রাত দশটা বেজে গেছে। ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। চট্টগ্রামে তার ছোট বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে সে। অফিসের কাজ শেষ করে শেষ মুহূর্তে টিকিট কেটেছে। সিট নাম্বার ২৭, এসি কোচ।
ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা বাজতেই আরিফ উঠে পড়ল। কোচের ভিতরে ঢুকে দেখল তার পাশের সিটটা খালি। জানালার ধারে বসে সে বাইরের আলো দেখছিল। হঠাৎ একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।
“এক্সকিউজ মি, এটা কি ২৮ নাম্বার সিট?”
আরিফ মুখ তুলে তাকাল। মেয়েটার বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। লম্বা চুল, ফর্সা গায়ের রং, চোখে হালকা মেকআপ। সাদা সালোয়ার কামিজে সে যেন চাঁদের আলো হয়ে উঠেছে।
“হ্যাঁ, বসুন।”
মেয়েটি বসল। তার নাম সাবরিনা। চট্টগ্রামের একটা কলেজে লেকচারার। ছুটিতে ঢাকায় এসেছিল মায়ের কাছে, এখন ফিরছে।
প্রথমে দুজনেই চুপচাপ। ট্রেন চলতে শুরু করল। বাইরে ঢাকার আলো ক্রমশ কমে আসছে। আরিফ একটা বই খুলল, কিন্তু মন বসছিল না। সাবরিনা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” সাবরিনাই প্রথম কথা বলল।
“চট্টগ্রাম। বোনের বিয়ে। আপনি?”
“আমিও চট্টগ্রাম। বাড়ি ফিরছি।”
কথা শুরু হলো। ছোট ছোট কথা থেকে ধীরে ধীরে গভীর আলোচনায় চলে গেল। আরিফ বলল তার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরির কথা। সাবরিনা বলল সে ইংরেজি সাহিত্য পড়ায়। দুজনেরই প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ। সাবরিনা বলল, “রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা পড়লে মনে হয় জীবনটা শুধু অপেক্ষার।”
রাত বাড়ছিল। ট্রেনের আলো হালকা। সাবরিনার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। আরিফ তার শালটা দিয়ে সাবরিনার কাঁধ ঢেকে দিল। সাবরিনা হাসল। “থ্যাঙ্ক ইউ।”
মাঝরাতে ট্রেন থামল একটা স্টেশনে। সাবরিনা উঠে চা আনতে গেল। দুজনের জন্য দুই কাপ। চা খেতে খেতে তারা আরও কাছাকাছি হলো। সাবরিনা বলল তার জীবনের কথা। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা একাই তাকে মানুষ করেছেন। আরিফ বলল তার বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন, কিন্তু সে নিজেকে একা লাগে অনেক সময়।
ভোর হতে হতে তারা দুজনেই বুঝতে পারল, এটা শুধু একটা সাধারণ যাত্রা নয়। কিছু একটা হচ্ছে। সাবরিনার হাতটা আরিফের হাতের কাছে চলে এলো। আঙুল ছুঁয়ে গেল। দুজনেই চমকে উঠল, কিন্তু হাত সরাল না।
চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাতে সকাল হয়ে গেল। নামার সময় সাবরিনা বলল, “আপনার নাম্বারটা দিন।”
আরিফ নাম্বার দিল। “কল করবেন নিশ্চয়ই?”
সাবরিনা হাসল। “অবশ্যই।”
বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকলেও আরিফের মন পড়ে ছিল সাবরিনার কথায়। দুদিন পর সাবরিনার কল এলো। “আজকে সময় আছে? কাট্টলি বিচে দেখা করব?”
আরিফ রাজি হয়ে গেল।
কাট্টলি বিচে সন্ধ্যায় তারা দেখা করল। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ, হালকা বাতাস। সাবরিনা পরেছিল নীল একটা শাড়ি। আরিফের চোখ আটকে গেল তার দিকে। তারা হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা বলল। সাবরিনা বলল, “আমি কখনো এভাবে কারো সাথে এত তাড়াতাড়ি কথা বলিনি।”
আরিফ তার হাত ধরল। “আমিও না। মনে হয় যেন অনেক দিনের চেনা।”
তারা একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেল। খাবারের পর সাগরের ধারে বসে তারা চুপচাপ বসে রইল। আরিফ সাবরিনার কপালে একটা চুমু দিল। সাবরিনা লজ্জায় মুখ লুকাল তার কাঁধে।
পরের কয়েকদিন তারা প্রায় প্রতিদিন দেখা করল। আরিফ বোনের বিয়ের পরেও চট্টগ্রামে থেকে গেল কয়েকদিনের জন্য। তারা পাহাড়ে গেল, সীতাকুণ্ডে গেল, পার্কে ঘুরল। প্রতিটা মুহূর্তে তাদের ভালোবাসা বাড়তে লাগল।
একদিন বৃষ্টি পড়ছিল। তারা একটা ছোট ক্যাফেতে আশ্রয় নিয়েছিল। বৃষ্টির শব্দের মাঝে সাবরিনা বলল, “আরিফ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
আরিফ তার চোখে চোখ রেখে বলল, “আমিও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি, সাবরিনা।”
সেই রাতে তারা প্রথমবার কাছাকাছি হলো। হোটেলের ঘরে, হালকা আলোয়। আরিফ সাবরিনার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার কাঁধে চুমু খেল। সাবরিনার শরীর কেঁপে উঠল। তারা ধীরে ধীরে একে অপরকে আবিষ্কার করল। সাবরিনার নরম ঠোঁট, তার বুকের উষ্ণতা, আরিফের শক্ত বাহু। বৃষ্টির শব্দের সাথে তাদের নিঃশ্বাস মিলে এক অপূর্ব সুর তৈরি করল। সেই রাতে তারা শুধু শরীর নয়, আত্মাকেও মিলিয়ে দিল।
সকালে সাবরিনা আরিফের বুকে মাথা রেখে বলল, “এটা স্বপ্ন নয় তো?”
আরিফ তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “না, এটা আমাদের বাস্তব।”
কিন্তু জীবন সবসময় সহজ নয়। সাবরিনার মা চাইতেন না তার মেয়ে ঢাকার ছেলের সাথে সম্পর্ক করুক। আরিফের পরিবারও একটু ইতস্তত ছিল। কিন্তু দুজনের ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে তারা সব বাধা অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নিল।
আরিফ চট্টগ্রামে চাকরি খুঁজতে শুরু করল। সাবরিনা তার মাকে বোঝাল। অনেক কান্নাকাটি, অনেক আলোচনার পর দুই পরিবার রাজি হলো।
ছয় মাস পর তাদের বিয়ে হলো। চট্টগ্রামের একটা সুন্দর হলঘরে। সাবরিনা লাল বেনারসিতে যেন স্বর্গের পরী। আরিফ তার দিকে তাকিয়ে চোখ ভরে গেল।
বিয়ের পর তারা একটা ছোট ফ্ল্যাট নিল সমুদ্রের কাছে। প্রতি সন্ধ্যায় তারা বিচে হাঁটত। হাতে হাত রেখে। আরিফ সাবরিনাকে জড়িয়ে ধরে বলত, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।”
সাবরিনা হেসে বলত, “আর তুমি আমার চিরকালের নায়ক।”
তাদের জীবনে ছোট ছোট ঝগড়া হতো, কিন্তু প্রতিবারই তারা আরও কাছাকাছি হয়ে যেত। এক বছর পর তাদের একটা ছোট্ট মেয়ে হলো। নাম রাখলেন “আরিয়া”।
আরিয়া যখন বড় হলো, তখন তারা তাকে গল্প শোনাত তাদের প্রেমের। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সেই ট্রেন যাত্রার গল্প।
বছরের পর বছর কেটে গেল। বয়স হলেও তাদের ভালোবাসা কমল না। প্রতি বছর তাদের অ্যানিভার্সারিতে তারা আবার সেই ট্রেনে চড়ত। একই সিটে বসত। হাতে হাত রেখে।
একদিন সাবরিনা আরিফের কানে কানে বলল, “যদি আরেকটা জন্ম হয়, তাহলে আবার তোমার সাথেই দেখা করব ট্রেনে।”
আরিফ চুমু খেয়ে বলল, “আমিও। চিরকাল।”
তাদের প্রেম হয়ে রইল অমর।
ট্রেন যাত্রার বিস্তারিত: ট্রেন চলার সময় তারা অনেক কবিতা আবৃত্তি করল। সাবরিনা “চোখের বালি” থেকে লাইন বলল, আরিফ “সোনার তরী”। রাতের খাবারে তারা একসাথে খেল। সাবরিনার হাতে খাবারের টুকরো লেগে গেলে আরিফ নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। সেই ছোঁয়ায় দুজনের শরীরেই বিদ্যুৎ খেলে গেল।
বিচের দৃশ্য: সাগরের ঢেউয়ের সামনে তারা প্রথম চুমু খেল। সাবরিনার ঠোঁট নরম, মিষ্টি। আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে তার চুল উড়ছিল।
প্রথম রাতের ঘনিষ্ঠতা: ঘরের ভিতরে আরিফ সাবরিনার শাড়ি খুলতে খুলতে তার প্রতিটা অংশ চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। সাবরিনা লজ্জায় কাঁপছিল কিন্তু আনন্দে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। তাদের শরীর এক হয়ে গেল ধীরে ধীরে, প্রতিটা স্পর্শে ভালোবাসা ঝরে পড়ছিল। সাবরিনার নিঃশ্বাস আর আরিফের গর্জন মিলে এক অপূর্ব সংগীত তৈরি হলো। সকাল পর্যন্ত তারা একে অপরকে ছাড়েনি।
বিয়ে ও পরবর্তী জীবন: বিয়ের দিন সাবরিনার মা কেঁদে বললেন, “তোরা সুখী হ।” আরিফের বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। বিয়ের পর তাদের ছোট সংসারে প্রতিদিন নতুন করে ভালোবাসা খুঁজে পেত তারা। রাতে শুয়ে তারা পুরনো দিনের কথা বলত। আরিফ সাবরিনার পেটে হাত রেখে বলত, “এখানে আমাদের ভবিষ্যৎ।”
....