আকাশের নীল চিঠি

ঢাকার ভিড়ে ভরা রাস্তায়, মিরপুরের একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকত রিয়ান। বয়স ২৮। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সকালে অফিস, রাতে ল্যাপটপের আলোয় চোখ জ্বলে। কিন্তু তার হৃদয়টা ছিল অন্যরকম। সে ভালোবাসত বৃষ্টি, পুরনো গান আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। তার বন্ধুরা বলত, “রিয়ান, তোর তো প্রেমিকা নেই, আকাশের সাথে প্রেম করিস নাকি?”

kxz

রিয়ান হাসত। “হয়তো।”

একদিন অফিসের প্রজেক্টের জন্য তাকে চট্টগ্রাম যেতে হলো। ট্রেনের টিকিট কেটে সে স্টেশনে এসে দাঁড়াল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম — এই যাত্রাটা তার কাছে সবসময়ই রোমাঞ্চকর। ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে, প্ল্যাটফর্মে একটা মেয়েকে দেখল সে। লম্বা চুল, সাদা সালোয়ার কামিজ, হাতে একটা বই। মেয়েটার চোখে একটা নরম আলো, যেন আকাশের নীল রং মিশে গেছে।

kx/춺'

ট্রেনে উঠে রিয়ান তার সিটে বসল। পাশের সিট খালি। কিছুক্ষণ পর সেই মেয়েটাই এসে বসল। “এক্সকিউজ মি, এটা কি ২৩ নম্বর সিট?” মেয়েটার গলা মিষ্টি, যেন বৃষ্টির ফোঁটা।

রিয়ান মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”

মেয়েটা বসল। নাম তার আফিয়া। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। বয়স ২৫। সে যাচ্ছে বাড়িতে। কথা শুরু হলো ধীরে ধীরে। প্রথমে আবহাওয়া, তারপর বই, তারপর স্বপ্ন। আফিয়া বলল, “আমি আকাশ দেখে গল্প লিখি। আর আপনি?”

রিয়ান হাসল, “আমি কোড লিখি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমিও আকাশ দেখি।”

ট্রেন চলতে থাকল। জানালা দিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। দুজনের কথা থামছিল না। আফিয়া তার বই থেকে একটা কবিতা পড়ে শোনাল। রিয়ান তার ফোন থেকে একটা পুরনো গান বাজাল — “আকাশের নীলিমায়”। রাত বাড়তে থাকল। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে আফিয়ার মাথা একবার রিয়ানের কাঁধে ঢলে পড়ল। রিয়ান নড়ল না। শুধু মনে মনে বলল, “এই মুহূর্তটা যেন চিরকাল থাকে।”

চট্টগ্রাম পৌঁছে তারা নামল। আফিয়া বলল, “আবার দেখা হবে তো?” রিয়ান তার নাম্বার নিল।

পরের দিন থেকে তাদের মেসেজ শুরু হলো। প্রতিদিন সকালে আফিয়া পাঠাত “শুভ সকাল, আকাশ কেমন আছে?” রিয়ান উত্তর দিত, “আপনার হাসির মতো নীল।”

রিয়ানের প্রজেক্ট শেষ হতে দু’মাস লাগল। এই দু’মাসে তারা প্রায় প্রতিদিন কথা বলত। আফিয়া তাকে চট্টগ্রামের সমুদ্রের গল্প শোনাত। রিয়ান তাকে ঢাকার ছাদের রাতের গল্প। একদিন আফিয়া বলল, “আমি তোমাকে দেখতে চাই।”

রিয়ান ফিরে এলো ঢাকায়। কিন্তু তার মন পড়ে রইল চট্টগ্রামে। দু’জনের মধ্যে দূরত্ব ছিল, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমছিল। তারা ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। আফিয়া তার লেখা গল্প পড়ে শোনাত। রিয়ান তাকে তার কোডের জটিলতা বোঝাত। হাসি, ঠাট্টা, চুপ করে থাকা — সবকিছুতেই প্রেম জন্ম নিচ্ছিল।

একদিন আফিয়া বলল, “রিয়ান, আমার বাড়িতে আসবে? আমার মা-বাবা তোমাকে দেখতে চায়।”

রিয়ানের বুক কাঁপল। সে রাজি হলো। পরের উইকেন্ডে সে চট্টগ্রাম গেল। আফিয়ার বাড়ি সমুদ্রের কাছে। সন্ধ্যায় তারা দুজনে সমুদ্রের ধারে হাঁটছিল। ঢেউয়ের শব্দ, হাওয়ায় উড়ছে আফিয়ার চুল। রিয়ান তার হাত ধরল।

“আফিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেকদিন ধরে।”

আফিয়ার চোখে জল। “আমিও। প্রথম দিন ট্রেনে তোমার কাঁধে মাথা রাখার পর থেকেই।”

তারা চুমু খেল। সমুদ্র সাক্ষী রইল। নোনা হাওয়ায় মিশে গেল তাদের প্রেম।

কিন্তু সব গল্পে বাধা আসে। আফিয়ার বাবা চাইতেন মেয়ের বিয়ে হয় চট্টগ্রামেই। রিয়ানের পরিবার ঢাকায়। দূরত্ব, চাকরি, পরিবার — সবকিছু তাদের বিরুদ্ধে। একদিন আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “রিয়ান, হয়তো আমাদের...”

রিয়ান তাকে থামিয়ে দিল। “না। আমি ছেড়ে দেব না। আমি চাকরি ছাড়ব না, কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না।”

রিয়ান একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে চট্টগ্রামে ট্রান্সফারের আবেদন করল। অফিসে অনেক ঝামেলা হলো, কিন্তু সে লড়ল। আফিয়া তার বাবাকে বোঝাল। দু’মাসের লড়াইয়ের পর রিয়ান চট্টগ্রামে চলে এলো।

নতুন জীবন শুরু হলো। তারা দুজনে একসাথে সমুদ্র দেখত, বৃষ্টিতে ভিজত, রাতে ছাদে বসে গল্প করত। আফিয়া তার প্রথম বই প্রকাশ করল — নাম “আকাশের নীল চিঠি”। বইয়ের উৎসর্গে লেখা ছিল — “রিয়ানের জন্য, যে আমার আকাশ।”

এক বছর পর। সমুদ্রের ধারে ছোট একটা বাড়িতে তারা বিয়ে করল। সাদামাটা অনুষ্ঠান। কিন্তু তাদের চোখে ছিল অসীম আনন্দ। রাতে, বারান্দায় বসে রিয়ান আফিয়াকে জড়িয়ে ধরল।

“তোমাকে ছাড়া আমার আকাশ অন্ধকার ছিল।”

আফিয়া তার কানে ফিসফিস করে বলল, “আর আমার আকাশ এখন তোমায় ভরে গেছে।”

তারা চুমু খেল। চাঁদের আলোয়, সমুদ্রের গর্জনে, তাদের প্রেম চিরকালের হয়ে গেল।

....
👁 245