর্ডার দিতে গিয়ে তার হাতের বইটা পড়ে গেল মেঝেতে। আয়েশা পাশের টেবিলে বসে ছিল। সে ঝুঁকে বইটা তুলে দিল। “রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’। আপনার পছন্দের?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল সে।

সেই থেকে শুরু। কথা থেকে কথা, কফি থেকে কফি। তারপর একদিন রাহাত বলল, “আয়েশা, আমরা একসাথে কোথাও যাই? শুধু আমরা দুজন। প্রেমের অমৃত যাত্রায়।”

kx/춺'

আয়েশা হেসে বলল, “কোথায় যাবে? সাগর না পাহাড়?”

“সাগর। কক্সবাজার। কিন্তু শুধু সাগর নয়। আমাদের ভেতরের সাগরটাও দেখব।”

তারা ঠিক করল দুই সপ্তাহের ছুটি। রাহাতের গাড়ি নিয়ে রওনা হবে ঢাকা থেকে। রাস্তায় থামবে যেখানে মন চায়। কোনো হোটেল বুকিং নয়, শুধু স্বাধীনতা।

প্রথম দিন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথ। গাড়ির ভেতর গান বাজছে—প্রতীক হাসানের সেই পুরনো গান “তোমাকে চাই”। আয়েশা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চুল উড়ছে হাওয়ায়। রাহাত একবার তাকাল, “তুমি জানো, তোমার চোখ দেখলে মনে হয় কোনো অমৃত ঝরছে।”

আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। “বাজে কথা! তুমি সবসময় এমন কবিতা বলো কেন?”

“কারণ তুমি নিজেই একটা কবিতা।”

তারা থামল কুমিল্লায়। একটা ছোট রেস্টুরেন্টে মুরগির রোস্ট খেল। আয়েশা বলল তার ছোটবেলার গল্প। গ্রামের বাড়ি, বাবা-মা’র কড়া শাসন, পড়াশোনার চাপ। রাহাত শুনতে শুনতে তার হাতটা ধরল। “আজ থেকে তোমার সব বোঝা আমি বইব।”

রাত নামার আগে তারা ফেনী নদীর পাড়ে পৌঁছাল। গাড়ি থামিয়ে বসল ঘাসের ওপর। আকাশে তারার মেলা। রাহাত আয়েশাকে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল প্রথমবার। চুমুটা ছিল ধীর, গভীর। যেন সময় থেমে গেছে। আয়েশার শরীর কেঁপে উঠল। “রাহাত… এটা ঠিক হচ্ছে তো?”

“প্রেম কখনো ভুল হয় না, আয়েশা। এটা আমাদের অমৃত।”

পরের দিন চট্টগ্রাম। তারা হিল ট্রেইলে ঘুরল। আয়েশা ক্লান্ত হয়ে পড়লে রাহাত তাকে কোলে তুলে নিল। হাসতে হাসতে তারা গড়িয়ে পড়ল ঘাসে। সেখানে আবার চুমু। এবার আরও তীব্র। আয়েশার হাত রাহাতের বুকে। তার হৃদয়ের স্পন্দন অনুভব করছে। “তোমার এই হৃদয়টা আমার,” ফিসফিস করে বলল সে।

কক্সবাজার পৌঁছাতে আরও একদিন লাগল। পথে তারা একটা ছোট গ্রামে থামল। সেখানে এক বুড়ি তাদের দুজনকে দেখে হাসল, “বাবা, তোমাদের চোখে প্রেমের আলো দেখছি। সাবধানে রাখো এই আলো।”

সাগরের কিনারায় তাদের ছোট কটেজ। রাতে ঢেউয়ের শব্দ। আয়েশা সাদা শাড়ি পরে এসেছে। চাঁদের আলোয় তার রূপ যেন অমৃতের মতো। রাহাত তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। “আয়েশা, আমি তোমাকে চাই। সারাজীবন। বিয়ে করবে আমাকে?”

আয়েশার চোখে জল। “হ্যাঁ… হাজারবার হ্যাঁ।”

সেই রাতটা ছিল তাদের প্রথম পূর্ণ মিলনের রাত। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের শরীর এক হয়ে গেল। রাহাত আয়েশার প্রতিটি ইঞ্চি ছুঁয়ে দিল যেন পূজা করছে। আয়েশা তার নাম ধরে কেঁদে উঠল আনন্দে। “আমি তোমার… শুধু তোমার।”

সকালে তারা সাগরে হাঁটল। হাতে হাত রেখে। আয়েশা বলল, “এই যাত্রাটা যেন কখনো শেষ না হয়।”

কিন্তু প্রেমের যাত্রায় বাধা আসবেই। ঢাকায় ফেরার পর আয়েশার বাবা জানতে পারলেন। তিনি রাগ করে বললেন, “ওই ছেলে তোমার জন্য ঠিক না। আমরা অন্য ছেলে দেখেছি।”

রাহাতের পরিবারও একই কথা। “তুমি তো জানো, আমাদের সমাজে এসব চলে না।”

দুজনের মাঝে ঝড় উঠল। আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে ফোন করল, “রাহাত, আমি পারব না বাবা-মাকে ছেড়ে।”

রাহাত বলল, “তাহলে আমরা একসাথে লড়ব। প্রেমের অমৃত কখনো শুকায় না।”

তারা গোপনে দেখা করতে লাগল। একদিন রাতে আয়েশা বাসা থেকে বেরিয়ে এল। তারা গাড়ি নিয়ে আবার রওনা দিল। এবার সিলেটের দিকে। পাহাড়ের মাঝে একটা ছোট রিসোর্টে থাকল তিনদিন। সেখানে তারা নতুন করে প্রেমের শপথ নিল। রাহাত আয়েশাকে নিয়ে জলপ্রপাতের কাছে গেল। ঠান্ডা পানিতে দুজনে ভিজল। ভিজে শাড়িতে আয়েশার শরীরের রেখা ফুটে উঠেছে। রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি আমার অমৃত।”

তাদের শরীর আবার মিলিত হল জলপ্রপাতের শব্দে। এবার আরও গভীর, আরও আত্মসমর্পণে। আয়েশা রাহাতের কানে ফিসফিস করল, “আমি তোমার সন্তানের মা হতে চাই।”

কিন্তু সমস্যা বাড়তে লাগল। আয়েশার বাবা পুলিশে খবর দিলেন। তারা পালিয়ে বেড়াতে লাগল। একদিন চট্টগ্রামের একটা ছোট হোটেলে ধরা পড়ল। আয়েশাকে জোর করে বাসায় নিয়ে যাওয়া হল। রাহাত একা বসে রইল সমুদ্রের পাড়ে। তার চোখে জল।

কিন্তু প্রেম হার মানে না। আয়েশা বাসায় বসে চিঠি লিখল। “রাহাত, আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না। আমরা আবার পালাব।”

এক রাতে আয়েশা জানালা দিয়ে নেমে এল। রাহাত অপেক্ষা করছিল নিচে। তারা সোজা চলে গেল সিলেটের চা বাগানে। সেখানে একটা ছোট কটেজ ভাড়া নিল। চারপাশে সবুজ পাহাড়। সকালে চা খেতে খেতে তারা পরিকল্পনা করল। রাহাত বলল, “আমরা বিয়ে করব। কোর্ট ম্যারেজ।”

আয়েশা রাজি হল। কিন্তু আগের দিন রাতে তারা আবার এক হয়ে গেল। এবার যেন বিদায়ের আগের মিলন। আয়েশার শরীর রাহাতের শরীরে লেপটে আছে। ঘামে ভেজা চুল, লাল ঠোঁট। “আমাকে আরও জোরে আলিঙ্গন করো,” বলল সে। রাহাত তার সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে দিল।

পরদিন তারা কোর্টে গেল। কাগজপত্র সব রেডি। কিন্তু আয়েশার বাবা এসে হাজির। রাগে চিৎকার করছেন। “এই বিয়ে হবে না!”

রাহাত শান্ত গলায় বলল, “স্যার, আমি আয়েশাকে সারাজীবন সুখে রাখব। আপনি আমাদের আশীর্বাদ করুন।”

আয়েশা কাঁদতে কাঁদতে বাবার পায়ে পড়ল। “বাবা, আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না।”

দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বাবা বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু যদি কোনোদিন কষ্ট দাও…”

রাহাত বলল, “কখনো না।”

বিয়ে হল। সবাই মিলে ছোট অনুষ্ঠান। তারপর তারা আবার যাত্রা শুরু করল। এবার হানিমুন। সুন্দরবনের দিকে। নৌকায় করে ঘুরল জঙ্গলে। রাতে নৌকার ছাদে শুয়ে তারা তারা দেখল। আয়েশা রাহাতের বুকে মাথা রেখে বলল, “এই যাত্রা আমাদের অমৃতের যাত্রা। কখনো শেষ হবে না।”

মাসখানেক পর আয়েশা জানাল, সে মা হতে চলেছে। রাহাত আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরল। “আমাদের ভালোবাসার ফসল।”

তারপর বছর গড়াল। তারা ঢাকায় একটা ছোট ফ্ল্যাটে সংসার শুরু করল। রাহাতের চাকরি, আয়েশার পড়ানো। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে তারা একটা ছোট যাত্রায় বের হয়। কখনো সোনারগাঁও, কখনো রাজশাহী। প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

একদিন তাদের মেয়ে বড় হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আব্বু, তোমাদের প্রেমের গল্প বলো।”

রাহাত হেসে বলল, “এটা প্রেমের অমৃত যাত্রা। যা কখনো শেষ হয় না।”

আয়েশা তার স্বামীর হাত ধরে বলল, “আর এই যাত্রায় আমরা একসাথে আছি চিরকাল।”

....
👁 190