লাল শাড়ির রোমান্টিক স্বপ্ন

ঢাকার ভিড়ে ভরা রাস্তায় প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম। নাম তার আয়েশা। আমি রাহাত। একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে জুনিয়র ডেভেলপার। সে তখন একটা বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করত। আমাদের প্রথম দেখা একটা কর্পোরেট ইভেন্টে। সে লাল শাড়িতে, চুল খোলা, আর হাসিতে যেন পুরো হলঘর আলো হয়ে গিয়েছিল। আমি সেদিন শুধু একবার তাকিয়েছিলাম, কিন্তু সেই চাহনি যেন আমার বুকের ভিতর কোথাও গেঁথে গিয়েছিল।

kxz

সেই ইভেন্টের পর দিন দশেক কেটে গেল। আমার বন্ধু সোহেল বলল, “রাহাত, তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। খুব ভালো ফ্যামিলি। আয়েশা নাম।” আমি প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন ছবি দেখলাম, চোখ কচলে দেখলাম—এ তো সেই মেয়ে! বুকটা ধক করে উঠল।

বিয়ের কথা পাকা হলো দ্রুত। দুই পরিবারের মধ্যে মিল ছিল অনেক। আমার বাবা-মা গ্রামের মানুষ, তারাও ঢাকায় থাকতেন। আয়েশার বাবা চাকরি করতেন সরকারি অফিসে। প্রথম দেখাতেই আমরা দুজন লজ্জায় মাথা নিচু করে হাসলাম। তারপর কথা বলতে বলতে জানলাম, সেও আমাকে সেই ইভেন্টে লক্ষ করেছিল। “তুমি তো খুব মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছিলে, কিন্তু মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছিলে,” বলে হেসেছিল সে।

kx/춺'

বিয়ে হলো শীতের শেষে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। ঢাকার একটা কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান। আয়েশা লাল বেনারসিতে যখন নেমে এলো, আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। সে আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “রাহাত, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।” আমি তার হাত চেপে ধরে বললাম, “আমিও। কিন্তু একসাথে তো ভয় কমবে।”

বিয়ের রাতে আমাদের নতুন ফ্ল্যাটে যখন একা হলাম, চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল বিছানায়। আয়েশা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ছিল। আমি তার কপালে চুমু খেয়ে বললাম, “আজ থেকে তুমি আমার। আর আমি তোমার। কোনো লুকোছাপা নেই।” সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে ভয়, লজ্জা আর একটা অদ্ভুত আলো। আমরা সেই রাতে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তার ছোটবেলার গল্প, আমার গ্রামের স্মৃতি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তারপর ধীরে ধীরে শরীরের কাছে এলাম। তার নরম ত্বক, তার শ্বাসের উষ্ণতা, সবকিছু যেন নতুন করে আবিষ্কার করছিলাম। সেই রাতটা ছিল আমাদের প্রথম মিলনের রাত—ধীর, সুন্দর, ভরা আবেগে।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস ছিল স্বপ্নের মতো। সকালে আমি অফিস যাওয়ার আগে সে আমার জন্য টিফিন বানিয়ে দিত। “খেয়ে যেও, না হলে রাগ করব,” বলে হাসত। আমি অফিস থেকে ফিরে দেখতাম সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরত। “আজকে কত দেরি করলে!” বলে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ দেখাত। আমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলতাম, “তোমার জন্যই তো তাড়াতাড়ি ফিরি।”

কিন্তু জীবন তো শুধু মধু দিয়ে তৈরি নয়। একদিন ছোট্ট একটা ঝগড়া হলো। আমি অফিসের প্রেশারে বাড়ি ফিরতে দেরি করেছিলাম। সে রান্না করে অপেক্ষা করছিল। যখন ফিরলাম, খাবার ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। সে চুপ করে বসে ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করায় বলল, “তুমি তো শুধু কাজ আর কাজ। আমাকে মনে নেই?” আমি প্রথমে বিরক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু তার চোখের কোণে পানি দেখে বুকটা মুচড়ে উঠল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “সরি আয়েশা। তুমি আমার সব। কাজ তো তোমার জন্যই।” সেই রাতে আমরা অনেকক্ষণ জড়াজড়ি করে শুয়ে ছিলাম। সে আমার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলেছিল, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি রাহাত। কখনো ছেড়ে যেও না।”

সেই বছরের গ্রীষ্মে আমরা গ্রামে গিয়েছিলাম। আমার দাদার বাড়ি, চট্টগ্রামের কাছে একটা ছোট গ্রামে। সেখানে নদীর ধারে বাঁশের ঘর। আয়েশা প্রথমে একটু অস্বস্তিতে ছিল, কিন্তু দু-তিন দিনের মধ্যে গ্রামের মেয়েদের সাথে মিশে গেল। সকালে উঠে সে আমার মায়ের সাথে রান্না করত। আমি দেখতাম তার হাতে ময়দা মাখা, কপালে ঘামের ফোঁটা। সেই দৃশ্য দেখে মনে হতো, এই মেয়েটা আমার জন্যই তৈরি হয়েছে।

একদিন বিকেলে নদীর ধারে আমরা দুজন হাঁটছিলাম। চারদিকে সবুজ ধানের খেত, দূরে পাখির ডাক। সূর্য ডুবছে। আয়েশা আমার হাত ধরে বলল, “রাহাত, এখানে যদি আমরা থাকতাম? ঢাকার এই ভিড় ছেড়ে?” আমি হেসে বললাম, “থাকব তো। একদিন। তোমার সাথে যেকোনো জায়গায়।” সে থেমে দাঁড়াল। তার চোখে চাঁদের আলো পড়ছিল। আমি তাকে কাছে টেনে নিলাম। তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলাম। সেই চুমু ছিল দীর্ঘ, গভীর। চারপাশের প্রকৃতি যেন আমাদেরই দেখছিল। সেই রাতে বাঁশের ঘরে, মশারির ভিতরে, আমরা একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। তার শরীরের প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা ছোঁয়া যেন আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। সে আমার নাম ধরে কাঁপছিল, “রাহাত... আরও কাছে...” আমরা সেই রাতে ঘুমাইনি অনেকক্ষণ। শুধু একে অপরের শরীরে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

গ্রাম থেকে ফিরে ঢাকায় নতুন একটা চ্যাপ্টার শুরু হলো। আয়েশা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। প্রথমে সে খুব ভয় পেয়েছিল। “আমি মা হব? আমি তো এখনো ছোট!” বলে কাঁদত। আমি তার পেটে হাত রেখে বলতাম, “তুমি সবচেয়ে সুন্দর মা হবে। আমাদের ছোট্ট রাজপুত্র বা রাজকন্যা।” তারপর তার মেজাজ খারাপ হতো, খাবারে অরুচি, শরীর ভারী। আমি অফিস থেকে ফিরে তার পা টিপে দিতাম, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। “তুমি আমার জন্য এত কষ্ট করছ, আমি তোমাকে কী দিতে পারি?” বলতাম। সে হেসে বলত, “শুধু ভালোবাসো। সারাজীবন।”

নয় মাস পর আমাদের মেয়ে হলো। নাম রাখলাম আফরিন। ছোট্ট আফরিন যখন প্রথম কাঁদল, আয়েশা আমার হাত চেপে ধরে বলল, “দেখো, আমাদের ভালোবাসার ফল।” হাসপাতালের সেই রুমে আমরা তিনজন। আমি আয়েশার কপালে চুমু খেলাম। “তুমি আমার নায়িকা।”

সময় চলতে লাগল। আফরিন বড় হতে লাগল। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হতো, কিন্তু প্রতিবারই মিলন হতো আরও গভীর। একবার আয়েশা রাগ করে বলেছিল, “তুমি আর আমাকে সময় দাও না!” আমি তাকে নিয়ে সারপ্রাইজ ট্রিপ নিয়ে গিয়েছিলাম কক্সবাজারে। সমুদ্রের ধারে হোটেলের বারান্দায় বসে আমরা অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলাম। সে আমার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “রাহাত, তুমি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।”

সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের মাঝে আমরা আবার একে অপরের কাছে ফিরে গেলাম। রুমের ভিতরে, জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। আয়েশার শরীর এখনো আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর। তার স্তন, তার কোমর, তার ঊরু—সবকিছু আমাকে পাগল করে। আমি তার প্রতিটা ইঞ্চি চুমু খেয়ে বললাম, “তুমি আমার জীবন।” সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপছিল, “আরও জোরে... তোমার সবটা চাই...” সেই রাতে সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা মিলিত হয়েছিলাম। ঘামে ভেজা শরীর, দ্রুত শ্বাস, আর অসীম ভালোবাসা।

বছরগুলো কেটে যাচ্ছিল। আফরিন পাঁচ বছরের হলো। আমরা এখনো প্রতি রাতে একে অপরকে আলিঙ্গন করে ঘুমাই। কখনো সে আমার বুকে মাথা রাখে, কখনো আমি তার কোলে। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। একদিন বৃষ্টির দিনে বিদ্যুৎ চলে গেল। আমরা তিনজন মিলে মোমবাতি জ্বালিয়ে গল্প করলাম। আয়েশা আফরিনকে গান শোনাচ্ছিল। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—এটাই তো স্বর্গ।

একবার আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। জ্বরে কাঁপছিল। আমি রাত জেগে তার মাথায় পানি দিচ্ছিলাম। সে দুর্বল গলায় বলল, “রাহাত, তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?” আমি তার হাত ধরে বললাম, “আমি সবসময় থাকব। তোমার পাশে।” সে সুস্থ হয়ে উঠলে আমরা আবার নতুন করে প্রেম করলাম। তার শরীর এখনো আমাকে আকর্ষণ করত। আমি তার পিঠে হাত বুলিয়ে, তার ঘাড়ে চুমু খেয়ে, তার সমস্ত শরীরকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতাম।

আমাদের প্রেম কখনো পুরনো হয়নি। প্রতিদিন নতুন। সকালের চা, রাতের খাবার, ছোট ছোট চুমু, লম্বা আলিঙ্গন—সবকিছুতেই ভালোবাসা। আয়েশা একদিন বলেছিল, “রাহাত, তুমি আমার চাঁদ। আমার জীবনের আলো।” আমি জবাবে বলেছিলাম, “আর তুমি আমার আকাশ। যেখানে আমি হারিয়ে যেতে চাই চিরকাল।”

আজও, বছরের পর বছর পরেও, যখন চাঁদ উঠে, আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত ধরে থাকি। আফরিন ঘুমিয়ে পড়লে আমরা একে অপরের চোখে তাকাই। সেই চাহনিতে এখনো সেই প্রথম ইভেন্টের আলো আছে। সেই লজ্জা, সেই আবেগ, সেই অফুরন্ত ভালোবাসা।

 

....
👁 392