বৃষ্টি যেন কখনো থামে না। ঢাকার বুকে, পুরানো ঢাকার সরু গলিতে, যেখানে পুরনো বাড়িগুলোর ছাদ থেকে জল পড়ে অবিরাম, সেখানে একটা ছোট্ট কফি শপ ছিল। নাম “বৃষ্টি ক্যাফে”। শুধু বৃষ্টির দিনে খোলে। আর বৃষ্টি তো ঢাকায় কখনোই পুরোপুরি থামে না।
সেই ক্যাফের জানালার পাশে বসে ছিল আরিয়ান। তার চোখ দুটো বাইরের বৃষ্টির দিকে। কালো চুল ভিজে আছে, শার্টের কলারও। হাতে এক কাপ গরম কফি, কিন্তু সে চুমুক দিচ্ছে না। তার চোখ যেন বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর মধ্যে কোনো একটা পুরনো স্মৃতি খুঁজছে।
“আরেক কাপ দিব?” নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল মেয়েটা।
আরিয়ান মুখ তুলে তাকাল। তার নাম ছিল নীলা। ক্যাফের মালিকানা তার বাবার ছিল, কিন্তু এখন সে-ই চালায়। লম্বা চুল, গাঢ় বাদামি চোখ, আর একটা হাসি যা বৃষ্টির মতোই শান্ত কিন্তু অবিরাম।
“হ্যাঁ… আরেকটা। কিন্তু এবার চিনি ছাড়া,” বলল আরিয়ান।
নীলা হাসল। “তুমি প্রতি বৃষ্টির দিনে আসো। কিন্তু কখনো বলো না কেন।”
আরিয়ান চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কারণ বৃষ্টি আমাকে তোমার কাছে নিয়ে আসে।”
সেই প্রথম দিনের কথা।
তিন বছর আগের কথা। আরিয়ান তখন সবে চাকরি ছেড়ে লেখালেখি করার চেষ্টা করছে। তার প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল “বৃষ্টির ভেতর প্রেম”। কিন্তু লিখতে পারছিল না। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে এই ক্যাফেতে ঢুকেছিল। নীলা তখন নতুন। তার হাত থেকে কফির কাপ পড়ে গিয়েছিল আরিয়ানের জামায়।
“সরি! সরি!” বলে সে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল।
আরিয়ান হেসে বলেছিল, “বৃষ্টি তো বাইরে, এখন ভেতরেও শুরু হলো?”
সেই থেকে শুরু। প্রতি বৃষ্টির দিনে আরিয়ান আসত। নীলা তার জন্য বিশেষ কফি বানাতো – “বৃষ্টি স্পেশাল”, যাতে দারচিনি আর আদা থাকত। তারা কথা বলত। প্রথমে আবহাওয়া নিয়ে, তারপর স্বপ্ন নিয়ে, তারপর অতীত নিয়ে।
নীলার বাবা মারা গিয়েছিলেন বৃষ্টির রাতে। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট। সেই থেকে সে বৃষ্টিকে ভয় পায় কিন্তু ভালোওবাসে। আরিয়ানের মা চলে গিয়েছিলেন যখন সে ছোট। বৃষ্টির দিনে মা তাকে গল্প শোনাতেন। তাই বৃষ্টি তার কাছে মায়ের স্মৃতি।
দুজনের মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়েছিল। বৃষ্টি যত জোরে হতো, তাদের কথা তত গভীর হতো।
একদিন নীলা জিজ্ঞাসা করেছিল, “তোমার উপন্যাসটা কেমন চলছে?”
আরিয়ান লজ্জা পেয়ে বলেছিল, “এখনো শুরুই করতে পারিনি। হিরোইনের চরিত্রটা তোমার মতো… কিন্তু আমি লিখতে পারছি না।”
নীলা তার হাতটা ছুঁয়ে বলেছিল, “তাহলে আমাকে বলো। আমি তোমাকে বলব কীভাবে লিখতে হয়।”
সেই রাতে বৃষ্টি আরো জোরে হয়েছিল। ক্যাফে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা দুজন শুধু বসে ছিল। নীলা তার জীবনের গল্প বলেছিল। কীভাবে বাবার মৃত্যুর পর একা হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে এই ক্যাফেটা তার একমাত্র সঙ্গী। আরিয়ান বলেছিল তার লেখক হওয়ার স্বপ্নের কথা, যা কেউ বিশ্বাস করে না।
সেই রাতে প্রথমবার তারা চুমু খেয়েছিল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে, কফির গন্ধের মাঝে, দুটো আত্মা মিলে গিয়েছিল।
তারপর থেকে তাদের প্রেম চিরকালের বৃষ্টির মতোই অবিরাম হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু জীবন তো শুধু বৃষ্টি নয়।
আরিয়ানের বাবা চাইতেন ছেলে বিদেশে পড়তে যাক। একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি করুক। নীলার দূর সম্পর্কের চাচা চাইতেন মেয়েটা বিয়ে করে সংসার করুক। “কফি শপ চালিয়ে কী হবে?” বলতেন তিনি।
দুজনের মাঝে ঝগড়া হতো। আরিয়ান বলত, “আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।” নীলা বলত, “তোমার স্বপ্ন নষ্ট করব না।”
এক বর্ষায়, যখন ঢাকা পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিল, আরিয়ান এসেছিল ভিজে। তার হাতে একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট।
“পড়ো,” বলেছিল সে।
নীলা পড়েছিল। উপন্যাসের নাম “চিরকালের বৃষ্টি”। গল্পটা তাদেরই। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে, যাদের প্রেম বৃষ্টির মতো। যা কখনো থামে না, শুধু রূপ বদলায়।
নীলার চোখে জল এসে গিয়েছিল। “এটা… আমাদের গল্প।”
“হ্যাঁ। আর এটা শেষ হয়নি। কারণ আমাদের গল্প শেষ হবে না।”
সেই রাতে তারা প্রথমবার শারীরিকভাবে কাছাকাছি হয়েছিল। ক্যাফের পেছনের ছোট্ট ঘরে। বাইরে বৃষ্টি যেন তাদের আশীর্বাদ করছিল। নীলার শরীরটা আরিয়ানের বুকে মিশে গিয়েছিল। তাদের চুমুতে ছিল বৃষ্টির স্বাদ। আরিয়ান তার কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুমি আমার চিরকাল।”
কিন্তু সমস্যা আসছিল।
আরিয়ানের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার বলেছিলেন বিদেশে চিকিৎসা লাগবে। আরিয়ানকে যেতে হবে কানাডায়। নীলা বলেছিল, “যাও। আমি অপেক্ষা করব।”
কিন্তু অপেক্ষা কঠিন।
দুই বছর কেটে গিয়েছিল। আরিয়ান কানাডায়। নীলা ঢাকায়। প্রতি বৃষ্টির দিনে তারা ভিডিও কলে কথা বলত। নীলা ক্যাফে চালাতো, আরিয়ান লেখালেখি করত। তার বই প্রকাশিত হয়েছিল। “চিরকালের বৃষ্টি” বেস্ট সেলার হয়েছিল বাংলাদেশে।
কিন্তু দূরত্ব তাদের ক্ষতবিক্ষত করছিল।
একদিন নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “আমি আর পারছি না আরিয়ান। বৃষ্টি যেন আমাকে গিলে খাচ্ছে।”
আরিয়ান বলেছিল, “আমি আসছি।”
কিন্তু আসতে পারছিল না। বাবার অবস্থা খারাপ।
তারপর এলো সেই দিন।
ঢাকায় প্রচণ্ড বন্যা। নীলার ক্যাফে পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সে একা চেষ্টা করছিল জিনিসপত্র বাঁচাতে। ফোন বন্ধ। আরিয়ান পাগলের মতো ফোন করছিল। কোনো উত্তর নেই।
সে প্রথম ফ্লাইটে চলে এসেছিল।
ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সোজা পুরানো ঢাকায়। রাস্তায় পানি কোমর পর্যন্ত। সে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল। ভিজে, ক্লান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
ক্যাফের সামনে এসে দেখল দরজা ভেঙে গেছে। ভেতরে কেউ নেই। তার হৃদয় থেমে গিয়েছিল।
“নীলা!” চিৎকার করে ডেকেছিল।
কোনো উত্তর নেই।
সে ভেতরে ঢুকেছিল। টেবিলগুলো উলটে আছে। তারপর পেছনের ঘরে গিয়ে দেখল – নীলা মেঝেতে বসে আছে, ভিজে, কাঁপছে। তার কোলে সেই ম্যানুস্ক্রিপ্টের কপি, যেটা আরিয়ান তাকে দিয়েছিল।
“নীলা…” আরিয়ানের গলা কেঁপে গিয়েছিল।
নীলা মুখ তুলে তাকিয়েছিল। চোখ দুটো লাল। “তুমি এসেছো…”
সে ছুটে গিয়ে নীলাকে জড়িয়ে ধরেছিল। দুজনের শরীর এক হয়ে গিয়েছিল। বাইরে বৃষ্টি যেন তাদের জন্যই নেমেছিল।
“আমি আর যাব না,” বলেছিল আরিয়ান। “আমার চিরকাল এখানে, তোমার কাছে।”
নীলা কাঁদতে কাঁদতে হেসেছিল। “তাহলে এবার গল্পটা শেষ করো।”
সেই রাতে তারা আবার মিলিত হয়েছিল। এবার আরো গভীরভাবে। আরিয়ান নীলার প্রতিটা অংশ চুমু খেয়েছিল। নীলা তার বুকে মাথা রেখে কাঁপছিল। তাদের শ্বাস মিশে গিয়েছিল বৃষ্টির শব্দের সাথে।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি,” বলেছিল নীলা।
“চিরকাল,” জবাব দিয়েছিল আরিয়ান।
তারপর থেকে তাদের জীবন বদলে গিয়েছিল।
আরিয়ান ঢাকায় ফিরে এসেছিল। তার বাবাও সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। নীলার ক্যাফে তারা দুজনে মিলে নতুন করে সাজিয়েছিল। “চিরকালের বৃষ্টি ক্যাফে” নাম দিয়েছিল।
প্রতি বৃষ্টির দিনে ক্যাফে ভরে যেত প্রেমিক-প্রেমিকায়। আরিয়ান তার নতুন বই লিখত। নীলা কফি বানাতো।
তাদের বিয়ে হয়েছিল এক বৃষ্টির দিনে। ছাদের ওপর, যেখানে বৃষ্টি সাক্ষী। নীলা সাদা শাড়িতে, আরিয়ান কালো পাঞ্জাবিতে। যখন কাজী সাহেব বলেছিলেন “স্বামী-স্ত্রী”, তখন বৃষ্টি যেন আরো জোরে নেমেছিল – আনন্দে।
বছরখানেক পর তাদের একটা মেয়ে হয়েছিল। নাম রেখেছিল “বৃষ্টি”।
আরিয়ান প্রতি সন্ধ্যায় মেয়েকে কোলে নিয়ে বলত, “তোমার মা আর আমার গল্পটা শোনো…”
নীলা পাশে বসে হাসত। তার চোখে সেই একই আলো।
জীবনের সব ঝড়, সব দূরত্ব, সব অপেক্ষা তারা পেরিয়ে এসেছিল। কারণ তাদের প্রেম ছিল চিরকালের বৃষ্টির মতো – কখনো থামে না, শুধু রূপ বদলায়। কখনো ঝড়, কখনো মৃদু, কখনো ঝিরিঝিরি। কিন্তু সবসময় উপস্থিত।
আর এখন, যখন তারা বৃদ্ধ হয়ে গেছে, তখনো প্রতি বৃষ্টির দিনে তারা ক্যাফের জানালার পাশে বসে। হাতে হাত রেখে। আরিয়ান বলে, “মনে আছে প্রথম দিনের কথা?”
নীলা হেসে বলে, “কীভাবে ভুলব? বৃষ্টি তো আমাদেরই।”
তাদের চারপাশে এখনো বৃষ্টি পড়ে। চিরকালের মতো।
....