অপেক্ষার শেষ চাঁদনী

একটা মেয়ে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, চুল খোলা, বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে গেছে একটু। মেয়েটার চোখে একটা অস্থিরতা। সে চারদিকে তাকাচ্ছে, যেন কাউকে খুঁজছে।

kxz

রাহাতের দৃষ্টি আটকে গেল। কেন জানি মনে হলো, এই মুখটা চেনা চেনা। ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে মেয়েটা দৌড়ে উঠে পড়ল কামরায়। তার টিকিট চেকারের সাথে একটু ঝামেলা হলো। রাহাত সাহায্য করল। “আপু, এই সিটটা ফাঁকা আছে, বসুন।”

মেয়েটা হাসল। তার হাসিতে চাঁদের আলো যেন ঝরে পড়ল। “ধন্যবাদ। আমি নাম মায়া। চট্টগ্রামে যাচ্ছি।”

kx/춺'

“আমি রাহাত। আলোকপুর যাচ্ছি।”

দুজনের মধ্যে কথা শুরু হলো। মায়া বলল, সে চট্টগ্রামের একটা কলেজে পড়ে, তৃতীয় বর্ষ। বাড়ি আলোকপুরের কাছেই একটা গ্রামে। বাবা-মা গ্রামেই থাকেন। রাহাতও তার গ্রামের কথা বলল। দুজনের গ্রাম খুব কাছাকাছি। ছোটবেলায় হয়তো দেখা হয়েছে কোনো মেলায় বা নদীর ঘাটে।

রাত বাড়তে লাগল। ট্রেনের জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। মায়া ঘুমিয়ে পড়েছিল রাহাতের কাঁধে মাথা রেখে। রাহাত নড়েনি। তার হৃদয়ে একটা অদ্ভুত শান্তি। অনেকদিন পর কারো সান্নিধ্য এমন ভালো লাগল।

সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমে তারা আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু ফোন নম্বর বিনিময় হয়েছিল।


গ্রামে ফিরে রাহাতের দিন কাটতে লাগল। সকালে নদীর পাড়ে হাঁটা, দুপুরে মায়ের রান্না খাওয়া, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। কিন্তু তার মন পড়ে থাকত মায়ার কথায়। দুইদিন পর মেসেজ এলো।

মায়া: “রাহাত ভাইয়া, আজকে আমাদের গ্রামের মেলা। আসবেন?”

রাহাত গেল। মেলায় মায়াকে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। মায়া পরেছিল লাল শাড়ি। চুলে ফুল গুঁজেছে। তারা ঘুরল মেলায়। খেলনা কিনল, জিলাপি খেল, নৌকায় চড়ল নদীতে।

রাতে চাঁদ উঠল। নদীর পাড়ে বসে তারা কথা বলছিল। মায়া বলল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। পরের মাসে। ছেলেটা ঢাকায় চাকরি করে। কিন্তু আমি... আমি এখনো বুঝতে পারছি না।”

রাহাত চুপ করে রইল। তার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল। কিন্তু সে বলল, “যদি মন না চায়, তাহলে বলো। জোর করে কিছু হয় না।”

মায়া তার হাত ধরল। “তোমার সাথে কথা বললে কেমন শান্তি লাগে। কেন জানি?”

সেই রাতে তারা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। চাঁদের আলোয় তাদের ছায়া এক হয়ে গিয়েছিল।


পরের কয়েক সপ্তাহে তাদের দেখা হতে লাগল গোপনে। রাহাত প্রায়ই মায়ার গ্রামে যেত। তারা নদীর ধারে হাঁটত, বৃষ্টিতে ভিজত, পুরনো আমগাছের তলায় বসে গান শুনত। রাহাত মায়াকে তার ঢাকার জীবনের গল্প শোনাত। মায়া বলত তার স্বপ্নের কথা — সে শিক্ষক হতে চায়, গ্রামের মেয়েদের পড়াতে চায়।

একদিন বিকেলে বৃষ্টিতে তারা একটা পরিত্যক্ত মন্দিরের ছাদের নিচে আশ্রয় নিল। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছিল না। মায়া রাহাতের বুকে মাথা রেখে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, রাহাত। কিন্তু আমার বাবা-মা... তারা অন্য ছেলেকে পছন্দ করে।”

রাহাত তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “আমি অপেক্ষা করব। যতদিন লাগে। তোমার সুখই আমার সুখ।”

তাদের প্রথম চুমু হয়েছিল সেই বৃষ্টির মধ্যে। নরম, ভয়ে ভয়ে, কিন্তু পুরোপুরি আন্তরিক। মায়ার ঠোঁটে বৃষ্টির স্বাদ মিশে ছিল। রাহাতের হাত কাঁপছিল যখন সে মায়ার কপালে চুমু খেল।


কিন্তু সুখ সবসময় স্থায়ী হয় না। মায়ার বাড়িতে খবর চলে গেল। তার বাবা রেগে গিয়ে মায়াকে বাড়িতে আটকে রাখলেন। রাহাতের সাথে যোগাযোগ বন্ধ। রাহাত ঢাকায় ফিরে গেল, কিন্তু তার মন পড়ে রইল গ্রামে। প্রতি রাতে সে মায়াকে মেসেজ করত, কিন্তু উত্তর আসত না।

একদিন হঠাৎ ফোন এলো মায়ার। “রাহাত, আমি পালিয়ে আসছি। আজ রাতে নদীর ঘাটে অপেক্ষা করো।”

রাহাত ছুটে গেল। চাঁদনী রাত। নদীতে চাঁদের আলো ঝিকমিক করছে। মায়া এসে পৌঁছাল। তার চোখে জল। “আমি আর ওই বিয়েতে রাজি না। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।”

তারা দুজনে নৌকা নিয়ে নদী পার হলো। অনেক দূরে একটা ছোট্ট হোটেলে উঠল। সেই রাতে তারা প্রথমবার একসাথে শুয়েছিল। শুধু আলিঙ্গন, চুমু আর অনেক কথা। মায়া রাহাতের বুকে মাথা রেখে বলেছিল, “এই মুহূর্তটাই আমার সারা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর।”


পরের দিন তারা ঢাকায় চলে এলো। রাহাতের ফ্ল্যাটে। পরিবারের সাথে কথা বলল। প্রথমে অনেক বাধা। মায়ার বাবা রাগ করেছিলেন, কিন্তু পরে মায়ার জেদ আর রাহাতের সততা দেখে রাজি হয়ে গেলেন।

ছয় মাস পর তাদের বিয়ে হলো। সাধারণ, কিন্তু খুব সুন্দর। নদীর পাড়ে, চাঁদের আলোয়। মায়া শাড়ি পরে, রাহাত পাঞ্জাবি। বন্ধুরা, পরিবার — সবাই এসেছিল।

বিয়ের পর তারা ঢাকায় নতুন জীবন শুরু করল। রাহাত কাজ করত, মায়া পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করল। প্রতি শুক্রবার তারা গ্রামে যেত। নদীর পাড়ে বসে পুরনো দিনের কথা বলত।

এক বছর পর মায়া গর্ভবতী হলো। রাহাত তার পেটে হাত রেখে বলত, “আমাদের ছোট্ট চাঁদনী আসছে।”


রাহাত আর মায়ার জীবনটা হয়ে উঠেছিল একটা সুন্দর গানের মতো। ছোট ছোট ঝগড়া, অনেক হাসি, রাত জেগে গল্প করা, বৃষ্টিতে ভেজা, চাঁদের আলোয় হাঁটা — সবকিছুতেই তাদের ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ত।

যখন তাদের মেয়ে জন্ম নিল, নাম রাখল “চাঁদনী”। প্রতি রাতে চাঁদ উঠলে রাহাত মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলত, “তোমার জন্যই এই অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।”

মায়া হেসে বলত, “আরও অনেক চাঁদনী রাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

....
👁 327