বৃষ্টি আর তোমার ভালোবাসা

ঢাকার ভিড়ে ভরা রাস্তায় বৃষ্টি পড়ছিল অঝোরে। জুন মাসের এই বৃষ্টি যেন শহরটাকে ধুয়ে মুছে নতুন করে দিতে চায়। রাহাত ছাতা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল মিরপুরের একটা বাস স্টপে। তার হাতে একটা পুরনো বই — “প্রেমের কবিতা”। বইটা তার বাবার ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে এটা তার সঙ্গী।

kxz

হঠাৎ একটা মেয়ে দৌড়ে এসে তার ছাতার নিচে আশ্রয় নিল। “এক্সকিউজ মি, একটু শেয়ার করবেন?” তার গলার স্বরটা বৃষ্টির মতোই মিষ্টি।

রাহাত তাকাল। মেয়েটার চোখ দুটো বড় বড়, কাজল টানা। ভেজা চুলগুলো কপালে লেপটে আছে। সাদা সালোয়ার কামিজে বৃষ্টির ফোঁটা লেগে চকচক করছে।

kx/춺'

“নিশ্চয়ই,” রাহাত হাসল। “আপনি কোথায় যাবেন?”

“ফার্মগেট। আপনি?”

“আমিও সেদিকেই। চলুন।”

তার নাম বৃষ্টি। বৃষ্টি আহমেদ। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যের ফাইনাল ইয়ার। রাহাতের সাথে সেদিন প্রথম দেখা। কিন্তু কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল যেন অনেক দিনের চেনা। বৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল, “আমার নাম শুনেই তো আপনি ছাতা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই না? বৃষ্টির সাথে বৃষ্টি!”

রাহাত হেসে উঠল। “হয়তো ভাগ্যের খেলা।”

সেদিন থেকে শুরু। প্রথমে মেসেজ, তারপর কল, তারপর কফি শপে দেখা। বৃষ্টি ছিল উদ্দীপনায় ভরা। সে কবিতা লিখত, গান গাইত, আর বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত। রাহাত ছিল শান্ত, চুপচাপ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার জীবনটা ছিল কোড আর ডেডলাইনের মধ্যে আটকে। বৃষ্টি যেন তার জীবনে এক ঝলক তাজা বাতাস।

দুই মাস পর।

তারা দুজনে রিকশায় করে যাচ্ছিল ধানমন্ডির লেকের পাশ দিয়ে। বৃষ্টি রাহাতের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “রাহাত, তুমি জানো? আমি ছোটবেলায় বৃষ্টিতে ভিজলে আমার মা খুব রাগ করত। বলত, ‘তোর নামই তো বৃষ্টি, তুই আবার ভিজিস কেন?’ আমি বলতাম, ‘মা, আমি তো নিজেকেই খুঁজে পাই বৃষ্টিতে।’”

রাহাত তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। “আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি বৃষ্টিতে।”

সেই রাতে প্রথম চুমু। লেকের পাড়ে, বৃষ্টির মধ্যে। তাদের ঠোঁট মিলিত হতেই মনে হলো পুরো শহর থেমে গেছে। বৃষ্টির ফোঁটা তাদের চোখের জল মুছে দিচ্ছিল।

কিন্তু ভালোবাসা কখনো সোজা পথে চলে না।

বৃষ্টির বাবা ছিলেন একজন সরকারি অফিসার। খুব রক্ষণশীল। তিনি চাইতেন বৃষ্টি বিয়ে করে চট্টগ্রামে তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে। রাহাতের পরিবারও সাধারণ। তার মা একা মানুষ, ছোট চাকরি করেন। দুই পরিবারের মধ্যে সামাজিক ব্যবধান ছিল স্পষ্ট।

একদিন বৃষ্টি কাঁদতে কাঁদতে রাহাতের ফ্ল্যাটে এসে হাজির। “বাবা বলেছে, আর যোগাযোগ করলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে।”

রাহাত তাকে জড়িয়ে ধরল। “আমি তোমাকে ছেড়ে দিতে পারব না, বৃষ্টি। আমরা একসাথে লড়ব।”

সেই রাতটা তারা একসাথে কাটাল। কোনো শারীরিক সম্পর্ক নয়, শুধু আলিঙ্গনে। বৃষ্টি রাহাতের বুকে মাথা রেখে কাঁদছিল। রাহাত তার চুলে চুমু খাচ্ছিল আর বলছিল, “তুমি আমার বৃষ্টি। তুমি না হলে আমার জীবন শুকনো মরুভূমি।”

পরের কয়েক মাস ছিল কষ্টের। লুকিয়ে দেখা, ছোট ছোট মেসেজ, রাত জেগে কথা বলা। বৃষ্টি তার ডায়েরিতে লিখত:

“রাহাত, তুমি যখন আমার হাত ধরো, মনে হয় পুরো পৃথিবীটা আমার। কিন্তু বাস্তব যখন টেনে নামায়, তখন ভয় করে। তবু তোমাকে ভালোবাসি। অনেক অনেক।”

একদিন বৃষ্টির বাবা সব জেনে গেলেন। তিনি বৃষ্টিকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। “এখানে থাকলে তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে।”

বৃষ্টি চলে গেল। রাহাতের ফোন বন্ধ। মেসেজের উত্তর নেই। রাহাতের জীবনটা আবার অন্ধকার হয়ে গেল। সে অফিসে যেত, কাজ করত, কিন্তু তার চোখে আর আলো ছিল না। প্রতি বৃষ্টির দিনে সে লেকের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াত। মনে পড়ত সেই প্রথম দিনের কথা।

ছয় মাস কেটে গেল।

রাহাত একদিন অফিস থেকে ফিরছিল। বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নাম্বার।

“হ্যালো?”

“রাহাত... আমি বৃষ্টি।”

রাহাতের হাত কাঁপতে লাগল। “বৃষ্টি? তুমি কোথায়?”

“ঢাকায় ফিরেছি। বাবা মেনে নিয়েছে। আমি বলেছি, আমি যদি তোমাকে না পাই, তাহলে কাউকেই বিয়ে করব না। আমি পড়াশোনা শেষ করেছি। চাকরি পেয়েছি। এবার আমরা একসাথে থাকব।”

রাহাত ছুটে গেল নির্দিষ্ট জায়গায়। সেই একই বাস স্টপ। সেই একই বৃষ্টি। বৃষ্টি দাঁড়িয়ে ছিল, ভিজে। তার চোখে জল আর হাসি মিশে।

তারা জড়িয়ে ধরল। এবার আর লুকিয়ে নয়। খোলা আকাশের নিচে।

“আমি তোমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাব না,” বৃষ্টি ফিসফিস করে বলল।

“আর আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না,” রাহাত বলল।

তারপর থেকে তাদের জীবনটা নতুন করে শুরু। তারা ছোট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিল মোহাম্মদপুরে। বৃষ্টি স্কুলে শিক্ষকতা করত, রাহাত তার চাকরি। সন্ধ্যায় তারা একসাথে রান্না করত, গল্প করত, কবিতা পড়ত।

এক বছর পর।

বৃষ্টির বাবা-মা শেষমেশ মেনে নিলেন। বিয়ে হলো সাদামাটাভাবে। কিন্তু তাদের ভালোবাসা ছিল রাজকীয়।

বিয়ের পরের প্রথম বর্ষাকাল। তারা ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিল। বৃষ্টি রাহাতের গলা জড়িয়ে বলল, “জানো, আমার নামটা সত্যি হয়ে গেছে। তুমি আমার জীবনে এসে সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছ। ভালোবাসায়, আনন্দে।”

রাহাত তার কপালে চুমু খেল। “আর তুমি আমার শুকনো জীবনটাকে সবুজ করে দিয়েছ।”

তারা অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি পড়ছিল অবিরাম। যেন আকাশও তাদের ভালোবাসায় সাক্ষী হতে চায়।

....
👁 400