ফুলের মতো প্রেমের গল্প

চারদিকে সবুজের সমারোহ । গ্রামের নামেই যেন ফুলের গন্ধ লেগে আছে। বর্ষাকাল শেষ হয়ে শরতের হাওয়া বইছে। মাঠের ধারে ধারে জবা, গোলাপ, কামিনী আর বেলি ফুলের বাগান। আর সেই বাগানের মাঝখানে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে থাকতো মেহের

kxz

মেহেরের বয়স চব্বিশ। সে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতো। তার চোখ দুটো যেন দুটো কালো জবা ফুল—গভীর, নরম। তার হাসিতে ফুটে উঠতো সকালের শিশির। গ্রামের মেয়েরা বলতো, “মেহের যেন ফুলের রানী।” কিন্তু মেহেরের মনে ছিল একটা অসম্পূর্ণতা। তার বাবা-মা অনেক আগেই চলে গিয়েছিলেন। সে একা। শুধু তার বাগান আর ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল তার সঙ্গী।

একদিন সকালে মেহের তার বাগানে জল দিচ্ছিল। লাল গোলাপের ডালে হাত বুলিয়ে বলছিল, “তোরা ফুটে ওঠ, যেন আমার প্রেমও একদিন এমন করে ফুটে ওঠে।” ঠিক তখনই রাস্তা দিয়ে একটা মোটরসাইকেল এসে থামল।

kx/춺'

মোটরসাইকেল থেকে নামল আরিফ। ঢাকা থেকে এসেছে। তার বয়স সাতাশ। সে একজন লেখক। তার নতুন উপন্যাসের জন্য গ্রামের শান্ত পরিবেশ খুঁজতে এসেছে। তার চুল উড়ছে হাওয়ায়, চোখে একটা স্বপ্নিল দৃষ্টি। সে মেহেরের বাড়ির সামনে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে।

“আপু, এই বাড়িটা কি ভাড়া দেওয়া যাবে?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।

মেহের মুখ তুলে তাকাল। প্রথম দেখাতেই তার বুকের ভিতর কেমন যেন একটা ফুল ফুটে উঠল। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ, ভাড়া আছে। কিন্তু আমি একা থাকি।”

আরিফ হাসল। “চিন্তা করবেন না। আমি শান্ত মানুষ। শুধু লিখতে চাই।”

সেই দিন থেকে আরিফের থাকা শুরু হল। সকালে উঠে আরিফ দেখতো মেহের বাগানে ফুলের যত্ন নিচ্ছে। তার হাতের নরম স্পর্শে ফুলগুলো যেন আরও সুন্দর হয়ে ফুটছে। আরিফ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো। তার নোটবুকে লিখে রাখতো— “একটা মেয়ে, যার চারপাশে ফুলের মতো প্রেম ছড়িয়ে আছে।”

দিন যায়। আরিফ প্রায়ই মেহেরের বাগানে যেত। “আপু, এই গোলাপটা কীভাবে এত সুন্দর হয়?”

মেহের লজ্জা পেয়ে বলতো, “ভালোবাসা দিয়ে যত্ন করলে সবকিছু ফুটে ওঠে।”

একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। আরিফ ছাতা নিয়ে মেহেরকে স্কুল থেকে আনতে গেল। মেহের ভিজে গিয়েছিল। তার চুল থেকে জল ঝরছে। আরিফ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যেন বৃষ্টিতে ভেজা একটা ফুল।”

মেহেরের গাল লাল হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। কিন্তু সেই রাতে তার ঘুম এল না। আরিফের চোখ দুটো বারবার মনে পড়ছিল।

ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে কথা বাড়তে লাগল। সন্ধ্যায় বাগানে বসে তারা গল্প করতো। আরিফ তার লেখার গল্প শোনাতো। মেহের তার ছাত্রদের গল্প বলতো। একদিন আরিফ বলল, “মেহের, তুমি জানো, ফুলের প্রেম কেমন হয়? ফুল কখনো জোর করে ফোটে না। ধীরে ধীরে, আলো আর বৃষ্টির স্পর্শে ফোটে। আমার মনে হয়, আমাদের প্রেমও তেমনি।”

মেহের চুপ করে রইল। কিন্তু তার হৃদয়ে একটা ফুল ফুটছিল।

গ্রামের লোকজন দেখতে শুরু করল। কেউ বলতো, “আরিফ ভালো ছেলে।” কেউ বলতো, “মেহেরের জন্য একটা সঙ্গী দরকার।” কিন্তু মেহেরের এক দূর সম্পর্কের চাচা ছিল—চাচা রহিম। সে চাইতো মেহেরকে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে। সে আরিফকে পছন্দ করতো না।

একদিন চাচা এসে বলল, “মেহের, এই শহুরে ছেলেটা তোমাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। সাবধান।”

মেহের কাঁদতে কাঁদতে আরিফের কাছে গেল। “আরিফ, হয়তো আমাদের এভাবে দেখা করা উচিত না।”

আরিফ তার হাত ধরল। “মেহের, প্রেম ফুলের মতো। ঝড় এলে সে মাটিতে পড়ে, কিন্তু শিকড় থেকে আবার ফোটে। আমি তোমাকে ছেড়ে যাব না।”

সেই রাতে তারা বাগানে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল। আরিফ মেহেরের চুলে একটা বেলি ফুল গুঁজে দিল। “এই ফুলটা তোমার মতোই সুন্দর।”

দিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো কাটছিল। তারা একসাথে ফুল তুলতো, বাগানে হাঁটতো, নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতো। আরিফ মেহেরকে তার লেখা কবিতা শোনাতো। মেহের লজ্জায় মুখ লুকাতো।

কিন্তু সমস্যা এল। চাচা রহিম গ্রামের মাতব্বরদের সাথে কথা বলে আরিফকে তাড়ানোর চেষ্টা করল। একদিন তারা আরিফের ঘরে এসে বলল, “তুমি এখান থেকে চলে যাও। মেহের আমাদের মেয়ে।”

আরিফ দুঃখিত হয়ে বলল, “আমি তাকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।”

মেহের শুনে কেঁদে ফেলল। সে আরিফের কাছে গিয়ে বলল, “আমি তোমার সাথে যাব।”

কিন্তু গ্রামের সম্মানের ভয়ে মেহের দ্বিধায় পড়ল। সে বলল, “আরিফ, একটু সময় দাও।”

আরিফ চুপ করে রইল। সে তার লেখায় ডুবে গেল। কিন্তু প্রতিদিন সে মেহেরের জন্য একটা করে ফুল রেখে যেত তার দরজায়।

একদিন ঝড় এল। ভয়ংকর ঝড়। মেহেরের বাগানের অনেক ফুল নষ্ট হয়ে গেল। মেহের কাঁদতে কাঁদতে বাগানে দাঁড়িয়ে ছিল। আরিফ ছুটে এল। সে মেহেরকে জড়িয়ে ধরল। “ফুল নষ্ট হলে আবার ফুটবে। কিন্তু তোমাকে হারালে আমি আর বাঁচব না।”

সেই মুহূর্তে মেহের তার সব দ্বিধা ছেড়ে দিল। সে আরিফের বুকে মাথা রেখে বলল, “আমিও তোমাকে ভালোবাসি। ফুলের মতো, পুরোপুরি।”

চাচা রহিম প্রথমে রাগ করলেও পরে তাদের ভালোবাসা দেখে রাজি হয়ে গেল। সে বলল, “যদি সত্যি ভালোবাসো, তাহলে বিয়ে করো।”

বিয়ে হলো ফুলবাড়ি গ্রামে। পুরো গ্রাম ফুলে ফুলে সাজানো। মেহের লাল শাড়ি পরে এল। আরিফ তার হাতে একটা গোলাপের মালা পরিয়ে দিল।

বিয়ের পর তারা ঢাকায় চলে গেল। কিন্তু প্রতি বছর শরতে তারা ফুলবাড়িতে আসতো। তাদের বাগান আরও সুন্দর হয়ে উঠল। আরিফের বই প্রকাশিত হলো— “ফুলের মতো প্রেম”। সেই বইয়ে মেহেরের গল্প ছিল।

বছর কয়েক পর তাদের একটা মেয়ে হলো। তার নাম রাখল ফুলি। মেহের বলতো, “আমাদের প্রেম যেন ফুলের মতো চিরকাল ফুটে থাকে।”

আরিফ তার কপালে চুমু দিয়ে বলতো, “তুমি আমার ফুল। আমার চিরকালের প্রেম।”

তাদের গল্প এখনো চলছে। ফুলবাড়ির বাগানে প্রতি সকালে নতুন ফুল ফোটে। আর তাদের হৃদয়ে ফোটে অমর প্রেম।


 

....
👁 449