ঝরনার মতো ভালোবাসা

সিলেটের চা-বাগানের মাঝে ছোট্ট একটা গ্রাম। নাম তার “জলছড়া”। চারদিকে সবুজ পাহাড়, ঝরনা আর কুয়াশার চাদর। সেখানে থাকতো রিয়া। বয়স চব্বিশ। চোখ দুটো যেন কালো জলের পুকুর, হাসলে গালে টোল পড়ে। সে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করতো। তার বাবা ছিলেন পুরনো চা-বাগানের কর্মী। মা মারা গিয়েছেন অনেক আগে। রিয়া একাই সংসার সামলাতো।

kxz

ঢাকা থেকে এসেছিল আরেক যুবক। নাম তার আদিত্য রায়। বয়স আটাশ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। কোম্পানির কাজে সিলেটে এসে জলছড়ায় থাকার সুযোগ পেয়েছে। তার দাদুর ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল গ্রামে। সেই বাড়িটা পরিষ্কার করে সে থাকতে শুরু করলো।

প্রথম দেখা হয়েছিল ঝরনার কাছে।

kx/춺'

সকালবেলা। রিয়া তার ছোট ভাইয়ের সাথে ঝরনায় পানি নিতে গিয়েছিল। আদিত্য ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছিল। হঠাৎ পা পিছলে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। রিয়া দৌড়ে এসে তার হাত ধরে ফেললো।

“সাবধান! এখানে পাথর পিছলা।” রিয়া হেসে বললো।

আদিত্য অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার চুলে জলের ফোঁটা, সাদা শাড়ি, আর সেই হাসি। যেন পাহাড়ের ঝরনা নিজেই নেমে এসেছে।

“থ্যাংক ইউ। আমি আদিত্য। নতুন এসেছি।”

“জানি। গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেছে। ঢাকার বড় সাহেব এসেছে।” রিয়া মজা করে বললো।

সেই থেকে তাদের দেখা হতে লাগলো। সকালে রিয়া স্কুলে যাওয়ার পথে আদিত্যকে দেখতো। আদিত্য কখনো চা-বাগানে ছবি তুলতো, কখনো ল্যাপটপ নিয়ে বারান্দায় বসে কাজ করতো।

একদিন বৃষ্টি নামলো। রিয়া স্কুল থেকে ফিরছিল। ভিজে যাচ্ছিল। আদিত্য ছাতা নিয়ে দৌড়ে এলো।

“আসুন, আমার বাড়িতে আশ্রয় নিন।”

রিয়া প্রথমে ইতস্তত করলো। কিন্তু বৃষ্টি আরো জোরে নামলো। দুজনে ছাতার নিচে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে পৌঁছালো। আদিত্য গরম চা বানিয়ে দিল।

“আপনি কেন ঢাকা ছেড়ে এখানে?” রিয়া জিজ্ঞাসা করলো।

“শান্তি খুঁজছিলাম। শহরের জীবনটা খুব দ্রুত। এখানে এসে মনে হয়েছে, জীবনটা আসলে ধীরে ধীরে উপভোগ করার।” আদিত্য বললো।

সেই রাতে তারা অনেক কথা বললো। রিয়া তার স্বপ্নের কথা বললো—স্কুলটাকে আরো বড় করতে চায়, গ্রামের মেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে চায়। আদিত্য বললো তার ছোটবেলার কথা, কীভাবে তার মা তাকে গান শিখিয়েছিলেন।

দিন যেতে লাগলো। তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতো বাঁধা পড়ছিল। আদিত্য প্রতিদিন সকালে রিয়ার জন্য ফুল নিয়ে আসতো। রিয়া তাকে গ্রামের লোকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতো। তারা একসাথে চা-বাগানে হাঁটতো, ঝরনায় পাথর ছুড়তো, আর রাতে তারার আলোয় গল্প করতো।

কিন্তু সমস্যাও ছিল।

রিয়ার বাবা চাইতেন না মেয়ে শহরের ছেলের সাথে ঘুরুক। গ্রামের লোকজনও ফিসফিস করতো। “শহুরে ছেলে, মেয়েটাকে নিয়ে চলে যাবে।” আর আদিত্যের কোম্পানি থেকে ফোন আসতো—ঢাকায় ফিরে আসতে হবে।

একদিন আদিত্য রিয়াকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলো। সূর্যাস্ত দেখছিল।

“রিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” আদিত্য হঠাৎ বলে উঠলো।

রিয়ার চোখে জল এসে গেল। “আমিও… কিন্তু আমাদের জীবন তো আলাদা। তুমি ঢাকায়, আমি এখানে।”

“আমি থেকে যাবো। এখানেই কাজ করবো। অফিস থেকে রিমোট করবো।” আদিত্য বললো।

কিন্তু সত্যি কি সম্ভব?

দিন কয়েক পর আদিত্যের মা-বাবা এলেন ঢাকা থেকে। তারা রিয়াকে দেখে খুশি হলেন না। “গ্রামের মেয়ে। কীভাবে শহরের জীবন সামলাবে?” তারা বললেন।

রিয়া কষ্ট পেল। সে আদিত্যকে বললো, “তুমি চলে যাও। আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করতে চাই না।”

আদিত্য চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। কিন্তু যাওয়ার আগের রাতে বৃষ্টি নামলো। সে রিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

“রিয়া! আমি যাবো না। তোমাকে ছাড়া আমার কোনো জীবন নেই।”

রিয়া দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। দুজনে ভিজতে ভিজতে জড়িয়ে ধরলো। বৃষ্টির মধ্যে তাদের চুমু প্রথমবার। যেন সব বাধা ধুয়ে যাচ্ছে।

পরের দিন আদিত্য তার বাবা-মাকে বোঝালো। “আমি এই মেয়েকে ভালোবাসি। সে আমাকে শান্তি দিয়েছে।” তার মা অবশেষে রাজি হলেন যখন রিয়াকে দেখলেন কত সুন্দর করে কথা বলে, কত যত্ন করে সবাইকে।

গ্রামের লোকজনও আস্তে আস্তে মেনে নিল। আদিত্য গ্রামে একটা ছোট সফটওয়্যার ট্রেনিং সেন্টার খুললো। রিয়া তার স্কুলের সাথে যুক্ত করলো।

এক বছর পর।

জলছড়ার ঝরনার কাছে তাদের বিয়ে হলো। সবুজ পাহাড়, ফুলের মালা, আর দুজনের হাসি। রিয়া লাল শাড়ি পরে, আদিত্য সাদা পাঞ্জাবি। যখন তারা সাতপাক ঘুরলো, তখন সবাই হাততালি দিল।

বিয়ের পর তারা ছোট্ট বাড়িটায় থাকতে লাগলো। সকালে চা খেতে খেতে তারা গল্প করতো। রিয়া আদিত্যকে গ্রামের গান শেখাতো, আদিত্য রিয়াকে ল্যাপটপে ছবি এডিট করা শেখাতো।

কয়েক বছর পর তাদের একটা মেয়ে হলো। নাম রাখলো “ঝরনা”।

প্রতি সকালে আদিত্য ঝরনায় নিয়ে যেত মেয়েকে। রিয়া পিছনে হেসে হেসে দেখতো।

জীবনটা ঠিক ঝরনার মতোই—প্রথমে জোরে নামে, বাধা পায়, তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে সুন্দর হয়ে যায়।

 


 

....
👁 664