ঢাকা শহরের অফিস পাড়ায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। রাস্তায় গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড় আর বৃষ্টির ফোঁটা মিলে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছে। আরিফ তার অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। ২৮ বছর বয়স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি ভালো, বেতন ভালো, কিন্তু মনটা সবসময় খালি।
“আরিফ ভাই, আজ আবার বৃষ্টি। বাসায় যাবেন কীভাবে?” পাশের কলিগ রাহাত জিজ্ঞাসা করল।
“হেঁটেই যাব। বৃষ্টি আমার ভালো লাগে,” আরিফ হাসল। কিন্তু তার হাসিতে সেই পুরনো দিনের আলো ছিল না।
সাত বছর আগে সে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছিল। পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু তার হৃদয়ে এখনও সেই ছোট্ট গ্রামের নদীর পাড়, সেই সবুজ ধানখেত আর একটা মেয়ের হাসি বাসা বেঁধে আছে। নাম তার—নিশি। নিশাত আক্তার।
সেই নিশি, যার সাথে তার প্রথম প্রেম হয়েছিল ক্লাস নাইনে। গ্রামের স্কুলে। বৃষ্টির দিনে তারা দুজন ছাদে দাঁড়িয়ে ভিজত। নিশি হাসতে হাসতে বলত, “আরিফ, বৃষ্টি যেন আমাদের গান গায়।”
আরিফ চোখ বন্ধ করল। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসছে। সাত বছর আগে নিশির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অন্য এক ছেলের সাথে। গ্রামের প্রথা, পরিবারের চাপ—কিছুই আরিফ করতে পারেনি। তারপর থেকে সে আর গ্রামে ফিরে যায়নি।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে আরিফ তার ল্যাপটপ খুলল। ফেসবুকে একটা পুরনো ছবি দেখল—নিশির। কিন্তু প্রোফাইল প্রাইভেট। কোনো আপডেট নেই। মনটা আরও ভারী হয়ে গেল।
দুদিন পর অফিস থেকে ছুটি পেল আরিফ। তার বাবার শরীর খারাপ। মা ফোন করে বললেন, “বাবা তোকে দেখতে চায়। একবার আয়।”
ঢাকা থেকে বাসে চেপে সকালে গ্রামে পৌঁছাল আরিফ। গ্রামের নাম মেঘনা। নদীর পাড়ে ছোট্ট গ্রাম। বাস থেকে নেমে চারদিকে তাকাল। সবকিছু একই আছে, শুধু তার মনটা বদলে গেছে।
বাড়িতে পৌঁছে বাবাকে দেখল। বয়স হয়েছে, কিন্তু চোখে সেই আগের জেদ। “তুই এতদিন পর এলি? বিয়ে করবি না?” বাবা জিজ্ঞাসা করলেন।
“বাবা, এখন না।” আরিফ হাসল।
বিকেলে নদীর পাড়ে হাঁটতে গেল। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হঠাৎ একটা চেনা গলা শুনল।
“আরিফ?”
ঘুরে তাকাল। ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে নিশি। সেই একই চোখ, একই হাসি। কিন্তু চুলে সিঁদুর, হাতে শাঁখা। বিয়ে হয়েছে।
“নিশি... তুমি?” আরিফের গলা কেঁপে গেল।
“হ্যাঁ, আমি। তোমার বাবার খবর শুনে এসেছিলাম। কেমন আছ?” নিশির চোখে সেই পুরনো আবেগ।
দুজনে নদীর পাড়ে বসল। বৃষ্টি তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু কেউ ছাতা খুলল না।
“তোমার সংসার কেমন?” আরিফ জিজ্ঞাসা করল।
নিশি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। “ভালোই। কিন্তু... সুখ? সুখটা যেন হারিয়ে গেছে।” তার চোখে জল।
আরিফ তার হাত ধরতে গিয়েও থেমে গেল। “নিশি, আমি তোমাকে ভুলতে পারিনি। এখনও প্রতি বৃষ্টিতে তোমার কথা মনে পড়ে।”
নিশি কাঁদল। “আমিও পারিনি। কিন্তু এখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
সেই রাতে আরিফ ঘুমাতে পারল না। পরের দিন সকালে নিশির বাড়িতে গেল। নিশির স্বামী রাহিম শহরে চাকরি করে, সপ্তাহে একদিন আসে। নিশি একা থাকে তার শাশুড়ির সাথে।
দুজনে গ্রামের পুরনো স্কুলে গেল। সেই বটগাছের নিচে বসল।
“মনে আছে, এখানে তুমি আমাকে প্রথম বলেছিলে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’?” নিশি হাসল।
“মনে আছে। আর তুমি লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলে।” আরিফ তার চুলে হাত বুলাল।
দিন যায়। আরিফ গ্রামে থেকে যায়। প্রতিদিন তারা দেখা করে। নদীর পাড়ে, ধানখেতের আলে, ছাদে বৃষ্টিতে ভিজে। কথা বলে, হাসে, কাঁদে। আরিফ বুঝতে পারে নিশির সংসারে সুখ নেই। রাহিম অন্য মেয়ের সাথে জড়িত। নিশি একা।
একদিন বৃষ্টির রাতে নিশি আরিফের কাছে এল। “আমি আর পারছি না। তোমার সাথে থাকতে চাই।”
আরিফ তাকে জড়িয়ে ধরল। “কিন্তু সমাজ? পরিবার?”
“ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে সবকিছু সম্ভব,” নিশি বলল।
তারা দুজনে পরিকল্পনা করল। আরিফ ঢাকায় ফিরে চাকরির ব্যবস্থা করবে নিশির জন্য। কিন্তু রাহিমের সাথে কথা বলতে হবে।
রাহিম গ্রামে এল। সে জানতে পারল আরিফের কথা। রাগে আগুন হয়ে গেল। “তুমি আমার বউয়ের সাথে...”
ঝগড়া হল। গ্রামের লোকজন জড়িয়ে পড়ল। আরিফকে বলল, “চলে যাও।”
নিশি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি আর তোমার সাথে থাকব না। ডিভোর্স চাই।”
রাহিম রাজি হল না। কিন্তু নিশির জেদ দেখে শেষমেশ রাজি হল।
আরিফের বাবা-মা প্রথমে রাগ করলেন, কিন্তু ছেলের সুখ দেখে মেনে নিলেন।
ছয় মাস পর। ঢাকায় একটা ছোট ফ্ল্যাটে আরিফ আর নিশি। নিশি এখন একটা স্কুলে পড়ায়। আরিফের চাকরি চলছে।
বৃষ্টির দিনে তারা ছাদে দাঁড়ায়। নিশি বলে, “এই বৃষ্টিই আমাদের আবার মিলিয়ে দিয়েছে।”
আরিফ তাকে চুমু খায়। “তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ ছিল।”
তাদের প্রেম এখন আর লুকানো নয়। সত্যি, গভীর, চিরকালের
ঢাকার যানজটে আটকে থাকা বাসে বসে আরিফ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। বৃষ্টির ফোঁটা কাচে আছড়ে পড়ছে। তার মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলো। গ্রামের স্কুলে নিশির সাথে প্রথম দেখা। নিশি ছিল ক্লাসের সেরা মেয়ে। লম্বা চুল, গভীর চোখ। আরিফ তাকে দেখে প্রথম দিন থেকেই মুগ্ধ।
একদিন বৃষ্টিতে স্কুল ছুটির পর তারা দুজন একসাথে ছাতা নিয়ে হাঁটছিল। নিশি হেসে বলেছিল, “তোমার ছাতাটা ছোট, আমি ভিজে যাব।” আরিফ তখন তার কাছে এগিয়ে এসে ছাতা একসাথে ধরেছিল। সেই ছোঁয়ায় প্রথম স্পর্শ।
ঢাকায় এসে আরিফ অনেক মেয়ের সাথে দেখা করেছে, কিন্তু কেউ নিশির জায়গা নিতে পারেনি। আজও অফিসের পর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরল। তার ফ্ল্যাট ছোট, একা। রান্না করে খেল, তারপর বিছানায় শুয়ে নিশির পুরনো চিঠি পড়ল। নিশি লিখেছিল, “তুমি যেখানেই থাকো, আমার হৃদয়ে তুমি আছ।”
গ্রামে পৌঁছে আরিফ দেখল সবকিছু একই। নদী এখনও বয়ে চলছে, ধানখেত সবুজ। বাড়িতে মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা বিছানায় শুয়ে। “বাবা, আমি এসেছি।”
বিকেলে নদীর পাড়ে গিয়ে নিশির সাথে দেখা। নিশি এখন ২৭ বছরের যুবতী। শাড়ি পরা, কিন্তু চোখে সেই আগের ঔজ্জ্বল্য। তারা অনেকক্ষণ কথা বলল। নিশি বলল তার সংসারের কথা। রাহিম ভালো মানুষ, কিন্তু ভালোবাসে না। শুধু দায়িত্ব।
আরিফ বলল, “আমি তোমাকে এখনও ভালোবাসি।” নিশি চোখ নামিয়ে বলল, “আমিও। কিন্তু কী করব?”
সেই রাতে বৃষ্টিতে তারা দুজন ছাদে উঠল। ভিজতে ভিজতে হাসল, কাঁদল। আরিফ নিশির হাত ধরে বলল, “এবার আমরা একসাথে থাকব।”