রাত এগারোটা বেজে গেছে। ঢাকার আকাশে মেঘ জমে আছে ঘন কালো। আয়েশা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনছিল। তার হাতে এক কাপ গরম চা। চুলগুলো খোলা, সালোয়ার কামিজের উপর একটা হালকা শাল। বিয়ের পর দু’বছর হয়ে গেছে, কিন্তু আজও তার স্বামী রাহাতের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বুকটা কেমন করে।
রাহাত ইঞ্জিনিয়ার। প্রজেক্টের জন্য সারাদিন অফিস আর সাইটে ছোটাছুটি। আজও বলেছিল, “দেরি হবে আয়েশা, খেয়ে নিও।” কিন্তু আয়েশা খায়নি। তার জন্য অপেক্ষা করতে ভালো লাগে।
দরজায় চাবির শব্দ হতেই আয়েশা ছুটে গেল। রাহাত ভিজে গেছে পুরো। শার্ট লেপটে আছে শরীরে। চুল থেকে পানি ঝরছে।
“এত ভিজে গেলে কেন?” আয়েশা বকা দিল নরম গলায়।
রাহাত হাসল। তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। “তোমার জন্য তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে বৃষ্টিতে পড়লাম।”
আয়েশা তার হাত ধরে বেডরুমে নিয়ে গেল। গামছা দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, “তুমি না থাকলে আমার কী হয় জানো?”
রাহাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। “কী হয়?”
“আমার পৃথিবী থেমে যায়।”
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। রাহাত আয়েশার কপালে চুমু খেল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে। চুমুটা গভীর হলো। আয়েশার শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল। দু’বছরেও এই চুমুতে তার শরীর এখনো আগুন হয়ে যায়।
“খেয়েছ?” আয়েশা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।
“না। তোমার হাতের রান্না ছাড়া কিছু খেতে ইচ্ছে করে না।”
আয়েশা হেসে রান্নাঘরে গেল। রাহাত পেছন পেছন। সে আয়েশাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তার গরম নিঃশ্বাস আয়েশার ঘাড়ে পড়ছে।
“রাহাত… খাবে না?”
“প্রথমে তোমাকে খাই।”
আয়েশা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিন্তু সরে গেল না। রাহাত তার কানের লতিতে চুমু খেল। আয়েশা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ ধরে ভালোবাসল। বৃষ্টির তালে তালে। ধীরে, গভীরে, পুরোপুরি নিজেদের মধ্যে হারিয়ে। আয়েশা যখন রাহাতের বুকে মাথা রেখে শুয়ে ছিল, তখন রাহাত বলল, “আয়েশা, আমরা চট্টগ্রাম যাব। দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়েছি।”
আয়েশার চোখ চকচক করে উঠল। “সত্যি?”
“হ্যাঁ। তোমাকে সমুদ্র দেখাব।”
দু’দিন পর তারা ট্রেনে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রেন। আয়েশা জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। রাহাত তার হাত ধরে আছে।
“মনে আছে আমাদের প্রথম দেখা?” রাহাত জিজ্ঞাসা করল।
আয়েশা হাসল। “কীভাবে ভুলব? তুমি আমার বান্ধবীর দাদার বিয়ে বাড়িতে এসেছিলে। আমি লাল শাড়ি পরে ছিলাম। তুমি একদম তাকিয়ে ছিলে।”
“তুমি এত সুন্দর ছিলে যে চোখ ফেরাতে পারিনি।”
ট্রেন চলছিল। রাত বাড়ছিল। কামরায় লাইট কম। আয়েশা রাহাতের কাঁধে মাথা রাখল। রাহাত তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার হাত নেমে এল আয়েশার কোমরে। আঙুলগুলো হালকা করে চাপ দিচ্ছিল।
“এখানে?” আয়েশা লজ্জায় ফিসফিস করল।
“কেউ দেখবে না।” রাহাত তার কানে কামড় দিল হালকা।
আয়েশার শ্বাস ভারী হয়ে গেল। রাহাতের হাত তার শাড়ির আঁচলের নিচে ঢুকে গেল। গরম ত্বকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে আয়েশার ঠোঁট কামড়াল। ট্রেনের দোলায় তাদের শরীর আরও কাছে আসছিল। আয়েশা রাহাতের জামার বোতাম খুলে তার বুকে হাত রাখল। তার হৃদস্পন্দন অনুভব করছিল।
“আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রাহাত।”
“আমিও, আমার জান।”
সেই রাতের ট্রেন যাত্রা তাদের জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রইল।
চট্টগ্রামে পৌঁছে তারা হোটেলে উঠল। সমুদ্রের খুব কাছে। বিকেলে তারা সমুদ্র সৈকতে গেল। ঢেউ আছড়ে পড়ছে। আয়েশা খালি পায়ে বালিতে হাঁটছিল। রাহাত তার পাশে।
হঠাৎ রাহাত আয়েশাকে কোলে তুলে নিল। আয়েশা চিৎকার করে হাসতে লাগল।
“নামাও! লোকে দেখবে!”
“দেখুক। তুমি আমার বউ।”
সমুদ্রের পানিতে তারা দুজনে ভিজল। রাহাত আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। লবণাক্ত পানি আর তাদের ঠোঁট মিশে গেল। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। আকাশ লাল হয়ে গেছে।
রাতে হোটেলের ব্যালকনিতে তারা বসে ছিল। আয়েশা রাহাতের কোলে। তারা একসাথে চা খাচ্ছিল।
“আমাদের একটা বাচ্চা হলে কেমন হয়?” আয়েশা হঠাৎ বলল।
রাহাত তার পেটে হাত রাখল। “খুব সুন্দর হবে। তোমার মতো চোখ, আমার মতো হাসি।”
আয়েশা লজ্জায় মুখ লুকাল রাহাতের বুকে। রাহাত তাকে তুলে নিয়ে বিছানায় নিয়ে গেল। সেই রাতে তারা খুব আস্তে আস্তে, খুব গভীরভাবে ভালোবাসল। প্রতিটা স্পর্শে যেন সমুদ্রের ঢেউ। আয়েশা রাহাতের নাম ধরে কেঁপে উঠছিল। রাহাত তার কানে কানে বলছিল, “তুমি আমার সব।”
দুই সপ্তাহ কেটে গেল খুব তাড়াতাড়ি। ঢাকায় ফিরে এসে আয়েশার শরীরে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব হচ্ছিল। একদিন ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানল— সে মা হতে চলেছে।
সেই সন্ধ্যায় রাহাত যখন বাসায় ফিরল, আয়েশা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
“কী হয়েছে জান?” রাহাত চিন্তিত।
আয়েশা তার হাত ধরে নিজের পেটে রাখল। “আমরা তিনজন হয়ে যাচ্ছি।”
রাহাতের চোখে পানি চলে এল। সে আয়েশাকে খুব আলতো করে জড়িয়ে ধরল। “তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি এতদিন। এখন থেকে আরও বেশি যত্ন নেব।”
সেই রাতে তারা আরও কাছাকাছি হলো। আয়েশার শরীর এখন আরও সংবেদনশীল। রাহাত প্রতিটা স্পর্শে যত্ন করে, ভালোবেসে। আয়েশা তার বুকে শুয়ে বলল, “এই বৃষ্টি আর সমুদ্রের স্মৃতি নিয়ে আমরা সারাজীবন বাঁচব।”